বন্দি মুরগীর ডিম বনাম প্রজন্মের বিশ্বাস । শিল্পী রহমান

  •  
  •  
  •  
  •  

ডিম কিনতে যেয়ে একবার ভুল করে ‘কেইজ এগস’ এর বক্স কিনে এনেছিলাম বলে আমার মেয়ে ৩ দিন আমার সাথে কথা বলেনি। আট কি নয় বছর আগের কথা, ওর তখন ১৮ বছর বয়স। এই ঘটনার একদিন আগে ও আমাকে একটা ডকুমেন্টারি দেখিয়েছিল যেখানে খুব পরিষ্কার করে দেখানো হয়েছে, কি নিষ্ঠুর ভাবে মুরগীগুলোকে অত্যন্ত সীমিত জায়গায় অর্থাৎ ওদের শরীরের মাপের খাঁচায় বন্দি করে রাখা হয়। শুধু তাই নয় ওই বন্দি অবুঝ পশুগুলো আরও অনেক রকমের নির্মমতার শিকার হয় , যা দেখলে চোখে পানি এসে যায়। ওই ডকুমেন্টারি দেখার পর ওদের ডিম খাওয়াটা রীতিমতো পাপ বলে মনে হয়। আমি তো সেই ডকুমেন্টারি দেখে, সারাটা সময় ‘আহা’ ‘উহু’ করে তারপরের দিনই দোকানে যেয়ে সেই ‘কেইজ এগস’ কিনে আনলাম। তখন আমি আগের রাতে দেখা ডকুমেন্টারির কথা সম্পুর্ন ভুলে গিয়েছি।

কেন কিনবো না ওটার দাম প্রায় দেড় কি দুই ডলার কম ! এই যে একটা কিছু উপলব্ধি করার পর, আমার পরবর্তী কাজের সাথে এর কোনো সামঞ্জস্যই রইলো না এটার কারণ কি? কারণ একটা বিষয়ে জ্ঞান থাকা এবং সেটা প্রয়োগের মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে। আর সে কারণে বেশীর ভাগ সময়ই দেখা যায় আমরা আমাদের অর্জিত জ্ঞানের অধিকাংশই প্রয়োগ করতে জানিনা।
আমাদের খাওয়া উচিৎ ‘কেইজ ফ্রী এগস’ অথবা ‘ ফ্রী রেইঞ্জ এগস’ , সেটাই মানবিক। এর পরে অবশ্য আর কোনদিন এই ভুল হয়নি আমার। কথা হলো একটা আর্টিকেল পড়ে বা ডকুমেন্টারি দেখে অথবা একটা কিছু শেখার পর সেটার সাথে সম্পর্কিত কোনো কাজের মধ্যে যদি তার প্রভাব না পড়ে তাহলে আমাদের সেই শিক্ষা সম্পুর্ন অর্থহীন।

যাইহোক এখন আমার সেই মেয়ে আরও বড় হয়েছে, জীবন তাকে আরও অনেক কিছু শিখিয়েছে। আমি যখন আমার মেয়ের কথা বলছি তখন আসলে ওদের প্রজন্মের কথা বলছি , আমার ছেলে মেয়ে এবং তাদের বন্ধুরা মোটামুটি সবার ক্ষেত্রেই এই বিষয়গুলো সত্য। এই প্রজন্মের ছেলে মেয়েরা অনেক ডকুমেন্টারি দেখে, পডকাস্ট শোনে, খবর দেখে এবং বিভিন্ন মাধ্যম থেকে অনেক জ্ঞান অর্জন করে। আর ওদের সব কাজে কর্মে তার একটা প্রভাব পরিলক্ষিত হয়, যা আমাদের অনেকের মধ্যেই হয় না। আমরা যেন দৌড়ে ওদের সাথে পেরে উঠছি না, বার বার পরাজিত হচ্ছি। অনেক বিষয়ে একমত হলেও নিজেদের মধ্যে পরিবর্তন আনতে পারিনা। যেমন, জুতা কাপড় কেনা।
ব্র্যান্ডের কিছু কিনতে রাজী নয় তারা, যা একসময় তাদের স্বপ্ন ছিল , কিন্তু কেন?
কারন বড় বড় কোম্পানিগুলো নিজেরা কোটি কোটি টাকা আয় করছে আর তাদের কারিগরগুলোকে অত্যন্ত কম বেতনে অমানবিক খাটুনি খাটাচ্ছে ।

কথা শতভাগ সত্য কিন্তু এটা একটু ঝামেলায় ফেলে দিয়েছে আমাদের । আমরা যখন পরিচিত কোনো ব্র্যান্ডের জামা বা জুতা কিনতে যেয়ে “মেইড ইন বাংলাদেশ” দেখে খুব খুশি মনে কিনতে যাই, সেটা ওরা কিছুতেই কিনতে দেবে না। নেপাল, শ্রীলংকা, ইন্ডিয়া, চায়না ইত্যাদি দেশের নাম থাকলেও একই অবস্থা , তাহলে এখন কি কিনবো? এমন কি কেমার্টের কম দামের জিনিস কিনলেও তারা খুব বিরক্ত কারন কেমার্টের বেশীর ভাগ জিনিষই বাংলাদেশের তৈরী। এর অর্থ বাংলাদেশের গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির কারিগরেরা খুব অল্প বেতনে কাজ করছে, আর এটা অন্যায়। সেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে এই প্রজন্মের নীরব বিদ্রোহই হলো এইসব দোকান থেকে কোনো জিনিষ না কেনা!

আমার প্রজন্মের যুক্তিটা অবশ্য একটু ভিন্ন , এইসব দেশের লোকগুলো কম বেতনে দিনরাত্রি খাটলেও ওরা তো খুশী যে ওদের একটা চাকরী আছে, ওদের পরিবারকে ওরা খেতে দিতে পারছে, নিজে খেতে পারছে। বেকার থাকার চাইতে বা পেটের ক্ষুধা সহ্য করার চাইতে এরা অনেক ভালো আছে। আমার বা আমাদের বন্ধু বান্ধবদের এইসব প্রডাক্ট না কেনার কারণে কি এমন পরিবর্তন হবে? এই বড় কোম্পানিগুলো কি তাদের কারিগরদের বেতন বাড়িয়ে দেবে? এর তো কোনো সম্ভাবনাই নেই।

এখন আমরা পড়েছি এক উভয়সংকটে। মনের ভেতরে একটা সংশয় ঢুকে গেছে , ব্র্যান্ডের কিছু কিনতে গেলে বিবেকের দংশনে ভুগি, আবার না কিনেই বা কি করবো? মাঝে নাঝে লুকিয়ে কিনে ফেলি , কি কঠিন শাষনে আছি বোঝা যাচ্ছে তো ? ঠিক যেমন ওরা ছোটবেলায় আমাদের লুকিয়ে অনেক কিছু করতো, তেমন।
স্থানীয় কারিগরের কিছু কিনতে গেলে অনেক দাম দিয়ে কিনতে হয় কারন এরা তো তাদের নিজস্ব কারিগরকে কম বেতন দিতে পারবে না । সেটা শুধু সম্ভব আমাদের দেশের মতো গরীব দেশের কারিগরদের বেলায়।

আমাদের পরের জেনারেশনের কাছে আমরা পরিবেশ রক্ষা করার পদ্ধতি শিখেছি, পানি কম ব্যবহার করবার মন্ত্র শিখেছি, প্লাস্টিক ব্যবহার না করবার অভ্যাস শিখেছি এবং এই মুহূর্তে ব্র্যান্ডের কিছু কেনা থেকে বিরত থাকছি। আমার মন এখনো ” মেইড ইন বাংলাদেশ” এর কিছু দেখলে প্রফুল্ল হয়ে ওঠে, গর্ব হয় এবং কিনতে ইচ্ছে হয় কারন আমি মনে করি, আমি তো ওদেরই সাহায্য করছি, কিন্তু পরমুহূর্তেই মানবিক চেতনার পোকাটা খোঁচা দিতে থাকে। এ এক বিশাল ডিলেমা … !

আমাদের দেশের গার্মেন্টস ফ্যাক্টরী পুরো দেশের রুপ পাল্টে দিয়েছে, এদের তৈরী কাপড় , জুতা, ব্যাগ দুরদেশে বসে কেনার সময় আমার মনে থাকে না এই কারিগরদের কম বেতনে রাখা হয়েছে। ওরা অনেক লম্বা সময় নিয়ে কাজ করে বলে নিজেদের জন্য সময় থাকে না, ওদের জন্য টয়লেটের সুব্যাবস্থা নেই, মেডিকেলের সুবন্দোবস্ত নেই … অনেকটা সেই খাঁচায় বন্দি মুরগীদের মতো। আমিই হয়তো চোখ বন্ধ করে রেখেছি, সত্য দেখতে বা বুঝতে চাইছি না কারন আমি আর কতোটুকু অবদান রাখতে পারবো? বিবেকের কাছে জবাব দিতে গিয়ে থমকে যেতে হবে । কিন্ত আমাদের পরের প্রজন্ম অত্যন্ত দৃঢতার সাথে সংকল্প করেছে তারা বড় বড় ব্র্যান্ডের কোনো কিছুই কিনবে না।

ওরা ঠিক কাজটাই করছে , শুধু আমার ছেলে মেয়েরাই নয়, ওদের বন্ধু বান্ধব ও অন্যদের সামান্য হলেও ওদের এই ত্যাগ হয়তো একদিন পরিবর্তন আনবে। আমি মন প্রাণ দিয়ে কামনা করছি ওদের এই ত্যাগ সফলকাম হোক।

শিল্পী রহমান: গল্পকার, কবি, সংস্কৃতিকর্মী, কাউন্সেলর ও গবেষক। স্থায়ী নিবাস ব্রিসবেন, অস্ট্রেলিয়ায়। 
প্রকাশিত গ্রন্থসমুহ: ধর্ষণ ধর্ষক ও প্রতিকার; উৎকণ্ঠাহীন নতুন জীবন; মনের ওজন; সম্ভাবনার প্রতিচ্ছায়ায়; যুদ্ধ শেষে যুদ্ধের গল্প; পথের অপেক্ষা; পাহাড় হবো ইত্যাদি।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments