বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরতে পেরে আনন্দিত : আবুল হাসনাৎ মিল্টন

  •  
  •  
  •  
  •  

অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী লেখক ও রাজনীতিবীদ ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন ভাষান্তর করেছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্বাচিত ২৩টি ভাষণ। বিশ্বব্যাপী বঙ্গবন্ধুর বাণী এবং আদর্শ ছড়িয়ে দিতেই তিনি সম্পন্ন করেছেন মূল্যবান দলিল সদৃশ্য অনুবাদ গ্রন্থ- ‘ Father of the Nation: the selected speeches of Bangabandhu Sheikh Muzibur Rahman’ । সম্প্রতি বইটি প্রকাশিত হয়েছে। প্রকাশ করেছে প্রখ্যাত বালবোয়া প্রেস অব অস্ট্রেলিয়া। আসছে ৬ নভেম্বর সিডনিতে সাড়ম্বরে গ্রন্থটির প্রকাশনা উৎসব হচ্ছে। প্রশান্তিকার সাথে এক তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বইটির অনুবাদক ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন গ্রন্থটির আদ্যোপান্ত জানান। এসময় তাঁর সাথে কথা বলেছেন প্রশান্তিকা সম্পাদক আতিকুর রহমান শুভ।

ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন

প্রশান্তিকা : প্রথমেই জানতে চাই গ্রন্থটি হাতে পাওয়ার পরে আপনার অনুভূতি কেমন ছিলো?

আবুল হাসনাৎ মিল্টন : বই প্রকাশ আমার জন্য নতুন কিছু নয়। এর আগে আমার সতেরোটি বই প্রকাশিত হয়েছে। তারপরও এই বইটি নিয়ে আমি খুবই টেনশনে ছিলাম। বিশেষ করে, কোভিডের কারণে প্রুফ দেখাসহ সব কাজই অনলাইনে করতে হয়েছে। বইটি হাতে পেয়ে চোখে জল এসে গিয়েছিল। হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ আমি বইটার দিকে তাকিয়ে ছিলাম।  বুকের ভেতর কী যে আলোড়ন হচ্ছিল তা লেখার সাধ্য আমার নাই। সাড়ে তিন দশকের বেশী সময় ধরে আমি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের আদর্শের রাজনীতির সাথে জড়িত। এই বইটির মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরতে পেরে আমি খুবই আনন্দিত। আমার আরো ভালো লাগছে যে, আমি বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা আপার হাতে এই সামান্য উপহারটা তুলে দিতে পারলাম। আমি বইটা এই দু’জনের নামে উৎসর্গ করেছি।

প্রশান্তিকা : বঙ্গবন্ধু ও তাঁর ভাষণের সাথে জড়িয়ে আছে আমাদের স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাস। এতো বড় একটি কাজে হাত দেয়ার সময় কারও অনুপ্রেরণা ছিলো কি?

আ হা মি: গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে হার্ভার্ডে পড়তে যাওয়া মাশরুফ হোসেন নামের বাংলাদেশ পুলিশের এক কর্মকর্তা ফেসবুকে একটা স্ট্যাটাস দিয়ে বলেছিলেন, বঙ্গবন্ধুর জীবনী নিয়ে ইংরেজি ভাষায় তেমন কোন বই নেই কেন? তারও কিছুদিন পরে নিউক্যাসেলে আমার এক প্রতিবেশী জাচিন্তা পারমিটার আমাকে জিজ্ঞস করেছিল, বাংলাদেশে শেখ মুজিবের মত এক বড় একজন নেতা ছিলেন, আমরা তা জানিনি কেন? ‍উল্লেখ্য, জাচিন্তা ঢাকায় একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে দুই বছর শিক্ষকতা করেছিলেন।

এই দুইটি ঘটনায় আমার মনে হয়েছিল, আমি কেন চেষ্টা করে দেখি না? দীর্ঘদিন অস্ট্রেলিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইংরেজিতে পড়িয়েছি, পিএইচডি সুপারভাইজ করেছি, এই অভিজ্ঞতার উপর ভর করে কাজটা শুরু করি না কেন? আর ভাল কাজে জীবনে কখনো আমার সাহসের অভাব হয়নি। কিন্তু সমস্যা হলো, আমার কাছে বঙ্গবন্ধুর উপর পর্যাপ্ত বই ছিল না। তখন ভাবলাম, বঙ্গবন্ধুর ভাষণ অনুবাদ করলে কী হয়।  ঢাকা থেকে লেখক রুদ্র সাইফুল বঙ্গবন্ধুর বেশ কিছু ভাষণের সফট কপি পাঠালো। এ বছরের ১৪ জানুয়ারি অনুবাদ করা শুরু করলাম। চার-পাঁচটি ভাষণ অনুবাদ করে মনে হলো, এই মুহূর্তে সব ভাষণ অনুবাদ না করে বরং নির্বাচিত কিছু ভাষণ অনুবাদ করি। ভাষণ নির্বাচনকালে আমি চেষ্টা করেছি, যাতে গুরুত্বপূর্ণ সব বিষয়ে পাঠক বঙ্গবন্ধুর ধারণাগুলো জানতে পারে। সেদিক দিয়ে বিবেচনা করলে বলা যায়, একজন ইংরেজিভাষী পাঠক এই বইটির মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধুকে সামগ্রিকভাবে আবিষ্কার করতে পারবেন। বঙ্গবন্ধু কেমন মানুষ ছিলেন, তাঁর রাজনৈতিক বিশ্বাস, নেতৃত্ব, রাজনৈতিক সংগ্রাম, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস, যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের অবস্থা, দেশ গঠনে তাঁর ভূমিকাসহ নানান বিষয় বইটিতে খুঁজে পাওয়া যাবে।

প্রশান্তিকা : মাশরুফ হোসেন সেই সময় হার্ভার্ডের ক্লাস হলে বঙ্গবন্ধুর ওপর কথা বলছিলেন। ক্লাসে ছিলো পিনপতন নীরবতা। মাশরুফ পরে একটি পোস্টে বলেছিলেন- বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে বিশ্ব পর্যায়ে নির্মোহ বিশ্লেষণ করে কেউ গ্রন্থ লিখেননি। এটা বড় আফসোসের। সেখানেই আপনার সাথে মাশরুফের কথোপকথন দেখেছি। আপনি সেখানে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছিলেন।

আ হা মি : হ্যাঁ একদম সঠিক বলেছেন। সেটা থেকেও অনুপ্রাণিত হয়েছি।

প্রশান্তিকা : আপাতত জানি আপনি এই বইটিতে বঙ্গবন্ধুর ২৩ টি ভাষণের ভাষান্তর করেছেন। বইটি সম্পর্কে আরও কিছু তথ্য সংক্ষেপে কি জানতে পারি ?

আ হা মি: বইটিতে বঙ্গবন্ধুর পঁচিশটি ভাষণ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তার মধ্যে ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের সংসদে বঙ্গবন্ধু কর্তৃক ইংরেজিতে প্রদত্ত দুটো ভাষণ রয়েছে। বাকি তেইশটি ভাষণ আমি নিজে ইংরেজিতে অনুবাদ করেছি। বিদেশী পাঠকদের বোঝার সুবিধার্থে আমি দুইশ ফুটনোট ব্যবহার করেছি। পাঠকের সুবিধার্থে বইটিতে বঙ্গবন্ধুর একটি সংক্ষিপ্ত জীবনীও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
বঙ্গবন্ধু কন্যা, বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা ভূমিকা লিখে দিয়ে বইটিকে আরো সমৃদ্ধ করেছেন। বইটির প্রচ্ছদ এঁকেছেন আমেরিকার ফ্লোরিডা নিবাসী শিল্পী অ্যানজি এলিয়া। মার্কিন প্রকাশনা সংস্থা হে পাব্লিশিং হাউজের সহযোগী প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান বালবোয়া প্রেস অব অস্ট্রেলিয়া বইটি প্রকাশ করেছে। বর্তমানে বইটির ই-বুক, পেপারব্যাক ও হার্ডকাভার ভার্সন পাওয়া যাচ্ছে। বইটির ইংরেজি সম্পাদনা করেছেন নিউজিল্যান্ডের পল মেহু। বইটি প্রকাশে আমাকে বিশেষভাবে সহায়তা করেছেন আমার বাল্যবন্ধু মো. সাইফুল আলম, অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মো. সুফিউর রহমান, গামা আব্দুল কাদির ভাই, মো. শফিকুল আলম ভাই, অস্ট্রেলিয়া যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক নোমান শামীম, বাংলাদেশের ডা. আব্দুন নূর ‍তুষার, ডা. আফতাব সিদ্দিক, অন্বেষা প্রকাশনের সত্বাধিকারী শাহাদাত হোসেন, জামালউদ্দিনসহ আরো অনেকে।

প্রশান্তিকা : আমার মনে হয় বঙ্গবন্ধুর ভাষণে অনেক বাক্য যেন কেবল আমাদের বুঝবার জন্য। তাঁর ভাষার সৌন্দর্য অতুলনীয়। যেমন – তোমাদের যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে কিংবা কেউ আমাদের দাবায়া রাখতে পারবে না। এরকম ফ্রেজগুলোর ভাষান্তর নিয়ে কি সমস্যায় পড়তে হয়েছিলো ? যদি বলতেন।

আ হা মি: ভাষণগুলো অনুবাদ করার আগে আমি ধারনাও করতে পারিনি, কাজটা এতো কঠিন হবে। এটা স্রেফ অনুবাদের কাজ ছিল না। যেহেতু আমি দীর্ঘকাল ধরে বঙ্গবন্ধুর আদর্শের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত, আমার এই অভিজ্ঞতাটুকু অনেক কাজে লেগেছে। আপনি যে উদাহরণটা দিলেন, তার চেয়েও অনেক কঠিন বাক্য বঙ্গবন্ধু বিভিন্ন ভাষণে ব্যবহার করেছেন। সেসব ক্ষেত্রে আমি ভাবানুবাদ করে আমার ইংরেজিভাষী দুয়েকজন বন্ধুর সাথে মিলিয়ে দেখেছি ভাবার্থ কাছাকাছি আছে কী না।

প্রশান্তিকা : সিডনিতে বাংলা বইয়ের দোকানে বিশেষ করে প্রশান্তিকা বইঘরে আপনার বইটি থাকছে। এছাড়া মেইনস্ট্রিম বুকশপেও কি বিদেশিরা আপনার বই পেতে পারেন? অর্থাৎ আমি বলতে চাইছি বঙ্গবন্ধুর অমর এই বাণীগুলোকে সর্ব শ্রেনীতে ছড়িয়ে দেবার কোন উদ্যোগ কি আপনি বা প্রকাশক নিয়েছেন?

আ হা মি: বর্তমানে বইটি প্রকাশনা সংস্থার ওয়েবসাইটসহ অ্যামাজন, বুকটোপিয়াসহ বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অনলাইন বুকশপে পাওয়া যাচ্ছে। পৃথিবীর যে কোন স্থান থেকে পাঠকেরা অনলাইনে এইসব বুকশপ থেকে বইটি কিনতে পারবেন। বিশ্বব্যাপী বইটির প্রচারের ব্যাপারে প্রকাশনা সংস্থার কিছু কার্য্যক্রম আছে, যেমন পৃথিবীর নিবন্ধিত সকল লাইব্রেরিতে বইটির ব্যাপারে ইমেইল করে জানিয়ে দেওয়া, পৃথিবীর বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও বই সম্পর্কিত ওয়েবসাইটে প্রেসরিলিজ পাঠানো, প্রচারণামূলক ভিডিও নির্মান। এর বাইরে বইটি মার্কেটিং করার জন্য অনেকে সংস্থা কাজ করে, যার জন্য আলাদা অর্থ ব্যয় করতে হয়। তারাই তখন পৃথিবীর বিভিন্ন বড় বড় বইয়ের দোকানে বইটি পৌছে দেয়। এই মুহূর্তে এটা আমার জন্য ব্যয়বহুল। তবে বইটির চাহিদা থাকলে মেইনস্ট্রিম বুকশপগুলো প্রকাশনা সংস্থার সাথে যোগাযোগ করে বইটি বিক্রির জন্য সংগ্রহ করতে পারবে।

প্রশান্তিকা : আসছে ৬ নভেম্বর সন্ধ্যায় সিডনিতে একটি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বইটির প্রকাশনা উৎসব হচ্ছে। এর আগে বেশি তথ্য আমরা জানতে চাইছিনা। সেটা প্রকাশনা উৎসবের পরেই হয়তো হবে। শুধু এটুকু বলুন- এরপরে আপনি কি নিয়ে ব্যস্ত রয়েছেন ?

আ হা মি: পেশাগত কাজের বাইরে আমি এখন লেখালেখিতে অনেক বেশী সময় দিচ্ছি। সম্প্রতি ভারতীয় বংশোদ্ভূত ক্যানাডিয়ান একজন কবির একশ কবিতা ইংরেজি থেকে বাংলায় অনুবাদ করলাম। আশা করি এই বইটি একুশের আগামী বইমেলায় অন্বেষা প্রকাশন থেকে প্রকাশিত হবে। এছাড়া সোনাগাজীর মাদ্রাসা ছাত্রী নুসরাতকে পুড়িয়ে হত্যা করার ঘটনার ছায়াবলম্বনে ‘নুসরাত’ নামের একটা উপন্যাস লিখছি। উপন্যাসটি বাংলা এবং ইংরেজি, দুই ভাষাতেই প্রকাশ করবো। ‘শেখ হাসিনা: ডটার অব বেঙ্গল’ নামে আরেকটি বইয়ের কাজও শুরু করেছি। এটিও ইংরেজি ভাষায়ই লিখবো। বর্তমান বিশ্বের আর কোন সরকার প্রধান এত বেদনা, প্রতিকূলতা ও চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে গেছে বলে আমার জানা নাই। আমার মনে হয়, বঙ্গবন্ধু এবং বাংলাদেশের পাশাপাশি শেখ হাসিনার ব্যাপারেও সারা পৃথিবীর আরো অনেক কিছু জানা উচিত। এ ছাড়া নিয়মিত কবিতা তো লিখছিই।

প্রশান্তিকা : প্রশান্তিকাকে সময় দেবার জন্য আপনাকে অশেষ ধন্যবাদ, কৃতজ্ঞতা। আপনার গ্রন্থটি অসংখ্য মানুষের মাঝে ছড়িয়ে পরুক, সেই প্রত্যাশা করি।

আ হা মি : আপানাকে এবং প্রশান্তিকার পাঠকদেরও আমি ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments