ফ্রিদা কাহলো: শিল্পের সংশপ্তক – আসমা সুলতানা (প্রশান্তিকার ঈদ আনন্দ আয়োজন)

  •  
  •  
  •  
  •  

ঈদ আসছে। আমরা অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি, আপনাদের প্রিয় প্রশান্ত পাড়ের বাঙলা কাগজ ‘প্রশান্তিকা’ ঈদ আনন্দ আয়োজন করেছে। দেশে বিদেশের লেখক ছাড়াও একঝাঁক নবীন লেখকেরা এই আয়োজন সমৃদ্ধ করবেন। সবাইকে অগ্রিম ঈদ মোবারক।

আজকের বিষয় শিল্প

ফ্রিদা কাহলো: শিল্পের সংশপ্তক – আসমা সুলতানা

জীবদ্দশায় তাঁর পরিচিতি নানা সীমাবদ্ধতায় আবদ্ধ থাকলেও, কোনো সন্দেহ নেই ফ্রিদা কাহলো আজ সর্বব্যাপী জনপ্রিয়-সাংস্কৃতিতে এমন একটি মর্যাদা অর্জন করেছেন, যার দৃষ্টান্ত দুর্লভ। আর সেকারণেই তাঁর জীবনী থেকে তাকে ঘিরে গড়ে ওঠা পুরাণকে পৃথক করার কাজটি খুব কঠিন। তাঁর ছবি এখন কোনো প্রাসঙ্গিকতা ছাড়াই সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। পরিণতি হচ্ছে এই মেক্সিকান শিল্পী সম্বন্ধে আমরা যতটা জানতে পারি, হয়তো ঠিক ততটাই কম আমরা তাঁর শিল্পকলাকে বুঝতে পারি। বিশ্বের প্রায় সকল দেশেই ফ্রিদা কাহলোর আদলের অণু প্রতিমূর্তি বেশ সহজলভ্য। এমনকি নিত্য ব্যবহার্য পণ্যদ্রব্যের গায়ে তাঁর শিল্পকর্মের মুদ্রিত চিত্র পাওয়া যায়। ফ্রিদা তাই একজন শিল্পী শুধু নন, একজন আইকন এবং একটি ব্র্যান্ডের নাম। মেহিকোর একজন সাধারণ আলোকচিত্রীর কন্যা থেকে, আধুনিক বিশ্বের একজন বিখ্যাত শিল্পী হয়ে ওঠার যে দীর্ঘ যাত্রাপথ, অদৃষ্টবৈগুণ্যবশত সেটি ফ্রিদার জন্যে খুব একটা মসৃণ ছিলো না। জীবন যুদ্ধে অপরাভূত, অদৃষ্টকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে, মৃত্যুকে কোলের পুতুল করে তিনি ঘুমিয়েছিলেন। যেভাবে তাঁর চিত্রকর্ম ‘দ্য ড্রিম’(১৯৪০) এ আমরা বিছানার উপরে বিস্ফোরক প্যাঁচানো একটি কংকালকে শুয়ে থাকতে দেখি। জীবনের শুরুতেই তাঁকে শিল্পকলাকে জীবন যুদ্ধের হাতিয়ার করে ‍নিতে হয়েছিলো। আমৃত্যু শিল্পকলা আর জীবনের প্রতি তিনি সৎ ছিলেন। সেই যুদ্ধ লড়ে গেছেন একাকী, কারো কোনো করুণা ছাড়াই। নাতিদীর্ঘ জীবনের অধিকারিণী এই শিল্পী শিল্পকলার জগতের একজন প্রকৃত ‘সংশপ্তক’।
চিত্র ১: শিল্পী ফ্রিদা কাহলো নিজ বাড়িতে শিল্পচর্চায় মগ্ন

ফ্রিদা কাহলো তার শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে জয় করেছিলেন, সে কারণে আজ একবিংশ শতাব্দীতে এসেও তিনি একজন প্রগতিশীল আত্মবিশ্বাসী নারীর উদাহরণ। তাঁর এই ব্যপক জনপ্রিয়তার কারণ শিল্পকলা, আর তাঁর শিল্পকলা আত্মজৈবনিক হবার কারণেই তাঁর জীবন যুদ্ধের গল্পটি তাঁর শিল্পকর্ম অপেক্ষা আমাদের বেশী আকৃষ্ট করে। ফ্রিদা শিল্পকর্মে তাঁর জীবনে ঘটে যাওয়া ধারাবাহিক ঘটনার বর্ণনা করে গেছেন, সেদিক থেকে বিচার করলে তাঁর শিল্পকলা আখ্যানমূলক। তাঁর হৃদয়ের অব্যক্ত অনুভূতি ভাষা খুঁজে পেয়েছে তার সৃষ্টিতে, এমন কিছু যা তিনি তাঁর দিনলিপিতেও প্রকাশ করতে পারেননি। কিন্তু কৌতূহলী দৃষ্টি সৃষ্টির নেপথ্যের মানুষটিকে আবিষ্কার করতে উৎসুক।

চিত্র ২ : আমি, লন্ডনের টেট মর্ডান গ্যালারিতে ফ্রিদা কাহলোর একক প্রদর্শনীতে, ২০০৫
শিল্পী পরিচয়ের পরিধির বাইরেও একজন মানুষ হিসাবে তার আরো পরিচয় থাকে। জীবনের ঘটে যাওয়া সব অভিজ্ঞতাগুলো তাঁর শিল্পকর্মে সব সময় প্রস্ফুটিত না হলেও, শিল্পকর্মের নেপথ্যের মানুষটি সম্পর্কে দর্শক মনে রয়ে যায় নানা ধরনের প্রশ্ন। জিজ্ঞাসু দর্শক একটি বিশেষ শিল্পকর্মের নেপথ্যের ইতিহাস আর শিল্পীর শিল্পচিন্তাকে জানতে চান। দর্শকেরা শিল্পীর সেই অনুভূতিকে অনুধাবন করতে চান। সেদিক থেকে বিবেচনা করলে ফ্রিদা কাহলোর জনপ্রিয়তার কারণ যতটুকু না তাঁর সৃষ্ট শিল্পকর্ম, তার থেকেও বেশী তাঁর জীবন; কারণ ফ্রিদা কাহলোর জীবন নানা কারণেই অনন্য। তাঁর চিত্রকর্মের মাধ্যমে শিল্পী যদিও তাঁর যন্ত্রণার কথা বলেছেন, তবুও তিনি খুব সর্তক থেকেছেন সেই চিত্রকলায় যেনো খুব বেশী মাত্রায় বিষণ্ণতা ভর না করে। ফ্রিদার চিত্রকলা তাই নান্দনিকতায় কোনো আপোষ করেনি। স্প্যানিশ বোলেরোর মতই হৃদয়স্পর্শী এর রহস্যময় সাংবেশিকতায়।
সম্ভবত ১৯০৭ সালে জুলাই মাসে মেক্সিকোর কয়ওয়াকানে তিনি জন্মগ্রহন করেছিলেন। জন্ম সাল নিয়ে খানিকটা রহস্য সৃষ্টি করেছিলেন তিনি, সে কারণে সঠিক জন্ম সালটি অজানা। শিল্পকলার এই বিশ্বায়নের যুগে ফ্রিদা কাহলো সম্পর্কে কম বেশী সবারই জানা। ফ্রিদার জীবনের মতোই তাঁর কাজ বহু স্তর বিশিষ্ট এবং গভীর। শিল্পকলার জগতে যে শিল্পীরা অনেক প্রতিকূলতা অতিক্রম করে তাদের সৃষ্টি অব্যহত রাখেন, কোনো সন্দেহ নেই ইতিহাস আর অনুরাগীদের মনে তাদের জন্যে একটি বিশেষ জায়গা চিরকালই সংরক্ষিত আছে। সবার শিল্পী হবার আকঙ্খাটা জীবনের শুরু থেকেই থাকে না। অনেকেই জীবনের পরিস্থিতির শিকার হয়েই শিল্পী হয়েছেন, আবার অনেকে শিল্পী হবার জন্যে জীবনে সকল পরিস্থিতিও মোকাবেলা করেছেন। আর যারা নিজ ইচ্ছায় শিল্পী হননি, নিয়তি তাদের নির্দিষ্ট করতে কার্পণ্য করেনি, তাদের জীবন নিংড়ে যেন সে তার নিজের লক্ষ্য পূরণ করেছে। তবে জীবনের একটা সময় এই শিল্পীরা অনুধাবন করেছেন, তাদের সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা ব্যক্ত করতে শিল্পকলার চেয়ে উত্তম কোনো মাধ্যম হয়তো তারা পেতেন না, বা তাদের সেই কষ্টকে কিছুটা হলেও লাঘব করতে শিল্পকলার অবদান অসীম।
চিত্র ৩: দ্য ড্রিম, ১৯৪০
এমন শিল্পীদের সংখ্যা শিল্পকলার জগতে নেহাত কম নয়, তাদের মধ্যে অনেকেই স্বশিক্ষিত শিল্পী। তারা নিজের যোগ্যতায় শিল্পকলার জগতে স্থান করে নিয়েছেন। ফ্রিদা কাহলো তেমনই একজন স্বশিক্ষিত শিল্পী যেমন আমাদের অনেকের প্রিয় ভিনসেন্ট ভ্যান গো ছিলেন স্বশিক্ষিত শিল্পী। জীবনের প্রথম ভাগে তিনি কখন ভাবেননি যে তিনি শিল্পী হবেন। আরো একজন শিল্পীর কথা স্মরণ করতেই হবে এখানে, কারণ ফ্রিদার চিত্রকলার সঙ্গে তাঁর চিত্রকলার অদ্ভুত রকমের একটি সাদৃশ্যতা পাওয়া যায়, তিনি ফরাসী শিল্পী অঁরি রুশো (১৮৪৪-১৯১০)। তিনিও একজন স্বশিক্ষিত শিল্পী যার শিল্পকলায় পশুপাখি, প্রাণী এবং প্রকৃতির প্রাধান্য দেখা যায়। তাঁর শৈলীর সঙ্গে ফ্রিদার চিত্রকলার সাদৃশ্যতা রয়েছে অনেক দিক থেকে। তাদের চিত্রে দাড়িয়ে থাকা মানব অবয়বগুলোর অনেক ক্ষেত্রে একই রকম, সেগুলোকে অপেশাদারী হাতে আঁকা চিত্র বলে অনুভূত হয়।
একজন চিত্রশিল্পী হবার আগে ফ্রিদা ন একজন চিকিৎসকহতে চেয়েছিলেন, সে কারণে বিজ্ঞানের বিষয়গুলো পড়তে বেশ ইচ্ছুক ছিলেন। মেধাবী ফ্রিদা মেহিকোর সর্বশ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠের অল্প কয়েকজন ছাত্রীদের মধ্যে একজন ছিলেন। ফ্রিদা চিত্রকলায় আমরা বৈজ্ঞানিক-শরীর সম্বন্ধীয় – অভ্যান্তরীণ অঙ্গপ্রত্যেঙ্গের চিহ্ন ব্যবহার হতে দেখি। যা ইঙ্গিত করে তিনি মানব শরীর সম্পর্কে অবগত ছিলেন এবং বৃক্ষ বা ইত্যাদি প্রাকৃতিক উপাদানের বৈজ্ঞানিক রেখাচিত্রেও তিনি ছিলেন পারদর্শী।
সতেরো বছর বয়সে তিনি তাঁর জীবনকে আমূল বদলে দেওয়া ভয়ংকর একটি সড়ক দূর্ঘটনার শিকার হয়েছিলেন। এর ঠিক পরের বছরেই ১৯২৬ সালে আঁকা তাঁর একটি রেখাচিত্রে সেই ভয়াবহ দুর্ঘটনাটিকে বাঙময় হয়ে উঠতে দেখি। ট্রলি বাসে যাতায়াতের সময় বাসটি অন্য একটি স্ট্রিট-কারের সঙ্গে ধাক্কা খায়। সেই দুর্ঘটনায় তিনি খুব মারাত্মক ভাবে আহত হন। যে যন্ত্রণা তাকে আজীবন বয়ে বেড়াতে হয়েছিলো। বাসের স্টিলের একটি রড তাঁর কোমরের হাড়টি ভেঙ্গে দিয়েছিল, তাঁর মেরুদণ্ড ও জরায়ুকে ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছিলো। প্রায় ত্রিশটির বেশী অস্ত্রপচারের পরেও, জীবনে তিনি সম্পূর্ণভাবে সুস্থ হতে পারেননি। এছাড়াও শৈশবে তিনি পোলিওতে আক্রান্ত হয়েছিলেন। এমন নানা ধরনের শারীরিক অক্ষমতা নিয়ে তিনি শিল্পচর্চা করে গেছেন। ১৯৩৬ সালে আঁকা ‘মাই গ্র্যান্ডপ্যারেন্টস, মাই প্যারেন্টস অ্যান্ড আই’- চিত্রটিতে ফ্রিদা তাঁর পিতা-মাতার পূর্বপুরুষদের ইতিহাস দেখিয়েছেন, কারণ তাঁর বাবা ছিলেন হাঙ্গেরিয়ান- জার্মান বংশোদ্ভুত, ফ্রিদা সাগরের প্রতীক দিয়ে সেটি বুঝিয়েছেন এবং মা ছিলেন মেক্সিকোর বংশোদ্ভুত, রুক্ষ ভূমি ও ক্যাকটাস যার প্রতিনিধিত্ব করছে। খুব অদ্ভুত সেই সম্বন্ধ – ফ্রিদার জন্মের সেই বিপরীতমুখিতা, আত্মপরিচয় ও সংস্কৃতিক টানাপোড়েন তাঁর চিত্রকর্মে সর্বদাই উপস্থিত। শেষ জীবনের সৃষ্টিগুলোয় ফ্রিদা তাঁর শিকড়ের কাছেই ফিরে এসেছিলেন বারে বারে।
চিত্র ৪: মাই গ্র্যান্ডপ্যারেন্টস, মাই প্যারেন্টস অ্যান্ড আই (১৯৩৬)
বাস দূর্ঘটনার পরে যখন তিনি বিছানায় বন্দী, তখন তাঁর বাবা-মা তাঁকে ছবি আঁকার সামগ্রী উপহার দিয়েছিলেন। বিছানায় শুয়েই তাঁর শিল্পী জীবনের যাত্রা শুরু হয়েছিল আর পরে ১৯৫৪ সালে তাঁর শিল্পী জীবনের নিয়তির চক্রটিও শেষ করেছিলেন বিছানায় শুয়ে। তাঁর জীবনযাপন শৈলীতে, তাঁর কেতাদুরস্তি দেখে মনে হয়না যে তিনি এত যন্ত্রণা সহ্য করেছেন। তিনি যেমন সক্রিয়ভাবে শিল্পচর্চা করেছেন তেমনি, জড়িত ছিলেন রাজনীতির এবং সামাজিক নানা ক্রিয়াকলাপের সঙ্গে। ফ্রিদা কাহলো তাঁর জীবনে দুজন পুরুষের কাছ থেকে পেয়েছেন অফুরন্ত ভালোবাসা শ্রদ্ধা এবং সহযোগিতা। একজন হলেন তাঁর বাবা, আরেকজন তাঁর স্বামী। এছাড়াও ফ্রিদার জীবনে এসেছে অনেক বিখ্যাত পুরুষ, আলোকচিত্রী, রাজনীতিবিদ, তারা ইতিহাসের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব, তাঁরা সবাই ফ্রিদার রূপ ও গুণের গুণমুগ্ধ ছিলেন। তাদের মধ্যে একজন ছিলেন রুশ বিপ্লবী লিওন ট্রটস্কি এবং শিল্প সমালোচক অ্যাঁদ্রে ব্রেতোঁ। শিল্পী জর্জিয়া ও‘কিফের সঙ্গে তাঁর একটি গভীর সম্পর্ক ছিলো বলে ধারণা করা হয়, যা প্রমাণ করে ফ্রিদা কাহলো নারী ও পুরুষ উভয় লিঙ্গের প্রতিই সমানভাবে আকৃষ্ট ছিলেন। ফ্রিদার শিল্পকলাতে তিনি তাঁর প্রিয়জনদের স্থান দিয়েছেন, স্বামী দিয়োগেকে তো প্রায়ই দেখা যায় তাঁর চিত্রকর্মে এছাড়াও তিনি অনেকবার, তাঁর পিতা-মাতা, বোন, তাঁর চিকিৎসককে এঁকেছেন। ১৯৫২/৫৩ সালের দিকে আঁকা, জীবনের শেষ দিকের একটি চিত্রে আমরা দেখি ফ্রিদার আত্মপ্রতিকৃতির হৃদয়ের পাশে দিয়েগোর চিত্র, কাঁধের কাছে একটি কালো কুকুর এবং কপালের মাঝে মারিয়ার প্রতিকৃতি ।
১৯২৯ সালে তিনি বিখ্যাত মেহিকান শিল্পী দিয়েগো রিভেরার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। রিভেরার নারী আসক্তি এবং ফ্রিদার বোনের সাথে অনৈতিক সম্পর্কের কারণে ১৯৩৯ সালে তাদের বিচ্ছেদ ঘটেছিল ১৯৪০ এ আবার পুনর্মিলনের আগে। যা প্রমাণ করে যে তাঁরা দুজনেই দুজনকে গভীরভাবে ভালোবাসতেন, যে ভালোবাসার কথা দুজনের শিল্পকর্মের মাধ্যমেই প্রকাশ পেয়েছে। ফ্রিদা ছিলেন স্বামী দিয়োগার রাজনীতি ও শিল্পকলার একজন সমালোচক ও অনুপ্রেরণাদাত্রী। তাদের মধ্যেকার গভীর ভালোবাসার সম্পর্ক ছিলো বেশ পরস্পরবিরোধী। তাঁরা দুজনেই ছিলেন সম্পর্কে অসৎ, কিন্তু নিজেদেরকে ভালোবাসতেন বলে আজীবন সেই সম্পর্কটা টিকে গিয়েছিলো। তাই এক বছরের জন্য বিবাহ বিচ্ছেদ নিলেও পরে সারা জীবন একই ছাদের নীচে আলাদাভাবে জীবন যাপন করেছিলেন পরস্পরের অনুপ্রেরণা হয়ে। ফ্রিদাকে দিয়েগো সারাজীবনই সহযোগিতা করে গেছেন, ফ্রিদার শিল্পচর্চার ক্ষেত্রে দিয়েগো কোনো ঘাটতি রাখেননি।
চিত্র ৫: হেনরি ফোর্ড হসপিটাল, ১৯৩২
সন্তান জন্মদানে অক্ষম ছিলেন জেনেও বারবার ফ্রিদা সন্তান ধারণের জন্য চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। তাঁর শিল্পকর্মগুলোয় তাঁর সন্তানহীনতার জন্য বেদনার কথা উঠে এসেছে বিভিন্ন সময়ে এবং মাধ্যমে। নিজের মায়ের সাথে তার সম্পর্কের শীতলতা আর নিজের সন্তান জন্ম দিতে না পারা অক্ষমতা, জটিল এই দুটি বিষয় নিয়ে তিনি খুব সাবলীলভাবে কাজ করেছেন। এই দুইয়ের মাঝে তিনি নিজের সাথে তাঁর আত্মসম্পর্কটিও নিশ্চিত করেছেন নানা উপাদানের ব্যবহার করে। ফ্রিদা কাহলোর জীবনে তিনবার গর্ভপাতের ঘটনা ঘটে। দ্বিতীয়বারের পরে, ১৯৩২ সালে তিনি এঁকেছিলেন ‘হেনরি ফোর্ড হসপিটাল’ চিত্রটি – যেখানে ফ্রিদা নিজেকে একেঁছেন হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থাকা যন্ত্রণা কাতর একজন মানবী রুপে। বিছানার সাদা চাদর রক্তে ভেজা এবং তাঁর হাতে ধরা ছয়টি লাল সূতা, সেই সূতোর সাথে বাঁধা ছয়টি বস্তু, ছয়টি বিষয়কে প্রতিনিধিত্ব করা এই প্রতীকগুলো খুবই অর্থবহ। চিত্রের পরিসরে দূরে আমেরিকার শহুরে আকাশরেখা ঠাই পেয়েছে। ফ্রিদা কাহলো আমেরিকার যান্ত্রিকতার সাথে কখনোই নিজেকে মানিয়ে নিতে পারেননি।
ফ্রিদা কাহলো মূলত তাঁর আত্মপ্রতিকৃতির জন্য সুপরিচিত হলেও, তিনি তাঁর দিনলিপিতে, জার্নালের মতো করে অনেক কিছু এঁকে রাখতেন। এমনকি তিনি অনেক স্টিল-লাইফ কিংবা ভূদৃশ্য অঙ্কন করেছিলেন। তাঁর শৈলী পরাবাস্তব মনে হলেও তিনি নিজেকে পরাবাস্তববাদী মানতে রাজি ছিলেন না। তিনি সহজ সরলভাবে নিজের কথা বলতে চেয়েছেন তাঁর কাজের মাধ্যমে। ফ্রিদার কাজ বেশীর ভাগই ছিল মাঝারি আকারের, দিয়েগোর মত বড় আকারের চিত্র নির্মাণ করবার মতো শারীরিক বিলাসিতা তাঁর ছিলো না।
ফ্রিদা কাহলো প্রথম নারী শিল্পী যাঁর নাম লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি বা ভিনসেন্ট ভ্যান গো অথবা পিকাসোর নামের পরেই উঠে আসে এবং যার অন্যতম কারণ হলো তাঁর জীবনযাপন শৈলী। ফ্রিদা শিল্পকলাকে কেন্দ্র করে তাঁর সমস্ত ব্যথা বেদনা ভুলতে চেয়েছিলেন। তিনি শিল্পকলাকে তাঁর যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে ব্যাবহার করছেন ঠিকই কিন্তু শিল্পকলার জগতটাকেও ঋদ্ধ করেছেন। সেক্ষেত্রে ফ্রিদার জীবনে শিল্পকলা জননীর মতো কাজ করেছে আর ফ্রিদা ছিলেন শিল্পকলারই সন্তান, আবার যিনি নিজেই জননীরূপে প্রসব করে গেছেন অসংখ্য চিত্রকলা। ফ্রিদা কাহলো ছাড়া শিল্পকলার জগত আমরা যেমন ভাবতে পারি না আজকের দিনে, তেমনি শিল্পকলা ছাড়া ফ্রিদার জীবনও ছিলো শূন্য। এই শূন্যতা পূরণে ফ্রিদা কাহলো এই পৃথিবীকে তাঁর মানব শিশুকে রেখে না গেলেও, রেখে গেছেন অসংখ্য রঙতুলির শিশু।
ফ্রিদার পিতৃপ্রদত্ত বাড়িটি আজ ফ্রিদা কাহলো মিউজিয়াম এবং ফ্রিদার রেখে যাওয়া সব অঙ্কন সামগ্রী, আসবাবপত্র, তাঁর শৌখিন পোশাক ও সাজসজ্জার সরঞ্জাম, সবকিছুই আজ দর্শকদের জন্য উন্মুক্ত। ফ্রিদা যেমন উন্মক্ত দুবাহু তুলে সবাইকে আমন্ত্রণ জানাতেন তাঁর বাড়িতে, তেমনি তাঁর রেখে যাওয়া স্মৃতিও আজ সেভাবেই শিল্পপ্রেমিকদেরকে উদার আমন্ত্রণ জানায়। ফ্রিদা কাহলোর বাড়িতে বা বিশ্বের সবত্র যেখানেই ফ্রিদা কাহলো শিল্পকলা রয়েছে, তিনি যেনো আমন্ত্রণ জানান এযুগের শিল্পীদেরকেও। যারা মনে, মননে, মগজে অজাত ভ্রূণ বহন করেন, প্রসবের প্রতীক্ষায় যারা সময়ের সংশপ্তক। ফ্রিদা কাহলো তাদের জন্য শূন্যস্থান রেখে গেছেন; কারণ তিনি যাবার আগে বলে গেছেন, তিনি আর ফিরতে চান না এই পৃথিবীতে-“আমি আশা করি এই প্রস্থান হবে আনন্দময় এবং প্রত্যাবর্তন করতে ইচ্ছুক নই আমি আর।”
চিত্র ৬: ফ্রিদা কাহলো মিউজিয়াম, মেহিকো

এপ্রিল ২০১৯, টরন্টো, কানাডা।
আসমা সুলতানা, ভিজ্যুয়াল আর্টিষ্ট,