ফিদা: বিদগ্ধ প্রেমিক ও শিল্পের যাদুকর -আসমা সুলতানা

  •  
  •  
  •  
  •  

 187 views

আসমা সুলতানা

প্রশ্ন একটাই কিন্তু উত্তর অনেক;  শিল্পী মকবুল ফিদা  হুসেন (১৯১৫-২০১১) আমাদের মনে সেই প্রশ্ন রেখে চলে গেছেন এই পৃথিবী ছেড়ে। আজও পৃথিবী শিল্পকলা ও শিল্পীদের কিভাবে মূল্যায়ন করছে ?
নিজভূমি ভারত থেকে বহুদূরে লন্ডনে, ২০১১ সালের ৯ জুনে, শিল্পী মকবুল ফিদা হুসেন তাঁর অসাধারণ আর বর্ণিল জীবনের সমাপ্তি ঘটিয়েছিলেন। নিজস্ব মহিমায় ভাস্বর শিল্পী মকবুল ফিদা হুসেন সফল হয়েছিলেন স্বতন্ত্র একটি জীবনধারা গড়ে তুলতে। প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত লম্বা তুলি হাতে নিয়ে ঘুরে বেড়াতেন। যেমনটা ফরাসী শিল্পী অঁরি মাতিস তাঁর লম্বা লাঠির ডগা দিয়ে শিল্প জগতে রাজত্ব করতেন, বা স্প্যানিশ পরাবাস্তব শিল্পের ক্ষ্যাপা রাজা শিল্পী সালভাদর দালিও তাঁর যাদুর  কাঠির মত লম্বা তুলি নিয়ে দাপিয়ে বেড়িয়েছেন সারা বিশ্বময়।

শিল্পী মকবুল ফিদা হুসেন ও তাঁর তুলি

মকবুল ফিদা হুসেন এমন একজন শিল্পী যিনি শুধুমাত্র নিজের শিল্পকর্মে মাধ্যমেই পরিচিত হননি সারা বিশ্বে, তাঁর সমগ্র জীবন যেন বহন করে আছে তার অসীম সাহসিকতার ইতিহাস। যিনি সেই যাত্রা পূর্ণ করতে সক্ষম হয়েছেন, শিল্পী মাত্রেরই যা কাম্য; একজন চিরায়িত প্রেমিকের স্বরূপ, এক মাতৃহারা শিশু, সুতীব্র আবেগময় দেশপ্রেমিক। শুধুই একজন শিল্পী নন তিনি একজন যোদ্ধাও বটে!

যে দেশপ্রেমিক শিল্পী আধুনিক শিল্পকলার জগতে ভারতের নাম চিরস্থায়ী করেছেন, তাকেই মৃত্যুবরণ করতে হলো স্বদেশ ছেড়ে বহু দূরে প্রবাসে, শিল্পী হিসেবে এটা তাঁর যতটা দূর্ভাগ্য তার চেয়ে বেশী লজ্জা ভারতের। ধর্মান্ধতার সীমাহীন  অজ্ঞতা আর রাজনৈতিক সমীকরণের সুবিধাবাদীতার প্রতিবাদে স্বেচ্ছা নির্বাসিত শিল্পী মকবুল ফিদা হুসেনের কণ্ঠেই যেন বেজে ওঠে যন্ত্রণার শেষ ভায়োলিন। যে কথাটি তিনি বলেছিলেন হয়তো আক্ষেপ করে বা কষ্টের প্রকাশে, আজ আর তা কে‌উই বলতে পারবে না খোলাসা করে: ‘আমাকে কেউ বেধে বাখতে পারবে না, আমি কালই  ফিরে যেতে পারবো, কিন্তু জানবেন, আমি যেখানেই যাই না কেনো প্যারিস, লন্ডন, নিউইয়র্ক বা কাতার, আমি চিরকাল এক ভারতীয় শিল্পী হয়েই থাকবো’।

শিল্পী মকবুল ফিদা হুসেনের আঁকা বিতর্কিত মাদার ইন্ডিয়া

ভারতবর্ষের ঠিক জন্মলগ্ন, ১৯৪৭ সাল থেকে শুরু তাঁর সুদীর্ঘ পথচলার মহাকাব্য। সেই বছরেই শিল্পী মকবুল ফিদা হুসেন যোগ দেন ‘দি বোম্বে প্রোগ্রেসিভ আর্টিস্টস গ্রুপ’ এ। এর মাধ্যমেই খুঁজে পান নিজের প্রতিভা বিকাশের সিঁড়িটা, এরপর থেকে আর কোনোদিনও পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে। সঙ্গে ছিলেন শিল্পী বন্ধু  এফ, এন, সুজা ও এস, এইচ, রাজা। যদিও তাঁর সহশিল্পী ও সহকর্মী দুজন খ্যাতির অন্বেষণে বিদেশের মাটিতে পা বাড়িয়েছিলেন। কিন্তু ফিদা হুসেন দেশের মাটিতেই শিল্পচর্চ্চা করবেন বলে দৃঢ় সংকল্প করেছিলেন এবং তাঁর স্বপ্নকে স্বদেশের মাটি, জলে, আবহাওয়ায় বেড়ে উঠতে দিতে থাকেন। যেনো ভারতমাতার সাথেই তাঁর যত সর্ম্পকের গাঁথুনি, মাতৃহীন এক শিশুর মত সেই সার্বজনীন মাতৃরূপকে খোঁজার প্রবল এক আকুতি নিয়ে রয়ে যান স্বদেশের মাটিতেই।

দেশ বিভাগের সমসাময়িক সময়ে শিল্পকলায় জাতীয়তাবাদের মতাদর্শের সংকীর্ণ পরিসর ‍ভেঙ্গে আন্তর্জাতিকতার বিশালতা খুঁজতে চল্লিশের দশকের শুরুতে যেসব নবীন সম্ভবনাময়ী শিল্পীরা এগিয়ে এসেছিলো, শিল্পী মকবুল ফিদা হুসেন ছিলেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম। জাতীয় চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে কিন্তু আর্ন্তজাতিক আঙ্গিকে শিল্পচর্চার যে আভঁ-গার্ড ধারা শুরু হয় উপমহাদেশে তার বীজ বপন করে যান কবিগুরু  রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। রবীন্দ্রনাথের রোপিত সেই আধুনিক শিল্পের বীজ থেকে ধীরে ধীরে বেড়ে উঠে আজ যা মহীরুহ, তারই অন্যতম এক প্রধান শাখা শিল্পী মকবুল ফিদা হুসেন। আমাদের এই বাংলায় যেমন শিল্পাচার্য জয়নুল ‍আবেদিন ছিলেন আধুনিক শিল্পের প্রধান পুরুষ সারা উপমহাদেশের মধ্যে।

এমন কিংবদন্তীয় এক শিল্পীকে, দেশের গর্বকে কি মূল্যায়ন করা সম্ভব আদৌ?  মানুষের প্রানঢালা ভালোবাসা ছাড়াও, দেশ তাকে প্রদান করেছে সবগুলো সর্বোচ্চ সম্মাননাগুলো। ১৯৫৫ সালে ভারতীয় সরকার শিল্পী মকবুল ফিদা হুসেনের প্রদান করে, পদ্মশ্রী পুরস্কার। এরপরে ১৯৭৩ সালে তাঁকে ভূষিত করা হয়, পদ্মভূষণ পুরস্কারে, ১৯৯১ এসে আবার পদ্ম বিভূষণও গ্রহণ করেন তিনি। ১৯৭১ সালে সাও পাওলো বিয়েনালে শিল্পী পাবলো পিকাসোর সঙ্গে শিল্পী মকবুল ফিদা হুসেনকেও বিশেষ আমন্ত্রণ জানানো হয়। বিরানব্বই বছর বয়সে কেরালা সরকারের দেয়া রাজা রবি বর্মা পুরষ্কার নিয়ে বেশ প্রতিবাদের ঝড়ও ওঠে।

শিল্পী মকবুল ফিদা হুসেনের আঁকা মাদার তেরেসা

এত স্বীকৃতি সত্ত্বেও, একথা সবারই জানা যে ফিদা হুসেন ছিলেন ভারতীয় গোড়া হিন্দু সমাজের রোষানলের শিকার। ভারতে উগ্র ধর্মীয় মৌলবাদ মাথা চাড়া দিয়ে উঠলে এক সময়ে নন্দিত চিত্রকর্ম  চিহ্নিত হয় বিতর্কিত হিসাবে। যাদের কাছে চিত্রকর্ম কোন বিশেষ অবস্থানে নেই, তারা কিভাবে কয়েক দশক আগে আঁকা ফিদা হুসেনের চিত্রকর্মে ধর্মের অবমাননা খুঁজে পায় তা বিস্ময়ের ব্যাপার।

যারা শিল্পের ভাষা বুঝতে অপরাগ তারাই বিচারের মানদণ্ড তুলে নেয় হাতে ও এমন ব্যক্তিত্বদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করান যে ভাবতেও অবাক লাগে। এই একবিংশ শতাব্দীতেও শিক্ষিত ও শিল্পিত ‍মন-মানসিকতার মানুষদেরও মেনে নিতে হয় এমন অন্যায় আব্দার সার্বজনীন স্বার্থে। ফিদা হুসেনের আঁকা ‘মাদার ইন্ডিয়া’ ও অন্যান্য হিন্দ‍ু ধর্ম এবং পুরাণের দেব দেবীদের বণর্নামূলক কাহিনী চিত্র, মহাভারতের বা হিন্দু উপাখ্যানের বিভিন্ন চরিত্রের সহজ সাবলীল প্রকাশ কোনো ভাবে না বুঝেই এক শ্রেনীর মানুষ প্রতিবাদ শুরু করে, মৌলবাদীদের উদ্দেশ্যমুলক প্ররোচনায়। রাজনৈতিক ও ধর্মীয় স্বার্থে বিরোধিতা করা হয়, অত্যন্ত আক্রমনাত্মক ভাবে। এমনকি শিল্পী ফিদা হুসেনকে হতে হয় ব্যক্তিগত আক্রমনের শিকার। তারপরেও ফিদা হুসেন আপন সাহসিকতায় সমুজ্জ্বল ছিলেন, ছিলেন দৃঢ়চিত্ত; দেশ থেকে তিনি নড়বেন না। কিন্তু হায়, নিয়তির নিষ্ঠুরতায় হার মানায়, মাঝে মাঝে মানুষের সীমাহীন ভালোবাসার মূল্যও।

মৃত্যুর মাত্র কয়েক বছর আগে প্রিয় দেশমাতার কোল ত্যাগ করতে হয় ভারতের এই কৃতি সন্তান মকবুল ফিদা হুসেনকে। তিনি এমন এক শিল্পী ছিলেন যাঁর কারো স্বীকৃতির প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন নেই নিরাপত্তার চাঁদরে নিজেকে লুকিয়ে রাখার। ফিদা হুসেন ‌এক সাহসী পৌরুষের প্রতীক। তাঁর বলিষ্ঠ ফর্ম গুলোতেই সেই পরিচয় মিলে যায়। তাঁর আঁকা ঘোড়া গুলো দৌঁড়ে বেড়ায়, দাপিয়ে বেড়ায় সারা ক্যানভাসময় যেনো শিল্পীর নিজেরই আত্মপ্রতিকৃতী। যেমন সারা বিশ্বময় তাঁর নিজের পৌরুষের দীপ্তিময় প্রতাপ ছড়িয়ে দিয়েছেন।

তরুণ বয়সে শিল্পী মকবুল ফিদা হুসেন তাঁর শিল্পকর্মের সাথে

মকবুল ফিদা হুসেনের কাজকে কোনো সুনির্দিষ্ট ধারার মাঝে আটকানো কঠিন, সংজ্ঞায়িত করাও সহজ নয়। হয়তো অনেকেই বলবেন কিউবিজমের কথা বা পিকাসোর মত বিরাট ক্যানভাসে ভারসম্য রক্ষা করবার কথা। সমসাময়িক শিল্পকলায় ফিদা হুসেনের শৈলী অনবদ্য ও অনন্য। যা সহজে চিহ্নিত করা যায়। অনেকটা কোলাজের মত, দ্বিমাত্রিক ফর্মগুলো যেনো ভাসমান ক্যানভাসের খোলা আকাশে ভেসে বেড়াচ্ছে। মোটা গাঢ় বর্হিরেখা ফর্মগুলোকে আরো বলিষ্ঠতা দেয়। উজ্জ্বল ও সাহসী রঙের ব্যবহার তাঁর কাজকে সর্বদা দিয়েছে তারুণ্যের ছোয়া। বিষয়বস্তু হিসেবে ফিদা বেছে নিয়েছিলেন নিজস্ব সাংস্কৃতির ও জীবনধারার ইতিহাস; মহাভারত বা রামায়নের কাহিনী । মায়ের মুখ খুঁজতে গিয়েই বোধ করি সৃষ্টি করেছেন মাদার তেরেসার উপরে আঁকা সিরিজ গুলো । ভারতীয় জীবনের অবিচ্ছেদ্য আদর্শ মহাত্মা গান্ধীর জীবনী এঁকেছেন গভীর জীবন দর্শন উপস্হাপনায়। এমন সব সমকালীন জাতীয় বিষয়বস্তুগুলো ফিদা তাঁর শিল্পের মাধ্যমে, সৃষ্টির মাধ্যমে, আধুনিক ও আর্ন্তজাতিক ভাবে উপস্হাপিত করেছেন। তাঁর প্রাকৃতিক সহজাত ভঙ্গিমাময় শিল্পকর্ম এবং স্বতঃস্ফুর্ত ভাবের প্রকাশ যেনো ভারতের আধুনিক শিল্পকলার ‘মহাভারত’। এমনকি এপিক সাইজের ক্যানভাসগুলোও ভারত মাতার বিশালত্বই প্রমান করে বারংবার।
ফিদা হুসেনের শিল্পী হয়ে ওঠার গল্পের শুরুটা সবার জানা হয়ে গেছে ইতমধ্যে। ভাগ্যের অন্বেষণে এক কিশোর বোম্বে শহরে খালি পায়ে হেঁটে বেড়িয়েছেন । অল্প পারিশ্রমিকের বিনিময়ে সিনেমার পোষ্টার ও ব্যানার এঁকে শুরু তাঁর শিল্পী জীবনের যাত্রা। সেই সিনেমাতেইে এসে যেনো পূর্নতা পেলো শেষে তাঁর তীর্থযাত্রা। ১৯৬৭ সালেই  তিনি বানালেন প্রথম চলচ্চিত্র ‘‘থ্রু দ্য আইস অব এ পেইন্টার’ এবং প্রথম বারেই জিতে নিলেন বার্লিন ফিল্ম ফেষ্টিভালে গোল্ডেন বিয়ার পুরষ্কার। এরপরে ‘গজগামিনী’তে, মাধুরী দিক্ষিতকে আমরা পাই, প্রধান চরিত্রে। সেই শ্বাশত প্রেমিকার চরিত্র, যাকে দেখে কালিদাস রচনা করেন শকুন্তলা আর যাকে দেখেই ভিঞ্চি আঁকেন মোনালিসা। সেই চিরন্তন ভারতীয় নারীর দেখা মেলে কখনও মাতৃরূপে, কখনও প্রেমিকারূপে আবার কখনও বিদ্রোহী রূপে। সময়ের খেলা থামে না, বয়ে যায় সে, প্রেমিক মন খুঁজে বেড়ায় যুগযুগান্তরে সেই প্রেমিকার মন, সেই মাতৃরুপী প্রেমিকার ভালোবাসা।

শিল্পী মকবুল ফিদা হুসেন এবং তাঁর শিল্পকর্ম

একাধারে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত চিত্রশিল্পী, ফটোগ্রাফার, চলচ্চিত্র পরিচালক ফিদা হুসেন প্রতিভা নিয়েই জন্ম নিয়েছিলেন। কোন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াই স্বশিক্ষিত ফিদা হুসেন শুধুমাত্র নিজের দেশেই নয় বরং সারা বিশ্বে নিজের জায়গা করে নিয়েছিলেন। তিনি আবারো প্রমাণ করলেন প্রতিভা সর্বদাই জন্মগ্রহন করে, প্রতিভা প্রতিষ্ঠানে গড়ে ওঠে না। সর্বকালের শ্রেষ্ঠ শিল্পী ভিনসেন্ট ভ্যান গো যেমন ছিলেন স্বশিক্ষিত শিল্পী। বাংলাদেশের শিল্পী এস, এম সুলতান এর নাম বলে নেয়া যায় এই সুযোগে। তবে ফিদা হুসেনের মত যোগ্য মর্যাদা আমরা তাকে দিতে পারিনি, বলাই বাহুল্য।
শিল্পী ফিদা হুসেন বহুগুণের অধিকারী ছিলেন বটে, তাঁর আরেকটি অসাধারণ ক্ষমতা ছিল, তিনি জানতেন কিভাবে তাঁর শিল্পকর্মকে বাজারজাত করতে হয় এবং এই কষ্টসাধ্য কাজটি তিনি নিজেই করতেন। পৃথিবীর বহু নামিদামী অকশন হাউসগুলোতে শিল্পী মকবুল ফিদা হুসেনের শিল্পকর্ম বিক্রি হয় আকাশ ছোঁয়া দামে। শিল্পকর্মের মুল্য অনেক বাড়িয়ে তিনি প্রমাণ করেছিলেন, শিল্পকর্মের অনন্যতাই এর বিক্রির মূল নিয়ামক, দাম নয়। আমাদের দেশের প্রবাসী শিল্পী শাহাবুদ্দীনের কথা এখানে আনাটা প্রাসঙ্গিক, আমাদের দেশে শিল্পকর্মের মূল্য ও বাজারকেও তিনি অনেকটা আকার প্রদান করেছেন ।
মনে পড়ে, শিল্পী শাহাবুদ্দিন আহমেদ তাঁর কাজ সম্পর্কে  বলতে গিয়ে একবার এক সাক্ষাতকারে যা বলেছিলেন, তার মর্ম করলে দাড়ায় যে, মানুষের সামনে যে বাধাগুলো আসে তা দেখে ভয় পেয়ে পিছিয়ে গেলে চলবে না, বাধাকে অতিক্রম করতে হবে আর বাধা অতিক্রম করতে প্রয়োজন, লাফ দেয়া। কারণ জীবনে উত্থান পতন থাকবেই, চিরসত্য সে কথা!

শিল্পী ফিদাকেও অনেক উত্থান পতনের মধ্যে দিয়ে জীবনে অগ্রসর হতে হয়েছে। জীবনে কখনও এমন সময় আসে যখন নিয়তি পায়ে পায়ে অনেক দূর নিয়ে আসে। এমনকি স্বদেশও ছাড়তে হয় ।সেই ভাবেই ফিদা হুসেন ছিটকে পড়েন নিজ দেশ থেকে ইংল্যান্ডের মাটিতে। আধুনিক শিল্পকলার চর্চার বলয় লন্ডন-নিউইয়র্ক -প্যারিস। লন্ডন পৃথিবীর সুন্দরতম প্রাচীন শহরের একটা। সেই বলয়ে যে কোনো শিল্পীই পাবেন নিরাপদ আশ্রয়। মৃত্যু হলেও ক্ষতি নেই এই শহরের বুকে, এই শহর যুগ যুগ ধরে এমন অনেক বিখ্যাত ব্যক্তিত্বদের মৃত্যুর সাক্ষী। শেষ পর্যন্ত নিজের বুকেও ঠাঁই দিয়েছে তাদের। কিন্তু নিজের মাতৃভুমি থেকে বহুদুরে অপিরচিত শহরে মৃত্যুবরণ করা কারোই কাম্য নয়। মকবুল ফিদা হুসেনও নিজের স্বদেশ থেকে বহুদূরে নিভৃত অভিমানে চলে গিয়েছেন আমাদের ছেড়ে, চিরতরে। তবে তিনি আমাদের হৃদয়ে আজও আসন অধিকার করে আছেন। সেই স্থান কখনও হারিয়ে যাবার নয়।

শিল্পী মকবুল ফিদা হুসেন তাঁর শিল্পকর্মের সামনে

এশিয়ার পিকাসো নামে খ্যাত হলেও ফিদা হুসেন এর তুলনা চলে না। ফিদা হুসেন এমন একজন শিল্পী, যিনি নিজ নামে, নিজ কর্মে ও নিজস্ব শিল্পকলা কৌশলের মাধ্যমেই পরিচিত ও খ্যাত। এমনভাবে খুব কম শিল্পী সফল হতে  জানেন। যিনি জীবনের শুরু থেকে শেষ অবধি একই ধারায় কাজ করে গেছেন। ৯৫ বছর বয়সেও তাঁর তুলি কাঁপেনি একফোটাও বয়সের ভারে। যে একদিন যাত্রা শুরু করেছিলো মাতৃরুপ সন্ধানে পৃথিবীর প্রান্তে সমস্ত নারীদের মাঝে, সেই যাত্রাকে তিনি র্পূনতা দিয়েছিলেন দুঃসাহসিক অভিযানে! সেই চিরতরুণ প্রেমিক ফিদা হুসেনকে কি পৃথিবী মনে রাখবে? অবশ্যই… মনে রাখার মত জীবন আর শিল্পের অর্ঘ্য তিনি রেখে গেছেন আমাদের মাঝে।

আসমা সুলতানা: ভিজ্যুয়াল আর্টিষ্ট, কবি, অনুবাদক, সমালোচক।
চিত্রকলা, শিল্পকলা এবং শিল্পকলার ইতিহাসে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন ঢাকা, লন্ডন ও টরোন্টোতে।
বসবাস: টরন্টো, কানাডা।
দেশে বিদেশে বেশ কিছু একক এবং যৌথ প্রদর্শনী ছাড়া শিল্পকলার ইতিহাস নিয়ে লেখালেখি করেন তাঁর নিজস্ব ব্লগে।
ওয়েব: www.asmasultana.co
গ্রন্থ: দেখার দৃষ্টিভঙ্গি(অনুবাদ); কেনেথ ক্লার্ক: সভ্যতা-একটি ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি’(অনুবাদ); ই এইচ গমব্রিখ: পৃথিবীর সংক্ষিপ্ত ইতিহাস(অনুবাদ); বালিশে লেগে থাকে বনভূমির ঘ্রাণ(কবিতা)।

0 0 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments