বাংলাদেশে হ্যাশট্যাগ মিটু এবং ভিক্টিম শেমিং এর সংস্কৃতি- তানজিনা তাইসিন

901

হ্যাশট্যাগ মিটু নিয়ে তোলপাড় চলছে বাংলাদেশে। শুরুর দিকে সবাই ধারণা করেছিল বিশ্বের অন্যান্য দেশের মত বাংলাদেশে এই আন্দোলন হালে পানি পাবে না। যৌন হেনস্থার শিকার নারীরা মুখ খুলবেন না। সে আশংকা (এবং কারও কারও স্বস্তি) কে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে একজন একজন করে নারী তাদের মুখ খোলা শুরু করলেন। ধারণা করি সংখ্যাটা সংঘটিত ঘটনার তুলনায় খুবই নগন্য, কিন্তু প্রতিটা ঘটনাই আলাদা আলাদা করে গুরুত্বপূর্ণ এবং এহেন শত হাজার ঘটনাকে রিপ্রেজেন্ট করে। #মিটু_বিডির প্রত্যেক নারীর সাহসিকতার প্রতি আন্তরিক শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছি, সেই সাথে এও বলি একটা ঘটনাও আমাকে বিস্মিত করে নাই। নারী হিসেবে ব্যক্তিগত নানা অভিজ্ঞতা এবং পরিপার্শ্বের অপরাপর মানুষদের সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনার জের ধরে আমি বলতে পারি, এসকল ঘটনা খুবই কমন শুধু প্রকাশ পায়নি যে কারণে সেটা হল উপযুক্ত প্লাটফর্ম কিংবা উপযুক্ত পরিবেশের অভাব। #মিটু একটা প্লাটফর্ম তৈরী করেছে ঠিক, কিন্তু পরিবেশ এখনও কতখানি উপযুক্ত সেটা প্রশ্নসাপেক্ষ। মিটু’র এ সকল ন্যারেটিভে বিস্মিত হইনি সত্য, তার কনসিকোয়েন্সসেস কি কি হতে পারে সে নিয়েও একটা পূর্বানুমান থাকা স্বত্বেও পরবর্তী প্রতিক্রিয়া আমাকে বাস্তবিকই বিস্মিত করেছে।
নারী প্রশ্ন একটা এসিড টেস্টের মত। মিটু কোন নারীবাদী আন্দোলন না, বরং যৌন নিগ্রহের শিকার নারী-পুরুষ-ট্রান্সজেন্ডার যে কোন মানুষ তার সাথে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনার বয়ান করতে পারেন এর আওতায়। একইভাবে অপরাধীও হতে পারেন যে কোন লিঙ্গ পরিচয়ের মানুষ। কিন্তু যখনই কোন নারী তার সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনার ন্যারেটিভ হাজির করছেন, খুলে খুলে পড়ছে যেন একেকজন তাবৎ তাবৎ আপাতঃ নারীবাদী, মানবতাবাদীদের মুখোশ। যা ঘটছে তা চিরায়ত এবং বহুল চর্চিত “ভিক্টিম শেমিং”।

একটু খোলাসা করে বলি। আমার আজকের আলোচনা মূলত এই ভিক্টিম শেমিং এর সংস্কৃতি নিয়েই। তৃতীয় মিটু ঘটনাটা প্রকাশ পাবার পর আমার সাথে কথা হচ্ছিল একজন নারীবাদী উন্নয়ন কর্মীর। বয়সে তিনি আমার অগ্রজ, বিস্তর কাজের অভিজ্ঞতা মাঠ-পর্যায়ের নারী নির্যাতন, নিপিড়নের ঘটনা নিয়ে। যেহেতু মিটু আন্দোলনের ধারাবাহিকতার তৃতীয় নারী আসমাউল হুসনা অভিযোগটি এনেছিলেন বাংলাদেশ বেতারের সংবাদ পাঠক, উপস্থাপক ও যাত্রী ইন্সটিটিউটের শীর্ষ কর্তা জামিল আহমেদের বিরুদ্ধে, বাংলাদেশের উন্নয়ন সংস্থায় দীর্ঘ সময় ধরে আমার কাজের অভিজ্ঞতার সূত্র ধরে তিনি জানতে চাইছিলেন, আমি জামিল আহমেদ কে চিনি কিনা! যেহেতু আমার সেই ভদ্র(!)লোকের সাথে পরিচয় নাই, তাই তিনি বলতে থাকলেন, জামিল আহমেদ সম্পর্কে নানা অভিযোগ তিনি বহু আগে থেকে শুনে আসছেন কিন্তু তার সবই আর্থিক বা অন্য দুর্নীতি, যৌন হয়রানির অভিযোগ তিনি শোনেন নি। এ পর্যন্ত ঠিক ছিল। অন্যান্য সকল দুর্নীতির মত যৌন হেনস্থার ঘটনা যদি এত সহজে প্রচারিতই হত তাহলে তো #মিটুর মত কোন আন্দোলনের প্রয়োজনই পড়ত না। এরপর তিনি যা বললেন তার সারমর্ম হল এই ঘটনা তার কাছে বিশেষ বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছে না। কারণ হিসাবে উনি যেসব যুক্তি হাজির করলেন সেগুলো হল, এই মেয়ে একা গেল কেন দেখা করতে, আর যদি গিয়েও থাকে কফি পান শেষে বাড়ি ফিরে গেল না কেন! একজন মানুষের অত সাহস হবে রাস্তার মধ্যে হ্যারাজ করবে (এই পর্যায়ে আমি বলেছিলাম রাস্তা নির্জন আর অন্ধকার ছিল) অন্ধকার রাস্তায় হাঁটতে যেতে বললেই হাটতে যাবে কেন! পরিশেষে যোগ করতে ভুললেন না, কিছুই টের পায়নি ইন্টেনশন যখন কাঁধে হাত রাখল! কিছু মেয়ে আছেই ক্ষমতাধরদের সাথে এসব সম্পর্কে যায় উপরে ওঠার সিঁড়ি হিসেবে, আর যদি সে ব্যাপারটা পছন্দ না করেই থাকে তাহলে এত বছর পরে বলল কেন, পাঁচ বছর চুপ করে ছিল কেন! ভিক্টিম ব্লেমিং বা ভিক্টিম শেমিংয়ের যে সকল প্রচলিত যুক্তি তার একটাও বাদ দেন নাই! আমার বিস্ময় যিনি এসব বলছিলেন তিনি নিজে একজন নারী এবং দীর্ঘদিন নারী নির্যাতন নিয়ে বাংলাদেশে কাজ করা মানুষ! এই পর্যায়ে, আমি ওনাকে আমার নিজের দুইটা অভিজ্ঞতা শেয়ার করি।

প্রথমটা একটা ইন্টারন্যশনাল আর্ট ক্যাম্পের। দেশের এবং দেশের বাইরে থেকে অনেকে অংশ নিয়েছেন। আমরা তখনো বিয়ে করিনি, কদিন পরই বিয়ে করতে যাচ্ছি, আমার বাগদত্তা ক্যাম্পের আয়োজকদের একজন। একথা আর্ট ক্যম্পের সবাই জানে, মুহুর্মুহু দুষ্টামি চলে আমাদের নিয়ে। খুবই বন্ধুত্বসুলভ পরিবেশে ৭ দিনের আর্ট-ক্যাম্প। সেখানে আমার, যৌন হেনস্থার শিকার হবার আশংকা নেই বললেই চলে। আমাদের সাথে দেশের খ্যাতিমান গায়ক, শিল্পি, ফটোগ্রাফার, ট্রাভেলাররা যেমন আছেন, অন্য দেশ থেকে আসা মানুষজনও আছেন, আছেন ছেলেরা, আছেন মেয়েরা নির্ভাবনায়, নিশ্চিন্তে শিল্পচর্চায়, শিল্পভাবনায়। এক সন্ধায় দারুন এক আর্ট ইন্সটলেশন দেখে, বাউল গানের আসর শেষে টলোমলো মন নিয়ে আমার একটু মেঘ মেঘ চাঁদের নীচে হাটতে ইচ্ছা হল। আধা গ্রাম আধা শহর জায়গাটায় হাঁটাহাঁটি নিরাপদ কিনা জেনে নিলাম আয়োজকদের কাছে-জানালাম বেশি দূর না এই কম্পাউন্ডের ভেতরেই আছি। আমি হাঁটছি, সবার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। পাশের দেশের এক শিল্পী, যিনি কিনা আর্ট ক্যাম্পের পার্টিসিপেন্ট, দেখি আসছে পিছু পিছু। একগাল হেসে জিজ্ঞেস করলাম, কোথায় যান দাদা? বলল, ‘হাঁটতে এসেছি, তুমিও হাঁটছ?’ আমি জ্বী বলতেই পাশে এসে দাঁড়ালেন বললেন, চল যাই! আমি সাথে কেও আছে এই ভেবে নিশ্চিন্ত হব কিনা ভাবছি, পেছনে তখনও সবাইকে দেখতে পাচ্ছি চাঁদের আলোয়, কথা-হাসির শব্দ শোনা যাচ্ছে। সেই বদমাস হঠাৎ হাত ধরল। আমি তখনও বুঝতে পারছি না, এই হাত ধরা বন্ধুসূলভ নাকি অন্যকিছু। এমনিতেই খুব ঘনিষ্ঠ না হলে নারীপুরুষ যে কারও স্পর্শে আমার অস্বস্তি। কিন্তু আমি বুঝতে পারছি না, আমার কালচারে হাত ধরা খুব স্বাভাবিক না হলেও ওর কালচারে তো এটা স্বাভাবিক হতে পারে। ইতস্তত করতে করতেই বদমাশ তার কালো চাদর খুলে আমাকে তার চাদরের ভেতরে নেবার জন্য টানতে থাকল। আমি ঝটকা দিয়ে সরিয়ে চিৎকার দিয়ে বললাম যাবনা! এহেনো নিরাপদ পরিবেশে, দুশো গজ দূরে আমার বাগদত্তার উপস্থিতিতে যে এহন ঘটনা ঘটতে পারে, না সেটা আমার কল্পনাতে ছিল, না আমার বাগদত্তার! আমি হাত ধরার পর পরই কিন্তু হাত ছাড়িয়ে নিতে পারতাম, এই কিংকর্তব্যবিমুঢ় অবস্থার ভেতর দিয়ে ভিক্টিম যে যায়, সেটা সেরকম মুহূর্তে পড়া মানুষ ছাড়া কেউ উপলব্ধি করতে পারবে না! এ ঘটনায় আমাকে কেউ দেয়নি, কিন্তু ভিক্টিম শেমিংয়ের সময় এসব বলেই তাদের ব্লেমটা দেয়া হয়, কেন, তুমি আগে বোঝনি, বুঝতে পারোনি!

দ্বিতীয় ঘটনাটা বেশ কিছু বছর আগের। চাকরীর সুবাদে এক কর্মশালা ধরনের প্রোগ্রামে আমরা প্রায় ৭০-৮০ জনের একটা দল ৫ দিনব্যাপী এক রিসোর্টে ছিলাম। দিনের বেলা সেমিনার রুমে ন’টা-পাঁচটার সেশন আর বাকী সময়টা দল বেঁধে ঘুরে বেড়ানো। রাতের দিকে কখনও গানের আসর বসে। আমি সেখানে খুবই নতুন মানুষ, তরুণ মানুষ কিন্তু একেবারেই ছোট মানুষ নই। বিশ্ববিদ্যালয়ের লেখাপড়া শেষ করে দু’বছরের উন্নয়ন সংস্থায় কাজের অভিজ্ঞতা ঝুলিতে আছে। আরও বলে রাখি, নারী-বান্ধব সে সংস্থার নিজস্ব হ্যারেজমেন্ট পলিসি আছে, জিরো টলারেন্স পলিসি আছে। আমাদের থাকার ব্যবস্থা কাছাকাছি দুটো বিল্ডিং এ। মাঝখানে দু চার মিনিটের হাটা পথ। এক রাতে অন্য ভবনে গানের আসর বসবে। আমাদের ভবন থেকে ১০-১২ জনের দল আমরা সে ভবনে গেলাম। আমি এবং আরও দু-চারজন বাদে সবাই পুরনো মানুষ, সবাই সবার পরিচিত। গান শুনছিলাম, এক পর্যায়ে একজন বললেন, তিনি জানেন আমি গান করি। সাথে সাথে হই হই অনুরোধ সকলের। এতক্ষন অসম্ভব সুন্দর ঠান্ডা মেজাজের রবীন্দ্র-সঙ্গীত, গজল হচ্ছিল। আমি মুলত ফোক ধাঁচের গান করি। ইতস্তত জানিয়ে গান শুরু করলাম। ফোক গানগুলো স্বভাবতই দ্রুত লয়ের আসর জমানো গান। কিছুক্ষণের ভেতর সিনিয়র-জুনিয়র অনেকে গানের তালে নাচতে শুরু করলেন। একেকটা গান শেষে আরেক গানের অনুরোধ আসতে থাকল, আমিও খুশি খুশি ৪/৫ টা গেয়ে ফেললাম। আমি হারমনিয়ামে, আরেকজন তবলায়, মাঝখানের ফাঁকা জায়গায় অনেকে নাচছেন, আনন্দ করছেন। তখনও খুব একটা খেয়াল করিনি, তাদের সকলেই পুরুষ। খেয়াল করলেও তেমন আমলে নেবার কথা না। আমার পরিচিত পরিসরে এমন অনেকবার ঘটেছে আমি স্টেজ এ বা নিদেন ঘরোয়া গানের আড্ডায় গাইছি, কেউ নাচছে, শরীর দোলাচ্ছে, আনন্দ করছে। অন্যের গানের সাথে আমিও বিস্তর নেচেছি, ভার্সিটিতে, বন্ধুদের আড্ডায়, কনসার্টে, কালচারাল প্রোগ্রামে। আমি আদতেই কিছু মনে করিনি। করিডোরের সংকীর্ণ জায়গায় তখন বেশ কিছু মানুষ, ভীড় বাড়ায় নৃত্যরত দলটা বেশ কাছে চলে এসেছে, কিন্তু একটা সম্মানজনক দূরত্বও আছে। আর আমার আসলে গান গাইতে ভাল লাগছিল, অন্য কিছুতে তেমন মনোযোগ ছিল না। রাত বেড়ে যাচ্ছিল দেখে গান থামালাম, যে দলটার সাথে এসেছি, তাদের দিকে তাকালাম ফিরবে কখন ঠাহর করতে। বড়ভাই তুল্য এক কলিগ বললেন, চলেন যাই! উঠে বের হতে যাব এমন সময়ে, বেশ সিনিয়র একজন এসে বললেন, আপনি তো নতুন, আপনার সাথে তেমন আলাপ হয়নি। আমি হেসে বললাম জ্বী! তারপর উনি বললেন বসেন, আমি হেসে বললাম ভাইয়া আমাদের বিল্ডিং এর সবাই তো চলে যাচ্ছে আমিও ফিরব। উনি বলতে থাকলেন, আপনাদের টিমে আসলে আপনার মত মানুষ দরকার, টিমটায় ট্যালেন্টেড আর কমিউনিকেশনে ভাল মানুষ থাকুক এমনটা আমরা চাচ্ছি…। উনি বলতে থাকলেন কেমন লাগছে, কাজ করতে অসুবিধা হচ্ছে কীনা এত সিনিয়র একজন মানুষ কথা বলছেন আমি হুট করে যাই বলতে পারছি না, ততক্ষনে বসেছি কিন্তু বারবার তাকাচ্ছি রাস্তায় অপেক্ষারত আমার দলটার দিকে… উনি বলে চলেছেন, আমার পাশে বসে, আমার একটা অস্বস্তি হচ্ছে, কিন্তু অস্বস্তিতা ঠিক কী সেটা বুঝতে পারছি না। উনি ঠিক আমার পাশে বসেই বলছেন, কাজ নিয়ে, টিম নিয়ে, আমি যেন দ্রুত সুইচ করার সিদ্ধান্ত না নেই, অসুবিধা হলে যেন ওনাকে জানাই এমন ধরনের সব কেজো আলাপ। ওনার পজিশন থেকে উনি সেটা বলতে পারেন কিন্তু আমার অবচেতন বলছে কি যেন ঠিক নাই, আমার অস্বস্তি বাড়ছে। আমিও এত সিনিয়র মানুষের কাছ থেকে (উনি আমার বসের বস শ্রেণীর) অভদ্রের মত চলে আসা ঠিক হবে কিনা এ নিয়ে দ্বিধা-দন্দে ভুগছি। আমাদের দলটার বড়ভাইতূল্য সে কলিগ ছিলেন, অসম্ভব বুদ্ধিমান একজন মানুষ, একজন আপাকে পাঠালেন আমাকে ডাকতে। উনি আসায়, সুযোগ পেয়ে দাঁড়ালাম, এরপরও উনি প্রায় ২/১ মিনিট আমাকে ছাড়লেন না, কথা বলে যাচ্ছেন। এসময় আমার অসস্তি চরমে, একরকম জোর করে বললাম এখন যাই এবং বের হয়ে চলে আসলাম। বের হয়ে আমার খুব খারাপ লাগছিল। অবশ্যই, আমি এমন কোন কিছু স্পষ্ট করে আইডেন্টিফাই করতে পারব না যেটাকে আমি চিহ্নিত করে বলতে পারি যে আমার সাথে খারাপ কিছু হয়েছে কিন্তু আমার ভীষণ খারাপ লাগছে। আমাদের দলটার সবার মূখ দেখে বুঝতে পারলাম, সবাই বুঝছে যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক না।  যে বড়ভাইতূল্য কলিগের কথা বলছিলাম তিনি সহ আরও দুজন নারী সে রাত্রে আমাকে ভীষণ সাহস জুগিয়েছিলেন। আমাকে স্বাভাবিক করেছিলেন। পুরুষ হয়েও বুঝিয়ে ছিলেন, আমার পরিস্থিতি, এতটুকু জাজমেন্টাল হননি, একবারের জন্যেও বলেন নি বা বোঝান নি যে এ পরিস্থিতির জন্য আমি দায়ী। কিন্তু আমার এক নারী সহকর্মী আকারে ইঙ্গিতে বুঝাচ্ছিলেন যে, পরিস্থিতি যে এমন হবে সেটা তো বোঝাই স্বাভাবিক, আমি কী বুঝিনাই!

সে সময়ের সে আপাত নিরীহ প্রশ্নে আমার অস্বস্তি বেড়েছিল। কিন্তু এ প্রশ্ন কিন্তু সেখানেই থেমে থাকে নি। প্রায় দু বছর পর, সেই নারীবাদের চর্চা করা নারী, নিজেকে নারীবাদী বলা নারী এবং নারী প্রশ্নে ভীষণ সাহসিকতার পরিচয় দেয়া, সোচ্চার, পড়াশোনা করা নারীবাদী আমাকে আবার একদিন খুব নিরীহ প্রশ্ন করলেন, তুমি সেদিন বুঝতে পারোনি? আমি আবার বললাম, আমি তো বুঝতে পেরেছি খারাপ লাগছিল, কিন্তু অনবরত কথা বলা ছাড়া তো উনি এমন কিছু করেন নি, যা নিয়ে আমি তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনতে পারি। সেজন্যই অফিসিয়াল অভি্যোগ আনিনি, যাদের জানাবার তাদের সকলকেই জানিয়েছি, সতর্ক থেকেছি, অ্যাভয়েড করেছি। উনি আবার বললেন, ‘না সবাই যে তোমার গানের সাথে নাচছিল, তখনও তুমি কিছু বোঝনি? সবাই তো বুঝতেছিল!’ আরও দু’চারটা আপাত নিরীহ কিন্তু ভীষণ ইঙ্গিতপূর্ণ কথা আমার অসম্ভব মন খারাপ হয়েছিল এই প্রশ্নে, শুধু বলেছিলাম, না বুঝিনি! তখন আমার এই খারাপ লাগাটার শেপ দিতে পারিনি এখন বুঝতে পারি ইনফ্যক্ট গতকালই রিয়ালাইজ করলাম, উনি ভিক্টিম শেমিং করেছিলেন।

ভিক্টিম শেমিংয়ের চরিত্র মূলতঃ এরকমই। কখনও খুব ডিরেক্ট প্রশ্নে ভিক্টিমকেই সংঘটিত ঘটনার জন্য দায়ী করা হয়, কখনো আপাত নিরীহ চেহারার প্রশ্নে বুঝিয়ে দেয়া হয়, দোশটা কিন্তু তোমারই! #মিটু আন্দোলনের বাংলাদেশ পর্যায়ের প্রায় প্রতিটি ঘটনার সাথে সাথে চলছে ভিক্টিম শেমিং। এই ভিক্টিম শেমিং অংশ নিতে বাদ পরছে না নারী পুরুষ, নারীবাদী, মানবতাবাদী, শিল্পসংস্কৃতি অঙ্গনের মানুষেরাও। নারী প্রশ্নে এসব মানুষদের কাছাখোলা অংশগ্রহণ, বিস্ময় বৈকি! কার সাথে যে কই মেলাচ্ছেন, উদোর পিন্ডি বুদোর ঘাড়ে দিয়ে ঘার উচিয়ে বক্তিমা ঝাড়ছেন, হাসব না কাঁদব ভেবে পাইনা! প্রণব সাহার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠতে একদল নারীবাদি পরলেন সেই চ্যানেলের নারী বিষয়ক অনুষ্ঠান পরিচালনা নারী সাংবাদিক বা নারী সহকর্মীদের নিয়ে। অভিযোগ তার চুপ থাকা নিয়ে শুরু হয়ে তার চরিত্রহনন এবং প্রণবসাথে তার কি সম্পর্ক থাকতে পারে সে পর্যন্ত চলে গেল। বিস্ময়! উনারাও নিজেদের নারীবাদীই বলেন। সর্বশেষে তোলপাড় সেলিম আল দীনের বিরুদ্ধে অভিযোগের পর। একজন লেখক তো সেলিম আল দীন পাঠক পরিষদের পক্ষে বিশাল বিবৃতি ফেঁদে প্রমাণ করতে চাইলেন মুশফিকা লাইজু মিথ্যা বলেছে। যে বিবৃতির পুরোটাই আমি ভিক্টিম শেমিং্যের আদলে পাঠ করতে পারি ‘সেলিম আল দীনের কাছে নানাজন নানা অনুরোধ, নানা দাবি নিয়ে যেতেন। আমরা ধারণা করছি, মুশফিকা লাইজুও এমন কোনো দাবি নিয়ে সেলিম আল দীনের কাছে গিয়েছিলেন। সেলিম আল দীন তা পূরণ করতে ব্যর্থ হন। সেই কারণে ক্ষুব্ধ হন মুশফিকা লাইজু। “ অথবা “মুশফিকা আরো লিখেছেন, সেলিম আল দীনের বাসায় যাওয়ার সময় তিনি তার প্রেমিককে পথে দাঁড় করিয়ে রেখে তারপর গিয়েছেন। আমাদের প্রশ্ন, প্রেমিককে পথে দাঁড় করিয়ে আপনি একা কেন সেলিম আল দীনের বাসায় গেলেন? প্রেমিককে কি নিয়ে যেতে পারতেন না?” আশার কথা যে, একটা অনেক বড় অংশের নারীপুরুষ, শিল্প-সংস্কৃতি গণমাধ্যম কর্মী মিটু আন্দোলনের পাশে দাড়িয়েছেন, ভিক্টিম নারীদের পাশে দাঁড়িয়েছে। আইনী-বিচার প্রক্রিয়ার ভেতর অপরাধীকে নিয়ে আসা #মিটু আন্দোলনের উদ্দেশ্য বা সাফল্য বলে আমি মনে করিনা, বরং সামাজিক, নৈতিক যে বিজয় সেটা মুখ্য। ভবিষ্যতে এর অপব্যবহার যে ঘটবে না তার গ্যারান্টিও আমি দিতে পারি না, কিন্তু এমন যে যে কারো সাথে চাইলেই করে ফেলা যায় না নির্ভয়ে (লোকলজ্জার ভয়ে ভিক্টিম তো চুপ করেই থাকবে) এই মেসেজ যে নিপীড়ন কারীর কাছে গেল, সেটিও #মিটু আন্দোলনের নানা তাৎপর্যপূর্ণ দিকের একটা। চলুক হ্যাশট্যগ মিটুর বাংলাদেশ অধ্যায়, খসে পড়ুক নীরবতার চাদর, বহুবছর ধরে ঢেকে রাখা ব্যক্তিগত যন্ত্রণা… ঝড়ে লন্ডভন্ড হোক সব…তবু আসুক আকাঙ্ক্ষিত, ভয়হীন, মুক্ত পৃথিবী।

তানজিনা তাইসিন
এডিলেইড, অস্ট্রেলিয়া
নভেম্বর ২০১৮।