বাঁচতে চাইলে এখুনি পালান দেশ ছেড়ে – নিঝুম মজুমদার

(১)
লন্ডন শহর থেকে যখন ঢাকায় যাই, তখন রাত জেগে তিন বোনের সাথে গল্প করি। কত গল্প যে করি। ক্লায়েন্টদের দুঃখের গল্প, এই শহরের সুখের গল্প, মানুষকে মানুষের মর্যাদা দেবার গল্প, আমার একটু একটু করে আগাবার গল্প।
বোনেরা মাঝে মধ্যে বিষ্ময় নিয়ে বলে, “স্বর্গের গল্প শুনি মনে হয়। ভাইরে তুই আর দেশে আসিশ না। তোরে নিয়ে ভয় হয়, কখন হুট করে গাট্টি বোচকা নিয়ে চলে আসবি। দেশটা ভালো হলে চিন্তা করতাম না। তোকে নিয়েই আমাদের সব চিন্তা”
বোনদের কপালে রাজ্যের চিন্তা আর আমার জন্য ভালোবাসার এইসব প্রকাশে যে বাক্যটা আমার অন্য বন্ধু-বান্ধব,স্বজন, শুভাকাংখীদের সাথে হুবুহু মিলে যায় সেই বাক্যটার পূর্ণ রূপ হচ্ছে-
“নিঝুম আর দেশে ফিরিশ না। কি আছে এখানে?”
আমি আমার বন্ধুদের এইসব আর্জ, এইসব দেশে না ফিরবার জন্য বলা উৎকন্ঠা এখানে থামাই। আমি এই কথাগুলোকে আবার নিয়ে আসছি একটু পর। একটু অন্য প্রসঙ্গে যাই-
(২)
রাজবাড়ী রেলগেট থেকে ঢাকায় আসছি। বাস ড্রাইভার শোঁ শোঁ করে গাড়ি চালাচ্ছে। সরু একটা রাস্তা। দুটো বড় বাস পাশাপাশি চলতে পারে কিছুটা স্থান রেখে। বাসের সামনে মাহেন্দ্র নামের তিন চাকার একটা ইজি বাইক পড়তেই বাস ড্রাইভার সেটিকে বাঁ পাশে রেখে নিজে পুরো ডানে চলে এলেন। এরপর সজোরে একটা টান দিয়ে সেই মাহেন্দ্রকে পাশ কাটিয়ে চলে এলো সামনে। আমি শ্বাসটা বন্ধ করে নিজ চোখে ঘটনাটা দেখলাম। পাশের যাত্রীর দিকে বিষ্ময় নিয়ে তাকাই। দেখি ছেলেটা ভাবলেশহীন। যেন এমন একটি ওভারটেইক অত্যন্ত সাধারণ ব্যাপার।
সামনের সিট থেকে এক লোক বলে উঠে এই লক্কর ঝক্কর হাই রোডে উঠে ক্যা? ধাক্কা দিয়া ফালায়া দেওন দরকার।
আমি নিজের কানকেও অবিশ্বাস করা শুরু করি। এরা বলে কি? একটা বাস একের পর এক যেভাবে সারাটা রাস্তা ওভার টেক করেছে, তার এক চুল যদি এদিক ওদিক হয় তাহলেও অন্য দিকের থেকে ছুটে আসা একটা বাস সিম্পলী উড়িয়ে দিয়ে যাবে আমাদের। কিন্তু এইসব ঘটনায় বাস যাত্রীদের সামান্যতম চিন্তা নেই। কেউ ঝালমুড়ি খাচ্ছে, কেউ বাদাম চিবুচ্ছে, কেউ পত্রিকা পড়ছে।
মাঝে মধ্যে সামনে থাকা অনেক বড় বাস গুলোকে যখন আমাদের বাস ওভারটেক করছিলো তখন অন্য দিক থেকে কোনো বসা আসছে কিনা সেটি দেখা যাচ্ছিলো না। কিন্তু আমাদের বাসের ড্রাইভার সেগুলো থোরাই কেয়ার করে। অন্ধের মত শুধু পেরিয়ে যেতে চায় সে। পেরিয়ে যায় নদী, সাঁকো, বড় রাস্তা, ধানের ক্ষেত।
একটা পর্যায়ে আমি সব কিছু ছেড়ে দিলাম অদৃশ্যের কাছে। যা হবার হবে। বাঁচি আর মরি, হবে। আমি নিজেও পাশের যাত্রীর মত ভাবলেশহীন হয়ে উঠি। আমি যেমন ড্রাইভারকে কিছু বলিনি, অন্য কেউও ড্রাইভারকে কিছু বলেনি। এ এক অদ্ভুত যাত্রায় যেন আমরা চলে যাচ্ছিলাম। মৃত্যুর বাঁক ধরে সে যাত্রা।
(৩)
একটা পর্যায়ে আমার মনে হোলো আমি কি ঠিক শুনতে পেলাম? আমার সামনে বিচারক এইমাত্র যা বললেন, তা কি আসলেই বলেছেন নাকি আমি আসলেই এখানে নেই? নাকি আমি মুরাকামির অদৃশ্য বেড়ালের মত কাউকেই দেখছি না। সব আমার কল্পনা?
চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক বললেন, “আমিই তো র্যাবকে বলেছি মাইরা ফালাইতে। যারা ধর্ষন করছে, ওদের বাচার রাইট নাই। এইসব হারকিউলিস টারকিউলিস মাইরা ফালাক সব। একদম ঠিক আছে”
আমি কিছুক্ষণ ঝিম ধরে থাকি। বিচারকের দিকে তীক্ষ্ণ চোখে গভীর দৃষ্টি দেই। ভরা এজলাশে, শত শত আইনজীবি, দর্শনার্থীদের ভীড়ে তিনি কথাটা বললেন অত্যন্ত উচ্চস্বরে। সামান্য গলা কাঁপেনি, সামান্যতম চিন্তার চিহ্ন তাঁর চোখে আর মুখে দেখা যায়নি, সামান্যতম অপরাধবোধ তাঁর মধ্যে আমি দেখিনি।
বরং তাঁর সামনে যেসব আইনজীবিরা ছিলেন তাঁরা ফ্যা ফ্যা করে হেসেছেন। যেন শতাব্দীর সবচাইতে উচিৎ কথাটা এই মাত্র সক্রেটিস বললেন।
(৪)
বিচারক এজলাশে। এটিও চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট। একজন ভিক্ষুক কোর্ট রুমে ঢুকে গেছে। ভিক্ষা চাইছে। পুলিশ হই হই করে তাড়িয়ে দিচ্ছে। লোকটা বাইরে দাঁড়ানো দর্শনার্থীদের কাছে ভিক্ষা চাইতে শুরু করেছেন।
বিচারকের সামনে প্রায় গোটা তিরিশেক আইনজীবি দাঁড়ানো। পুরো হল রুম জুড়ে প্রচন্ড শব্দ। কে কোন দিক থেকে কি বলছে কিছুই বুঝতে পারা যাচ্ছে না। এক আইনজীবির হিয়ারিং শেষ হয়নি, আরেক আইনজীবি একটা ধাক্কা মেরে অন্য আইনজীবিকে সরিয়ে দিলেন। “ভাই বহুত বলসেন। এইবার আমার পালা”
বিচারক তাঁর ক্লার্কের সাথে কথা বলছেন। পান চিবুচ্ছেন। কফিওয়ালা রুমের পাশে বসে কফি বিক্রি করছেন। গোটা তিরিশ আইনজীবি সবাই এজলাশের সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। কে কার আইনজীবি এগুলোর কোনো ঠিক নেই। কারো কালো কোর্টে ঘামের সাদা দাগ লেগে রয়েছে, নোংরা হয়ে রয়েছে সাদা শার্ট, পন্সের স্যান্ডেল পরে চলে এসেছেন, কালছে হয়ে যাওয়া প্যান্ট, নোংরা হয়ে ওঠা গাউন। মনে হচ্ছিলো এটা একটি দেশের আদালত হতে পারেনা, এটি স্রেফ একটি ঘোর লাগা সময়ের গল্প। মনে হচ্ছিলো মধ্যযুগের একটি বৈকালিক সমাবেশে আমরা ঢুকে পড়েছি স্বপ্নের মধ্য দিয়ে। আমার মনে হচ্ছিলো, আমি যেন সময়কে অতিক্রম করে বহুদূর বহুদূর চলে এসেছি।
(৫)
ঢাকার মতিঝিলে বা গুলিস্থানে কিংবা ইনফ্যাক্ট ঢাকার অসংখ্য আনাচে আর কানাচে রাস্তায় দেখা যায় রাজ্যের তার একটির সাথে আরেকটি পেঁচিয়ে রয়েছে উঁচু উঁচু বিদ্যুতের খুঁটির সাথে। এগুলো একটির সাথে আরেকটি এমনভাবে পাকিয়ে রয়েছে যেটি দেখলে মনে হতে পারে কাম্রুখ কামাক্ষার জটাধারী সাধু-সন্তরা ঠাঁয় দাঁড়িয়ে রয়েছে এই তিলোত্তমা নগরীতে। একজন সংবেদনশীল মানুষ এই অবস্থার সামনে দাঁড়িয়ে স্রেফ ভাব্বেন, “এখানকার মানুষেরা স্রেফ মৃত্যুটা বুকের উপর নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছেন অবলীলায়”
এখানকার শত শত এপার্টমেন্ট, শত শত ইমারত, দালান-কোঠা শুধু মানুষের শরীর এলিয়ে দেবার স্থান কেবল। শুধু কোটি কোটি টাকা নির্ধারণ করে এক এক আজব হাট বাজার। এখানকার মানুষ জানেই না সুপেয় পানি কাকে বলে, নিরাপদ জীবন কাকে বলে, অগ্নি নির্বাপক ব্যবস্থা কাকে বলে, মানুষের অধিকার কাকে বলে।
প্রতিটি এলাকার জমির মালিকেরা তার জমির প্রতিটি ইঞ্চি জমিতে ইমারত উঠাতে চায় কিন্তু ঘরের সামনে একটা হাত স্থান ছেড়ে দিতে নারাজ। ১০ তলা ভবন বানিয়ে প্রতি তলা ফ্ল্যাট বিক্রি করছে ১ কোটি-২ কোটি টাকায় কিন্তু সামান্যতম চিন্তা নেই বাসার সামনে জীর্ণ রাস্তাটি নিয়ে, ডোবাটি নিয়ে কিংবা সেই ইমারতে আগুন লাগলে কি হবে সেটি নিয়ে।
একটা সময় ভাবতাম, এটি হয়ত ইচ্ছে করেই করে না। কিন্তু এখন আমার মত পাল্টেছে। আমার ধারনা এরা জানেই না, নিজের জীবনের নিরাপত্তা বলে কোনো ব্যাপার থাকতে পারে।
এই শহরের অনেক মানুষের অনেক দামী গাড়ী রয়েছে, প্রচুর অর্থ রয়েছে, বাড়ী রয়েছে কিন্তু তাঁর কাজ থেকে ঘরে ফিরতে যে কালো ধোঁয়ায় আর শীষার শহরে তিনি ভেতরে ভেতরে মরে যাচ্ছেন, তিনি সেটা জানেন-ই না।
ঢাকায় গেলে পাঁচ মিনিট পর পর মুখটা ভর্তি হয়ে যায় বালুতে। বিষাক্ত বাতাসে নিঃশ্বাসটা বন্ধ হয়ে ওঠে, অবিরাম গাড়ির হর্নে মাথাটা ফেটে যেতে থাকে। মনে হয় একটা নোংরা শহরে এসে পৌঁছে গেছি যেখানে মানুষ ভাবলেশহীন, স্বাভাবিক আর নির্লিপ্ত।
(৬)
এফ আর টাওয়ারে ফায়ার এক্সিট নাকি তালা মেরে রাখা হয়। এই কথাটা শুনেই মাথাটা ভোঁ ভোঁ করে ঘুরতে থাকে। আসলে এফ আর টাওয়ার ফাওয়ার তো অনেক দূরের কথা। এবার ঢাকায় গিয়ে এমন সব বিল্ডিং-এ গেছি যেখানে গিয়ে মনে হয়েছে সিম্পলী দুই হাত জমির উপরে ১০ তলা বিল্ডিং বানিয়ে ফেলেছে। সে ইমারতের সিঁড়ি বেয়ে একজন মানুষের যেতে পারাটাও আমার কাছে দুঃসাধ্য মনে হয়েছে। আর সেই ইমারতের অগ্নি নির্বাপন ব্যবস্থা অনেক অনেক দূরের গল্প। সেখান থেকে পালিয়ে বের হয়ে আসাটাই মনে হয়েছে পৃথিবীর সবচাইতে দূরহতম কাজের একটি।
(৭)
আমার খুব প্রিয় একজন বড় ভাই। নামকরা ব্যারিস্টার। অনেক দিনের প্র্যাক্টিস। নিজের গাড়ি রয়েছে, বাড়ি রয়েছে। কিন্তু আমাকে জানালেন তিনি দেশের বাইরে চলে যেতে চান। আমি পরম বিষ্ময় নিয়ে ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে থাকি। বিশ্বাস হতে চায় না। ভাই এক এক করে হাই কোর্টের বিচারকদের একজন একজন করে বর্ণনা করলেন। কি করে হাই তুলতে তুলতে বিচারক আইন নিয়ে কথা বলেন… “যান…যান…আইন কপচায়…সামনে বাড়ান কি বলবেন…”
শেখ ফজলে নূর তাপস কোর্টে দাঁড়ালে বিচারকরা ব্যস্ত হয়ে পড়েন তাঁর কথা শুনবার জন্য। কিন্তু তাপসের মত নন এমন অখ্যাত আইনজীবির আইন শুনবার সময় নেই বিচারকদের হাতে। জুনিয়ারদের দিয়ে সারাটা দিন কাজ করান সিনিয়ার রা। দিন শেষে ১০০ বা ২০০ টাকা ধরিয়ে দেন। অসভ্য ব্যবহার, নোংরা আচরণ, তাচ্ছিল্য এসব যেন নিত্য ঘটনা।
ভাই তাই আর এই দেশে থাকতে চান না। সন্তানদের ভবিষ্যৎ ভেবে তাই চলে যেতে চান দেশের বাইরে। যেখানে সকল প্রতিভার চর্চা করা যায়, সম্মান নিয়ে বেঁচে থাকা যায়। যেখানে হাইকোর্টের বেঞ্চ বাগানো বিচারপতিরা পান চিবুতে চিবুতে কথা বলেন না, হাই তুলতে তুলতে অর্ডার দেন না, টাকা নির্ধারণ করে মামলার ভবিষ্যৎ স্পস্ট করেন না।
পরিশেষঃ
আপনারা যারা আজকে এফ আর টাওয়ার নিয়ে ভাবলেন, দুই সপ্তাহ আগে চকবাজার নিয়ে, তারও আগে কামরাঙ্গীর চরের আগিন নিয়ে, তারও আগে নীলক্ষেত মার্কেট নিয়ে, তারও আগে বঙ্গবাজার নিয়ে আমি তাদের অভিনন্দন জানাই। আপনাদের এইসব ধৈর্য্য, আপনাদের এসব একের পর এক ভাবনায় দেশ বহু এগিয়ে গেছে। ছোট মুখে তাই বড় কথা বলি একটা।
বাঁচতে চাইলে এখুনি পালান দেশ ছেড়ে। পশ্চিমে না পারলে অন্তত ভুটানে হলেও পালান। জাস্ট পালান।
নিঝুম মজুমদার
লেখক, কলামিস্ট ও আইনবিদ
লন্ডন, যুক্তরাজ্য।