বাংলাদেশির রসুইঘরে মাতোয়ারা যখন সারা বিশ্ব । মোঃ ইয়াকুব আলী

  •  
  •  
  •  
  •  

 208 views

বেগম রোকেয়া তাঁর ‘রসনা-পূজা’ প্রবন্ধে ভারতবর্ষের মুসলমান সমাজের রসনা পূজার বিশদ বিবরণ দিয়েছেন। সেখানে তিনি রসনা পূজার কারণ এবং রসনা পূজার ফলে যেসব ভোগান্তি হয় তারও উল্লেখ করেছেন। পাশাপাশি রন্ধনশালারও পুঙ্খানুপুঙ্খু বিবরণও দিয়েছেন। তাঁর ভাষায় ‘কাহারও বাড়ি গেলে দেখিবে, চালের উপর খড় নাই, ঘরখানার চারিদিকে আবর্জনাময়, বসিবার একটু স্থান নাই, মাথার উপর (চালে) মাকড়সার জাল ঝুলিতেছে – এইরূপ তো হীন অবস্থা। কিন্তু জলখাবার সময় দেখিবে অতি উৎকৃষ্ট পারাটা, কোর্মা, কাবাব উপস্থিত – আমাদের সাত দিনের খাবার খরচ তাঁহার একদিনে ব্যয় হয়।’ এছাড়াও রন্ধনশালার বর্ণনা দিতে যেয়ে বলেছেন ‘দ্বারদেশে পচা কাদা; হংস, কুক্কুট ইত্যাদি সেই (পচা ফেনমিশ্রিত) কাদা ঘাঁটিতেছে, তাহার দুর্গন্ধে আপনার ঘ্রাণেন্দ্রিয় ত্রাহি ত্রাহি করিবে। কিন্তু পশ্চাদপদ হইবেন না – কোনমতে ভিতরে প্রবেশ করিয়া দেখিবেন কেহ বাটনা বাটিতেছে, কেহ কুটনা কুটিতেছে, কেহ কেওড়া বা গোলাপজলে জাফরান ভিজাইতেছে। এখানকার সুগন্ধ এতই আনন্দপ্রদ (Inviting) যে ব্রাম্মণের পৈতা ছিঁড়িতে ইচ্ছা হইবে।’ এতো গেলো আমাদের রান্নার আয়োজন, বসনা পূজার কিঞ্চিৎ বিবরণ।

কিশোয়ার চৌধুরী

এইবার আসা যাক আমাদের রান্না বা তৈরী দ্রব্যাদির খ্যাতির বিষয়ে। বঙ্কিমচন্দ্র বা প্রমথ চৌধুরীর পর সৈয়দ মুজতবা আলী আমাদের রম্য সাহিত্যকে অন্য মাত্রায় নিয়ে গিয়েছিলেন। উনার অন্যতম সেরা রম্য গল্প ‘রসগোল্লা’। এই গল্পের রম্য বিষয়বস্তুর সাথে আরো একটা বিষয় লক্ষণীয়। সেটা হচ্ছে রসগোল্লার স্বাদ। এই স্বাদ এতই মনোহরী যে পৃথিবীর যেকোন প্রান্তের যেকোন মানুষকে কাবু করতে সক্ষম। ঝান্ডুদা একবার তার বন্ধুর মেয়ে চিংড়ির জন্য লন্ডনে এক টিন রসগোল্লা নিয়ে যাচ্ছিলেন কিন্তু কাস্টমস অফিসারের জোরাজুরিতে সেটা খুলে দেখাতে হয়। মিষ্টির টিন একবার খুললে সেটা আর কোনভাবেই সংরক্ষণ করা যাবে না। এটা বহুবার বুঝিয়েও কোন লাভ হলো না। যেহেতু খুলেই ফেলতে হলো তাই সেখানে উপস্থিত দেশ বিদেশের সকল যাত্রী, পুলিশ, অফিসার সবাইকে রসগোল্লা খাইয়ে দিলেন। সবাই খুবই তৃপ্তি করে সেটা খেলেন কিন্তু যে অফিসারের পীড়াপীড়িতে টিনটা খুলতে হয়েছিলো তিনি খাবেন না। তখন ঝান্ডুদা তার বিশাল বপুর শরীর নিয়ে উনাকে চেপে ধরে নাকের উপর একটা রসগোল্লা লেপ্টে দেন। অফিসার ক্ষুব্ধ হয়ে পুলিশ ডাকলেন। পুলিশ আসার পর ঝান্ডুদা পুলিশকেও রসগোল্লা খাওয়ার জন্য দিলেন। অফিসার উনার অভিযোগের কথা বলতে শুরু করলেন কিন্তু পুলিশ ততক্ষণে একটা রসগোল্লা মুখের মধ্যে নিয়ে চোখ বন্ধ করে রইলেন আড়াই মিনিট। এমনই আমাদের রসগোল্লার স্বাদ।

এছাড়াও সৈয়দ মুর্তাজা আলী তাঁর প্রবন্ধ-বিচিত্রা গ্রন্থে লিখেছেন: ‘তখনকার দিনে [মুঘল আমলে] পান খাওয়ার খুব রেওয়াজ ছিল। পূর্ববঙ্গে সাচি ও অন্যান্য প্রকার পান ও সুপারী পর্যাপ্ত পাওয়া যেত। কিন্তু পানের মশলা আসত বিদেশ থেকে। বিহার থেকে আসত বিখ্যাত জনকপুরী। সাচি পানের এত চাহিদা ছিল যে, ঢাকার সাচি পানের জন্য আলাদা বাজার বসেছিল। এই বাজারের নাম ছিল সাচিপান দরিয়া।’ অন্যদিকে জেমস টেলর-এর ‘কোম্পানী আমলে ঢাকা’ (মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান অনূদিত) গ্রন্থ থেকে জানা যায় তখন ঢাকায় ‘তাম্বলী সম্প্রদায়’ নামে এক পেশাজীবী শ্রেণির কথা; যারা পান-সুপারি বিক্রির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বাংলাদেশে তাম্বুল বা পানকে সাধারণত খাওয়ার পর পরিবেশন করার চল আছে। আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা সবাই মোটামুটি কমবেশি পান খান বিশেষকরে উৎসবের খানদানার শেষে পান পরিবেশন বাংলাদেশের অনেক পুরোনো ঐতিহ্য। সময়ের সাথে সাথে পানের সাথে অনেক মসল্লা যোগ হয়েছে কিন্তু পানের চাহিদা রয়ে গেছে। বয়স্ক যাদের পান চিবোনোর মতো দাঁত নেই তারাও হামানদিস্তা বা শিল পাটাতে ছেঁচে পান খান। কিন্তু পান তাদের খেতেই হবে।

মাস্টারশেফের তিন বিচারকের সঙ্গে গ্রান্ড ফাইনালের তিন প্রতিযোগী কিশোয়ার, জাস্টিন এবং পিট।

উপরের ঘটনাগুলো গত কিছুদিন ধরে মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে কারণ অস্ট্রেলিয়াতে চলছে ‘মাস্টারশেফ অস্ট্রেলিয়া’ নামের অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে বড় রিয়েলিটি শো। সেখানে সারা অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন প্রান্তের সেরা রাঁধুনিরা বিভিন্ন ধাপ পার করে চূড়ান্ত প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য একের পর এক সুস্বাদু এবং মুখরোচক পদ রান্না করে চলেছেন। আর সেখানেই অংশ নিয়েছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রতিযোগী কিশোয়ার চৌধুরী নূপুর। অবশ্য এই শোতে এই প্রথম কোন বাংলাদেশির অংশগ্রহণ নয়। এর আগেও ২০১৭ সালে প্রচারিত নবম আসরে রাশেদুল হাসান নামের একজন বাংলাদেশি অস্ট্রেলিয়ান অংশ নেন। তিনি নির্বাচিত হন সেরা ২৪-এর জন্য। তবে প্রথম পর্বেই শেষ হয়ে যায় রাশিদুল হাসানের মাস্টারশেফের যাত্রা। নানান অভিজ্ঞতা আর কিছু স্মৃতি নিয়েই বাড়ি ফেরেন তিনি।
এবারের মাস্টারশেফ অস্ট্রেলিয়ার ত্রয়োদশ আসরের প্রতিযোগী বাংলাদেশি বংশদ্ভুত কিশোয়ার চৌধুরীর বিশেষত্ব হচ্ছে তিনি শুরু থেকেই বাংলাদেশের সব ঐতিহ্যবাহী খাবার পরিবেশন করে চলেছেন। তাঁকে এই প্রতিযোগিতার শুরুতে যখন জিজ্ঞাসা করা হয়েছিলো এই প্রতিযোগিতা থেকে তার এক্সপেক্টেশন কি? তখন তিনি বলেছিলেনঃ তিনি অস্ট্রেলিয়াতে বাংলাদেশের খাবারের প্রচলন করতে চান আর বাংলাদেশি খাবারের উপর একটা বই লিখতে চান যাতেকরে সহজেই যে কেউ বাংলা খাবার তৈরি করতে পারেন। এরপর তিনি একে একে বাংলাদেশের সব খাবার রান্না করে গেছেন যার মধ্যে আছে ফুচকা, চটপটি, সমুচা, আলুর দম আর তেঁতুলের চাটনির মিশেল, খিচুড়ি, বেগুন ভর্তা, মাছ ভাজা  আর নিরামিশের প্ল্যাটার, খাসির রেজালা ও পরোটা, ক্রোসাঁ উইদ আ ক্যালকাটা টুইস্ট। সবশেষ গত ১১ই জুলাই রোববার সেমিফাইনালের সার্ভিস চ্যালেঞ্জে তিনি রান্না করেছিলেন স্ট্রাটার হিসেবে কিংফিশ, মেইন মেন্যু হিসেবে ছিলো গোট নিহারী আর ডেজার্ট হিসেবে ছিলো দি বেঙ্গল আফটার মিন্ট।

মাস্টারশেফ কিচেনে মা বাবা এবং পরিবারের সঙ্গে কিশোয়ার।

মাস্টারশেফ অস্ট্রেলিয়ার এবারের ফিনালেতে উঠার লড়াই ছিলো এই ‘সার্ভিস চ্যালেঞ্জ’। এ চ্যালেঞ্জে বিচারকদের পাশাপাশি রেস্তোরাঁয় আগত অতিথিদেরও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রান্না করে খাওয়াতে হয়েছিলো। এই ‘সার্ভিস চ্যালেঞ্জ’ মোটেই সহজ ছিল না। তিনজন প্রতিযোগীকেই এমন তিনটি পদ রাঁধতে হবে, যা তাঁদের নিজস্ব ইউনিক খাবারকে তুলে ধরবে। খাওয়াতে হবে ২৩ জন গ্রাহক, ২০ জন অতিথি আর প্রতিযোগিতার তিন বিচারককে। আর এ সবকিছুই করতে হবে মাত্র ঘণ্টা সময়ের মধ্যে। কিশোয়ার অনেক বেশি করছিলেন। কিশোয়ারের মেইন কোর্স ছিল নেহারি, যার আসল স্বাদ পেতে হলে সেটাকে সারারাত ধরে চুলার অল্প জ্বালে জ্বালাতে হয়। কিন্তু এই স্বল্প সময়েই কিশোয়ার রান্না করেন মজাদার নেহারি। উনি বলেছিলেনঃ এটি তাঁর বাবার শেখানো রেসিপি। খাবার শেষে ডেজার্ট। সেখানেই কিশোয়ার তাঁর উদ্ভাবনী শক্তি দিয়ে তৈরী করেন পানের সাথে আইসক্রিমের মিশেলে এক অদ্ভুত রিফ্রেসিং ডেজার্ট। এটাকে উনি নাম দিয়েছিলেন, দি বেঙ্গলি আফটার ডিনার মিন্ট। এটা মুখে দিয়েই বিচারকদের মুখোভঙ্গিতে ফুটে উঠে অদ্ভুত সব ভঙ্গিমা। উনার পান খেয়ে বিচারক মেলিসা বলেন, ‘এটা কিশোয়ারের প্রেমপত্র বাংলাদেশের জন্য’।

এভাবেই অস্ট্রেলিয়ার ভিক্টোরিয়া রাজ্যের মেলবোর্নের বাসিন্দা, দুই সন্তানের মা কিশোয়ার চৌধুরীর পৌঁছে যান এই শোয়ের ফাইনালে। এটা নিয়ে অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী সব বয়সী বাংলাদেশিদের মধ্যেই উত্তেজনা কাজ করছে। সবাই প্রশংসা বন্যায় ভাসিয়ে দিচ্ছেন কিশোয়ারকে। এমনকি বাংলাদেশ থেকেও পাচ্ছেন শুভেচ্ছা বাণী। কিশোয়ার এই প্রতিযোগিতায় যে কারণে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন সেটা হচ্ছে উনি প্রত্যেকটা রেসিপি রান্না করার পর বলেছেন সেই রেসিপিটা উনি বাংলাদেশের কার কাছ থেকে পেয়েছেন। সেখানে যেমন একদিকে এসে উনার বাবা মায়ের নাম। অন্যদিকে এসেছে বাংলাদেশের রাস্তার খাবারের কথাও। অবশ্য উনার রাস্তার খাবার টেস্ট করে বিচারকেরা বলেছেন এটাই যদি রাস্তার খাবার হয় তাহলে আমি প্রতিদিনই রাস্তার খাবার খেতে চাই। আর কিশোয়ার যতবারই বাংলাদেশের নাম বলেন উনার গলার ধরে আসে। চোখ হয়ে যায় অশ্রুসিক্ত। এটা ব্যক্তিগতভাবে আমার খুব ভালো লেগেছে। তাই উনাকে টিভির পর্দায় যতবারই বাংলাদেশের নামটা উচ্চারণ করতে শুনি ততবারই আমাদেরও গলা ধরে আসে। আসলে এই অবারিত আবেগটাই তো আমাদের সম্বল। সামর্থ না থাকা সত্ত্বেও জীবনে চলার পথে একধাপ এগিয়ে দেয় এই আবেগ।

প্রতিযোগিতার অন্যতম জনপ্রিয় বিচারক মেলিসা লিয়ং কিশোয়ারের মিষ্টি পান খেয়ে বলেন, ‘ ইটস্ আ্য লাভ লেটার টু বাংলাদেশ।’

শুরু করেছিলাম রসনা পূজা, রন্ধনশালার পরিবেশ এবং বিদেশে আমাদের মিষ্টির কদর দিয়ে। সেখানে ফিরে আসি। অবশেষে আমাদের পরিশ্রমী বাঙালি মায়েদের বাটনা-বাটা, কুটনা-কুটার একটা আন্তর্জাতিক অর্জন পেতে যাচ্ছি আমরা। রান্নাঘরের পরিশ্রমকে আমরা সাধারণত স্বীকৃতি দিতে চাই না। সেদিক দিয়ে চিন্তা করলে এটা অবশ্যই অনেক বড় একটা অর্জন। আমাদের ডেজার্টের কথা এখন জানে সারা বিশ্ব। কিশোয়ার চৌধুরী যেন বাংলাদেশকেই এগিয়ে নিয়ে চলেছেন বিশ্বের দরবারে। কিশোয়ার চৌধুরীর জন্য শুভ কামনা। উনি উনার সেরাটা চেষ্টা করবেন এটা আমরা সবাই এখন জানি। ফাইনালে উনি জিতুক বা না জিতুক উনার মাধ্যমে আবারও বিশ্বময় বাংলাদেশের নাম উচ্চারিত হবে, বাংলাদেশের পরিচয় পৌঁছে যাবে আরো বেশি মানুষের কাছে।

বিঃ দ্রঃ এই লেখা যখন প্রকাশিত হচ্ছে তখন ফাইনালে কিশোয়ার একটা চমৎকার ব্যাপার ঘটিয়ে ফেলেছেন। পান্তা ভাতের সাথে আলু ভর্তা আর শুকনা মরিচ পোড়া। সাথে ছিলো ইলিশের বিকল্প হিসেবে সার্ডিন মাছ আর একেবারে খাঁটি পেঁয়াজ, ধনেপাতার বাংলাদেশি সালাদ। এই খাবার তৈরি করে কিশোয়ার বলেনঃ এটা কখনোই কোন রেস্তোরাতে পাওয়া যাবে না। এই সহজ খাবার বিচারকেরা পরম তৃপ্তি সহকারে খেয়েছেন এবং বলেছেন এটা খুবই সাধারণ খাবার হলেও অনেক শক্তিশালী একটা খাবার। সবগুলো পদ একসাথে মুখে নিলে স্বাদে মন প্রাণ একেবারে ভরে যায়। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কিশোয়ার যে সাহস নিয়ে মাস্টারশেফ অস্ট্রেলিয়ার মতো বড় আসরে পান্তা পরিবেশন করেছেন সেটা সত্যিই প্রশংসার দাবিদার। উনি একেবারে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন শেকড়ের সাথে সম্পর্ক মানুষকে সবসময়ই বড় করে, মহান করে।

ছবিগুলো নেয়া হয়েছে মাস্টারশেফ পেজ থেকে ।

মো: ইয়াকুব আলী
লেখক, প্রকৌশলী
সিডনি, অস্ট্রেলিয়া।
প্রকাশিত গ্রন্থ: নদীর জীবন; অস্ট্রেলিয়ার ডায়েরি।

0 0 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments