বাংলাদেশের ঐতিহাসিক জয়: অস্ট্রেলিয়া প্রবাসীদের প্রতিক্রিয়া

  •  
  •  
  •  
  •  

আতিকুর রহমান শুভ: অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে এই প্রথম বাংলাদেশ একটি সিরিজ জয় করেছে। শুধু সিরিজ কেনো দেশটির বিপক্ষে টানা দুই ম্যাচ জয়ের ইতিহাসও এই প্রথম। আমরা কঠোর লকডাউনে ঘরে বসে দিনযাপন করছি। সাকিব, মাহমুদুল্লাহ, মুস্তাফিজদের এই বিজয় আমাদের নিরানন্দ জীবনকে আনন্দে ভরে দিয়েছ। অভিনন্দন প্রিয় বাংলাদেশ।

গতকাল পাঁচ ম্যাচের সিরিজের তৃতীয় ম্যাচে বাংলাদেশ ১০ রানে, ৪ আগস্টে ৫ উইকেটে এবং এর আগে প্রথম ম্যাচে ২৩ রানে জয়লাভ করেছে। আজ এই প্রতিবেদন লেখার সময় পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়ার নামকরা প্রধান পত্রিকাগুলো এখন পর্যন্ত এই খেলা নিয়ে কোন নিউজ করেনি। হয়তো চলমান অলিম্পকি কাভারেজ করার জন্য ব্যস্ত তাদের ক্রীড়া সাংবাদিকেরা। যদিও টেলিভিশনের খবরে একটু দেখিয়েছে। যার অধিকাংশ জুড়ে ন্যাথান এলিসের ডেবু হ্যাট্রিকের খবরটাই বেশি ছিলো।

কঠোর লকডাউনের নিষেধাজ্ঞা না থাকলে অস্ট্রেলিয়ায় ছোট্ট বাংলাদেশ খ্যাত লাকেম্বায় গ্রামীণ চত্বরে কিংবা সাউথ ওয়েস্ট সাবার্ব মিন্টোর বিডি হাবের বিশাল টিভিতেই খেলা দেখতেন ক্রীড়ামোদী বাঙালিরা। শুধু তাই নয় কয়েকটি আনন্দ মিছিলও নিশ্চিত বের করে ফেলতেন তারা।

বিজয়ী স্কোয়াড। বাংলাদেশ ক্রিকেটের সোনার ছেলেরা।

আমরা প্রশান্তিকার পক্ষ থেকে সেই আনন্দিত প্রবাসী ক্রীড়ামোদীদের কিছু প্রতিক্রিয়া সন্নিবেশিত করেছি। পাঠকদের জন্য এখানে দেয়া হলো:

আবু তারিক, সংগঠক; সম্পাদক, সিডনি বেঙ্গলী: প্রথমেই আমি বলেছিলাম, দুইটাই আমার দেশ একটি আমার জন্মভূমি আরেকটি আমার বাসভূমি। আমি অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের ম্যাচ হলে বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়ে খেলা দেখি। অস্ট্রেলিয়াকে বাংলাদেশ সিরিজে হারাতে পারে এইটা একটা স্বপ্ন ছিলো বরাবরই। বাস্তবে যখন ঘটে গেলো, তখন মনে হলো একটা স্বপ সত্যি হলো। মিছিল করেছিলাম যেদিন বাংলাদেশ প্রথম ওয়ান ডে স্ট্যাটাস পেয়েছিল, গত রাতেও এমন একটা ফিলিংস হয়েছিল।

আলী আশরাফ হিমেল, ক্রিকেট সংগঠক ও খেলোয়াড়, সিডনি:

আলী আশরাফ হিমেল ও অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেটার।

অনেকেই বলছেন অস্ট্রেলিয়া দূর্বল শক্তির দল নিয়ে গিয়েছে কিন্তু বাংলাদেশও তামিম, মুশি, লিটন, তাসকিন, রুবেল, সাইফ দের ছাড়া অনভিজ্ঞ দল খেলিয়েছে।
অস্ট্রেলিয়া তাদের টি২০ স্কোয়াড নিয়ে গত কয়েক বছর ধরেই পরীক্ষা নিরীক্ষা করছে কারণ তারা তাদের সেরা দলটি খুজে পায়নি। এই দলের ক্যারি, জাম্পা, স্টার্ক, হ্যাজেলউড, ওয়েড, অ্যাগার, টাই, মার্শ ইত্যাদি অনেকেই তাদের গত বেশ কিছু টি২০ সিরিজেই ছিলেন। তারা ওয়ার্ল্ড ক্লাস প্লেয়ার কোন সন্দেহ নেই এখানে। সব চাইতে বড় কথা দিন শেষে টিম ম্যানেজমেন্ট সেরা দলটাই খেলতে নামান আর অস্ট্রেলিয়ার মতন পেশাদার দল নিয়ে এমন মন্তব্য শোভা পায় না। বিশ্বকাপের আগে তারা কোন ধরনের এক্সপেরিমেন্ট করতে যাবে না।

বাংলাদেশ কখনোই টি২০ তে ভাল দল না তাই পর পর দুই সিরিজ জয় আর এবার অস্ট্রেলিয়ার মত দলের বিপক্ষে জয় দলের সব নতুন মুখদের আত্মবিশ্বাসকে আরো শক্তিশালী করবে যা আমাদের বিশ্বকাপে আমাদের জন্য অনেক পজিটিভ কিছু নিয়ে আসবে বলে আমি মনে করি।

আবুল হাসনাত মিল্টন, কবি; রাজনীতিবীদ, নিউ ক্যাসল, অস্ট্রেলিয়া: ক্রিকেটের সংক্ষিপ্ত ফর্ম্যাটে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে একটি শক্ত অবস্থান তৈরী করে নিচ্ছে, যা তাদের সাম্প্রতিক খেলার ফলাফলে প্রতিফলিত হচ্ছে। ক্রিকেট বিশ্বের অন্যতম মোড়ল অস্ট্রেলিয়ার বিরূদ্ধে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক টি-২০ সিরিজ জয়ের মাধ্যমে তাদের সেই অবস্থানের ধারাবাহিকতারই প্রমাণ হলো। আশা করি, এই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে আসন্ন টি২০ বিশ্বকাপ ক্রিকেটেও বাংলাদেশ ভালো করবে। বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের জন্য শুভ কামনা রইল।

বাংলাদেশ ক্রিকেটে সাকিবের অবদান বলে শেষ করা যাবেনা। বল ছাড়াও ব্যাট হাতে প্রতি ম্যাচে প্রতিবার ৪টি চার হাকেন আমাদের অলরাউন্ডার।

সাঈদ ফয়েজ, সংগঠক, সিডনি: আমি খুব এক্সাইটেড যে আমরা অস্ট্রেলিয়ার সাথে প্রথম কোন সিরিজে জয়লাভ করেছি। আমি মনে করি আমাদের ক্রিকেটের উন্নয়ন স্বার্থে আমাদের আরও ফাস্ট ও স্পোর্টিং পিচ বানাতে হবে। যেনো আমরা বিদেশের মাটিতে টপ ফেবারিটদের সাথেও লড়াই করতে পারি। কেননা আমাদের সাম্প্রতিক সব সাফল্য এসেছে দেশের মাটিতে। আমাদের দলে অনেক নতুন এবং তরুণ ক্রিকেটারদের আবির্ভাব হচ্ছে এই বিষয়টিকে আমি খুব আনন্দিত। এখন আমরা শুধু অভিজ্ঞ খেলোয়ারই নয় নতুনদের ওপরও নির্ভর করতে পারব।

আকবর দীপু, সমালোচক; ক্রীড়ানুরাগী, সিডনি: ক্রিকেট মোড়ল ত্রয়ী দেশের একটি দেশ অস্ট্রেলিয়া। চলনে বলনে স্বভাবে খেলায় অন্যান্য দলগুলিকে গোণায়ই ধরতো না এবং স্লেজিংয়ে এই অস্ট্রেলিয়া রীতিমতো কুখ্যাত হিসাবে নাম কুড়িয়েছে। অনেকবারই অস্ট্রেলিয়া দলের বাংলাদেশে যাওয়া নিয়ে নানারকম প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করেছে। অতীতে একবার অস্ট্রেলিয়া সকার টিম বাছাইপর্বের খেলায় বাংলাদেশে যেতে অপারগতা প্রকাশ করলে ফিফার কঠোর পদক্ষেপে যেতে বাধ্য হয়েছিল। বাংলাদেশ যতবারই অস্ট্রেলিয়া সফরে এসেছে খেলার ভেন্যু হয় ডারউইন। এবারও পাঁচ ম্যাচের টি-২০ খেলায় অস্ট্রেলিয়ার সম্প্রচার মাধ্যমে প্রচার হয়নি।
এবারও অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট টিমের বাংলাদেশে যাওয়া নিয়ে কত টালবাহানা, কত অযৌক্তিক আবদার যা বিসিবি মেনে নিয়েছে। এই আবদার মেনে নিতে একটি বিশাল অংক খরচও হয়েছে। বিসিবি চেয়েছে যে কোনো মূল্যে অস্ট্রেলিয়া বাংলাদেশে আসুক, খেলুক।

আমি অত্যন্ত আনন্দিত যে পাঁচ ম্যাচের সীমিত ওভারের এই খেলায় বাংলাদেশ প্রথম তিনটি ম্যাচে পরিষ্কারভাবে জিতে তাদের অহংবোধে কুঠারাঘাত করতে সক্ষম হয়েছে। আকাশে উড়তে থাকা অস্ট্রেলিয়াকে পাতালে নামিয়ে এনেছে আমাদের বীর ব্যাঘ্র-শাবকেরা।
ক্রিকেটে সুস্থতার জয় হোক। বাংলাদেশ জিতে গেলে জিতে যাই আমরা সবাই ।

গতকাল সিরিজ জয়ের মুহূর্তে অধিনায়ক মাহমুদুল্লাহ রিয়াদের উচ্ছ্বাস।

ফারিনা মাহমুদ, লেখক; সাংবাদিক, মেলবোর্ন: বাংলাদেশের জয়ে খুব খুশি হয়েছি। দেশ থেকে ভালো খবর তো খুব বেশি আসে না। এই জয়টা অন্তত একটু হলেও মনটা ভালো করেছে। শুভকামনা।

আল নোমান শামীম, রাজনীতিবীদ; সম্পাদক, মুক্তমঞ্চ, সিডনি: একসময়ে টিভি পর্দায় অন্য দেশের খেলোয়াড়দেরদেখতাম আর আফসোস করতাম, আহারে, একদিন আমাদের দেশের ছেলেরাও যদি খেলতো, এরকম পাখিরডানার মতো উড়াল দিয়ে উদযাপন করতো, গ্যালারী জুড়ে উড়তো লালসবুজের পতাকা। এই চিন্তা এখন বাস্তব, আরো বাস্তব বিশ্ব ক্রিকেটের তথাকথিত মোড়ল অস্ট্রেলিয়াকে সিরিজে হারানো, তাও ম্যাচ সিরিজটা ম্যাচ বাকীথাকতেই জিতে নেয়া।

বাংলাদেশের এই জয়টা আমাদের অহংকার, নিজেদের উপর আমাদের নিজেদের বিশ্বাস বাঙালীর আজন্মলড়াই করার সাহস হিসেবে দেখি।

জয় হোক বাংলাদেশের, জয় হোক অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটের।

আবুল সরকার, সংগঠক; সভাপতি, বিডি হাব: আমার একদিকেবাংলাদেশ যেটি আমার জন্মভূমি অন্যদিকে দীর্ঘ ২৬ বছরেরবাসভূমি অস্ট্রেলিয়া। দুটি দেশ যখন একই খেলায় মেতে উঠে তখনআমি আনন্দিত হই। ক্রিকেটে অন্যতম শীর্ষ দেশ অস্ট্রেলিয়া। সেইদেশকে আমার জন্মভূমি হারিয়ে দিয়েছে। অন্তত: ক্রিকেটে আমারদুই প্রিয় দেশ কাছাকাছি পৌঁছাতে পেরেছে। অভিনন্দন বাংলাদেশ।একই সময়ে টোকিও অলিম্পিকে রেকর্ড সংখ্যক মেডেল জয় করেক্রমান্বয়ে এগিয়ে যাচ্ছে অস্ট্রেলিয়ার আ্যথলেটরা। অভিনন্দনতাদেরকেও।

মুহাম্মাদ ফোরকান, সিডনিতে বাংলাদেশ সুপারলীগ ক্রিকেটে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্সে খেলেছেন এবং প্রথম সেঞ্চুরিয়ান):

মুহাম্মাদ ফোরকান

অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশের এই প্রথম টানা দুটি ম্যাচ জয়ের ইতিহাস সৃষ্টি হয়েছে। গতকাল সেই ইতিহাস ভেঙে প্রথম সিরিজ সেটা যেকোন ফরমেটে জেতা সম্ভব হলো। আমার আফসোস, দেশে থাকলে বন্ধু বান্ধবদের সাথে খেলা দেখা হতো। এখানে লকডাউনের কড়াকড়ির মধ্যেও ঘরে বসে দেখলাম।
আমার কাছে কালকের ম্যাচের টার্নিং পয়েন্ট ম্যান হলো অধিনায়ক মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ ভাই। ক্রিজে ওনার এই অবদানের কারণেই একটা ভিত্তি তৈরি হয়েছে। তারপর সাকিব, মুস্তাফিজ সহ বোলিং ডিপার্টমেন্ট পুরোটাই সফল ছিলো।

আরিফুর রহমান, লেখক, সিডনি: এই সিরিজ আমাদের ছিল। সেরকম টা আগে থেকেই আমার মনে হচ্ছিল। পূর্বে আমাদের অনেক জয় এসেছে কিন্তু এতোটা কনফিডেন্টলি আসবে আমি ভাবতে পারিনি। আমি আসলে ভীষণ কনফিডেন্ট ছিলাম। কেনো এতটা নিশ্চিত ছিলাম আমি বলতে পারব না। তাও আবার অস্ট্রেলিয়ার মতো দলের সাথে। আমি ভীষণ খুশি। বেশি খুশি নতুন কিছু তরুণ খুব ভালো ক্রিকেট খেলছে। দূর্দান্ত খেলছে। তারা এই স্পিড ধরে রাখবে আমার বিশ্বাস।

মামুন রশিদ, প্রেসিডন্ট, National Sports Cricket Academy, সিডনি:

মামুন রশিদ

এই খেলাটার কারণে বাংলাদেশ আজ অনেক উঁচু মাত্রায় পৌঁছাল। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এতো বড় মাপের খেলায় বাংলাদেশের এটিই প্রথম সাফল্য। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে একটি সিরিজ জেতা চাট্টিখানি কথা নয়। অস্ট্রেলিয়া টিম যে দূর্বল তা নয়। এই টিম যথেষ্ট স্ট্রং টিম। তাদের রয়েছে ওয়ার্ল্ড টপ ক্লাস বোলার এবং ব্যাটসম্যান। বাংলাদেশের এই যে তারুণ্য নির্ভর ধারাটা শুরু হলো তার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে।
আমি অস্ট্রেলিয়ার সমর্থক। বাংলাদেশ যখন অস্ট্রেলিয়ার সাথে খেলে তখনও আমি অস্ট্রেলিয়াকে সাপোর্ট করি। আমি এখানে মেইনস্ট্রিমে একটি ক্রিকেট ক্লাব চালাই। আমার টিমে বাংলাদেশী ছাড়াও অন্যান্য দেশের নতুন প্রজন্ম খেলে। আমি দেখতে চাই এরা সবাই মিলে এক অস্ট্রেলিয়ার জন্যই খেলবে, একদিন ন্যাশনাল টিমেও চান্স পাবে। সেই অর্থে ক্লাবের প্রেসিডেন্ট হিসেবে আমি অস্ট্রেলিয়াকে সমর্থন করি। তবে বাংলাদেশ যখন ইনডিভিজুয়ালি খেলে তখন অবশ্যই আমি আমার মাতৃভূমি বাংলাদেশের সমর্থক। এই জয়ে বাংলাদেশের প্রতি অভিনন্দন।

সুরঞ্জনা জেনিফার খান, চিকিৎসক, সংগঠক, সিডনি: গত মাসে মাস্টারশেফের কিশোয়ার, আর এই মাসে বাংলাদেশ ক্রিকেট টিম। হোয়াট এ পারফরম্যান্স। অস্ট্রেলিয়া এখন নতুন করে বাংলাদেশকে চিনছে। বলা যায়, সমীহ করার মত করে চিনছে।
২০০৭ এ সবুজ পাসপোর্ট নিয়ে এদেশে এসেছিলাম। কালের পরিক্রমায় পাসপোর্টের রঙ বদলে গেছে। গত রাত্রে জয়ের পরে মনে হোল, মনের ভেতরে যে বাংলাদেশ, তাকে কেড়ে নেওয়ার সাধ্য কার? ভীষন আনন্দের, ভীষন গর্বের মুহূর্ত আমাদের সবার জন্য। অভিনন্দন বাংলাদেশ ক্রিকেট টিম।

এস এম আমিনুল ইসলাম রুবেল, সাংবাদিক; সংগঠক, সিডনি: শক্তিশালী অস্ট্রেলিয়ার সাথে বাংলাদেশ যখন রেকর্ড গড়ে দুই ম্যাচ হাতে রেখেই সিরিজ জয় করে নিলো, তখন রাত প্রায় তিনটা, লকডাউনে ঘরবন্দী, কিন্তু আনন্দ তো আর বাঁধ মানে না। বন্ধুরা সবাই সবাইকে ফোন দিচ্ছিলাম, ফাইন খেলে খাবো, তবুও গাড়ি নিয়ে লাল-সবুজের পতাকা উড়িয়ে সিডনীতে মৌন আনন্দ মিছিল করার প্রস্তুতি নিয়ে ফেললাম। অনেক চেষ্টার পর আবেগকে তো কন্ট্রোল করা গেলো, তবে সোশ্যাল মিডিয়ার তোলপাড় থেকে আনন্দ আহরণের সুযোগ ছাড়লাম না। অস্ট্রেলিয়ার নিয়মিত আন্তর্জাতিক বর্ডার বন্ধ আছে দীর্ঘদিন, আমরা প্রবাসী বাংলাদেশীরা এই মহামারীর নির্মম নিয়তিতে আটকে গেছি, করোনায় টালমাটাল প্রিয় জন্মভূমি আর বাসভূমি। অনেক অপেক্ষার পর এমন আনন্দের ক্ষণ এনে দিল আমাদের প্রিয় টাইগার সাবকেরা-
বাংলা ওয়াশ চাই
বাংলাদেশ;
তোমাকে ধন্যবাদ।

গতকাল মুস্তাফিজের শেষ ওভারে মাত্র ১ রান দিয়ে ৫টি ডট বল করেছেন। ম্যাচের ওইরকম মুহূর্তে তার ডট বলগুলোকে বলা হয়েছে ৫ উইকেটের সমান।

মিতা চৌধুরী, সাংবাদিক; সংগঠক, মেলবোর্ন: জাতি হিসেবে বাঙ্গালীর আছে হাজার বছরের ঐতিহ্য।  কিন্তু সমসাময়িক কালে নানাবিধ কারনেই আমাদের যেনো উৎসব বা উদযাপন করার উপলক্ষ্য ক্রমেই কমে আসছে। এই যেমন চলতি টোকিও অলেম্পিক আসরে আমার বাসভূমি অষ্ট্রেলিয়া যেমন একের পর এক পদক জিতেই চলেছে সেখানে আমার জন্মভূমির অবস্থা একেবারেই নাজুক। তারপর আছে বর্তমান করোনা পরিস্থিতি, যা দেশের বাইরে থাকলেও আমাদের ক্রমাগতভাবেই আমাদের রাখছে উদ্বিগ্ন। এইসকল হতাশার মাঝেই আমাদের ক্রিকেটদলের সিরিজ জয় যেনো মরুভূমির বুকে বহু প্রতিক্ষার বৃষ্টি। আমাদের বেশকয়েকজন নিয়মিত খেলোয়ার নেই এইবারের স্কোয়াডে তারপরও নবীনদের নিয়ে এইবারের এই স্কোয়াড চমৎকার খেলছে। দলনেতা হিসাবে মাহমুদুল্লাহ রিয়াদও চমৎকার নেতৃত্বের পরিচয় দিচ্ছেন।

বাংলাদেশী অষ্ট্রেলিয়ান হিসেবে বাংলাদেশ ও অষ্ট্রেলিয়া দল মুখোমুখি হলে আমার মতো অনেকেই এক দ্বৈরথে পড়ে যান তাই দুই দলের জন্যই শুভকামনা। বাংলাদেশ দলকে বিশেষভাবে বলতে চাই, আমাদের বিভিন্ন অনিশ্চয়তার মাঝে এই ক্রিকেটই এক পরম আনন্দ যা নিয়ে গোটা জাতি ধর্ম, বর্ণ, রাজনৈতিক মতাদর্শের উর্ধ্বে থেকে এক হতে পারে, তাই এই আনন্দ ও পাওয়াটুকু জিইয়ে রাখতে হবে! ক্রিকেটের এই অর্জনকে নিয়ে যেতে হবে আরো বহুদূর। আবারো অভিনন্দন ও শুভকামনা প্রিয় দলকে, এগিয়ে চলো টাইগারস ।

অজয় দাশগুপ্ত, কলামিস্ট, সিডনি: ২৫ বছর সিডনিতে আছি। ক্যাঙারু ছাপমার্কা পাসপোর্ট নিয়েছি। পরিচয় পাল্টে হয়ে গেছি বাংলাদেশী অস্ট্রেলিয়ান। এদেশে আসার আগে মার্ক টেলর, মার্ক ওয়াহ, স্টীভ ওয়াহ, শ্যান ওয়ার্ণ, ব্রেট লীকে চিনতাম। সাদা লম্বা জোরে বল করা তীব্র ব্যাটিং এ এদের জুড়ি মেলা ছিল ভার। একদা জেফ থমসন ডেনিস লিলির নাম শুনতাম। লিলি বলতেন তিনি ক্রিজে রক্ত দেখতে পছন্দ করেন। দেশের সেরা আইকন ডন ব্র্যাডম্যানও একজন ক্রিকেটার।

এদেশে আসার পর জানলাম, না হে, ক্রিকেট এক বা দুই নাম্বার খেলা নহে। একে, এ, এফ, এল, আমার কাছে যা গায়ের জোরের ফুটবল, দুই’য়ে রাগবি, যা দেখলে মনে হবে মানুষ যখন মহিষের মতো গুঁতোয়। তিনে সকার, চারে ক্রিকেট। তবে সিডনি ক্রিকেট গ্রাউন্ড বা মেলবোর্ণ ক্রিকেট গ্রাউন্ডে এলেই বুঝবেন ক্রিকেট কি বা কতোটা নান্দনিক ও ঐতিহাসিক হতে পারে। একটি স্টেডিয়ামের ভেতর চিচিং ফাঁকের মতো জাদুঘর তাতে একশ বছর আগের স্কোর কার্ড, হাতে লেখা নিয়ম থেকে শুরু করে শচীন তেন্ডুলকার, ইমরান খান, ভিভ রিচার্ডসের বিশাল সব কাট আউট।

সমস্যা একটাই, এদেশের সাথে অন্য দেশগুলোর সময় মেলে না। কাজের দিনগুলোয় রাত জেগে খেলা দেখা অসম্ভব। এসব সমাজে বসকে তেল দিয়ে স্যার ডেকে চাকরী চলে না। সব নিয়ম ও কঠিন কাজের শৃঙ্খলে বাঁধা। তা ছাড়া এখানে আড়াই কোটির বেশী মানুষের জন্য গন্ডায় গন্ডায় টিভি চ্যানেল নাই। কেরী প্যাকার রূপার্ট মারডকদের মতো মিডিয়া মোগলরা চ্যানেল বানায় বিজনেসের জন্য। বাংলাদেশ, জিম্বাবুয়ে কিংবা আফগানিস্তানের সাথে খেলা দেখানোর ভাবনাটা এতোদিন তাদের মাথায় ছিলো না।
কিন্তু এবার তাদের ভাবতে হবে। একদিকে এদেশে বাংলাদেশীর সংখ্যা অন্যদিকে টি ২০ তে বাংলাদেশের সিরিজ জয়। এই জয় তারুণ্যের নির্ভীক মনের জয়। এ জয় আত্মগর্বীর পরাজয়। খেলা খেলাই। তারপরও অস্ট্রেলিয়ার সিরিজ পরাজয় তাদের জন্য শিক্ষা বাংলাদেশের জন্য গৌরবের সূচনা।
জয়তু বাংলাদেশ ক্রিকেট। করোনা ভীত সিডনি থেকে জয় বাংলা।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments