বাংলাদেশে এইডস’র ভয়াবহ সংক্রমণ এখনও অজানা : অধ্যাপক ড. অলক পাল

  •  
  •  
  •  
  •  

 567 views

আতিকুর রহমান শুভ: চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিদ্যার অধ্যাপক ড. অলক পাল। তিনি ২০১০ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত বিভাগটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর জন্ম বাংলাদেশের পর্যটন শহর কক্সবাজারে। বিশ্ববিদ্যালয়ে অসংখ্য ছাত্র ছাত্রীদের প্রিয় শিক্ষক, নিবেদিত গবেষক, বন্ধু বৎসল এবং সংস্কৃতিমনা একজন মানুষ তিনি।
ইংল্যান্ডের নামকরা প্রকাশনা সংস্থা স্প্রিন্জার থেকে সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে অধ্যাপক ড. অলক পালের বই ‘ HIV/AIDS in Bangladesh’. সেই প্রসঙ্গে তাঁর অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি বলেন, “আমার পিএইচডি থিসিস থেকে আমার লেখা এই বই। এই অনুভূতি সত্যিই বলে বোঝানো সম্ভব নয়। দীর্ঘ যাত্রা পথে অনেক চড়াই-উৎরাই ছিল, ছিল অনেকের সহযোগিতা এবং ভালবাসা।” এর আগে ২০১৯ সালে আরেক নামকরা প্রকাশক Routledge বের করে অলক পালের সম্পাদিত বই ‘Geography in Bangladesh.’

আজ প্রশান্তিকার সঙ্গে তাঁর সম্প্রতি প্রকাশিত বইয়ের আলোচ্য বিষয় এবং সাম্প্রতিক বাংলাদেশ নিয়ে কথা বলেছেন অধ্যাপক ড. অলক পাল

অধ্যাপক ড. অলক পাল, ভূগোল ও পরিবেশ বিদ্যা, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

প্রশান্তিকা: আমরা জানি আপনার পড়াশুনা হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। তারপর বোধ হয় চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করলেন?
অলক:
জি। সেখানে যোগদানের পরবর্তীতে যুক্তরাজ্যের ডারহাম ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি সম্পন্ন করি। বাংলাদেশের HIV বা AIDS ছিলো আমার গবেষণার বিষয়। পিএইচডির থিসিস থেকেই Springer এই বইটি প্রকাশ করেছে। এজন্য আমি কৃতজ্ঞ তাদের কাছে এবং সেই সাথে আমার পিএইচডি সুপারভাইজার ডারহামের এমিরেটাস অধ্যাপক পিটার জে এটকিন্সের কাছে বিশেষভাবে ঋণী। সেই ২০০৯ সালে যে পিএইচডি শেষ করেছি এতোদিন পরে বইটি আলোর মুখ দেখেছে বা তারা আমার গবেষণাকে গ্রন্থে রূপদানের পরিকল্পনা করেছেন, তাতেই আমি আনন্দিত। আজকে বইটি হাতে পেয়ে অনেক পুরনো স্মৃতি মনে পড়ছে।

প্রশান্তিকা: আপনি পড়েছেন ভূগোল ও পরিবেশ নিয়ে। অথচ পিএইচডি করলেন এইডস বিষয়ে। এর ব্যাখ্যা কি?
অলক:
অনেকেই মনে করেন ভূগোলের সাথে স্বাস্থ্যের আবার মিল কিসে? আমরা বলি ভূগোল এমন একটি বিষয় যার সাথে স্বাস্হ্য এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থার যেমন মিল রয়েছে তেমনি টেকনোলজিরও মিল রয়েছে। পিএইচডি চলাকালীন data collection করতে যখন দেশে আসি, তখন অনেকেই আড় চোখে তাকিয়েছে। Geography’র ছাত্র হয়ে HIV নিয়ে কাজ করছি ! কিন্তু Health Geography বরাবরই আমার আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু। আর এই সময়ে Public Health তো পুরো পৃথিবীতে সবচেয়ে আলোচিত ইস্যু। আমি আমার এই বইতে HIV/AIDS বিষয়ে ঝুঁকিতে থাকা মানুষের ভৌগোলিক, সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক আচরণ বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করেছি।

প্রশান্তিকা: পরপর দুটি বড় গ্রন্থের প্রকাশনার পরে আপনার ভবিষ্যতের গ্রন্থ পরিকল্পনা কি? মানে এই মুহূর্তে কি লিখছেন?
অলক: ২০১৯ সালে দেশের প্রখ্যাত ভূগোলবিদদের রচনা নিয়ে ‘Geography in Bangladesh’ এবং এবছর আমার HIV/AIDS in Bangladesh’ প্রকাশের পর আমি নতুন একটি গ্রন্থে হাত দিয়েছি। এটিও একটি সংকলন। এটি বের করছে যুক্তরাষ্ট্রের Palgrave Macmillan প্রকাশনী। এছাড়া দেশের প্রকাশনী থেকে আগামী বইমেলার আগে আমার সম্পাদনায় আরও দুটি বই বের হবে। প্রথমটি আমার স্যার প্রখ্যাত নগর বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক নজরুল ইসলামের সঙ্গে। বইটি চট্টগ্রাম শহর নিয়ে বাংলায় রচিত হচ্ছে। অন্যটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হুমায়ূনের সঙ্গে আরেকটি সংকলন গ্রন্থ: Health and Environment: contemporary research in Bangladesh, এটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষ উপলক্ষে প্রকাশিত হচ্ছে। ভূগোলের ২২ জন অধ্যাপক এই গ্রন্থে লিখছেন।

অধ্যাপক ড. অলক পাল রচিত ও সম্পাদিত গ্রন্থ HIV/AIDS in Bangladesh এবং Geography in Bangladesh.

প্রশান্তিকা: বাংলাদেশে এইচআইভি বা এইডস’র প্রকোপ কেমন?
অলক:
সরকারের তথ্যমতে এইডস’র অবস্থা তেমন ভয়াবহ নয়। কিন্তু আমার গবেষণায় দেখা গেছে এর সংক্রমণের মাত্রা এখনও ভয়াবহ। মানুষ অহরহ আক্রান্ত হলেও গোপন রাখার চেষ্টা করে। সুতরাং অন্তিম কাল না এলে চিকিৎসকেরা জানতে পারছে না- তার এইডস হয়েছিলো। দেশে পতিতাবৃত্তির বৈধতা না থাকার ফলে হোটেলে, রাস্তায় বা ছোটখাট পরিসরে মানুষ দেহ ব্যবসার বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে। সেক্ষেত্রে শিক্ষার অভাবের কারণে রিস্ক ফ্যাক্টরগুলো বড় আকারে প্রকট হচ্ছে। তাছাড়া মাদকের ব্যবহার, একটি সিরিঞ্জে বহু মানুষে ছড়িয়ে যাচ্ছে ভয়াবহ এইডস। আমার এই গ্রন্থে ভুক্তভুগী, মাঠ পর্যায়ের রোগীদের অভিজ্ঞতা এবং আউটকাম নিয়ে আলোচনা করেছি।

প্রশান্তিকা: যতদূর জানি বাংলাদেশ সরকারের একটি বড় ফান্ড রয়েছে এই নাজুক অবস্থা সামাল দেবার জন্য। সেই তৎপরতা কি গবেষণায় দেখা যায়নি?
অলক:
সেই তৎপরতা রয়েছে। তবে আশানুরূপ নয়। আপনি জানেন, এইচআইভি একটি সংক্রামক রোগ। এটি যৌনকর্মী, মাদকসেবী এবং ট্রান্সপোর্ট ওয়ার্কারদের মাধ্যমেই ছড়ায়। আমি গবেষণায় দেখেছি সরকারের তৎপরতায় অনেক লুপহোলস রয়েছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে আশু পদক্ষেপের খুব দরকার। যেটা অনেক সময় করা হয় না। গবেষণায় এরকম অনেক ভৌগোলিক ভালনারেবল পয়েন্ট বের হয়ে এসেছে।
এইডস’র জন্য মানুষ শুধু যৌনকর্মী বা মাদকসেবীদের দায়ী করেন। কিন্তু যারা এটা বহন করে নিয়ে যান তারা লোকচক্ষুর আড়ালে চলে যায়। উদাহরণ দেয়া যায় এভাবে- অধিকাংশ মানুষ নিছক আনন্দের জন্য দেখা যায় একজন যৌনকর্মীর সঙ্গে কনডম ব্যবহার ছাড়াই যৌন সঙ্গে মিলিত হয়। তারপর আরেক জন সুস্থ নারীর দেহে তাঁরাই বহন করে অসুখটা। এভাবে রোগটি দ্রুত ছড়িয়ে যাচ্ছে।

প্রশান্তিকা: করোনায় আক্রান্ত বাংলাদেশ সহ পুরো পৃথিবী। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থা কেমন?
অলক:
পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোতে করোনাভাইরাসের ভয়াবহ প্রকোপ হলেও বাংলাদেশে এখনও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে রয়েছে। তবে বুঝতে পারছিনা কতদিন এই অবস্থা বিরাজ করবে। বাংলাদেশে পরিস্থিতি বরং ভালোর দিকেই যাচ্ছে। অবশ্য শীত আসছে। সেসময় ঠান্ডা কাশি সহ নিউমোনিয়ার প্রকোপ এমনিতেই বাড়ে। করোনার সাথে যা সমানতালে বাড়বে। সেসময়েই আমাদেরকে বেশি সতর্ক থাকতে হবে। মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক রাখতে হবে।

স্ত্রী সুমনা পোদ্দার এবং দুই পুত্র অণিরুদ্ধ এবং অরিন্দম নিয়ে অলক পালের ছোট্ট পরিবার।

প্রশান্তিকা: সবশেষে আপনার জন্মস্থান, বাবামা এবং পরিবার সম্পর্কে জানতে চাই।

অলক: আমার জন্ম কক্সবাজারে। বাবা মা তেমন শিক্ষিত ছিলেন না। কিন্তু তারা তাদের সমস্ত অর্থ আমাদের ছয়ভাইবোনের লেখাপড়া এবং মানুষ করার পেঁছনে ব্যয় করেছেন। আমার মা মারা গেছেন ২০০৩ সালে, বাবা ২০১৫তে। আমার সহধর্মিনী সুমনা পোদ্দার একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে একাউন্টিং বিভাগের শিক্ষক। অণিরুদ্ধ এবং অরিন্দম নামে আমাদের দুই পুত্র রয়েছে।

প্রশান্তিকা: আপনার মূল্যবান সময় থেকে এতক্ষণ সময় আমাদেরকে দেবার জন্য প্রশান্তিকার পক্ষ থেকে অশেষ ধন্যবাদ।
অলক:
আপনাকে এবং প্রশান্তিকার অগণিত পাঠককে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা।

[ আগ্রহী পাঠক যারা অধ্যাপক ড. অলক পালের সাম্প্রতিক বইটি সংগ্রহ করতে চান তারা আমাজন সহ নামকরা অনলাইন বুকশপে যোগাযোগ করতে পারেন। অথবা বইটির প্রকাশকের ওয়েবসাইটে:
https://www.springer.com/gp/book ]

0 0 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments