ফিরে দেখা একাত্তর । এস এম জাকির হোসেন

  •  
  •  
  •  
  •  

 281 views

[ ১৯৭১ সাল। রক্তক্ষয়ী ৯ মাসের যুদ্ধে বীর বাঙালী মুক্তিযোদ্ধারা মুক্ত করেছিলেন আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ। এই যুদ্ধে আমরা হারিয়েছি ত্রিশ লক্ষ শহীদ, দুই লক্ষ নারীর সম্ভ্রম ও আত্মত্যাগ এবং অসংখ্য বুদ্ধিজীবির প্রাণ। ঘৃণাভরে ধিক্কার জানাই পাক হানাদার ও তাদের এদেশীয় দোসর রাজাকার, ঘাতকদের। বিজয়ের এই মাসে আমরা প্রশান্তিকায় শ্রদ্ধা জানাই বীর মুক্তিযোদ্ধাদের। কথাসাহিত্যিক ও গবেষক এস এম জাকির হোসেন লিখেছেন ‘ফিরে দেখা একাত্তর’ শিরোনামের এই মূল্যবান লেখাটি। বিজয়ের এই মাসে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছে।]

প্রথম পর্ব:
মোমের আলোয় কি ঢেকে দেয়া যায় সবটুকু অন্ধকার?
কিংবা, ধুয়ে ফেললেই কি মুছে যায় সব রক্তের দাগ?

না, যায় না। কিছু কিছু অন্ধকার কখনই কাটে না। আঁধারের কোন রঙ নেই। আঁধার যতই গাঢ় হয়ে ওঠে- মনে বাসা বাঁধে ভয়, শঙ্কা, আতঙ্ক। গভীর রাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে জেগে উঠলে ভয়ঙ্কর দুঃস্বপ্নের ছায়ারা তাড়া করে ফেরে। কখনো মন থেকে মুছে ফেলা যায় না, হাজার বাতির আলোকরশ্মিও ঢেকে দিতে পারেনা সেই ভয়াল কালো অন্ধকার। ফ্রেমে বাঁধানো ছবির মত ক্ষণে ক্ষণে চোখের সামনে ভেসে ওঠে। নিশীথের অন্ধকার ভেদ করে ভেসে আসা ভয়ঙ্কর শ্বাপদের রক্ত হিম করা চিৎকারে কেঁপে ওঠে অন্তরাত্মা!
কিছু কিছু সময় বড় বেশী স্থির। কারো কারো কাছে অতীতটা অনেক বেশী জ্বলজ্বল করে। ধ্বংসলীলার বিভিষিকাময় প্রহরগুলো জেগে থাকে সমস্ত সত্ত্বা জুড়ে। ধূসর অ্যালবামের বিবর্ন ছবিগুলি ক্ষণে ক্ষণে মনকে বড় অস্থির করে তোলে! ভালবাসার সবুজ চত্বরে ছোবল হানে বিষাক্ত নাগীন, সবুজের বুক থেকে কেড়ে নেয় তার সবটুকু রঙ। প্রদীপজ্বলা সন্ধ্যার স্নিগ্ধ আলোটুকু নিভে যায় ঝড়ো হাওয়ায়। আশাহত পাখির মত ডানা ঝাপটায়, ছুটে বেড়ায় দিগ্বিদিক। এমনই দুঃস্বপ্নের অমানিসায় ঢাকা ছিল একাত্তরের জীবন। কালরাত্রির অন্ধকার ছিল সে জীবনে, ভয়ঙ্কর হিংস্র শ্বাপদের ভারী পদধ্বনি ছিল সে জনপদে, হায়েনার ধারালো নখের আঁচড়ে ক্ষতবিক্ষত ছিল সে জীবন।

একাত্তরের শেষভাগে যশোর সীমান্ত ঘুরে বিখ্যাত মার্কিন কবি অ্যালেন গিন্সবার্গ তাঁর ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ কবিতায় সেই সময়ের এক নির্মম ছবি তুলে ধরেছিলেন-

ঘরহীন ওরা ঘুম নেই চোখে,
যুদ্ধে ছিন্ন ঘর বাড়ি দেশ
মাথার ভিতরে বোমারু বিমান,
এই কালোরাত কবে হবে শেষ!

ছায়াঢাকা, কোকিল ডাকা সবুজ শ্যামল প্রান্তর জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা স্মৃতিময় সোনালী অতীত কেবলি ফিরে ফিরে ডাকে! একটুকরো আঙিনা, পদ্ম পুকুর- যেখানে ফুটে আছে থরে থরে লাল পদ্ম! বাঁশ বাগানের নিচ দিয়ে ছুটে চলা মাথার সিঁথির মত সরু মেঠোপথও হাতছানি দেয়! গোয়ালে বাঁধা নিরীহ পশুগুলির বোবা দৃষ্টি দেখে বুকের ভিতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে! তারপরও ওরা ছুটে চলে। কিছুই করার নেই, পিছনে তাড়া করে আসছে হায়েনার দল। চলে যেতে হবে সব ছেঁড়ে, যত দ্রুত সম্ভব। ছুটে চলে ওরা, সবকিছু পিছনে ফেলে। ঘরবাড়ি, ফসলি জমি, গোয়ালে বাঁধা গরু, পুকুর ভরা মাছ, আর? আর পূর্বপুরুষের শেকড়।

শত শত মুখ হায় একাত্তর,
যশোর রোড যে কত কথা বলে
এত মরা মুখ আধমরা পায়ে,
পূর্ববাংলা কলকাতা চলে । 

দলে দলে ছুটছে মানুষ! রাস্তার দু পাশ ধরে লাইন দিয়ে ছুটে চলেছে। বিভিন্ন বয়সের মানুষ, ষাট বছরের বৃদ্ধ থেকে শুরু করে পাঁচ বছরের শিশুও ছুটছে। দুধের শিশু কোলে নিয়ে মা ছুটছে, কোন কোন মা ছুটে চলেছেন তার অনাগত সন্তানকে নিজের দেহের ভিতর ধারণ করেই। ছিন্ন বস্ত্র, খাদ্যহীন-দীর্ঘ পথচলায়। যাবার বেলায় বার বার পিছন ফিরে চায়। আবার কবে আসবে, কে জানে হয়ত আর আসাই হবে না! হায়রে নিয়তি! বুকের ভিতর কান্নার ঢেউ চেপে জন্ম জন্মান্তরের চির চেনা সেই সাজানো আঙিনা ছেঁড়ে দলে দলে ছুটে চলে। দুরু দুরু বুকে শঙ্কা! মনে ভয় চেপে পা বাড়ায় অজানা অনিশ্চয়তার পথে! পেছন থেকে বাবা তাড়া সবাইকে দেয়, ছোট ছেলেটা হাঁটতে গিয়ে বার বার পড়ে যাচ্ছে! বাবা চিন্তিত, অনেকটা পথ বাকি। শেষ পর্যন্ত পৌছুতে পারবে তো! পথে ওৎ পেতে নেই তো হায়েনার দল! শত শত আতঙ্কগ্রস্থ মানুষ দিগ্বিদিক ছুটতে থাকে প্রাণভয়ে। সবসময় ভয়ে তটস্থ থাকে এই বুঝি এসে পড়ল পাক বাহিনী কিংবা ধরিয়ে দিল রাজাকার বাহিনী! সবারই লক্ষ্য সীমান্তের ওপারে আশ্রয়কেন্দ্র। আশ্রয়কেন্দ্র? ওখানে ওদের কি পরিচয়? হ্যা, ওখানে ওদের একটাই পরিচয়- উদ্বাস্তু!


মুক্তিযুদ্ধে পাক বাহিনীর নীল নকশা অনুযায়ী প্রথমে এদেশকে নেতৃত্ব শূন্য করার চেষ্টা চলে। তারপর একে একে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়-বিশেষ করে হিন্দু ধর্মালম্বীদের বিশেষভাবে লক্ষ্যবস্তু করা হয়। তাদের অনেককেই নির্বিচারে হত্যা করে বাড়ি ঘর লুট করে জ্বালিয়ে দেয়া হয়। বাকীদের সঙ্গে থাকা টাকা পয়সা, সোনা দানা, কাপড় চোপড় কেড়ে নিয়ে তাড়িয়ে দেয়। আর সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক পরিনতি হয় বিভিন্ন বয়সের নারীদের, যাদের স্থান হয় বিভিন্ন পাক সেনা ক্যাম্পে। বেঁচে থাকার প্রচন্ড আশা নিয়ে এইসব মানুষ দিনের পর দিন শত শত মাইল ছুটে চলে। রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে কেউ কেউ খালি পায়ে, গাঁয়ে কাদা মাটি মেখে। সাথে নেই পর্যাপ্ত খাবার কিংবা বিশুদ্ধ পানি। ক্লান্ত বিধ্বস্ত মানুষগুলো পালাচ্ছে যেন পিছনে তাড়া করছে পাগলা কুকুর! তবুও বাচতে পারে না অনেকেই, যারা ভাগ্যবান তারা সীমান্ত পার হয়ে যায় কিন্তু বিশাল সংখ্যক মানুষই প্রাণ হারায় পাক বাহিনীর বুলেট, বেয়োনেটের আঘাতে। মেয়েদেরকে বন্দী করে নির্বিচারে ধর্ষন করা হয়েছে।

প্রখ্যাত সাংবাদিক অ্যান্থনী মাসকারেনহাস করাচীস্থ ‘দি মর্নিং সান’ পত্রিকায় ১৯৭১ সালে কর্মরত ছিলেন। একাত্তরের এপ্রিলে ঢাকা সফরকালে তিনি গনহত্যার তথ্যাদি সংগ্রহ করেন এবং বিলেতে পালিয়ে গিয়ে ‘সানডে টাইমস’ পত্রিকায় গনহত্যার তথ্যাদি প্রকাশ করে বিশ্ব বিবেককে জাগ্রত করতে অগ্রনী ভূমিকা পালন করেন। তিনি তার “দ্যা রেইপ অব বাংলাদেশ” গ্রন্থের এক জায়গায় লিখেছেন-

কুমিল্লা অঞ্চলে সেনাবাহিনীর সঙ্গে আমার স্বল্পকালীন অবস্থানকালে হত্যা ও অগ্নিসংযোগের ফলে মানুষের মধ্যে যে প্রচন্ড ভীতি দেখা দেয় তা আমি সরাসরি প্রত্যক্ষ করেছি। সেখানে গ্রামে গ্রামে ও ঘরে ঘরে হানা দিয়ে সুপরিকল্পিতভাবে হিন্দু ও যারা সামরিক বাহিনীর চোখে অপরাধী ছিল তাদের ধরে এনে হত্যা করা হত। আমি দেখেছি একটি পুলের ক্ষতি করা হলে তার প্রতিশোধ নিতে গিয়ে কিভাবে সমস্ত গ্রাম ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে।

পঁচিশে মার্চ রাতে পাক বাহিনীর পরিকল্পিত নীল নকশা অনুযায়ী বাঙালি নিধনে শুরু হয় হত্যাযজ্ঞ। সেই থেকে শুরু করে নয় মাস ধরে সমগ্র বাঙালি জাতির উপর চলে অমানুষিক নির্যাতন। সেই কালরাতের অবর্ননীয় গণহত্যার দৃশ্য দেখে শহরের ভীত সন্ত্রস্ত মানুষগুলো জীবন বাঁচাতে ছুটতে থাকে গ্রামের পথে, আপনজনদের কাছে। তখনো তারা জানত না সেখানে তাদের জন্য ওত পেতে আছে আরেক বিপদ! যেখানে কুসংস্করাচ্ছন্ন ও স্বার্থান্বেসী মহলের ষড়যন্ত্র, পাকি বাহিনীর সাথে হাত মিলানো বাঙালি রাজাকার বাহিনীর লোকগুলোর হিংস্র দৃষ্টি এড়িয়ে অনেক গ্রামেও টিকে থাকা কষ্টকর হয়ে পড়ে এই সব নিরীহ মানুষদের। এই চেনাজানা পরিচিত মানুষগুলোই সেসময়ে স্বার্থের কারণে পরিণত হয় শত্রুতে। পাকিদের দোসর এইসব রাজাকার বাহিনীর ষড়যন্ত্রের কারণে হানাদার বাহিনী বাড়ি বাড়ি গিয়ে তল্লাশি চালিয়ে তরুন-যুবাদের পরিকল্পিতভাবে হত্যা করে, সেই সাথে ধরে নিয়ে যায় অসংখ্য মেয়েদের। তাদের অত্যাচার থেকে বাঁচতে নিজেদের সবকিছু ছেঁড়ে প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে বেড়ায় গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে। পথের শত বাধা পেড়িয়ে, পরিবার পরিজনের নিরাপত্তার খাতিরে ছুটে চলে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে। মাথার উপরে শকুনের ওড়াওড়ি আর পিছনে তাড়া করে ফেরা এদেশীয় হায়েনা-রাজাকার, আলবদরের দৃষ্টি এড়িয়ে।

চলবে।

তথ্য সুত্রঃ
১. Newspaper Report: Bangladesh Genocide Archive
২. দ্যা রেইপ অব বাংলাদেশ-অ্যান্থনী মাসকারেনহাস
৩. অস্ট্রেলীয় ইতিহাস গবেষক ড. বিনা ডি কস্তা কর্তৃক গৃহীত ডা. জিওফ্রে ডেভিসের সাক্ষাতকার (1971: Rape and its consequences- Bina D’Costa)
৪. বিশেষ কৃতজ্ঞতাঃ কুলদা রায় এবং এম এম আর জালাল।

0 0 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments