ফুলসুন্দরী ও হাওয়ার পাখি । প্রতীক ইজাজ

  •  
  •  
  •  
  •  

ছেলেটাকে রোজ দেখি। একহারা গড়ন, হাসিমুখ। ছোটখাট, শুকনো ধরণের। কাশফুল চুল, বাতাসে শরীর ওড়ে। বেশ গুছিয়ে কথা বলে। মাঝে মধ্যে অবোধ শিশুর মতো একদম চুপ হয়ে যায়, মেঘ জমে বুকে। সেদিন যদি ওকে জিজ্ঞেস করি, কি হয়েছে? হাসিমুখ নিয়ে বলবে, বৃষ্টি, দখিনের হাওয়া বৃষ্টি এনেছে। আমরা চোখের দিকে তাকাই। শান্তজল চোখ বেয়ে তখন ওর ঠোঁট ছুঁয়েছে।

একটা মেয়ের গল্প বলেছিল একদিন। মেয়েটা নাকি কোন ফুলেরই নাম মনে রাখতে পারতো না। ঘাসফুলকে বলতো চন্দ্রমল্লিকা, হলুদ গাঁদাকে সূর্যমুখী। একবার জারুল ফুলকে চারুলতা বলে ভীষন লজ্জায় ফেলেছিল সবাইকে। সেই থেকে ওর নাম হয় ফুলসুন্দরী। সেই থেকে মেয়েটি ভুলে যাওয়া ফুলের নামের মতো ছেলেটাকেও ভোলে। ছেলেটা রোজ গাছতলায় দাঁড়িয়ে, ভুল নামে ফুলগুলোর কাছে, এখনো ফুলসুন্দরীর গল্প বলে।

তেমাথার বাঁক পেরুলেই একটা ঢিবি, পাশেই বুড়ো অশ্বত্থ। জটাচুল নিয়ে অশ্বত্থের ঝুল নেমেছে বাতাসে। পানিতে নেমেছে শ্মশানের সিঁড়ি। লাল ইটের শেষ ধাপটায় জলের বুদবুদ। আগে ছেলেটা মাছ ভাবতো। কিছুদিন জলপোকা, পানকৌড়িও ভেবেছে। একদিন দেখে, সিঁড়িটার নিচে গভীর খাদ। খাদের ভেতর কতগুলো চুড়ি, কাচের টুকরো, একটা নাকছাবি। ছেলেটা ফুলসুন্দরীকে বলেছিল। মেয়েটা হেসেছে। দেখবে বলে একদিন সুর্যাস্ত অবধি ঢেউয়ে পা ভিজিয়ে বসেছিল দুজন। আর বুদ্বুদ ওঠেনি। মেয়েটা হেসেছিল। ছেলেটা খাদের ভেতর হাত ডুবিয়ে সারারাত কাটিয়ে দেয়। সকালে জল নামে, পাতা ভাসে, গুণগুণ শিস তুলে ভেসে যায় নৌকা। জলকাদা হাতে কেবল ছেলেটাই তাকিয়ে থাকে দূর কোন বুদ্বুদের দিকে।

একবার খুব ব্যস্ত হয়ে পড়লো, ভীষন তাড়া। গনগন করে হাঁটে। গান ধরে, চুলে সিঁথি কাটে। ডাকলে আড়চোখে খানিক তাকায় বটে, কিন্তু কথা বলার ফুরসত নেই। আমরা তো ভেবে মরি। ব্যাপার কি। একদিন খুব ভোরে ছেলেটাকে ব্যালকনিতে দেখা গেল। নরম মুঠোর ভেতর পেজাতুলোর মতো ছোট্ট একটা চড়ুই। আঙ্গুলের ফাঁক গলে ওর কিচিরমিচির শোনা যায়, পাখার ঝাপটানি। আমরা বললাম, করছ কি? ছেলেটা হাসলো। কি বললো ঠিক বোঝা গেল না। শুধু দেখলাম, চড়ুইটা উড়তে উড়তে মিলে গেল আকাশে। ছেলেটা মুঠোহাত বুকের কাছে নিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। মুঠোর ফাঁক গলে কয়েকটা ঝরা পালক ঝিরি ঝিরি কাঁপলো বাতাসে। ছেলেটাও কাঁপলো। ঠোঁট বন্ধ, মুখ বন্ধ। শুধু অস্পষ্ট একটা শব্দ ভেসে এলো কানে, ফুলসুন্দরী।

আমরা অনেকবার ছেলেটার অনেক গল্প শুনতে চেয়েছি। ফুলসুন্দরী, মাছের টোপ, জলপদ্মপুকুর। যার সঙ্গে চৌদ্দ বছরের বাস, সেই নির্বাসিত জীবন। বাড়ির পাতকুয়া, কলপাড়, বাঁধানো ঘাট। একবার উধাও হয়ে গেল, সেই নিরুদ্দেশের গল্পটাও। ঘর বাঁধবে বলে জলচৌকি, কয়েকটা বকুলের চারা, একটা পাটি কিনেছিল। একবার তো হইহুল্লোড় বাঁধিয়ে একটা বায়োস্কোপ বসালো পাড়ায়। কত রাজা-বাদশার ছবি, মক্কা মদিনা, ইউসুফ-জুলেখার পালা। নেচে নেচে, গেয়ে গেয়ে কাটলো কত রাত। জোস্নায় স্নান সারলো। ডুব সাঁতার কাটলো। মনময়ুরীর পায়ে পড়ালো সোনার নুপুর। আমরা হেসেছিলাম। ছেলেটা গল্প বলেনি।

একবার, একটা গল্প অবশ্য বলেছিল, ঘরের গল্প। একতলা বাড়ি, সবুজ উঠোন, মাটির পাড়। নকশাকাটা বারান্দা পেরুলেই কলপাড়, তার পাশেই বাতাবি লেবুর গাছ। ফুলের মধ্যে রক্তজবা, একটা জারুল থাকবে। পুবমুখী জল কলকল একটা পুকুর কাটবে। পদ্ম ভাসবে, ছায়া ভাসবে, রূপার পেখম বাধা নৌকার গলুই ভাসবে। ছেলেটা মেঘ দেখবে, জল দেখবে। জলে ‍নুপুর পা নাচিয়ে দুদ্দাড় ঝড় তুলবে মেয়েটি। জলে জলে মেঘে মেঘে ভেসে যাবে বুকের রুমাল। ছেলেটা গান গাইবে।

আমাদের গান শোনা হয়নি। পাহাড়ের গল্পটাও না। যে স্মৃতির রুমাল উড়ে গেল আকাশে, কোন সুতোয় বোনা ছিল পাখি, আমাদের তাও দেখা হয়নি। এক দুপুরে, হাটবার শেষে, মহাজনী নাও ভাসিয়ে নদীতে, খুব করে ধরেছিলাম ফুলসুন্দরীর গল্প শুনবো বলে। সেই থেকে ছেলেটা হাওয়া। সেই থেকে, ছেলেটা, হাওয়ার পাখি!

পশ্চিম মালিবাগ, ঢাকা।
২৩ জুন ২০২০।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments