ফাগুন হাওয়ার উড়াল পাখী – জন মার্টিন

  •  
  •  
  •  
  •  

১৯৫২ সনে ওই গ্রামে আমি থাকলে ঠিক এই কাজগুলো করতাম। রাতের অন্ধকারে দেয়ালে লিখতাম, ‘রাষ্ট্র ভাষা বাংলা চাই’, ‘উর্দু ভাষা মানি না’ এবং ‘দেশালাই কাঠি।’ এগুলো লিখে বসে থাকতাম না। আমি নাটক করতাম। দ্রোহের নাটক। নীল-দর্পণ তেমন একটি নাটক। আমি তো নীল-দর্পণ নাটকটি সেই আশির দশকে বাংলা একাডেমীতে করেছি।
আমি খোলা মাঠে প্যান্ডেল বানাতাম। মাইকিং করে মানুষ ডাকতাম। তারপর হ্যাজাক লাইটে নাটক করতাম। নাটক করতে গিয়ে আমি মৌসুমীর প্রেমে পড়তাম। লুকিয়ে ওর হাত ধরতাম। দুজনের মধ্যে সাগরের মতো বাঁধা থাকলেও আমরা চোখে চোখে কথা বলতাম। রিহার্সাল এ আমি ওর পাশে বসতাম। ও সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে আমার দিকে তাকাতো। আমি মিটি মিটি হাসতাম। নাটকের রিহার্সাল শেষে আমি ওকে বাড়ি পৌঁছে দেবার কত ফন্দি করতাম। আর এই সব সেই ১৯৫২ সনের জানুয়ারি থেকে শুরু করে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত করতাম। তারপর ২১ শে ফেব্রুয়ারি আমি ঠিকই ওকে নিয়ে মিছিলে যেতাম। মৌসুমীর বাবা হয়তো ওকে আসতে দিতো না। তারপরও মৌসুমী বাড়ি থেকে বেড় হতো। সাদা শাড়ি পড়তো, আমি পাঞ্জাবী পড়তাম , গলায় চাদর জড়িয়ে চিৎকার করে বলতাম, ‘রাষ্ট্র ভাষা বাংলা চাই।’ আমরা দল বেঁধে হাতে হাত ধরে রাস্তায় মিছিল করতাম। ভাষার জন্য।
অথচ ১৯৫২ তে আমার জন্মই হয়নি। কিন্তু আমি ভাবতে শুরু করলাম – ঐখানে আমি ছিলাম। ওগুলো তো আমার গল্প। এই যে আমার জন্মের আগের একটি ঘটনায় আমি দিন, সময় আর কাল ভুলে গিয়ে এক হয়ে যাই – এবং একসময়ে ১৯৫২ ‘র ঘটনা আমার ঘটনা হয়ে উঠে – এই কাজটি কে করছে? আমি মনোযোগ দিয়ে দেখি সেই ম্যাজিশিয়ান এর নাম। তৌকির আহমদ। আচ্ছা …. ওতো আমার নাটকের সহযাত্রী। আমি তো ওর কাজের প্রশংসা করতেই পারি। আর সেই প্রশংসায় একটু পক্ষপাতিত্ব থাকতেই পারে। কিন্তু আমি কোনো রকম পক্ষপাতিত্ব করার আগেই দেখলাম তৌকির- আমাকে সেই ১৯৫২ র ফেব্রুয়ারিতে নিয়ে গেছে।
বাহান্ন কিংবা একাত্তরের গল্প বলার একটি নিয়ম আছে। কে বা কারা যেন একটি ফর্মুলা ঠিক করে দিয়েছে। কি কি বলতে হবে আর কি কি দেখতে হবে তার একটি লিস্টি আছে। ওই লিস্টির সাথে না মিললেই ‘ঘচাং।’
আমার সব সময় মনে হয়েছে, ওই বাহান্নর বা একাত্তরের গল্প কি শুধু ঢাকাতে হয়েছে? ওই ক্র্যাকপ্ল্যাটুনের গল্পের বাইরে আর কোনো গল্প কি আছে? যুদ্ধ কি শুধু মাঠে ময়দানে হয়েছে? মানুষের মনে কোনো যুদ্ধ হয়নি?
সেই একই ফর্মুলায় ১৯৫২ ‘র ফেব্রুয়ারি বললেই আমরা বুঝি – ঢাকা শহর, মেডিক্যাল কলেজ, আর শহীদ মিনার। কিন্তু ‘ফাগুন হাওয়ায়’ আমরা অন্য গল্প দেখলাম। একটি মফস্বলের গল্প। গ্রামটি ঢাকা থেকে অনেক দূরে হলেও ওখানে বাঙালী থাকে, সেই বাঙালীর বুকে ভাষার জন্য আগুন জলে, আর সে আগুনে একটি থানা উড়ে যায়। কেবল ভাষার জন্য।
আমি মন দিয়ে ছবিটি দেখি। সেই বাহান্নর কথা। স্মার্ট-ফোনে হিসাব কষি, ‘৬৭ বছরের পুরানো গল্প।’ আমার মন ভাবে, ‘এতো বছর আগে ওই গ্রামটি কেমন ছিল? মানুষগুলো কোন কাপড় পড়তো, কোন জামা পড়তো, কি ভাবে চুল আঁচড়াতও? বাড়িগুলো কেমন ছিল? মানুষে কি এই ভাবে হাটতো, ঘুরতো আর কথা বলতো?’
আমার ভয় হয়। সেই পুরানো বাড়ি, বাড়ির আসবাব, দরজা জানালা, পর্দা, দেয়ালে ছবির ফ্রেম, খাটের উপরের চাদর – সব ঠিক থাকবে তো? অমন যত্ন করে কি এই ছবিটির ক্যানভাসটি তৈরী হবে?
তৌকির চেষ্টা করেছে। এই সিনেমার বাজেট কত ছিল জানি না। তবে ছবির ক্যানভাস দেখে বুঝা যায় যে অনেক কাটছাঁট করে, খুব সাবধানে ক্যানভাসটা তৈরী করেছে । আর ক্যামেরা ঠিক ওই ক্যানভাসে টাইট শটস দিয়ে আটকে ছিল অনেক জায়গায়। তারপরও ছবির প্রতিটি ফ্রেমে চেষ্টা আর যত্নের স্পর্শ দেখেছি।
প্রথমে গল্পের কথা বলি।
গল্পটি শুরু হয়েছে ধীর গতিতে। কিন্তু দশ মিনিট পরই গল্পটি এগুতে থাকে। আর এই উত্তেজনা শুরু করে সেই পুলিশ অফিসার। তার উদাম চলাফেরা, আর ঔদ্ধত্য তখন থেকেই মনে একটি উত্তেজনা তৈরি করে। একটি পাখি কেবল ‘বৌ কথা কও’ বলেই ছবিতে কেমন করে যেন একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হয়ে যায়। পাখির রূপকটি চমৎকার ভাবে গল্পের সাথে মিলিয়েছে গল্পকার। পুলিশ অফিসার যখন ওই পাখিকে গুলি করে, সেই গুলি হলের ভিতরে বসে থাকা দর্শকের বুক এফোঁড় ওফোঁড় করে ফেলে।
গল্পটি শুরু হয় – পাখি, নষ্ট গাড়ী আর গরুর গাড়ী দিয়ে বেশ এগিয়ে যায়। তারপর একটি নাটকের দল গল্পটি আরো দ্রুত বেগে সামনে নিয়ে যায়। ঠিক সময়ে নীল-দর্পণ বিষয়টি শুরু হয়েছে। আমরা দর্শকদের সিটে বসে ভাবি কখন যুদ্ধটি শুরু হবে। আমরা সবাই জানি – এই যুদ্ধে কারা জিতেছে। তারপরও এই জানা ঘটনা তৌকির চমৎকার ভাবে বলেছে। আর আমরা শুনেছি যেন মনে হয়েছে আমরা কিছুই জানি না। এই প্রথম গল্পটি শুনছি। সিটে বসে উত্তেজনা অনুভব করেছি। সেই বৌ কথা কও পাখি কখন যে আমার মনের পাখি হয়ে গেল – টের পেলাম না।
গল্পটি বিশ্বাসযোগ্য হয়েছে কারণ যারা অভিনয় করেছে তারা ওই গ্রামেই বাস করেছে। আমার তো এখন আর কারো নাম আলাদা করে মনে পড়ছে না। ওদের বেড়ে উঠা, ঘোরাফেরা ওখানেই। অথচ ওদের প্রায় সবাইকেই চিনি। অনেকে তো আমাদের নাটকের সহযোদ্ধা। তারপর ওদের আলাদা করে কেন দেখতে পেলাম না ? সেই ৬৭ বছরের পুরানো কাপড় পরে, মাথায় তেল দিয়ে ওরা যে আন্ডার-টোনে অভিনয় করলো, ঠিক সেই কারণেই এই চেনা মানুষগুলো সেই গ্রামের বাসিন্দা হয়ে গেল।
গল্পটির শেষ এমন একটি গান দিয়ে হলো যে গানের জন্য কোনো বাঙালির কোনো ছবির দরকার হয়না , গল্পের দরকার হয় না। সেই গান হুট করে মনের গভীরে লুকিয়ে থাকা কান্না চোখের কোণ ভিজিয়ে দেয়। তৌকির সেটা জানে। তাই গল্পের শেষে দর্শক ভেজা চোখ নিয়ে বাড়ি ফিরে। একজন নির্দেশক এর চেয়ে বেশি আর কি বা চাইতে পারে?
অনেকদিন পর একটি ছবি দেখলাম – যেটা নিয়ে কথা বলতে ইচ্ছে হলো। আমার ১২ বছরের মেয়েকে নিয়ে ছবিটি দেখেছি। ও আমাদের ভাষা আর স্বাধীনতার কত গল্প শুনেছে। এই ছবিটি ওর মনে কিছু দৃশ্য জুড়ে দিল। আমি তো এমন একটি ছবিই ওকে দেখাতে চেয়েছি। তৌকির আমার হয়ে সেই কাজটি করে দিলো।
এবার কয়েকটি অন্য বিষয়ে মন্তব্য জুড়ে দেই।
কাজটি কঠিন। কারণ গল্পটি ছিল ৬৭ বছরের আগের ঘটনা। সব কিছু সেই পুরানো দিনের মতো করতে হবে তো। একটি চায়ের দোকান যত সহজে সেই পুরানো সময়ে ফিরিয়ে নেয়া যায় – একটি বাজার হয়তো এতো সহজে সেই ৬৭ বছর আগে নেয়া যায় না। আমার মন বলে ওই চায়ের দোকান রাস্তার পাশে হয়তো কোনো খুপরি দোকান নয়। ওটা একটি বাজারের মাঝে থাকলে ক্যানভাসটা আরো বড় হতো। দোকান ঢোকা আর দোকান থেকে বের হয়ে যাওয়ার শটগুলো যে কত ‘টাইট’ করে নেয়া হয়েছে তা বেশ বুঝা যায়। আমার বার বার মনে হয়েছে – আহারে – বাজেট কি আর একটু বাড়ানো যেত? দোকানটি কি বাজারের এক কোনায় হতে পারতো? পুরো বাজারটি সেই ৬৭ বছরের পুরানো বাজার হলে কি চমৎকারই না হতো? এই একই অনুভূতি হয়েছে যখন দেয়ালের লিখন শুরু হয়েছে। লং শটে জায়গাটি যে ভাবে বুঝানো যেত – অমন টাইট শটের দৃশ্য চোখ আর বুকের উপর উঠে বসেছিল। তাই পুলিশ যখন ট্রাক আটকায়, তখন মনে হয় ওটা রাস্তায় নয়, ট্রাকটি কারো বাড়ির সামনে এসে ধরা দিলো। আমি অনুমান করি বাজেটের কারণেই হয়তো ক্যানভাসটা আরো বড় করা যায় নি। কিন্তু এই ছবিতো আনকোরা নতুন কোনো নির্দেশক করেনি। আর তৌকির তো এই ছবি আরেকবার করার সুযোগ পাবে না। তাহলে – বাজেটে আর একটু ধাক্কা দিলে কি এমন হতো?
তৌকির একজন আর্কিটেক্ট। এই কারণেই সেই সময়টিকে ধরার জন্য খুব যত্ন নিয়ে পরিবেশটি তৈরী করেছে । লোকেশনটি চমৎকার। বিশেষ করে থানাটি দারুণ নির্বাচন হয়েছে। পুরো গল্পটি আমাদের মনে লুকিয়ে থাকা আবেগের ডালায় লতার মতো ভর করে এগিয়েছে।
গল্পটি শোনার জন্য আমাদের মনের এই প্রাক-প্রস্তুতি পরিচালক জানত। আর তৌকির ভারী সুন্দর করে সেটা ব্যবহার করেছে। এটাকে কিন্তু ‘গল্প-বলার মুন্সিয়ানা’ বলা যেতেই পারে। আর শেষের সেই গানের কথা তো বললাম।
ভাল লেগেছে কিছু রিলিফ। যেমন ঐযে ‘বোতল থেরাপি’, ‘বোরখা থেরাপি ‘ ‘মোরগ চুরি। ‘ এগুলো কেবল ঘটনা নয়, বরং সেই গ্রামের এক-ঝাঁক তরুণের স্বাভাবিক জীবন যাত্রার দুষ্টু-মিষ্টি গল্প। এই হাস্য রসের ঘটনাগুলো এমন ভারী একটি গল্পকে আর একটু এগিয়ে নিয়েছে। টান টান হয়ে বসা দর্শক একটু স্বস্তি পেয়েছে। এটাই পরিচালকের মাত্রাবোধ।
ক্যামেরা খুব সাধারণ ভাবে ব্যবহার করেও যে একটি চমৎকার চিত্রায়ন করা যায় – তা বেশ উপভোগ করলাম। একবার মনে হয়েছিল – ক্যামেরার কোনো দুর্দান্ত কাজ দেখলাম না তো ? নিজেকেই নিজে উত্তর দিলাম, ‘আরে বোকা, ১৯৫২ তে যে ক্যামেরা ছিল, সেটা দিয়েই সিনেমাটি বানানো হয়েছে। ‘ তৌকিরের এই পরিমিত এবং পরিপক্ব দৃষ্টি আমার ভাল লেগেছে।
আরে, অভিনয় নিয়ে কিছু বললাম না না তো? আচ্ছা সিনেমায় কে কে যেন অভিনয় করেছে? আমি তো ওখানে কাউকে অভিনয় করতে দেখলাম না। যাদের দেখলাম ওরা তো ওই গ্রামেই থাকে। তাইনা ?
মেকআপ নিয়ে একটু বলার ছিল। সেটা আর বললাম না। কখনো তৌকিরের সাথে দেখা হলে এই ছবিটি নিয়ে লম্বা গল্প হবে।
ফেরার পথে আমার মেয়েকে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘কি রে মা, কেমন লাগলো ?’
ও সব কিছু বাদ দিয়ে শুধু পাখীর কথা বললো।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘পাখিটির নাম মনে আছে? ওটা বউ কথা কও।’
ও এক সেকেন্ড ও সময় না নিয়ে বলল, ‘না বাবা। পাখীটির নাম বাঙালী।’
সিনেমাটি তো এই গল্পটিই বলতে চেয়েছে। সেই পাখিটি সিনেমার ফ্রেম থেকে কখন যে উড়ে এসে – প্রবাসে জন্ম নেয়া, বেড়ে উঠা এক কিশোরী মেয়ের মনের ভিতরে অনায়াসে জায়গা করে নিল !
সিডনির রাস্তায় ১০০ কিলোমিটার গতিতে গাড়ি চালাতে গিয়ে আবারও মনে হোল, ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় অনেক অনেক অনেক ভালবাসি।‘
ধন্যবাদ তৌকির। ধন্যবাদ ছবির সামনের, পিছনের সকল কর্মীকে।