বদরুজ্জামান আলমগীরঃ বৃক্ষ একটি মনোহর । একটি সাক্ষাৎকার

  •  
  •  
  •  
  •  

[ পৃথিবীতে অধিকাংশ মানুষই বৃত্তের ভেতরে বাস করেন। খুব কম সংখ্যক মানুষই আবার বৃত্তের বাইরে নিজের অজান্তেই আরেকটি বৃত্তে আবিষ্ট হচ্ছেন। আপনি আপনার পরিধির ব্যাপ্তি ঘটাচ্ছেন এবং সেই বর্ধিত গোলকে সকলের সাথে ভাগাভাগি করছেন আপনার সুস্থতা, সৌখিনতা, আদর্শ এবং ভিন্নতা। আপনি এভাবেই বৃত্তের বাইরে আরেকটি বৃহৎ বৃত্তেরই মানুষ। আজ প্রশান্তিকার আসরে এসেছেন সেরকমই একজন বৃত্তের বাইরের মানুষ- কবি, নাট্যকার ও অনুবাদক বদরুজ্জামান আলমগীর।]

বদরুজ্জামান আলমগীর জন্মেছেন ভাটি অঞ্চল কিশোরগঞ্জের বাজিতপুরে। পড়াশোনা বাজিতপুরে, পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। বহু বছর ধরে দেশের বাইরে- যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়ায় বাস করছেন। বাঙলাদেশে নাটকের দল- গল্প থিয়েটার- এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য; নাট্যপত্রের সম্পাদক। নানা পর্যায়ে আরও সম্পাদনা করেছেন- সমাজ ও রাজনীতি, দ্বিতীয়বার, সাংস্কৃতিক আন্দোলন, পূর্ণপথিক, মর্মের বাণী শুনি, অখণ্ডিত। প্যানসিলভেনিয়ায় কবিতার আসর- সংবেদের বাগান-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। তিনি নিয়মিত লিখছেন প্রশান্তিকা সহ দেশে ও প্রবাসের নানা পত্র পত্রিকায়।

তাঁর প্রকাশিত বইয়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্য আখ্যান নাট্য : নননপুরের মেলায় একজন কমলাসুন্দরী ও একটি বাঘ আসে। আবের পাঙখা লৈয়া।
প্যারাবল : হৃদপেয়ারার সুবাস। কবিতা : পিছুটানে টলটলায়মান হাওয়াগুলির ভিতর। নদীও পাশ ফেরে যদিবা হংসী বলো। দূরত্বের সুফিয়ানা। ভাষান্তরিত কবিতা : ঢেউগুলো যমজ বোন। ছিন্নগদ্য : সঙ্গে প্রাণের খেলা।
প্রকাশিতব্য নিবন্ধ : আশ্চর্য বতুয়া শাক ও কাঁচা দুধের ডিসকোর্স। দরজা খুলেই দেখি জেব্রা ক্রসিং।

সময়ের নন্দিত কবি বদরুজ্জামান আলমগীরের সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন প্রশান্তিকা সম্পাদক আতিকুর রহমান শুভ।

প্রশান্তিকা : মনে কি পড়ে, ঠিক কত বয়সে প্রথম কবিতা সৃষ্টি হয়- তারপর থেকেই কি আপনার হাতে অবিরাম কবিতা ধরা দিয়েছে? শুরুর গল্প এবং তার পরম্পরাটা শুনতে চাই।

বদরুজ্জামান আলমগীর : আমি, যদ্দূর মনে পড়ে- ক্লাস নাইনে পড়ি। আমার মন বলে- আমার কিছু শুনতে ইচ্ছা করে; প্রাণ বুঝি কান পেতে রয়, নিজেকে কেমন একটু অচেনা লাগে, ভাবি- আমি ঠিক আমি না, অন্য কেউ; ইচ্ছাটিও করে এমনই, মনে হয়- সরাসরি নয়, আমাকে ইঙ্গিতে কেউ কিছু বলুক। কেমন আনকোরা, কিছুটা খসখসে, বুকের সন্ধিক্ষণে কেমন জানি মধুর একটা ব্যথা। মোড়ে দাঁড়ানো এমন একটি সময়েই বুঝি প্রথম কবিতাটি লেখা হয়ে ওঠে।

কিন্তু আমি দুর্ভাগা, আমার বেলায় এমনটি হয়নি- বুকের ভিতর একটি ঢেউখেলানো স্লেট নিয়ে উন্মুখর অপেক্ষা করেছিলাম; কবিতার বদলে আমার স্লেটে সময় একটি গল্প লিখে যায়।

আশির গোড়ার দিকে আমাদের সময় এবড়োখেবড়ো, কালের মুখমণ্ডলে গুটিবসন্তের দাগ। সেইসময় ব্যক্তিস্বাতন্ত্র‍্যের গৌরব অঙ্কিত হয়নি; আমার মাতৃভূমি, জনপদ একসঙ্গে পাশ ফেরে, মুষ্ঠির চাউলের মতো একপাত্রে থাকে, স্বপ্ন দ্যাখে, স্বপ্নভঙ্গের জন্য হাহাকার করে।

তাই পাখির পালকের শঙ্কিত রঙে একটি ছেলে মৃদু ও ভঙ্গুর দুটি কবিতার পয়ারের জন্য অপেক্ষা করে, কিন্তু সময় তার স্লেটে একটি গল্প লিখে দিয়ে যায়। বোধকরি একেই বলে- মালিক, সবারে দিলা টিয়ার বাচ্চা, আমারে দিলা শালিক।

প্রশান্তিকা : আমার এক ডাকসাইটে সাংবাদিক বন্ধু বলেছিলেন- বাংলাদেশের নাটকে সেলিম আল দীনের পরেই আপনার নামটা উচ্চারিত হয়। এই তথ্য কি আপনার কানেও পৌঁছেছে?

বদরুজ্জামান আলমগীর : এক মেয়ের নতুন বিয়ে হয়েছে। মেয়েটি এখনও পাকাপাকি স্বামীর বাড়ি যায়নি। একদিন মেয়ে তার মা-কে বলে : মায়া, আমার খালি হাঁটুর দিকে চুলকায়।
মা মেয়েকে বলে : আলা তোর জামাই আইবো।
মেয়ের উত্তর : যাহ, মায়া যে কী কয়, হুনতে খালি ভালোই লাগে! হা হা।

বদরুজ্জামান আলমগীর

প্রশান্তিকা : বাংলাদেশের সাম্প্রতিক কবিতা চর্চা সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কি?

বদরুজ্জামান আলমগীর : সাম্প্রতিক কবিতা নিয়ে সামগ্রিকভাবে কোন সিদ্ধান্তমূলক কথা বলা তো সম্ভব নয়, উচিত নয়, ঠিকও নয়। সবার কবিতা আমার পড়া হয়ে ওঠেনি। শত শত ছেলেমেয়ে কবিতা লিখছেন। আমি অবশ্য কবিতার কাজগুলো আন্তরিকভাবে ফলো করার চেষ্টা করি।
কখনো কখনো এমন ভালো, মনকাড়া কবিতা দেখি যে, আনন্দে রীতিমত লাফিয়ে উঠি। যদিও এমন ঘটনা হরহামেশায় ঘটে না, তারজন্য অপেক্ষা করতে হয়।

আমার অনুমান- বাংলাদেশের সাম্প্রতিক কবিতা চর্চা কথাটি দিয়ে আপনি পদাবলী কবিকন্ঠ- ওই জমানার পরের কবিতা সম্পর্কে জানতে চেয়েছেন।

বড় বড় খ্যাতনামা, প্রবাদপ্রতিম কবিদের পরের কবিতা সম্পর্কে আমার পাঠ, কান পেতে শোনা, অনুভব করা, নীরবতা ও চিৎকার থেকে প্রথম যে বোঝটি তৈরি হয়েছে, তা হলো- এখনকার কবিতা অনেক বেশি চালাক। কবিতা এখন আর বাড়িতে থাকে না, কবিতা থাকে বাসায়।

মার্কসবাদী ডিসকোর্সে একটা কথা আছে- সামাজিক শ্রেণী। একই পেশার লোকদের এককথায় বলে সামাজিক শ্রেণী। যেমন জেলে সম্প্রদায়, তন্তুবায়, শিক্ষক- তাঁরা একেকটি সামাজিক শ্রেণী। বাঙলাদেশের কবিরাও এখন একটি সামাজিক শ্রেণী। তাঁরা নিজেরাই কবিতা প্রোডিউস করেন, নিজেরাই তা পড়েন, বাহবা দেন, বা নিন্দা করেন।

মানুষের সামগ্রিক বাসনা, প্রস্তুতি, তাদের আলো ও অন্ধকারের সঙ্গে নাড়ির যোগ নেই, যতোটুকু যোগাযোগ- তা বুদ্ধিবৃত্তিক। অনেকের কবিতা-ই ভীষণ পরিচ্ছন্ন, পেশাগত দক্ষতায় হয়তো বা মজবুতও।

যিনি যে-ভাষার কবি, তাঁকে নিদেনপক্ষে তাঁর জনপদের প্রাণের ভিতরে যে শীতাতপ তাঁর থেকে বিচ্ছিন্ন হতে দেখিনি- কবিতার ইতিহাস এর সাক্ষী দেয় না- আমরা বলতে পারি, শার্ল বোদলেয়ার, পাবলো নেরুদা, কী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, অথবা আনা আখমাতোভা, বা জীবনানন্দ দাশের কথা, এমনকী আমাদের আবুল হাসানের কথাও যদি তুলি; তাঁরা কেউ নিজ কৌমের থেকে অলঙ্গ দূরত্বের অয়োময়ে বাঁধা নন।

আমার নিজের কাছে কবি ও কবিতা তার কৌমের হৃদস্পন্দনের সঙ্গে এমনই এক জন্মদাগের নৈকট্যে বিন্যস্ত। আমার লেখা ‘কবি এমন’ শিরোনাম কবিতায় কবির সংজ্ঞার্থ এমন :

সবাইকে ঘুম পাড়িয়ে রাত্রি জেগে থাকে, /একজন কবি এমন / সবার পক্ষে  ক্রুশবিদ্ধ হন যিশুখ্রিস্ট যেমন। সমুদ্রের অসীম একোরিয়ামে / নুন থৈথৈ পানির আত্মায় / সেলাই করে চোখের জলে নকশিকাঁথা, / প্রাণের তারানা ক্ষণ- ঢালুর দিকে হেঁটে যাওয়া কবিটি এমন।

শামসুর রাহমানের কবিতার আমি ভক্ত, কী অভক্ত কিছুই না; কেবল উদাহরণ হিসাবে তাঁর নামটি বলছি। সাম্প্রতিক কবিতায় শামসুর রাহমানপনা নেই, একদম না। এখন কবিতা ভীষণ দূরবর্তী। যে-কোন দূরের জিনিস নিটোল ও পরিচ্ছন্ন হয়, কেননা, তাতে স্পর্শের, ও শারীরিক ঘর্ষণের দাগ নেই; জীবনে জীবন ঘষে, বা মেঘের সঙ্গে মেঘের হানাহানির ফলে যে আগুন জ্বলে- তার আঁচ নেই, আছে অনেক গোছানো বিজলি বাতির আভা।

প্রশান্তিকা : দেখতে পাচ্ছি- সাম্প্রতিক সময়ে আপনি বেশকিছু কবিতা অনুবাদ করেছেন। অনুবাদ সাহিত্যের প্রয়োজনীয়তা সব ভাষাভাষীরই রয়েছে, বাংলায় বোধ হয় আরও অনুবাদ হওয়া দরকার।

বদরুজ্জামান আলমগীর : জি, কিছু অনুবাদের কাজ করেছি, কেবল কবিতার অনুবাদ। আমি অবশ্য কখনোই অনুবাদ কথাটা বলি না, বলি- ভাষান্তর। অনুবাদ ও ভাষান্তর কথা দুটির মধ্যে আয়তন ও পরিসরে রকমফের আছে।

গত কয়েক বছরে কবিতার সঙ্গে রাত্রিদিনের সংসারে বই করেছি- নদীও পাশ ফেরে যদিবা হংসী বলো; দূরত্বের সুফিয়ানা; প্যারাবল : কবিতাগদ্যের বই করেছি- হৃদপেয়ারার সুবাস। পরিস্কার বুঝতে পারছিলাম- আমার প্রথম কবিতার বই- পিছুটানে টলটলায়মান হাওয়াগুলির ভিতর- থেকে পরের বইগুলো স্বভাবে ভিন্নতর হয়ে উঠেছে।

স্বভাবের ভিন্নতার নিয়ামক হিসাবে আমি দেখতে পাই কবিতার নাভিমূলে একধরনের মরমিয়া, কী অধ্যাত্মবোধ, কী পরাবাস্তবতার সম্মিলিত বিন্দুরা দিনকেদিন দানা পাকিয়ে উঠছে। মানুষকে শ্রেষ্ঠত্বের নামতা থেকে টেনে তুলে সমগ্রের পাটাতনে দাঁড় করালে চিত্রটি এমন দেখি- সব মানুষই তার বাহিরানা ও ভিতরানার সম্মিলিত যোগফল, কেবল বস্তুবাদ, বা শুধুই ভাববাদ বলে কিছু নেই; কেউ উত্তীর্ণ ভাববাদের উচ্চতায় উঠতে চাইলে তারমধ্যে বস্তুবাদের দৃঢ়তা থাকতে হবে, নিজেকে ফলপ্রসূ বস্তুবাদী হিসাবে গড়ে তুলতে তারমধ্যে থাকতে হবে ভাববাদের পোঁচ।

তখনই ঝুঁকে পড়ে ভাবি- শ্রেষ্ঠত্বের বদলে সমগ্রের কথা তুলতে এভাবে বলতে পারি- জয় কার্ল মার্কস- জয় মনসুর হাল্লাজ।

মনকে ফলবতী বৃক্ষের সম্ভ্রমে দেখতে চাইলে তারসঙ্গে মননের রাখীবন্ধন আবশ্যক; মননকে পদ্মফুলের মর্মে বাঙময় করে তুলতে চাইলে মনের পরাগরেণু তাতে মিশাতে হবে। কবিতায় আত্মভ্রমণের এই পর্যায়ে এসে ভাবি- কবিতার বিশ্বগ্রামে মরমিয়ার মনোভাষ্যরূপ একবার ঘুরে দেখতে পারলে তীর্থযাত্রার পুণ্য হতো।

এমনই এক ভাবনার নিরিখে অধিবাস্তববাদী কবিতার সংকলন- ঢেউগুলো যমজ বোন বইটি করি। এই ভাষান্তর যাত্রার ফল আমি অনুভব করি এভাবে :
লোকজ বাঙলার ভাব ও ভাষার যে গভীর নিজস্বতা তা অন্য কোন ভাষায়, বিশেষকরে ইংরেজিতে নেই। তার কারণ- ইংরেজি প্রমিতকরণের শক্ত শৃঙখলার দাপটে সমান্তরাল লোকভাষাটি আর টিকে নেই; ইংরেজি পুরোটাই কাজের ভাষা, ভাবের গোপন, জড়ানো, অপরিপক্কতার আনকোরা বিহবলতা তাতে টিকে নেই।

ভাষান্তরে কেবলই আমেরিকান কবিতার একটি সংকলন মোটামুটি শেষ করে এনেছি। সাম্প্রতিক আমেরিকান কবিতার ভাষান্তর প্রক্রিয়ার ভিতর দিয়ে ইংরেজি ভাষা সম্পর্কে আমার অনুমান আরো পোক্ত ভিতের উপর দাঁড়ায়। এ-দফায় আমার ভাষান্তরে কবি’র তালিকায় আছেন- গ্যারি সোটো, মার্ক স্ট্র‍্যান্ড, কার্ল স্যান্ডবার্গ, টেড কুসার, চার্লস সিমিক, টোয় ডেরিকট, বিলি কলিন্স, জেমস টেইট,  ডেভিড ওয়াইট, জয় হারজো, কেনেথ কোখ, মের ওলিভার, জন অ্যাশবেরি, লুইজ গ্লিক, শ্যারন ওল্ডস,ফিলিপ লেভিন, এথরিজ নাইট, গ্যারি স্নাইডার, টম স্লেই, জেরল্ড স্টার্ন এবং টোনি হোগল্যান্ড।

উপরের এই ২০কবির কবিতা ভাষান্তর কালে মোটের উপর আমেরিকান কবিতাপাঠ ও বোঝাপড়ার উপর দাঁড়িয়ে আমার ধারণাগুলো এরকম :  আমেরিকান কবিতা অবিশ্বাস্যরকম নির্মেদ। তাঁদের কবিতায় কোন দোটানা নাই। কোন কবি’র কবিতায় রিপিটেশন থাকে না বললেই চলে। যাপিত জীবনের নিরেট বাস্তব থেকে তাঁদের অভিব্যক্তি নিঙড়ে তোলা। একজন কবি যে ভাষায় কথা বলেন, কাজ করেন- একই ভাষায় কবিতা লেখেন। জীবনের আলো-আঁধারি নিয়ে একজন কবি কবিতা লিখতে পারেন, কিন্তু তার উপস্থাপনায় কোন আলো-আঁধারি অস্বচ্ছতা থাকবে না।

বাঙলার ভাব ও আধ্যাত্মিকতার সঙ্গে অন্যান্য অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে মজবুত দেশগুলোর তফাৎ বেশ মৌলিক ও দৃষ্টিগ্রাহ্য : কিছুটা ভিন্নপথে আগাতে পারে- কিন্তু তাদের ভাব ও আধ্যাত্মিকতার কেন্দ্রভূমি বাইবেল; অন্যদিকে বাঙলা ভাবের মূলে আছে নানা মত, সমূহ তরিকা, সিলসিলা ও বিবিধ গৌন ধর্মের নানামুখী প্রবাহ।

প্রশান্তিকা : আপনার পড়াশোনা ইংরেজি সাহিত্যে। লেখালেখি করছেন বাংলায়। একটা কথা প্রচলিত আছে- আমাদের বাংলা সাহিত্যের ইংরেজি অনুবাদ অপ্রতুল। আপনার শিক্ষা এবং দক্ষতা নিশ্চয়ই এ বিষয়ে অবদান রাখতে পারতো। সেদিকে কখনই গেলেন না কেন?

বদরুজ্জামান আলমগীর : একদম যাইনি- তা ঠিক নয়। অন্য কোন বড় লেখকের সর্বনাশ করার আগে নিজের কিছু লেখা ইংরেজি করার উদ্যোগ নিয়েছিলাম। কয়েকটি করেওছি। আমার হৃদপেয়ারার সুবাস বেরুনোর পর নিউইয়র্কের কিছু বাঙালি বন্ধু কোমর বেঁধে এটির ইংরেজি করার পরিকল্পনা করে। সেভাবে ইংরেজি এবং বাঙলা- এই দুই ভাষাতেই সমান ওস্তাদ- এমন কিছু লোকের সঙ্গে বৈঠকও করা হয়। তাঁরা আদ্যোপান্ত হৃদপেয়ারার সুবাস পাঠ করে তাঁদের তদন্ত রিপোর্ট হাজির করেন, সেখানে মোট কথাগুলো এরকম :

ইংরেজি ভাষাভাষী পাঠকের নন্দন বিবেচনা দিনের শেষে বাইবেল থেকে আসা। গভীরভাবে লোকাল একটি বাঙলা পাণ্ডুলিপি প্রথানির্ধারিত আধ্যাত্মিক চৈতন্যের উপর বিন্যস্ত নয়, তা মূলধারা স্পিরিচুয়াল ডিসকোর্স থেকে অনেক দূরের জিনিস। ইংরেজি ভাষাভাষী পাঠক, দর্শক এগিয়ে এসে বাঙলার আদলে নিজেকে স্থানান্তর করবে- এখনো সেরকম মনস্তাত্ত্বিক কাঠামো গড়ে ওঠেনি।

হৃদপেয়ারার সুবাস-এ একজীবনে বলে একটি কবিতাগদ্য আছে, যার শেষলাইন এমন :

আমার মুরশিদ গুণমণি গো, লোহারে বানাইলা কাঞ্চা সোনা- এর ইংরেজি কী; ইংরেজি না হয় ঠেলেঠুলে করা হলো- কিন্তু ইংরেজি পাঠকের কাছে এর মানে কী?

কিংবা, ঘুড্ডি কে বানাইলো রে, কামেলা রইলো কই, এমন রঙ্গিলা ঘুড্ডি দেখে আমি ধান্ধা খাইয়া রই গো আমি ধান্ধা খাইয়া রই- মালেক দেওয়ানের এই গানের কালাম ব্যবহার করা হয়েছে হরিণের ডানা প্যারাবলে- ইংরেজি করা হলে এর নিয়তি এ-কে কোথায় নিয়ে যাবে?

এবার ধরা যাক জালালউদ্দিন রুমির কথা। দারুণভাবে আমেরিকায় ঢুকেছেন। কিন্তু এই রুমি মধ্যপ্রাচ্যের জালালউদ্দিন রুমি নয়, ওদের প্রয়োজনীয় রুমি। ধনবাদী দুনিয়ায় ব্যক্তির অমোচনীয় নিঃসঙ্গতায় এক ম্যাজিকেল ধন্বন্তরির নাম জালালউদ্দিন রুমি। পশ্চিমের এই এক প্রতিজ্ঞা। তারা যেভাবে চান, এমনকী জিসাস- তাদের প্রয়োজন ও বাজারের আদলে তৈরী ধর্মাবতার।

কর্পোরেট পুঁজির এমন এক একচ্ছত্র ক্ষমতা ওখানে যে, একজন কবি কেন, ভাবের পদকর্তা কী ছার- করপোরেটের বাইরে যাবার শক্তি নেই কারুর নাই। এর নিরঙ্কুশ ভয়াবহতার দিকটি বোঝার জন্য ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর কথাটি এখানে বসিয়ে দেয়া যেতেই পারে : আমি এমেরিকার প্রেসিডেন্ট- একজন চিয়ার লিডার, আমি খেলোয়াড় ও দর্শকের মনোরঞ্জনের জন্য ভাঁড়ামি করি, নেচে যাই।

আলোকিত গহ্বরের সত্যতা সত্ত্বেও আমাদের সাহিত্য ইংরেজিসহ দুনিয়ার নানা ভাষায় অনূদিত হওয়া ভীষণ জরুরি। কিন্তু শখের ঘোড়া দৌড়িয়ে এই কাজ করা যাবে না। এমন অনুবাদক লাগবে- যিনি জীবনের সমস্ত আনন্দ, খেদ, ভালোবাসা এককৌটায় মিশিয়ে নিজের আয়ু দিয়ে অন্যের মাথায় পালক এঁকে দিতে রাজি থাকবেন। যিনি দুটি ভাষা ও সংস্কৃতির আদ্যোপান্ত খবর রাখেন- প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও নিরন্তর ধৈর্যশীল হবেন।

এমন অনুবাদক হতে হবে- যার জন্য লেখক ও প্রকাশক দুজনেই অপেক্ষা করবেন,  যেভাবে গ্রেগরি রেবাসার জন্য ৪বছর অপেক্ষা করেছিলেন গাব্রিয়েল গারসিয়া মার্কেজ। তারপর তাঁর হাতেই অনূদিত হয় জগদ্বিখ্যাত সিয়েন এনোস ডি সোলেডাড : ওয়ান হান্ড্রেড ইয়ার্স অব সোলিটিউড।

প্রশান্তিকা : বহুদিন আপনি নাটকের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং বোধ করি এখনও আছেন। নাটক নিয়ে আপনার কাজের পরিধি জানতে চাই।

বদরুজ্জামান আলমগীর : নাটকই আমার মূল কাজের এলাকা ছিল। ছিল প্রত্যয়ে কথাটি বলা-ই ভালো। রাতদিন পাগলের মতো নাটক লিখেছি, আর পথে, সমাবেশে, খোলা জায়গায় তাদের মঞ্চস্থ করেছি। আমার লেখা নাটকের নামগুলো মনে করার চেষ্টা করে দেখতে পারি- আঁচল হিমাদ্রি, ইলেকশন বাজারজাতকরণ কোম্পানি লিমিটেড, বাঘ, চন্দ্রপুরাণ, এক যে আছেন দুই হুজুর, লেনিন কোথায়, প্রতিমা আসে, যোজনগন্ধা মায়া, পুণ্যাহ, নননপুরের মেলায় একজন কমলাসুন্দরী ও একটি বাঘ আসে, আবের পাঙখা লৈয়া, জুজুবুড়ি, অহরকণ্ডল, ডুফি কীর্তন, পানিবালা, ময়ূর নিধি, পিঁয়াজ কাটার ইতিহাস। আমার কাজের মূল ক্ষেত্র গণনাট্য সংঘ বাজিতপুর, পরে গল্প থিয়েটার। নির্দেশনার কাজও করেছি অনেক। অভিনয় করেছি কম।

আমাদের নাটকে অনেক ভালো কাজ হয়েছে। বাঙলা নাটক এখন তার আদি মৌলিক মোকামের দিকে যাত্রাকরেছে। নতুন পুরনো মিলিয়ে অনেক থিয়েটার গ্রুপ সারাবছর তাঁদের আন্তরিক কাজগুলো করে যাচ্ছেন। অনেকগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন স্বতন্ত্র নাট্যকলা বিভাগ চালু হয়েছেতাঁরাও নতুন নতুন নিরীক্ষা যুক্ত করে চলেছেন। 

আর সমস্যার কথা যদি বলেনআমি ৩টি সমস্যার কথা বলবো. নাটকের ঢাকা কেন্দ্রিকতা . নাট্যান্দোলনে ক্ষমতা রাজনীতির প্রভাব। . মঞ্চ নাটকের তারকা প্রথা। 

সারাদেশে থিয়েটার চর্চা হয়নানা জায়গায় অনেক ভালো কাজ করেন তাঁরা। কিন্তু সবাই ঢাকার দিকে তাকিয়েথাকেনঢাকা যেন বেহেস্তের মুখে দণ্ডায়মান দারোয়ানআপনি ইবাদত বন্দেগি সবই করেছেন, কিন্তু দারোয়ান অনুমতি না দিলে বেহেস্তে ঢুকতে পারবেন না।

আমাদের মত ভাষা, আচার, আর লোক আঙ্গিকের এমন অসামান্য বৈচিত্র্য দুনিয়ার খুব কম ভূখণ্ডেই পাওয়াযাবে। কিন্তু আমরা কী সাভারে কেবল রথযাত্রা নিয়ে নাটক হতে দেখেছিকী অষ্টগ্রামে তাজিয়ার পরম্পরা নিয়ে থিয়েটার, অথবা সুন্দরবনে বাঘ শিকারীদের নিয়ে আঞ্চলিক ভাবে উপস্থাপিত কোন নাটক পেয়েছি?

দুর্ভাগ্যজনক ভাবে বাঙলাদেশে গ্রাম থিয়েটার, মুক্তনাটক দলের কাজও অনেক গুটিয়ে এসেছে।

বাঙলাদেশের থিয়েটারে বাঙলার প্রত্ন, বাঙলার ইতিহাস, তার নিজস্ব ভঙ্গিমাটুকু অভিনয়ে, পরিবেশনায়, নাট্যদর্শন চিন্তায় আরো জঙ্গম, মৌলিক নিজস্ব গভীরতায় উঠে আসার কথা ছিল।

বলে না যে, ডোরাকাটা দাগ দেখে বাঘ চেনা যায়, বাতাসের বেগ দেখে মেঘ চেনা যায়, গোঁফের সাইজ দেখে খান্দান বোঝা যায়। স্পেনে একটা কথা বলেতুমি কী তোমার দেশের মেয়েদের জীবন নিয়ে কিছু বলতে চাওতাহলে আমাকে কেবল একটা লোকগীতি গেয়ে শোনাও। আল বেরুনি বলতেনকোন শহরের মানুষের মন বড় না ছোটতা অনুমান করার জন্য তুমি ওদের রাস্তার প্রশস্ততা দেখো। আমার কাছে মনে হয়, একটি দেশে গণতন্ত্র আর মানুষের অধিকারের মাত্রাটি পরিমাপ করতে চাইলে তাদের নাটক দেখো।

থিয়েটারে রাজনীতি মনস্কতা থাকবেথাকবে বলছি কেনথিয়েটারে রাজনীতি থাকতেই হবে, কিন্তু সেই রাজনীতি দার্শনিক প্রত্যয়নিষ্ঠ, কোন দলের কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা নয়। ক্ষমতা রাজনীতির সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ কোন থিয়েটার সত্যিকার সৃজনশীল কাজ হাজির করতে পারবেন বলে আমি মনে করি না।

টেলিভিশনের অভিনয় শিল্পীদের তারকাখ্যাতি ব্যবহার করে মঞ্চ নাটককে ভিতর থেকে ফোকলা করে ফেলা হয়েছে। মঞ্চনাটকের জন্য দরকার দুর্ধর্ষ অভিনয়ের দাপটতারকা খ্যাতি নয়। টেলিভিশনের তারকাবাজির বাইরে একদিন নিশ্চয়ই মঞ্চের জীবন লিপ্ত নিজস্ব তারকা বেরিয়ে আসবেন।

প্রশান্তিকা : প্রশান্তিকায় বিভিন্ন সময়ে আপনার কবিতা এবং গদ্য প্রকাশিত হয়েছে। অসংখ্য পাঠক আপনার ভাষার আঙ্গিক এবং ভাবনার গভীরতার প্রশংসা করেছেন। সে বিষয়ে আপনার কাছেই শুনতে চাই। আপনি যেভাবে লিখেন- কবিতা কি এরকমই হতে হবে?

বদরুজ্জামান আলমগীর : আমি নিজে কবিতা লিখি না- কবিতা লেখে আমার কৌম, আমার সময়। আমি এক নিরাশ্রয় গৃহী- আমার কৌমের কাছে, পূর্বপুরুষের কাছে শুয়ে থাকতে, বুড়ি দাদিমার হাতপাখার বাতাসে নিরুপদ্রব ঘুম যেতে চাই, শত টাউয়েল থাকার পরও আমি চাই আমার মা তার আঁচলে আমার মুখটি মুছে দিক, বাবার কোমরের ব্যথায় ঈষদুষ্ণ আকনমেন্দির পাতা ঘষে দিতে চাই- এইটুকু এই সামান্য আকুতির কথা আমার অক্ষম পদ্যে লিখি- তার একতিল বেশি কিছু তো নয়।

আমার কৌমের দিকে মুখ করে থাকা কোনভাবেই জাতীয়তাবাদী কোন ঘেরাটোপ নয়। আমি একে বলি- আন্তর্জাতিকতাবাদী লোকাল।

প্রশান্তিকা : আমরা বদরুজ্জামান আলমগীরকে পড়তে ভালোবাসি। তিনি নিজে কাদেরকে পড়েন ?

বদরুজ্জামান আলমগীর : দেখুন, আমি মহাভারত থেকে বাজারের ঠোঙ্গা সবই পড়ি। কেবল বই কেন- এই দুনিয়া কতোবড় বই- তা পড়তে পড়তেই যে কোনফাঁকে এক জীবন নাই হয়ে যায়। এখন আমাদের ঘরে একটি বিড়াল আছে- আমার ছেলে ওর নাম রেখেছে কোরিয়েণ্ডার- ধনেপাতা। কোরির চোখের গভীরতা আর মায়া, যে নির্মোহতা- আমি কোনভাবেই মিলাতে পারি না। কোরিয়েণ্ডার কীভাবে এতোটা নির্মোহ, স্নেহের কাছে, ভালোবাসার ডাকে কেমনকরে এমন শর্তহীন- আমি জানি না। আমার মনে হয়, একটি বিড়ালের প্রাণপদ্ম পাতায় একজন গৌতম বুদ্ধ ধ্যান করে আছেন!

এতোক্ষণ যা বললাম- তার কোনকিছুই হয়তো ঠিক নয়, কেবলই কথার কথা, নির্দিষ্টভাবে কোন আকারে অনড় নয়- তারা হয়তো কতোগুলি নিরুত্তরের পঞ্চায়েত, নাকি এরা গরুর মায়াবী চোখের পানি- যা কিছু বলতে না পারার কান্দন গুডা মাত্র!

মায়া করে, ভালোবেসে আমার মত একজন অতি অতি সাধারণ মানুষের কাছে কতোকিছুই জিজ্ঞেস করেছেন- একটুখানি জানার কথা বললে অসীম অজানা পাহাড় হয়ে চারপাশে জমে ওঠে।

কী বলবো বলুন- আমি তো সময়ের ভিতর সালভাদর দালির মেল্টিং ক্লক-  অবিরাম গলে গলে যাই।

প্রশান্তিকা : বাংলাদেশ ও দেশের বাইরে এই মুহূর্তে আমরা বড় অশান্ত ও অসময় পার করছি। সব কিছু সামাল দিয়ে প্রশান্তিকাকে সময় দেবার জন্য আপনাকে অশেষ ধন্যবাদ।

বদরুজ্জামান আলমগীর : প্রশান্তিকার টিম, আপনাকে এবং প্রশান্তিকার অসংখ্য পাঠককে আমার শুভেচ্ছা, কৃতজ্ঞতা।

বিজ্ঞাপন
0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments