ফেরা অথবা না ফেরা । ঈদ গল্প । নাদেরা সুলতানা নদী

  •  
  •  
  •  
  •  

সামিয়া বসে আছে। স্থির। শহরের এক কোণের এক রেল স্টেশনের প্ল্যাটফর্মের বেঞ্চিতে, একা।

সূর্য ডুবে গেছে বেশ খানিক আগে। আধো আলো আধো ছায়ার কোমল এক মায়া ছড়ানো সন্ধ্যা।

কিন্তু তার মনের কোণে আজ ঝড়, তীব্র এক ঝড়! ভীষণ ধ্বংসাত্মক সে ঝড়, যার অস্তিত্ব এই মুহূর্তে সে তার পুরো শরীর জুড়ে টের পাচ্ছে। ভেতর থেকে কাঁপছে, চোখেও কেমন ঘোলা দেখছে সব। অনেক কান্না পাচ্ছে কিন্তু কাঁদতে পারছেনা। ঠিক কতখানি রাগ, অভিমান, ক্ষোভ বা হতাশা সে বুঝতে পারছেনা। অপেক্ষা করে আছে আরো একটু অন্ধকারের।

শেষ বিকেলের অল্প আলো এখনও আছে চারপাশে, শেষ হওয়ার অপেক্ষায়, তাকিয়ে আছে রেললাইন ধরে, দূরে, অনেক দূরের পরের ট্রেনের…

শেষ কবে এমন নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে নিজের উপর মনে করতে পারছেনা। প্রায় ১২ বছরের সংসার, ১০ বছরের এক পুতুল কন্যা এবং কন্যার পিতাকে নিয়ে যে সময় পার করেছে তাতে ঠিক এই অনুভুতি কখনও হয়নি!

না বিয়ে নামক ঘটনাটা সামিয়ার জীবনে কোন ইতিবাচক পরিবর্তন নিয়ে আসেনি একদিনের জন্যেও। নাটক সিনেমাকে হার মানিয়ে ঠিক বিয়ের দিন থেকেই বদলে যায় জীবন। নিজ জীবনে যা কিছু আঁকড়ে বড় হয়ে উঠা তার প্রায় সব একে একে ভাঙ্গতে শুরু করেছে বিয়ের মত একটি অধ্যায় তার জীবনে জুড়েছে যেদিন, সেদিন থেকেই।

বাংলাদেশে মূলতঃ আশির দশকের আগে বা পরে জন্ম নেয়া বেশীর ভাগ মেয়ে জীবন মানেই অনেক সংস্কার এবং মূল্যবোধ আঁকড়ে সংসার না ভাঙ্গার কঠিন মন্ত্রে দীক্ষিত হওয়া সময়ের কঠিন যোদ্ধা। সামিয়া তারই এক নির্মম প্রতিনিধি।

বিয়ের পর বদলে যাওয়া সময়, তার অতীব কোমল স্পর্শকাতর ব্যক্তিত্বকে নুইয়ে দিতে বারবার হানা দিয়েছে। কঠিনতম সময়ের সাথে চেয়েছে মানিয়ে নিতে। যুদ্ধ করতে করতেই মা হওয়া। সময় এমন থাকবেনা হয়তো, এই আশায় করেছে পার দিন, মাস, বছর। জীবন তাঁকে দাঁড় করে দিয়েছে নানান বৈরীতার মুখোমুখি।

যুদ্ধ করতে করতে নিজের অজান্তেই জন্ম নিয়েছে অচেনা সামিয়া। বিয়ের প্রায় একযুগ পর আবিষ্কার করেছে তার জীবনে না-থাকাগুলোর তীব্র আর্তনাদ। অলিন্দে কাঁঠাল চাপা ফুটানো তীব্র  অনুভব নিয়ে কথা বলেছে বৃষ্টি ধারায় অনেকদিন। নিজের অক্ষমতা ছুঁড়ে ফেলে পেতে চেয়েছে কাউকে তীব্র আলিঙ্গনে। শরীর মন একসাথে কথা বললে কেমন হয় সে অনুভূতি প্রায় মরে যাওয়া সামিনা প্রকৃতির মাঝে নিঃসঙ্গ দাঁড়িয়ে অনেকদিন শুনতে চেয়েছে নিঃশ্বাসে নিঃশ্বাসে সে অনুভব!

ক্ষয়ে যাওয়া সামিয়া, মরে যাওয়া সামিয়া… তুমুল ভাবে বাঁচতে চাওয়া সামিয়া, জীবনের ডাকে সাড়া দিতে চাওয়া সামিয়ারা মাঝে মাঝে এক সাথে হয়ে তুমুল বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে। সময়ে অসময়ে সব সামলে চেয়েছে শুধুই মাথা তুলে মেয়েটাকে সুস্থ পৃথিবীর বাসিন্দা করে দিয়ে যেতে।

আজ হঠাৎ সব কেন ভেঙ্গে গেল। কিচ্ছু টানছেনা তাকে এই মুহূর্তে… মেয়ের মুখ, প্রিয় বন্ধুর মুখ, কোন এক ভুল সময়ে তীব্র প্রেমে ডুবে যেতে চাওয়া সেই মিথ্যে প্রেমিকের ঘোর বিভোর চাহনি, না কিচ্ছু না।
যে মা বাবার এক জীবন এখনও কাটে শুধু তাকে সুখী দেখবে বলে, তার নিজের জন্ম শহরের ছোট্ট দোতলা বাড়িতে এমন কি সে মা-বাবাও না…
সামিনা আজ ভুলে গেছে কী ছিল তার প্রিয় সুর, কী তাকে ভাবাত জীবন সুন্দর… না সে পাচ্ছেনা। এই মুহূর্তে তার মাথা শূন্য…

মেয়ে জন্মের পর আরো একবার মা হতে যেয়ে হতে পারেনি, হারাতে হয় দু মাসের মাতৃত্ব। হসপিটালের বিছানায় লম্বা সময় পর হঠাৎ চেতনা ফিরে এলে যেমন অনেকক্ষণ বুঝতে পারছিলনা তার কী হয়েছে, সে কোথায়, কেন… আজ তেমন এক ঘোরে সে আচ্ছন্ন… খুব খুব ঠান্ডা, হীম হীম, কিন্তু হাত বাড়ালে কিছুই ছুঁয়ে দেয়া যাচ্ছেনা, কেউ তাকে জড়িয়ে ধরছেনা।

কিশোরী সামিয়া কোন এক দুর্ঘটনা দেখে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গিয়েছিলো… কতক্ষণ সে জানেনা… শুধু মনে হচ্ছিলো অনেক অনেক দূর থেকে কেউ তাকে ডাকছে… সা—মি—য়া- সা…মি…য়া!! জেগে উঠেছিল সে, তার মুখের সামনে ঝুঁকে থাকা মা বাবার ঝাপসা মুখে তাকিয়ে, তারও পর, ঠিক তার পেছনেই দূরের নারকেল গাছের ঝুলে থাকা ভীষণ সবুজ পাতার তিরতির নাচন দেখে বুঝতে পেরেছিল সে মরে যায়নি।

সামিয়া মধ্যবিত্ত যে পরিবারটি থেকে বের হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রী নিয়েছিল, স্বপ্ন দেখেছিল একটা চাকরী করবে। অধ্যাপক বাবা আর স্কুল শিক্ষক মা আর ছোট বোনকে দেখাবে জীবনের আরো কিছু রঙ!

কিন্তু ভুল সময়ে ভুল এক মানুষ এসে নিয়তির লেখায়ই হোক বা তার বুঝতে না পারার অক্ষমতাই… বিয়ের মত এক অধ্যায়ে ঢুঁকে যেতে হলো। তারপরও স্বপ্নটা জিয়েই রেখেছিল। প্রেমিক হয়েই যে মানুষ তার জীবনে এসেছিল। মা বাবা, সামাজিকতা সব বিবেচনায় একদম ভালো না বেসেও  মন ঠিক করে নিয়েছিল সামিয়া, যে তাকে এত আগ্রহ করে নিয়ে যাচ্ছে সেও তাকে ভালোবাসবে, ঠিক বাসবে।

সেটা হয়নি, একদম শুরুতেই নাটকীয়ভাবে সামনে এলো, সামিয়ার স্বামী রূপে আবির্ভূত হওয়া মানুষটি সিনেমায় দেখানো কোন চরিত্রের মতোই বিজনেস করে, নেশা করে, রাগ হলে পরে সামিয়া যা কল্পনাও করেনি কোনদিন সেরকম ভাষায় কথা বলে। যা কিছু এক জীবনে সামিয়া তীব্রভাবে ঘৃণা করেছে, মানুষকে কথা দিয়ে কথা রাখা, অন্যদের সম্মান করে কথা বলা, জীবনকে খুব সরল সহজ করে দেখা কিছুই এই মানুষের মাঝে নেই।

সামিয়া বিয়ের বছর দুইয়ের মাথায় মা হয়ে গেল বুঝতে না বুঝতেই।  মেয়ে রিমিঝিম এলো শুষ্ক জীবনে এক পশলা সুখের বৃষ্টি ধারা হয়ে যেন। একটা বাচ্চা মানেই সংসারের আবহটা বদলে যাওয়া। রিমঝিম আসায় সামিয়া বিয়ে এবং লাইফ পার্টনার নিয়ে যা কিছু না পাওয়া, ক্ষোভ, দীর্ঘশ্বাস দিতে পারলো সাময়িক চাপা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের খুব বেশী বন্ধু সামিয়ার ছিলোনা। হলে থাকার সুবাদে রুমমেট আর ক্লাসের কজনই ছিল প্রিয়। এর মাঝেই একজনই ছিল তার প্রাণের কাছে। ক্লাসের হিসেবে এক বছরের  সিনিয়র হলেও তারা ছিল বন্ধু। নাদিয়াই ছিল পুরো বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে খুব কাছাকাছি থাকা এক বন্ধু।

রিমঝিমের বয়েস যখন মাত্র ৮ মাস তখনই একদিন সামিয়া গিয়েছে বনানী ১১ নাম্বার রোডে রিমঝিমের জন্যে কিছু কেনাকাটা করতে। বের হয়ে, সামনেই এক কেকের দোকান থেকে কি মনে করে পরদিন নূতন বছরের প্রথমদিন সেলেব্রেট করার জন্যে কেক কিনতে গিয়েই হঠাৎ নাদিয়ার সাথে দেখা। বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়ার পর এই প্রথম। বাড়ির ঠিকানা থাকলেও সেই সময় যোগাযোগ আর ধরে রাখা যায়নি। প্রথমে বিস্ময়, দুজনেরই অবয়বে বেশ কিছু বদলে যাওয়া দেখে… এবং কিছু সময় সামিয়াই কেন যেন আর নিজেকে ধরে রাখতে পারেনি, নাদিয়াকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে। নাদিয়ারও ভেজে চোখ। কে কেমন  আছে, জিজ্ঞেস না করেও যেন বুঝে নেয় একজন আরেকজনের স্পর্শে।

জানা হয় দুজনেই আছে মোহাম্মদপুরে। নাদিয়া কাজ করছে একটা বেসরকারী কোম্পানীতে, বনানীতেই অফিস। ফোন নাম্বার থাকায় যোগাযোগটা এবার আর হারায়না।

এবং সামিয়ার অজান্তেই নাদিয়াই যেন নূতন করে আশীর্বাদ হয়ে আসে ওর জীবনে।
সামিয়া খুব দুঃস্বপ্নের মত একটা সংসারে জীবন পাড়ি দিচ্ছে। প্রায়ই ওর দম বন্ধ হয়ে আসে মানিয়ে নিতে, চাইলেও জবে ফিরতে পারছেনা, নিজের মা বাবা কষ্ট পাবে সংসারটা ভেঙে দিলে সেইরকম একটা চিন্তায় পারছেনা মুক্ত হতে এবং এই জাতীয় সকল আবেগ, তিক্ত অভিজ্ঞতা নাদিয়ার সাথে আরো দুই এক দফা দেখাতেই বিয়ের পর প্রথমবারের মত শেয়ার করা কার সাথে।

কথা প্রসঙ্গেই নাদিয়া জানায় সে অস্ট্রেলিয়াতে চলে যাচ্ছে মাইগ্রেশন ভিসা নিয়ে খুব শীঘ্রই। সামিয়া যদি চায়, আবার পড়ালেখাটা একটু ঝালিয়ে নিয়ে তার সেই স্বপ্নের পথে হাঁটতে এখনও আছে সময়। নাদিয়াই ওকে নূতন করে জানতে দেয়, এক জীবনে বিয়ের মত একট বিষয় ঠিকঠাক কাজ না করলেই জীবন শেষ হয়ে যায়না।

সামিয়া, শ্বশুরবাড়িতে একদিন সাহস করে প্রথমবারের মত বলে সে আবার পড়াশুনাটা শুরু করতে চায়। প্রস্তুতি নিচ্ছে আইইএলটিএস পরীক্ষার। একদম শুরুতে সবাই থমকে গেলেও, আস্তে আস্তে হাওয়া বদলে যায়। সামিয়া ৩ বছর বয়েসি মেয়ে রিমিঝিম এবং ওর বাবাকে নিয়ে একদিন সত্যি উড়ে এসে পাড়ি দেয় প্রশান্ত পারে।

সাউথ অস্ট্রেলিয়ার রাজধানী সাজানো গুছানো ছোট শহর এডেলেড এসে পোঁছায়…

স্টুডেন্ট ভিসা নিয়ে আসার পর আর দশজনের যে স্ট্রাগলগুলো সামলে নিয়ে জীবন আগাতে হয়। সামিয়াকেও তাই করতে হল। পড়ালেখা, পার্ট টাইম জব, নিজের মেয়ের স্কুল, বাড়ি ভাড়া, গাড়ি অন্যান্য বিল সব মিলে জীবন এতটাই ব্যস্ত হয়ে গেল সেখানে আর অন্য হিসেব নিকেশের সময় আর রইলোনা।

জীবনে পরিবর্তন এলো, নিজেও অল্প অল্প করে একটু সাহসী হলো… আলাদা করে একেবারেই নিজের একটা সংসার হলো তার। মেয়েটা স্কুল জীবন শুরু এবং তার সাথে  প্রবাস জীবনের নূতন জীবন ধারা বেশ মানিয়েই নিল।

শুধু বদলানো গেলোনা রিমঝিমের বাবা নামক চরিত্রটা। তার একের পর ভুল সিদ্ধান্ত, আরো বেশী অনিয়ন্ত্রিত জীবন এবং অন্যান্য নানান সমস্যাকে পাল্লা দিতে গিয়ে একের পর ঘটনা সামাল দিতে গিয়ে, সামিয়াকে একের এক দেখতে হলো ভয়ঙ্কর দিন রাত্রি…

পড়ালেখাটা শেষ করে একটা ভালো জবে ঢুঁকতে পারলেও সংসারটা ধরে রাখা গেলোনা।

মেয়েটার একটা সুস্থ স্বাভাবিক জীবন এবং আর কোন উপায় না থাকায় শুধু টিকে থাকার লড়াই করতে গিয়েই সংসারে একা মায়ের কাগুজে নিয়ম বেঁছে নিতেই হলো। রিমিঝিমের বাবা শুধু বাবা পরিচয় থাকলেও সামিয়ার সাথে আর রইলোনা কোন যোগসূত্র। এর মাঝেই রিমঝিমের দাদা  চলে যাবার দুঃসংবাদ, রিমঝিমের বাবাকে যেতে হলো দেশে।

বিষয়টা এমন না যে সামিয়া ততদিনে মনকে মানানো শিখেনি, এমন না যে তার জীবন যে শুধু রিমিঝিককে নিয়েই পাড়ি দিতে হবে এটা ভাবেনি তারপরও দেশে চলে যাবার পর প্রায় বছর হয়ে গেলেও যখন আর আর রিমঝিমের বাবা ফিরছেইনা তখনই এক বন্ধু পরিবারের হাত দিয়ে দেশ থেকে আসে ডিভোর্স লেটার… যে মুক্তি সে হয়তো বিয়ের পর পর বা রিমঝিমের জন্মের আগেই নিতে পারতো যদি সে এই সময় এসে জীবনকে ঘিরে যতটা সাহসী হয়েছে, ভাবতে পারছে তা তখন পারতো।

সেটা পারেনি, আজ সময়ই এসে তাকে সেখানে এসে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

সামিয়া শিখে নিয়েছিল একা চলতে, জীবনের অন্য অনেক আহ্বানকে উপেক্ষা করতে। শিখেই নিয়েছিল প্রেম বা বিশেষ কোন পুরুষ সঙ্গ ছাড়াই জীবনকে নিয়ে এগিয়ে যেতে। আত্নপ্রত্যয়ী নিজেতে মগ্ন এবং সুশৃঙ্খল এক জীবন যাপন নিয়েই ছিল সে তৃপ্ত।

এর মাঝেই তার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি করতে আসছে এক জুনিয়র তারই শহরে এই রকম এক বিষয়ে তার এক ক্লাসমেট বন্ধু যোগাযোগ করিয়ে দেয়। একদম শুরুতে যদি সম্ভব হয় কিছু বিষয়ে হেল্প করা।

সামিয়া অস্ট্রেলিয়ার ছোট সেই স্বপ্নের শহর ছেড়ে যে কান্ট্রি টাউনে উঠে এসেছে তার অদূরেই অন্য এক শহরে আসছে সেই ছেলেটি। ইচ্ছা না থাকা সত্বেও নিতান্ত বাধ্য হয়েই জানান দিতে হয় তার অবস্থান।

তারই বিশ্ববিদ্যালয়ের জুনিয়র সেই শিক্ষক ফাহিম, আসতে আরো প্রায় ৪ মাস বাকি, এর মাঝেই ফেসবুক এবং ফোনে অল্প বিস্তর যোগাযোগ।
কেমন আছেন, এখন ওয়েদার কেমন… কি কি নিয়ে আসা উচিইত, কি না এমন সব অতি সাধারণ প্রশ্ন।

জানা হয় সে কি লিখছে, কি পড়ছে।

ফাহিমের সাথে মাসখানেক যোগাযোগের পরই সামিয়া  বুঝতে পারে, এই ছেলেটার কথা শুনতে তার এত ভালো লাগছে, কারো কথা শুনতে এত ভালো লাগতে পারে এইরকম একটা বিষয়ই তার জানা ছিলোনা।

ফাহিম বুঝতে পারে সামিয়ার মত একজন শ্রোতা, গুনমুগ্ধ কেউ খুব দরকার। দেশ ছেড়ে শিক্ষা ছুটি নিয়ে আসার আগে ওর পাবলিশ হওয়া আরো দুটো বইয়ের সাথে তিন নাম্বার যে বইটা প্রকাশিত করতে যাচ্ছে সেটি একটি অনুবাদ।

সামিয়া প্রতিদিনের মত কাজ শেষ করে ট্রেনে করে ফিরছে, এর মাঝেই ফাহিমের মেসেজ,
তুমি কোথায়?
(না ফাহিম কবে থেকে যেন আর আপনি করে বলেনা, এটা যে সামিয়া টের পায়নি তা না, কিন্তু কেন যেন এই নিয়ে প্রশ্ন করবার তাগিদটা ভেতর থেকে আসছেওনা) ।
এক্ষুনি একটু ইমেইল চেক করতে পারবে?
সামিয়া জানায় ওর অবস্থান, বলে যে পারবে মোবাইল থেকে, কিন্তু নেটওয়ার্ক  ঠিক ঠাক কাজ করেনা তাই কল দেয়া যাবেনা। ৩০ মিনিট পর দিতে।
সামিয়া ইমেইলে দেখতে পারে, ফাহিমের প্রকাশিত বইটি নিয়ে দেশের একজন নামকরা বুদ্ধিজীবি লিখে দিয়েছেন মুখবন্ধ… খুব মনোমুগ্ধকর। তাই সে উচ্ছ্বসিত।

ঠিক ৩০ মিনিট পরই ফাহিমের কল, সামিয়া সামিয়া… সামিই…য়া আমি যে কী খুশী তোমাকে বলে বুঝাতে পারবোনা। স্যার যে আমায় নিয়ে এত আন্তরিক এবং সুন্দর কথা বলবেন আমি কল্পনাও করিনি।
কেন জানিনা এমন একটা খুশীর খবর দেখ ঢাকায় থেকে কাউকে পেলামনা শেয়ার করবো বলে, মনে হলো তোমাকেই জানাই। সেই সুদূরের দূর দ্বীপ বাসিনি রাজকন্যাকে।

সামিয়া বুঝতে পারছিল উচ্ছ্বাসটা। আরো ভালো লাগলো এমন একটা মুহূর্ত ফাহিম ওকেই শেয়ার করলো বলে।

এরপরের কিছু দিন খুব দ্রুত ঘোরের মাঝে চলে গেল… সামিয়ার কল্পনা ছাড়িয়ে… ফাহিম যা বলতো সেই কথা যে বলা যায়, সামিয়ার জন্যেই যে কেউ এভাবে বলতে পারে জানা ছিলোনা। সামিয়ার জীবন প্রেম ছিলোনা, প্রেমিক ছিলোনা। কিছু অনুভব হয়তো ছিল। ভালোবেসে খুব করে কাউকে জড়িয়ে ধরলে কেমন হয় সেই আলিঙ্গন জানা ছিলোনা, জানতে ইচ্ছেও করেনি।

ফাহিম যেদিন এলো ওর অন্য কজন পরিচিত বন্ধু ওকে এয়ারপোর্ট থেকে তুলে নিয়ে এলো। সামিয়া যেখানে আছে হুট করে সেখানে আসতেও পারবেনা ফাহিম এটা জানতো এবং বিষয়টি নিয়ে এক ধরনের স্বস্থিও কাজ করেছে তার।

সামিয়া খুব করে অপেক্ষায় আছে দেখা হোক একবার, কিন্তু সেই দেখাটা যেন হয় খুব কাংখিত, দুজনের জন্যেই। ফাহিম এবং সামিয়া বয়েসে ৫/৬  বছরের পার্থক্য হলেও তাদের চিন্তা ভাবনা এবং অন্য বেশ কিছু বিষয় এত বেশী কাছাকাছি। বিশেষ করে ফাহিমের মত একজন তুমুল পড়ুয়া দুর্দান্ত লেখে এবং বলে এমন কারো গুনমুগ্ধ না হয়ে পারাই যায়না। আর সেই মানুষ যদি এভাবে জানান দেয়, সামিয়া কতোটা আলাদা কেউ এবং বিশেষ কেউ ওর জীবনে।

ফাহিম ওর ক্যাম্পাসে এসেছে। নিজের একটা আলাদা থাকার জায়গা হয়েছে। এবং সকাল সন্ধ্যের মেসেজে একটা প্রচ্ছন্ন আহ্বান থাকে,
কবে আসবে সুন্দরী…
এবার একদিন আস, এবার দেখা দাও…
তোমাকে হাঁটু গেড়ে প্রোপোজ করার সুযোগটা তো দাও এবার।।

সামিয়া বুঝতে পারেনা  কোনটা সত্যি, কোনটা শুধুই নির্মল মজা। সামিয়া ডুবে ভাসে। দ্বিধাচলে।

এত প্রাণের বন্ধু নাদিয়া যে আছে অন্য শহরে, সেই বন্ধুকেও কী এক অদৃশ্য বাঁধায় বলতে পারেনা ফাহিম যে ওকে খুব নিরবে এমন এক জগতের বাসিন্দা বানিয়ে দিয়েছে, যেখানে ওর বয়েস কিছুতেই আর ৪০ ছুঁই ছুঁই না… ও যে ঘোরে আছে বা আদৌ এটা ঘোর না সত্যি কী সে নিজেই জানে!

নিজের ভেতরের সকল সংস্কার, ভয়কে আপাত চাপা দিয়ে একদিন হুট করেই মেয়ের স্কুল হলিডেতে নাদিয়ার কাছে বেড়াতে যেয়েই সে সিদ্ধান্ত নেয় এবার সে ফাহিমের কাছে একদিন যাবে।

শহর থেকে ফাহিমের ওখানে প্রায় দেড় ঘন্টার এক ট্রেন যাত্রা।  দুরুদুরু বুকে ট্রেনে চেপে বসে মনে হয় এই সামিয়াকে সে ঠিক চেনেনা। ট্রেন ছাড়ার পর আরো একবার মনে হতে থাকে, সে কী আসলেই ফাহিমের সাথে নিতান্তই একটা স্বাভাবিক দেখা সাক্ষাৎ করতেই যাচ্ছে? কেন যাচ্ছে?

এ কী শুধুই এক ট্রেন জার্নি, নাকি স্বর্গের পথ এলো নামি…

নাদিয়াকে বলে যায় ওর অফিসের এক মিটিঙে সে সারাদিন বিজি থাকবে, রাতের ডিনার সেরে আসবে।  রিমঝিম নাদিয়া আর ওর ছেলেমেয়েদের সাথে বেশ ভালো থাকে তাই ওকে নিয়ে আপাতত কোন চিন্তা করতে হচ্ছেনা।

কী হতে যাচ্ছে, কী হতে পারে, সব জল্পনা কল্পনা বাদ দিয়ে যখন নির্দিষ্ট স্টেশনে এসে পোঁছায় ততক্ষণে এক ঝলক বৃষ্টি আসে নেমে… কোন রকমে ট্যাক্সি করে ফাহিমের ঠিকানায়। সকালেই বলেছিল সে আসতে পারে, দুই একদিনের মাঝে, তবে জানাবে। সেটা যে আজই সেটা বলেনি। তবে জিজ্ঞেস করেছিল আজ ফাহিমের কাজ কী, বলেছিল তেমন কোন কাজ নেই।

বাসা গুছাবে এবং সম্ভব হলে গ্রোসারী সেরে রান্না বান্না করার চেষ্টা করবে। সামিয়া হেসে বলেছিল, আরে তাহলে তো আজই আসা উচিত ছিল…

ফাহিম মজা করেছিল… এসো হে সুন্দরী, চলে এসো এবং আরো হালকা কিছু রসিকতা। সারা জীবনের সিরিয়াস সামিয়া ভেতর থেকে লজ্জা আর তীব্র প্রেমে মরে যাচ্ছিলো সুখে। আহ এ সুখ অনুভব জানা ছিলোনা তার।

পারলে সামিয়া একটা লাল শাড়ী পরেই আসতো। এর মাঝেই একদিন ফেসবুকে লাল মেরুন একটা খুব পুরোনো সিল্ক শাড়ী পরে ছবি দিয়েছিল প্রোফাইলে। সামিয়ার ফেসবুক জগত বেশ ছোট, খুব কাছের কিছু বন্ধু আত্মীয় পরিবার ছাড়া খুব বেশী কেউ নেই এবং সেও ওভাবে জড়ায়না। প্রোফাইল পিকচার যে বদলাতে হয় বা করা উচিত এই বিষয়টাই মাথায় আসেনি।

ঐ ছবিটা হঠাৎ একদিন ফাহিম দেশ ছেড়ে আসার আগে ভাইবারে পাঠিয়ে বলেছিল, এই মেয়েটাকে চেন?  আমি এর প্রেমে পরেছি, এই মেয়েটার সাথে দেখা করতেই আমি অস্ট্রেলিয়া যাচ্ছি, জানো তুমি?

সামিয়ার ইচ্ছে থাকা সত্বেও শাড়ি পরা হয়নি আজ, নিজের সবচেয়ে প্রিয় রঙের একটা টপস, কালো প্যান্টের সাথে দারুণ একটা স্কার্ফ এইটুকুনই… সাজগোজ সে কোন কালেই করতে পারতোনা বা করেনি। প্রবাস জীবনে এসে ভালো একটা অফিসিয়াল জব করতে এসেই যা অল্প বিস্তর নিজেকে গুছিয়ে রাখাটাই যা শিখেছে। সে এটা জানে সার্টিফিকেটে সে ৩৯ + হলেও তাকে বরাবরই দেখায় ২৭ বছরের এক তরুণীর মত। কিন্তু আজ এই বেলায় এক তরুণ শিক্ষককে মিট করতে এসে এই সব বয়েসের হিসেব ঘড়িও যেন গেছে থেমে।

ফাহিমের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ছোট পাখির মত করে কাঁপছে সামিয়া… লজ্জা পাচ্ছে। প্রচণ্ড অবাক বিব্রত এবং বিরক্তও হলো সে, নিজেই নিজেকে ছোট একটা ধমকও দিল, সামিয়া সাবধান, নিজেকে হারিয়ে ফেলোনা এভাবে…

কখন দড়জায় নক করেছে সে নিজেও জানেনা…

ফাহিম, দরজা খুলে দাঁড়িয়ে, উফ এমন হাসি কারো হয়!  এত মায়া, এত সুন্দর কেন!

… সামিয়া কোন রকমে বললো, আসবো?

ফাহিম কী অপেক্ষা করেছিল? ও কী খুব খুশী? ও কী সত্যিই সামিয়ার প্রেমে ততোটাই আকুল ব্যাকুল যতোটা সামিয়া।

কোন ভাবনার মাঝেই আর থাকেনা দেখা হওয়া এই সময়টুকু…
ফাহিম প্রায় ছোঁ মেরে শুন্যে তুলে নেয় সামিয়াকে…
এক সেকেন্ড সময়ও সামিয়া পায়না বাঁধা দেবার বা আসলে তাদের এই সম্পর্ক, তীব্র টানকে তারা প্রেম বলবে কি বলবেনা এমন কোন বিষয় অবতারণার।

জীবনে অসংখ্য বসন্ত পার হয়ে এই প্রথম বুঝতে পারে সামিয়া ভালোবেসে একটা আলিঙ্গনের শক্তি এবং ছাপ কী ভীষণ তীব্র সুখের হতে পারে।

স্বপ্নময় একদিন যেন সামিয়াকে অনেকবার কোন কারণ ছাড়াই গুনগুন করে মান্না দে’র গাওয়া সেই গানটা নূতন করে মনে করিয়ে দেয় ‘’শুধু একদিন ভালোবাসা, মৃত্যু যে তারপর তাও যদি হয়’’।

এই স্বপ্ন ঘোর, প্রেমকে সামিয়া অমুল্য এক পাওয়া হিসেবেই মনের মাঝে খুব যতনে তুলে নিয়ে ফিরে আসে আবার দেখা হবে সেই অপেক্ষায়।

নাদিয়ার কাছে ফিরে একটু অপরাধী লাগে নিজেকে, শুধু বলে তোকে আমি কোনদিন কিছু লুকাইনি, লুকাবোওনা। একটা বিষয় আপাতত বলছিনা। খুব শীঘ্রই বলবো আমি।

না দেখা করে চলে আসার পর সময়টা সামিয়ার জন্যে  কী এক রহস্যময় কারণে কেন যেন ফাহিম দুই একদিন বেশ আবেগীয় মেসেজ দিলেও , অন্য রকম একটা দুরত্ব বজায় রাখতে থাকে। সামিয়া ঠিক বুঝতে পারেনা…  কী তার কারণ!

একই বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক বাংলাদেশী ছাত্রী নাদিয়ার এক বন্ধুর ছোট বোন পড়তে আসে একই ক্যাম্পাসে। কথা প্রসঙ্গে যখন বলে ওখানে পরিচিত বাংলাদেশী কেউ আছে কিনা, সামিয়া ফাহিমের পারমিশন নিয়ে ওর নাম্বার পোঁছে দেয়।

নাদিয়ার বাসায় এক মাস পর আবার একদিন সামিয়া যায়। ততদিনে নিজের ভেতরে ভাঙ্গা গড়ার খেলাটা বেশ ভোগাতে শুরু করেছে। আজ সে বলবে সব নাদিয়াকে, বলতেই হবে যে!

ফাহিমকে যখনই কল দেয় বা যোগাযোগ করতে চায়, তখনই শুনতে পারে সে ঐ মেয়েটিকে হেল্প করছে, আজ ওর বন্ধুদের সাথে পরিচয় হলো। আজ ও কাজ করছিলো বিশ্ববিদ্যালয়ের সুপারভাইজরের রুমে… হঠাৎ ঐ মেয়েটি এসেছিল সারপ্রাইস দিতে, আজ ওকে নিয়ে বের হচ্ছে কফি শপে, আজ  সব চেনাতে যাচ্ছে, আসে পাশে কোথায় সী বিচ, কোন জায়গাটা থেকে সান সেট দেখা যায়…  যে সময়টা ওদের বিশেষ কথা হতো, আজকাল ঠিক বিকেল থেকে রাত অনেকটা সময় ফোনই অফ থাকে ফাহিমের।

একদিন কাজে বসে সামিয়া কফি ব্রেকে দূরের এক জানালা আকাশে তাকিয়েই দেখে গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি… হুট করেই ফাহিমের সাথে দেখা করতে যাওয়া সেই দুপুরট মনে পড়ে… ফাহিমকে একের পর এক টেক্সট দিয়ে যায়, না আর কোন রিপ্লাই আসেনা। এ কী এক দুঃসহ যন্ত্রণা। এই থেকে মুক্তি পেতেই নাদিয়ার কাছে আসা আজ।

পেইন্টিং: রাফিয়া হাসিন

নাদিয়ার সাথে দেখা করতে আসার পরই নাদিয়া ঠিক বুঝে ফেলে সামিয়া যে একদম ভালো নেই। রাতের খাবারের ঝামেলা শেষ করে, নাদিয়া ওর হাজবেন্ডকে বলে আমি সামিয়াকে নিয়ে একটু ড্রাইভ করে আসি,  বাচ্চারা ওদের ঘরে, তুমি ঘুম পেলে ঘুমিয়ে যেও…

নাদিয়ার বাসার খুব কাছেই একটা ছোট এক সৈকত, রাতে ওটা হয়ে উঠে অন্যরকম রহস্যময় সুন্দর। সোজা ড্রাইভ করে যেতে থাকে… গাড়িতে বাজতে থাকে রিমিক্স…

‘’ শেষ করোনা শুরুতে খেলা, না ভেঙ্গোনা’’

সামিয়া প্রথমে খুব নীরবে কাঁদে, এরপর ভীষণ শব্দ করে… নাদিয়া কোন কথা বলেনা। ইচ্ছে করেই বলেনা। সে জানে, সামিয়ার এই কান্নাট খুব দরকার। এবং এক সময় সেই বলবে…

নাদিয়া, সামিয়াকে এটা বলেনা যে, সে এর মাঝেই ফাহিমের বিষয়টা জেনেছে। তারই আরেক বন্ধুর পরিচিত একজন ফাহিমের কলিগ। নাদিয়া জানতে পারে, এই ছেলেটা তার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রায় ৫ বছরের প্রেমিকা তাকে ছেঁড়ে পারিবারিক সিদ্ধান্তে বিয়ে করে ফেলার পর থেকেই মানসিকভাবে অনেকটাই অসুস্থ হয়ে পড়ে।

এরপর একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হওয়া এই মুহূর্তে দেশে সবচেয়ে নামকরা লেখক এবং সাংবাদিকদের একজন তার সাথে ছিল একটা অন্য রকম রিলেশন। ফাহিমের ফ্লাটে সেই মেয়েটির ছিল অবাধ যাতায়াত।

কোন কারণে সেই মেয়েটির সাথে এখন আর কথা বলার সম্পর্কও নেই।

নাদিয়া যখন এই সব জেনেছে তার আগেই দেশ থেকে বাংলাদেশী যে ছাত্রীটি এসেছে এই মুহূর্তে সেই অসুস্থ ফাহিম হয়তো তাকেই দেখাচ্ছে প্রেম, স্বর্গ… মায়ার খেলাটা।

কিন্তু সামিয়ার মত এমন স্ট্রং পার্সনালিটির কাউকে ফাহিম এমন নিষ্ঠুর এক দিক না দেখালেই ভালো হতো। এই খেলাটায় নাদিয়ার এই বন্ধু সহজ সুন্দর সামিয়াই কেন…

সামিয়া প্রায় ২ ঘন্টা কেঁদেছে… এরপর বলছিল, কখনও তীব্র কষ্ট নিয়ে, কখনও খুব ক্ষোভ নিয়ে, নিজের প্রতি রাগ নিয়ে, নাদিয়া শুনছে।

সামিয়া বললো, আমি এখন ঠিক আছি, কিন্তু আমার নিজেকে খুব অসহ্য লাগছে। এই আমিটাকে ফাহিম কেন এভাবে নিয়ে এলো সামনে। এই লেসনটার কী খুব দরকার ছিল আমার নাদিয়া। আবার কাছে, আবার প্রশ্ন করে। কেন আমি, কেন কেন?

নাদিয়া সামিয়ার শুধু বন্ধু না, সবচেয়ে কাছেরও কেউ। নাদিয়া ওর জীবনের সকল শক্তি নিয়ে যে ওর পাশে থাকবে, সে যে কোন ভুল করেনি। এই অনুভব যে জীবনের সুস্থ স্বাভাবিক এক আহ্বান নূতন করে বুঝায়… কতটা কাজ হয় যদিও তা বুঝা যায়না।

বাসায় ফিরে সেদিন লম্বা ঘুম দেয় সামিয়া এবং ইভেনিং শিফটে নাদিয়া কাজে যাবার পরই সামিয়া বের হয়ে আসে দূরের এই স্টেশনে…

খুব ইচ্ছে শেষ ট্রেনে চেপে কোথাও একটু লুকিয়ে থাকতে। খুব ইচ্ছে করে আর কোন দিন কোথাও না ফিরতে… মেয়ে রিমঝিম খুব গুছানো এবং বুদ্ধিমতি এক মেয়ে হয়েছে এই ব্লেসিংসটুকু সে রেখে যাচ্ছে, এই যা সান্ত্বনা।

মা সামিয়াকে তার মেয়ে রিমিঝিম যেমন দেখেছে তার বাইরে ফাহিমের সাথে অল্প কিছু সময় জড়িয়ে যাওয়া সামিয়া  এই দুইয়ের যুক্তি, দর্শনের লড়াইটা বাড়তে বাড়তে সামিয়া ঝাপ্সা চোখে থাকিয়ে থাকে ট্রেন আসছে…

সে কী ফিরবে, না কী ফিরবেনা?

চাইলেই কে আবার সেই আগের সামিয়াটাকে ফেরত পাবে?
জীবনে চাইলেই কে ফেরা যায়, থাকে কী চাবিটা নিজের কাছেই এমন কোন ঘোর থেকে বের হয়ে আসতে চাইলে সব ভুলে?


নাদেরা সুলতানা নদী
: মেলবোর্ন, অস্ট্রেলিয়া। 

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments