বাংলাদেশের ভারতনীতিঃ কৌশল বা আপস?

  •  
  •  
  •  
  •  

রাজনীতিতে একটা কথা প্রচলিত আছে যে ‘পলিটিক্স ইজ অ্যান আর্ট অব কম্প্রোমাইজ’ (রাজনীতি হলো আপসের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার কৌশল)। এই কৌশলে কখনো কখনো হেরেও জিততে হয়। শক্তিশালী মিত্রদের খুশি রাখতে হয়। তাই, পররাস্ট্রনীতি একটি জটিল প্রক্রিয়া। এই জটিল প্রক্রিয়ায় অনেক সন্ধি হয় যেগুলো আপাত দৃষ্টিতে কম লাভজনক মনে হলেও ভবিষ্যতে দর কষাকষিতে কাজে লাগে। হুদাইবিয়ার সন্ধির মতো পৃথিবীতে এরকম অনেক বড় বড় চুক্তি আছে যেখানে আপাত দৃষ্টিতে বিপক্ষে মনে হলেও পরবর্তীতে এসব চুক্তি লাভজনক বলে প্রমানিত হয়েছে।
ভৌগোলিক কারনেই বাংলাদেশ চীন ও ভারতের মাঝখানে খুব গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে আছে। তাছাড়া বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক উত্থান অনেকের চোখে চক্ষুশুল হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই বাংলাদেশকে কৌশলী হয়ে বিশ্ব রাজনীতিতে টিকে থাকতে হচ্ছে।জননেত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে কোনও মতেই শ্রীলঙ্কা বা আফ্রিকার কিছু দেশের মত চীনের ঋণের ফাঁদে ফেলে চীনের অর্থনৈতিক কলোনি বানাবেন না। বাংলাদেশ চীন ও ভারতের মাঝখানে একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে গড়ে উঠতে চায়। আর সেক্ষেত্রে ভারতকে তার পাশে চান সেটারই ইঙ্গিত দিয়ে যাবার জন্যই এই সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক সামিটে শেখ হাসিনা যোগ দেন।

এবারের ভারতের সাথে করা ৭ চুক্তির মধ্যে ৪টি চুক্তি নিয়ে অনেক সংশয় রয়ে গেছে যাতে মনে হতে পারে যে ভারতের দিকে পাল্লা বেশ ভারি। আমিও দ্বিমত পোষণ করছি না, আসলেই ভারতের দিকে পাল্লা একটু ভারি, বিশেষ করে ফেনী নদীর পানির ব্যবহার বিষয়ে। তবে এটা ইস্যু হিসেবে হয়তো তেমন জোরালো হতোনা কিন্তু হয়েছে কেননা এমন এক সময় এই চুক্তি গুলো হলো যখন ভারতের সাথে বাংলাদেশের বিভিন্ন কারনে সম্পর্কের টানাপোড়েন চলছে। যদিও ভারত মায়ানমারের রাখাইন প্রদেশে ইতোমধ্যেই ২৫০ বাড়ি বানিয়ে ফেলেছে এবং ফিরতে ইচ্ছুক রোহিঙ্গাদের জন্য সেখানে আরও বাড়ি নির্মাণ করছে এবং রোহিঙ্গাদের জন্য গত দু’বছর ধরে ভারত ব্যাপক মানবিক ত্রাণ পাঠিয়ে আসছে তথাপি বিভিন্ন কারনে রোহিঙ্গা ইস্যুতে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ভারত বাংলাদেশকে সাহায্য করেনি । এজন্যে চীনের সাথে ভারতের মিয়ানমারের বাজার ভাগাভাগি, মিয়ানমারের পাশে থাকা ভারতীয় অঙ্গরাজ্যগুলোকে বিভিন্ন সুবিধা দেয়া ও ঐসব রাজ্যে বিভিন্ন বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দমনে মায়ানমারের সাহায্যসহ আরও কিছু ইস্যু দায়ী বলে অনেকে মনে করছেন।
এছাড়া দীর্ঘ ৭ বছর পর বাংলাদেশ ভারতে ইলিশ রপ্তানি করতে না করতেই ভারত বাংলাদেশে পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দিল, আর ফারাক্কা বাঁধের সবগুলি গেইট খুলে দিয়ে বাংলাদেশকে বন্যার শঙ্কায় ফেলে দিল। তাছাড়া ভারতের পররাস্ট্রমন্ত্রী তাদের একান্ত অভ্যন্তরীণ বিষয় বললেও ভারতের এন আর সি বা নাগরিক-পঞ্জী নিয়ে বাংলাদেশের মানুষের মনে সংশয় ও উৎকণ্ঠা থেকেই যাচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী

তাই এমনিতেই বাংলাদেশের মানুষের ভারতের উপর ক্ষোভ তৈরী হয়েই ছিল, আর ওই সময়ে এই চুক্তিগুলো সেই আগুনে ঘি ঢালার মতো কাজ করেছে। উল্টো “মরার উপর খাড়ার ঘা”য়ের মতো বুয়েটের কিছু অপদার্থ ছাত্রলীগ নেতাকর্মী পিটিয়ে তাদের এক সহপাঠীকে মেরে ফেললো। (আল্লাহ ওকে জান্নাতবাসী করুন। ওর খুনীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি। আশার কথা হচ্ছে যে ওর খুনীদের বেশীরভাগকেই গ্রেফতার করে আইনের আয়োতায় আনা হয়েছে)।
উল্লেখ থাকে যে, ২০১১ সালে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিংয়ের বাংলাদেশ সফরের সময় ১৯৭৪ সালের স্থলসীমানা চিহ্নিতকরণে চুক্তির সমর্থনে প্রটোকল স্বাক্ষর; ৪৭টি বাংলাদেশি পণ্যের শুল্কমুক্তভাবে ভারতের বাজারে প্রবেশাধিকার প্রদান; দুই দেশের মধ্যে বিদ্যুত্, পানিসম্পদ, খাদ্যনিরাপত্তা, শিক্ষা, ব্যবস্থাপনা, যোগাযোগ বিস্তৃতি, জলবায়ু ও টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে যৌথভাবে কাজ করা এবং প্রয়োজনে পানিসম্পদ ব্যবহারে নদীর অববাহিকাভিত্তিক ব্যবস্থাপনা ও বিনিয়োগের বিষয়ে দুই দেশের নেতারা একমত হন। তখন বেশীরভাগ চুক্তিই বাংলাদেশের পক্ষে গিয়েছিল। এমনকি পশ্চিমবঙ্গের মূখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির শক্তিশালী বিরোধীতা না থাকলে সেবার তিস্তা নদীর পানি বন্টন চুক্তিও হয়ে যেতো। ভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জনাব নরেন্দ্র মোদী সাহেব এখনো বাংলাদেশের সাথে তিস্তা চুক্তি করতে বদ্ধ পরিকর। এজন্যে অনেকে বলছেন ২০২১ সালে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে যদি কেন্দ্রীয় ভারতের ক্ষমতাশীন দল বিজেপি জিতে যায় তবে বাংলাদেশের সাথে তিস্তা পানির চুক্তি সহজে হয়ে যাবে।

তাই ২০১৯ সালের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের ভারতের সাথে করা কিছু চুক্তি আপাত দৃষ্টিতে ভারতের দিকে ভারি হলেও ভবিষ্যতে এই পাল্লা আমাদের দিকে ভারি করতে সহায়ক হবে বলে আমি আশা করছি। কেননা একমাত্র জননেত্রী শেখ হাসিনাই পেরেছেন ভারতের কাছ থেকে এমন কিছু জিনিষ আদায় করে নিতে যা বাংলাদেশের আর কোন সরকার প্রধান পারেনি যেমনঃ
(১) বাংলাদেশ ভারত স্থল-সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়ন ও ছিটমহল বিনিময়ের মাধ্যমে দশ হাজার একর জমি বাংলাদেশের মধ্যে সংযুক্তি,
(২) আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ভারতের সাথে সমুদ্রসীমার বিরোধ নিষ্পত্তি ও সমুদ্রসীমা জয়;
(৩) টিপাইমুখে বাধ নির্মান বন্ধ;
(৪) গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি;
(৫) ফারাক্কা চুক্তি;
(৬) শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা যার ফলে ২০১৯ সালেই প্রথমবার ভারতে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। আগের বছরের তুলনায় এ প্রবৃদ্ধি প্রায় ৪৩ শতাংশ;
(৭) বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সহযোগিতার অংশ হিসেবে বর্তমানে ভারত থেকে ১ হাজার ১৬০ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ আমদানি করছে বাংলাদেশ। এর মধ্যে ১৬০ মেগাওয়াট আসছে ত্রিপুরা থেকে;
(৮) ভারত কর্তৃক বাংলাদেশকে পাঁচশ’ মিলিয়ন ডলার (৫০ কোটি ডলার) ঋণদান;
(৯) সন্ত্রাসবিরোধী কাজ এবং নিরাপত্তাসংক্রান্ত সহযোগিতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও ভারত একসঙ্গে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত;
(১০) বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে হত্যাকাণ্ড অনেকাংশেই বন্ধ;
(১১) বাংলাদেশিদের জন্য ভারতীয় ভিসা জটিলতা অনেকটা নিরসন যাতে বিভিন্ন কারনে বাংলাদেশীরা দ্রুত ও ঝামেলাবিহীনভাবে ভারতে যেতে পারেন বিশেষ করে ব্যাবসা ও চিকিৎসা ক্ষেত্রে প্রচুর বাংলাদেশী ভারতে যায়;
(১২) এছাড়া বাংলাদেশ-ভারত সরাসরি যোগাযোগ ব্যাবস্থার উন্নতি যাতে ভারত থেকে বিভিন্ন বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা যায় ও দু দেশের মানুষের মধ্যে অন্তরঙ্গতা বাড়ানো যায়;
(১৩) কিছু ট্রানসিট সুবিধা দিয়ে ভারতের সেভেন সিস্টার খ্যাত রাজ্যগুলোয় (অরুণাচল প্রদেশ, আসাম, মেঘালয়, মণিপুর, মিজোরাম, নাগাল্যান্ড এবং ত্রিপুরা রাজ্য) মালামাল পৌঁছে দেয়ার রুট হিসেবে মাশুল আদায়ের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা আয় (অনেকে এটাকে সমালোচনা করলেও ইউরোপের দিকে তাকালে দেখা যায় আন্তদেশীয় ট্রানসিট সুবিধা থাকার কারনে সকলেই উপকৃত হচ্ছে);
ইত্যাদি।

এবার তাকাই সাম্প্রতিক বাংলাদেশ-ভারত চুক্তির দিকেঃ
দুই দেশের সরকার প্রধানের নেতৃত্বে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার পর তাদের উপস্থিতিতেই চুক্তি সই ও চুক্তিপত্র বিনিময় হয়।
>> স্বাক্ষরিত একটি সমঝোতা স্মারকের আওতায় ফেনী নদীর ১ দশমিক ৮২ কিউসেক পানি প্রত্যাহার করতে পারবে ভারত; ওই পানি তারা ত্রিপুরা সাবরুম শহরে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ প্রকল্পে ব্যবহার করবে।
>> উপকূলে সার্বক্ষণিক মনিটরিং ব্যবস্থার (কোয়েস্টাল সারভাইল্যান্স সিস্টেম-সিএসএস) বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারকে সই করেছে দুই দেশ।
>> চট্টগ্রাম ও মোংলা সমুদ্র বন্দর দিয়ে ভারতীয় পণ্য পরিবহনের বিষয়ে একটি স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি) সই হয়েছে।
>> বাংলাদেশ থেকে ভারতের ত্রিপুরায় এল পি জি (লিকুয়িড পেট্রোলিয়াম গ্যাস) রপ্তানি
>> চুক্তি হয়েছে বাংলাদেশকে দেওয়া ভারতের ঋণের প্রকল্প বাস্তবায়নে।
>> সহযোগিতা বিনিময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে ইউনিভার্সিটি অব হায়দরাবাদের মধ্যে সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে।
>> এছাড়া সাংস্কৃতিক কার্যক্রম বিনিময় নবায়ন এবং যুব উন্নয়নে সহযোগিতা নিয়ে দুটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে।
এবার আসি সমালোচিত বিষয়গুলিতে। মূলত সমালোচনা হচ্ছে প্রথম চারটি চুক্তি নিয়ে। নিম্নে আমি এগুলি নিয়ে বিষদ আলোচনা করবো।

প্রথম চুক্তিঃ স্বাক্ষরিত একটি সমঝোতা স্মারকের আওতায় ফেনী নদীর ১ দশমিক ৮২ কিউসেক পানি প্রত্যাহার করতে পারবে ভারত; ওই পানি তারা ত্রিপুরা সাবরুম শহরে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ প্রকল্পে ব্যবহার করবে।
সমালোচনাঃ
(১) ফেনী নদীর পানি দিয়ে দিলে আমাদের ক্ষতি হবে।
(২) নিলে এমনিতে নিতো, চুক্তি কেন করতে হবে?
(৩) ভারত কেন ভূগর্ভস্থ পানি ব্যাবহার করছে না?
(৪) ভারত যেখানে আমাদের তিস্তা নদীর পানি দিচ্ছে না সেখানে আমরা কেন তাদের ফেনী নদীর পানি দিচ্ছি?
জবাবঃ
(১) পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, শুকনা মৌসুমে ফেনী নদীর পানির গড় পরিমাণ ৭৯৪ কিউসেক এবং বার্ষিক পানির গড় পরিমাণ প্রায় ১৮৭৮ কিউসেক। এতে বলা হয়, ফেনী নদীর ১.৮২ কিউসেক করে পানি প্রত্যাহার শুষ্ক মৌসুমের গড় পানি প্রবাহের মাত্র ০.২৩ শতাংশ।
নদী বিষয়ক সংগঠন রিভাইরাইন পিপল এর মহাসচিব শেখ রোকন বলেন, “শুষ্ক মৌসুমে অর্থাৎ ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল মাসে ভারত যদি ১.৮২ কিউসেক পানি তুলে নেয় তাহলে তা পরিবেশের উপর তেমন কোন প্রভাব ফেলবে না। কারণ ওই সময়ে ফেনী নদীতে এর চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণ পানি থাকে।”
পানি সম্পদ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক বিশেষজ্ঞ আইনুন নিশাত বলেন, এ পরিমাণ পানি তুলে নিলে আসলে তা পরিবেশ এবং আশপাশের বসতির উপর কোন প্রভাব ফেলবে না। তিনি আরও বলেন বাংলাদেশের ভাটিতে এই নদীর উপর মুহুরি সেচ প্রকল্প আছে। আমি মনে করি না এই প্রায় দুই কিউসেক পানি উত্তোলন করলে তা পরিবেশের উপর কোন ধরণের প্রভাব ফেলবে।
তাই বোঝা যাচ্ছে, ফেনী নদীর পানি ভারতকে কিছুটা দিলে আমাদের ব্যাপক ক্ষতি হবে না কিন্তু এর দ্বারা ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের কিছু মানুষের অনেক উপকার হবে ও ভারত ভবিষ্যতে তিস্তা নদীসহ অন্যান্য অভিন্ন নদীর পানির সুষম বন্টনে চাপের মুখে থাকবে।
(২) উল্লেখ থাকে যে সমস্ত আন্তর্জাতিক আইন উপেক্ষা করে ভারত ইতিমধ্যে ফেনী নদীর পানি ব্যাবহার করছে (https://bit.ly/2Mr9Jxo), উজানের পানি এমনিতেও প্রত্যাহার করা হচ্ছে, কিন্তু এই চুক্তির মাধ্যমে এখন এটা আইন ও জবাব দিহিতার মধ্যে নিয়ে আসা গেলো, যেমন আমরা ফারাক্কায় করেছিলাম। এই অতি অল্প পানি ত্রিপুরা থেকে অন্য কোনো শহরে বা রাজ্যে যাবার উপায় নেই, কারন রাজ্যটি ব্যাপক ভাবে পাহাড়ী ও এই শহরটি ছাড়া অন্য অন্য শহরগুলি দূরে এবং আরো পানি নেয়া বয়ে নেয়া অর্থনৈতিক ভাবে অচিন্তনীয়।
(৩) ত্রিপুরার সাবরুম মূলত একটি স্থলবেষ্টিত শহর (উল্লেখ্য, এই সাব্রুম শহর স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ে আমাদের প্রথম আশ্রয়দাতা)। পানীয় জল হিসেবে সাবরুমে ভূ-গর্ভস্থ পানি ব্যবহার করা হয়। যাতে আয়রনের পরিমাণ অনেক বেশি এবং আর্সেনিকের কারনে খাবার পানি দুর্লভ। এসব কারণ মিলিয়ে ওই অঞ্চলটিতে দীর্ঘদিন ধরেই পানি সংকট চলছিল। এই চুক্তির পর ওই অঞ্চলটির পানীয় জলের অভাব অনেকাংশেই পূরণ হবে বলে জানাচ্ছেন স্থানীয়রা। তাই মানবিক কারনে ঐ অঞ্চলে পানি ব্যাবহার করার অনুমতি দেয়া হয়।
(৪) কেউ কেউ এটাকে তিস্তা নদীর ইস্যুতে পশ্চিমবঙ্গের মমতা দিদিকে নরম করার কৌশল হিসেবে দেখছেন। এছাড়া, চুক্তি সম্পাদনের সময় যৌথ বিবৃতিতে জানানো হয়েছে যে ভারতের প্রধানমন্ত্রী জনাব মোদী বলেছেন, তার সরকার তিস্তায় সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের (স্টেকহোল্ডার) সঙ্গে নিরন্তর কাজ করে চলেছে যাতে যত দ্রুত সম্ভব একটি তিস্তা চুক্তি সম্পাদন করা যায়। তাই, এটাকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এগিয়ে আসা বা প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে যাতে অচিরেই তিস্তা নদীর পানির চুক্তি হয়।  উল্লেখ থাকে যে, ২০১১ সালে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং ও পরবর্তীতে জনাব মোদীর সফরের সময় তিস্তা নদীর পানির চুক্তির সমস্ত কিছু প্রস্তুত থাকলেও পশ্চিমবঙ্গের মমতা ব্যানার্জির শক্তিশালী বিরোধীতার কারনে তা আর সম্পন্ন হয়নি। এ নিয়ে রাজ্য সরকার আর কেন্দ্রীয় সরকারের মধ্যে বিরোধ চলছে।

দ্বিতীয় চুক্তিঃ উপকূলে সার্বক্ষণিক মনিটরিং ব্যবস্থার (কোয়েস্টাল সারভাইল্যান্স সিস্টেম-সিএসএস) বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারকে সই করেছে দুই দেশ।
সমালোচনাঃ দেশের সার্বভৌমতা ক্ষুন্ন করে বাংলাদেশের সীমানায় কেন ভারতের রাডার বসাতে হবে?
জবাবঃ রাডার গুলো কোস্ট গার্ডের জন্য এবং সেগুলো নিয়ন্ত্রন করবে বাংলাদেশ নৌবাহিনী এবং প্রয়োজনে ভারত বাংলাদেশ নৌবাহিনীর মাধ্যমে সেগুলা থেকে উপকৃত হবে। যেহেতু রাডার ক্রয় করা হচ্ছে ঋণ চুক্তির আওতায় এবং যেহেতু ঋণ ভারত দিচ্ছে তাই রাডার গুলাও তাদের দেশ থেকে আনা হচ্ছে এবং সেগুলো সেটাপ করতে ভারতের সহযোগিতা দরকার।
উল্লেখ থাকে যে, ভারত এই ধরনের চুক্তি শ্রীলংকা, মালদ্বীপ, মায়ানমার সহ সব দেশের সাথেই করেছে এবং সব দেশই পারস্পারিক সহযোগিতার জন্য এই চুক্তি করে থাকে।

তৃতীয় চুক্তিঃ চট্টগ্রাম ও মোংলা সমুদ্র বন্দর দিয়ে ভারতীয় পণ্য পরিবহনের বিষয়ে একটি স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি) সই হয়েছে।
সমালোচনাঃ বাংলাদেশ ভারতের আছে বাংলাদেশের পোর্ট বিক্রি করে দিয়েছে?
জবাবঃ মোটেও না। স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি) সই মানে চট্টগ্রাম ও মোংলা সমুদ্র বন্দর দিয়ে দেওয়া না বরং এই চুক্তির সাহায্য ভারত ট্যাক্সে ডিসকাউন্ট এবং পেপারওয়ার্ক একটু দ্রুত পাবে। ভূটানের সাথেও বাংলাদেশ এই চুক্তি করবে। এতে বাংলাদেশের লাভ যে তারা কাস্টমার পাচ্ছে ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা যাবে, আর ভারতের লাভ যে তারা তাদের সেভেন সিস্টার রাজ্যগুলোতে বাংলাদেশের মাধ্যমে মাল পাঠাতে পারবে। আর এই এসওপি শুধু ভারত বাংলাদেশের মধ্যেই হচ্ছে তা না, সারা বিশ্বে এটি হচ্ছে আর তাইতো এর নাম স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর। তাই এতে ভয়ার্ত হওয়ার কিছু নাই।

চতুর্থ চুক্তিঃ বাংলাদেশে থেকে ভারতের ত্রিপুরায় এল পি জি (লিকুয়িড পেট্রোলিয়াম গ্যাস) রপ্তানি।
সমালোচনাঃ হায় হায়, বাংলাদেশের নিজেরই গ্যাস নাই, ভারতকে গ্যাস দিয়ে দিলে আমাদের কি হবে?
জবাবঃ বাংলাদেশ ভারতের সাথে প্রাকৃতিক গ্যাস রপ্তানির চুক্তি করে নাই করছে এল পি জি গ্যাস রপ্তানি। এলপিজি হ’ল তরল পেট্রোলিয়াম গ্যাস – প্রোপেন এবং বুটেনের মিশ্রণ। প্রাকৃতিক গ্যাস মিথেন হয়। এলএনজি তরলযুক্ত মিথেন এবং সিএনজি সংকুচিত প্রাকৃতিক গ্যাস।
বাংলাদেশের ১৯টি কোম্পানি বিদেশ থেকে এলপিজি আমদানি করে তা বোতলজাত করে বিক্রি করে। এই ১৯টি কোম্পানির মোট উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ২০ লক্ষ টন প্রতি বছর। আরো ৪ টি টার্মিনাল নির্মাণ শেষ হবার পথে। তখন টার্মিনাল গুলির গ্যাস খালাস সক্ষমতা হবে প্রায় ১ কোটি টন। কিন্তু বাংলাদেশে বর্তমানে এলপিজির চাহিদা রয়েছে মাত্র ৯ লক্ষ টন। কোম্পানিগুলো বর্তমানে আরো ১১ লক্ষ টন ও ভবিষ্যতে আরও ৯১ লক্ষ টন বেশি উৎপাদন করতে পারবে চাহিদা বৃদ্ধির সাথে সাথে। ভবিষ্যতে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীন চাহিদা ৪০ লক্ষ টন হলেও বাংলাদেশ প্রায় ৬০ লক্ষ টন বিদেশে রপ্তানি করতে পারবে।
বাংলাদেশের উত্তরপূর্ব দিকে ভারতের সাতটি রাজ্যে প্রতি মাসে এলপিজি গ্যাস এর চাহিদা বছরে প্রায় ১২ লক্ষ টন কিন্তু ভারতের এই সাতটি রাজ্যের আশেপাশে কোনো নদীবন্দর না থাকায় এলপিজি সরবরাহ অত্যন্ত ব্যয়বহুল। ভারতের নিজের প্রচুর এলপিজি আছে কিন্তু ইন্ডিয়ান পেট্রোলিয়াম যদি আসাম বা অন্য রিফাইনারি হতে তরল গ্যাস ত্রিপুরার বিশালগড়ে এনে বোতলজাত করে গ্রাহকের কাছে পৌঁছাতে যায়, সময় ও দূরত্বের কারনে খরচ অনেক বেশী পরে যায়। বাংলাদেশ হতে এটা কিনে বোতলজাত করে বিক্রি করলে অনেক কম খরচ হয়, সাথে সময়ও। এটার মাধ্যমে বাংলাদেশের একটা নতুন সুযোগ সৃষ্টি হল। আগামীতে নাগাল্যান্ড, মণিপুর ও মিজোরামে এই বাজার বড় করার সুযোগ হবে। বাংলাদেশের কোন নতুন বিনিয়োগ লাগবে না। কারন প্ল্যান্ট করাই আছে।
তাই বাংলাদেশের কোম্পানিগুলো যেহেতু আরো এগারো লক্ষ টন বেশি উৎপাদনের ক্ষমতা রাখে কাজেই ভারত বাংলাদেশী কোম্পানির কাছ থেকে এলপিজি ক্রয়ের সিদ্ধান্ত নেয়। তাই বাংলাদেশের বেক্সিমকো ও ওমেরা কোম্পানির সাথে ইন্ডিয়ান পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের চুক্তি হয়েছে এলপিজি রপ্তানির। বেক্সিমকোর মংলা প্ল্যান্ট হতে আমদানিকৃত তরল গ্যাস তাঁদের নিজস্ব ট্যাংকারের মাধ্যমে নিয়ে যাওয়া হবে ত্রিপুরার বিশালগড় বটলিং প্ল্যান্টে। আমদানিকৃত তরল গ্যাসের ভ্যালু এড হবে। বাংলাদেশ সরকার পাবে ট্যাক্স। তারপর সেটা পরিবহন হবে আমাদের ট্যাংকারে, মানে আবার ভ্যালু এড। প্লাস মুনাফা।
ভবিষ্যতে বাংলাদেশের চাহিদা যদি ৪০ লক্ষ টনও হয় তখনও বাড়তি ৬০ লক্ষ টনের ফ্যাসিলিটি ফেলে না রেখে ভারত, নেপাল, ভুটান, বা অন্য কোন দেশে পুনরপ্তানি করলে এখান থেকে মুনাফা করা সম্ভব। এটাকে বলে রিসোর্স অপটিমাইজেশন।
উল্লেখ থাকে যে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সহযোগিতার অংশ হিসেবে বর্তমানে ভারত থেকে ১ হাজার ১৬০ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ আমদানি করছে বাংলাদেশ। এর মধ্যে ১৬০ মেগাওয়াট আসছে ত্রিপুরা থেকে। তাই ত্রিপুরাতে এলপিজি রপ্তানি আমাদের জন্যে ভারতের সাথে বানিজ্য ঘাটতি মেটাতে সহায়ক হবে।
প্রশ্ন থাকতে পারে বাংলাদেশের কোম্পানিগুলো কোথা থেকে এলপিজি আমদানি করবে? বাংলাদেশের কোম্পানিগুলি কাতার বা অন্য দেশ থেকে স্পট মার্কেট রেটে এলএনজি বা এলপিজি আমদানি করবে। সেটা আমদানির পর ভারতের কাছে পুনরায় বিক্রি করবে। আর ভারতের কাছে বিক্রির মূল্য এবং কাতার বা অন্য দেশ থেকে গ্যাস আনার মূল্যের পার্থক্য হবে এদেশের কোম্পানির লাভ। এই ব্যাপারটাকে বলে পূন:রপ্তানি।
বিশ্বের এমন অনেক দেশ আছে যাদের নিজস্ব প্রাকৃতিক সম্পদ বলে কিছুই নেই। কিন্তু ভৌগলিক অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে তারা পূনরপ্তানির ব্যাবসা করে বিশ্বের অন্যতম বড় ইকোনমিতে পরিনত হয়েছে। সিঙ্গাপুর এর আয়তন এতই ছোট যে তাদের দেশে সম্পদ বলতে কিছুই নেই। কিন্তু তাদের অবস্থানের কারনে এবং একটি গভীর সমুদ্রবন্দরের কারনে তারা সেটিকে কাজে লাগিয়ে পুনরপ্তানি করে মুনাফা ভোগ করে। এমনকি বাংলাদেশ নিজেও মধ্যপ্রাচ্যের কোন দেশ থেকে তেল আমদানি করার জন্য সিঙ্গাপুরের সাথে চুক্তি করে। সিঙ্গাপুর মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল কিনে আমাদের কাছে বিক্রি করে। আর এখান থেকে লাভ করে। মূলত বন্দর এবং টার্মিনাল ফ্যাসিলিটির কারনেই সিঙ্গাপুর থেকে তেল কিনতে গেলে আমাদের সময় এবং খরচ উভয়ই কম লাগে।
তাই, সবকিছু না জেনে চিলে কান নিয়ে গেছে শুনে দৌড় দিলে অনেক ক্ষেত্রেই ক্ষতি। আসুন দেশের প্রবৃদ্ধিতে জান-মাল-সময় নিয়ে এগিয়ে যাই, ও দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গঠন করি।
বিঃদ্রঃ এই প্রবন্ধের বেশীরভাগ তথ্যই বিভিন্ন সোর্স থেকে সংগৃহীত।

মোল্লা মোঃ রাশিদুল হক
মেলবোর্ন প্রবাসী শিক্ষক, গবেষক, রাজনীতিবিদ, লেখক ও কবি।