বাক স্বাধীনতা ও বাংলাদেশ -শিমুল শিকদার

  •  
  •  
  •  
  •  

আমি তখন ইউনিভার্সিটিতে পড়ি। সে সময় আমাকে একবার জেলে যেতে হয়েছিল। একা না, দলবলসহ। সে আমার প্রথম জেলযাত্রা হলেও আমাদের দলের অনেকেরই আগে থেকেই সেখানে যাওয়া আসার অভিজ্ঞতা ছিল। কাজেই আমরা যারা জেলের নুতন অতিথি ছিলাম, তারা কিছুটা ভয় পেলেও বাকিদের ভাব ভঙ্গি দেখে মনে হয়েছিল পুরনো জায়গায় ফিরতে পেরে তারা কিছুটা আনন্দিত। জেলের কোথায় কেমনে কি করলে কি হয় সে সব কায়দা কানুন তারা ভালোই জানতো। একজনের আবার জেল কর্তৃপক্ষের সাথে আগে থেকেই খাতির ছিল। সে কারণে আমরা ভালই খাতির যত্ন পেতাম। জেলের মধ্যে আড্ডা আর গল্প গুজবে আমাদের সময় কাটতো। সেখানে রইসউদ্দিন নামের এক আসামীর সাথে আমার পরিচয় হয়েছিল। শুকনা পাতলা, গায়ের রং কালো। একটা চোখ নষ্ট। একেবারে দুষমনের মতো চেহারা। বাড়ি ভৈরব। রইসউদ্দিন ছিল জোড়া খুনের আসামী। এতো কাছ থেকে কখনো খুনী মানুষ দেখিনি আগে। খুনের মামলার আসামী শুনে প্রথমে ভয়ে লাফ দিয়ে উঠেছিলাম। একদিন সুযোগ পেয়ে তাকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কি আসলেই খুন করেছেন? লোকটি ছিল ভীষণ স্বল্পভাষী। তার বেশিরভাগ উত্তরই ‘হু হা’ ‘র মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতো। রইসউদ্দিন অনেকক্ষণ চুপ থেকে ‘হা’ বোধক মাথা নাড়লো। উত্তর শুনে আমি ভীষণ দমে গেলাম। লোকটাকে দেখলে ভয় ভয় করতো। তাই এড়িয়ে চলতাম। কিন্তু ভয়ঙ্কর মানুষদেরও সুন্দর একটা মন থাকতে পারে। রইসউদ্দিনের সাথে কেমনে কেমনে যেন আমার খাতির হয়ে গেলো। তখন নুতন সিগারেট ধরেছি। জেলের ভিতর করার কিছু নাই। সারাদিন তাই সিগারেট টানতে ইচ্ছে করে। ওখানে তাই সিগারেটের চাহিদাও অনেক। রইসউদ্দিন একটু পরপর আমার হাতের মধ্যে সিগারেট গুঁজে দিতো। লোকটিকে ভালো লাগার আর একটি বিশেষ কারণ হলো, তার ছিল অদ্ভুত গানের গলা। সন্ধ্যা নামলেই চুপচাপ এই লোকটা সবার মধ্যমনি হয়ে যেতো। প্লেট, বাঁটি, গামলা বাজিয়ে সে গানের আসর জমিয়ে ফেলতো। সময় মতো খাবার দাবার, দিনের বেলা আড্ডা-গল্প আর রাত নামলেই গানের আসর। এতে মনে হতে পারে জেলের জীবন খুব বেশী খারাপ কি?

আমাদের ছিল রাজনৈতিক মামলা। উকিল ছিল ভালো। কাজেই আমি জানতাম, আমাদের বেশীদিন ভিতরে থাকতে হবে না। কেস কোর্টে উঠলেই বেল হয়ে যাবে। সুতরাং দুঃচিন্তার তেমন কোন কারণ নেই। বন্ধুরা সবাই খুব স্বাভাবিক আচরন করলেও ভিতরে ভিতরে আমি ভীষণ দুমড়ে মুচড়ে পড়েছিলাম। কবে ছাড়া পাবো সেই আশায় যেন শ্বাস বন্ধ করে ছিলাম। ঘটনাটা অনেককাল আগের। কিন্তু আজ এতকাল পরে এসেও মনে পড়ে, জেলের মধ্যের সেই কয়টা দিনকে মনে হয়েছিল যেন কয়েক শত বছর। জেলের ছোট্ট ভেন্টিলেটরের ভিতর দিয়ে একটুখানি যে আকাশ দেখা যেতো তাকে এতো সুন্দর আগে কখনো লাগেনি। ওই আকাশটুকুর দিকে তাকিয়েই যেন মুক্তির স্বাদ নিতাম। কান খাড়া করে দুরের কোন রাস্তায় রিকশার টিং টাং আওয়াজ শুনতাম। রিকশাওয়ালাগুলোকে মনে হতো পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ। রিকশাটা উড়িয়ে তারা যেখানে খুশী সেখানে চলে যেতে পারে। বাধা দেয়ার কেউ নেই। ধীরে ধীরে আমার কাছে মনে হতে লাগলো, এরকম আর কয়দিন থাকেল আমি দম আটকে মরে যাবো। মনে হতে লাগলো, আমার যদি কোন অর্থ সম্পদ থেকে থাকে তাহলে সব কিছুর বিনিময়ে হলেও এই বন্দী দশা থেকে বের হতে চাই। মুক্ত হতে চাই এখনি, এই মুহূর্তে। মুক্ত বাতাসে বুক ভরে নিঃশ্বাস নিতে চাই। আমি ছুটতে চাই। যেদিকে খুশী, যেভাবে খুশী, যখন খুশী।
কাঠগড়ায় দাড়িয়ে যখন আমাদের বেলের রায় শুনলাম, তখন আমি কেঁদে ফেলেছিলাম। বুক ভরে যে নিঃশ্বাস নিলাম তাকে মুক্ত বাতাস বলে মনে হলো। সেদিন সেই মুহূর্তে আমার মনে হয়েছিল, মানুষের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো – স্বাধীনতা।

স্বাধীনতা নামের মহামূল্যবান এই পদার্থটি আমরা জন্মগতভাবে বিনামুল্যে পাই বলে এর মুল্য কখনো বিচার করতে বসি না। এর আসল মুল্য তখনই বুঝা যায় যখন কেউ তা হারায়। মানুষের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ যে স্বাধীনতা এই সত্যটা রাষ্ট্র কিন্তু খুব ভালো করেই জানে। আর তাই কোন মানুষ যখন অপরাধ করে তখন শাস্তি হিসেবে তার সোনাদানা, টাকাপয়সা, জায়গা জমি কেড়ে নেয় না। যা নেয় তা হলো তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধিকার। তাকে চার দেয়ালের মধ্যে বন্দী করে তার স্বাধীনতা হরন করা হয়। জেলখানায় অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থানের কোন সমস্যা থাকে না। কাজেই বন্দীর বিশেষ কোন সমস্যা হওয়ার কথা না। কিন্তু যে জিনিসটার অভাবে মানুষ হাহাকার করে মরে, সে হলো তার স্বাধীনতা। অপরাধের ধরন যতো গুরুতর হয়, স্বাধীনতার হরনও ততো বেশী হয়। বড় অপরাধীদের নির্জন কারাবাস দেয়া হয়, যাকে বলে Solitary confinement. ফাঁসির আসামিকে থাকতে হয় কনডেম সেলে। এই Solitary confinement অথবা কনডেম সেলে আসামীকে ছোট্ট একটা কক্ষে একা থাকতে হয়। মনের কথাটুকু পর্যন্ত বলার একজন মানুষ পাশে থাকে না। সাধারন কয়েদীদের থেকে Solitary confinement অথবা কনডেম সেলের কয়েদীদের পার্থক্য হলো, মানুষের শেষ যে স্বাধীনতা, যার নাম ‘বাক স্বাধীনতা’, সেটুকুও কেড়ে নেয়া হয়। জেলের ভিতর একজন মানুষের সাধারন চলাচলের স্বাধীনতা কেড়ে নেয়ার পরও তার কথা বলার স্বাধীনতাটুকু থেকে যায়। সে আরেকজন মানুষের সাথে অন্তত মনের কথাটুকু বলতে পারে। কিন্তু শেষ সে কথা বলার অধিকারটুকু যখন কেড়ে নেয়া হয়, তখন মানুষ হিসেবে পরিচয় দেয়ার আর কিছু অবশিষ্ট থাকে না।
একজন মানুষের কথা বলার অধিকার যে কত শক্তিশালী অধিকার তার একটা উদাহরন দেয়া যাক। পৃথিবী নামের এই গ্রহে উত্তর মেরু থেকে দক্ষিণ মেরু পর্যন্ত আমাদের চলাচলের অধিকার প্রকৃতি জন্মগতভাবেই আমাদের দিয়ে দেয়। কিন্তু আমরা মানুষরাই জন্মের সাথে সাথে আমাদের সেই চলাচলের সীমাকে দেশ নামের এক টুকরো ভুখন্ড দিয়ে সীমিত করে দেই। আমরা চাইলেই বর্ডার নামের কল্পিত লাইন অতিক্রম করতে পারি না। অর্থাৎ জন্মের সাথে সাথেই রাষ্ট্র আমাদের চলাচলের স্বাধীনতাকে সীমিত করে দেয়। বাকি থাকে কথা বলার স্বাধীনতা। বাংলাদেশের একজন মানুষের পক্ষে সুদূর আমেরিকা যাওয়া সম্ভব নাও হতে পারে। কিন্তু তার বক্তব্যটুকু হোয়াইট হাউসে বসা আমেরিকার প্রেসিডেন্টেকে নাড়িয়ে দিতে পারে। বাক স্বাধীনতার মাধ্যমে মানুষ তার বক্তব্যকে উত্তর মেরু থেকে দক্ষিণ মেরু পর্যন্ত পৌঁছে দিতে পারে। মানুষের বাক স্বাধীনতা এতোই শক্তিশালী।

বাক স্বাধীনতার কথা যখন বলি, তখন প্রথমে বলতে হয়, ‘বাক’ বলতে ঠিক কি বুঝায়। আমরা মুখের যে শব্দ দ্বারা কাজ সম্পন্ন করি তাকে ‘বাক’ বলে। এই বাক দ্বারা মানুষ আদেশ দেয়, উপদেশ করে, তর্ক বিতর্ক করে, বন্ধুকে গল্প শোনায়, প্রেমিক প্রেমিকা ভাব বিনিময় করে। এই বাক দ্বারা আমরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই, প্রার্থনা করি, অপরের মঙ্গল কামনা করি। এই বাক দ্বারাই আবার গালি দেই, কৌতুক করি, ঘৃণা প্রকাশ করি, দম্ভ অহংকার করি, ঘটনার বর্ণনা করি। শব্দের তৈরি যে বাক্য দিয়ে কার্য্য সম্পন্ন করি তাই ‘বাক’। এই বাক আমরা জন্মগতভাবেই অধিকার করি।
বাক স্বাধীনতা বললে বলতে হয়, কথার দ্বারা আমাদের মনের ভাব অথবা কার্য্য সম্পন্ন করার অধিকারকে বুঝায়। মানুষের স্বাধীনতার প্রথম ধাপ হলো, কোন বিষয়ে ভাবনা ও তা প্রকাশের স্বাধীনতা। অর্থাৎ আমি যা ভাবি তা প্রকাশের স্বাধীনতা। বাক স্বাধীনতা বলতে সাধারনত কোন মতবাদ, ভাবনা, আলোচনা, সমালোচনাকে বুঝায়। কথা বলার এই অধিকারই আমাদের স্বাধীনতার মূল ভিত্তি। বাক স্বাধীনতা না থাকলে রাজনৈতিক স্বাধীনতা, ভোটের স্বাধীনতা, ধর্মের স্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতাসহ সব স্বাধীনতা ব্যর্থ হয়ে যায়।
মানুষের নিত্য নুতন ভাবনা ও তার প্রকাশের দ্বারা সমাজের সঙ্গতি, অসঙ্গতি যাচাই বাছাই চলে। চলে আলোচনা, তর্ক বিতর্ক। চলে রাজনৈতিক নেতা নেত্রীবৃন্দের কর্ম, নীতি নৈতিকতার আলোচনা সমালোচনা। ভুলটাকে সরিয়ে ফেলা হয়, সুদ্ধটাকে সামনে এগিয়ে দেয়া হয়। একটি দেশের জনগনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাক স্বাধীনতা হলো, কোন রাজনৈতিক দলকে ‘হা’ অথবা ‘না’ বলা। যে দল পছন্দ তাকে ‘হা’ বলা, যে দলকে অপছন্দ তাকে ‘না’ বলা। ভোটের মাধ্যমে তারা সেই ‘হা’ অথবা ‘না’ মতের প্রকাশ ঘটায় এবং পছন্দের শাসক নির্বাচিত করে। জনগনই একটি রাজনৈতিক দলকে দেশ শাসনের ভার দেয়। কাজেই জনগন অবশ্যই সেই শাসক গোষ্ঠীর কাজ কর্মের সমালোচনার অধিকার রাখে।

খৃষ্টপূর্ব প্রায় সাড়ে তিনশত বছর আগে এরিস্টটল জিওসেন্ট্রিক ইউনিভার্সের ধারনা দেন। তিনি বলেছিলেন, পৃথিবী এই মহাবিশ্বের কেন্দ্র। সমস্ত চাঁদ, সূর্য, গ্রহ নক্ষত্র পৃথিবীকে কেন্দ্র করে ঘুরছে। এরিস্টটলের জিওসেন্ট্রিক ইউনিভার্সের ভুল ধারনাটি পৃথিবীতে প্রায় দুই হাজার বছর ধরে প্রচলিত ছিল। ১৫শ’ সালে কোপার্নিকাসের আবিস্কারের পর পৃথিবীর মানুষ প্রথম জানতে পারে, আমাদের সৌরজগতে সূর্যকে কেন্দ্র করে পৃথিবীসহ সমস্ত গ্রহ উপগ্রহ ঘুরছে। কোপার্নিকাস তাঁর এতো বড় আবিস্কার গোপন রেখেছিলেন। কারণ তখনো ইউরোপে মানুষের বাক স্বাধীনতার পরিবেশ তৈরি হয়নি। তাঁর এই আবিস্কার প্রকাশিত হলে তাঁকে হত্যা করা হতো। এতো বড় আবিস্কার গোপন রেখে কোপার্নিকাস মরে গিয়ে বেঁচে গেলেও বাঁচতে পারেনি ব্রুনো, গ্যালিলিও। তাঁরা কোপার্নিকাসের আবিস্কারকে সত্য বলে স্বীকৃতি দিয়ে সে গবেষণাকে আরো সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু তা তখনকার ইউরোপ সমাজের হাজার বছরের পুরনো ধ্যান ধারনার মূলে আঘাত করে। তখনকার সমাজ সে আঘাত সহ্য করতে পারেনি। ব্রুনোকে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। গ্যালিলিও ক্ষমা চেয়ে কোনমতে রক্ষা পেলেও তাঁকে বাকি জীবন কাটাতে হয়েছে অন্ধকার কারাগারে। সেখানে তাঁকে আর কোন প্রকার গবেষণা করতে দেয়া হয়নি। সেভাবেই তাঁর মৃত্যু হয়। গালিলিওর মৃত্যুর প্রায় সাড়ে তিনশ বছর পরে ১৯৯২ সালে ভ্যাটিকান চার্চের পোপ গালিলিওর সেই কারাদণ্ডের রায়কে সেদিনের চার্চের ভুল সিদ্ধান্ত বলে বিবৃতি দেন। কিন্তু ততদিনে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে। পৃথিবী গ্যালিলিও আরো নুতন নুতন আবিস্কার থেকে বঞ্চিত হয়েছে। সমাজ বিরোধীর উছিলায় আজ আমরা যাদের কথা আটকে দিচ্ছি তাদের মধ্যেই হয়তো অনেক গ্যালিলিও, কোপারনিকাস, ব্রুনো লুকিয়ে আছে।
আমাদের দেশে এমন একটা সময় ছিল যখন স্বামীর চিতায় জীবন্ত স্ত্রীকে পুড়িয়ে হত্যা করা হতো, ধর্মের নামে চলতো নরবলী। ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর, রাজা রামমোহন রায়েরা হাজার হাজার বছর ধরে চলে আসা ভয়াবহ এই সব প্রথার বিরুদ্ধে যখন কথা বলেন, তখন হিন্দু সমাজ তাদের বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠেছিল। সেদিনের হিন্দু সমাজ যদি এই সব সংস্কারকদের মুখ বন্ধ করে দিতে পারতো তাহলে আরো কত কত জীবন্ত মানুষ ধর্মের নামে প্রান হারাতো।
বাক স্বাধীনতাকে তারাই ভয় পায়, যারা পরিবর্তনকে ভয় পায়। সামনে এগিয়ে যেতে যারা শঙ্কিতবোধ করে। যারা অভ্যস্ত রীতিনীতিকে আঁকড়ে রাখতে চায়। অথচ রীতিনীতি, কৃষ্টি, শিল্প, সংস্কৃতি এসব স্থির, স্থায়ী কোন বিষয় না। এসব বহমান। সময়ের সাথে সাথে এদের পরিবর্তন ঘটে। আজকের বাংলাদেশের মানুষ যে ভাষায় কথা বলে, যে পোশাক পরিচ্ছেদ পড়ে, যে খাদ্য খায় শত শত বছর আগের সাথে তুলনা করতে দেখা যাবে এর চেহারা ছিল অনেক ভিন্ন। সময়ের সাথে সাথে ভুখন্ডের মানচিত্রেরও পরিবর্তন ঘটে। আজকের এই বাংলাদেশ এক সময় ছোট ছোট রাজ্যে বিভক্ত ছিল। এরপর সময়ের প্রয়োজনে তা হয়ে পড়ে বৃহত্তর পাক-ভারত উপমহাদেশের একটা অংশ। ধীরে ধীরে আবার হয়ে যায় পাকিস্তানের একটা ভাগ। এই মুহূর্তে বাংলাদেশ স্বাধীন এক ভূখণ্ড। সময়ের সাথে সাথে এর আরো অনেক পরিবর্তন ঘটতে পারে। ভূখণ্ড বড় হয়, ছোট হয়, কৃষ্টি কালচার বদলায়, সংস্কৃতির পরিবর্তন ঘটে। কিন্তু একমাত্র মানুষের মানবিক উন্নয়নটুকু অবশিষ্ট থেকে যায়। মানবিকতার এই উন্নয়ন কেবলমাত্র সম্ভব বুদ্ধিবৃত্তির চর্চা, তার প্রকাশ ও আদান প্রদানের মধ্যে দিয়ে।
রাজতন্ত্রে রাজাই আইন। সেখানে বাক স্বাধীনতার সুযোগ কম। কিন্তু গনতন্ত্রে রাজাও যা, প্রজাও তা। তাই গণতান্ত্রিক দেশে বাক স্বাধীনতা চর্চার সুযোগ থাকে। কিন্তু দেশেভেদে আবার স্বাধীনতার সংজ্ঞাও ভিন্ন হয়। কানাডার সংজ্ঞা যেমন উগান্ডায় খাটবে না, তেমনি দক্ষিণ কোরিয়ার সংজ্ঞা আমেরিকাতে চলবে না। আমেরিকায় প্রতিবাদ হিসেবে জাতীয় পতাকা পোড়ান যায়। কিন্তু বাংলাদেশের আইনে তা নিষেধ। কাজেই বাক স্বাধীনতার সংজ্ঞাও বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন হয়। একটি দেশে গনতন্ত্রের পরিপক্কতা ও জনগনের শিক্ষার উপর নির্ভর করে সে দেশের স্বাধীনতা সংজ্ঞায়িত করা হয়। একজন অশিক্ষিত মজুরের স্বাধীনতার সংজ্ঞা আর একজন উচ্চ শিক্ষিতের স্বাধীনতার সংজ্ঞা এক নয়। তেমনি একজন শিক্ষিত মানুষের বাক স্বাধীনতা আর একজন অশিক্ষিত মানুষের বাক স্বাধীনতা কখনোই এক হবে না। তাই একটি স্বাধীন গণতান্ত্রিক দেশের জনগন অথবা সরকার বাক স্বাধীনতার জন্য প্রস্তুত নাও হতে পারে। এজন্য জনগনের রাজনৈতিকভাবে অভিজ্ঞতা অর্জন করা যেমন প্রয়োজন, তেমনি সরকারের সৎ ও অভিজ্ঞ হওয়াও জরুরী। এক্ষেত্রে সরকারের ভুমিকাই সবচেয়ে বড়। একটি দেশে বাক স্বাধীনতা যথাযথভাবে প্রয়োগের জন্য জনগনকেও সেভাবে প্রস্তুত করতে হয়। সরকারের উচিত জনগনের মেধার চর্চা ও বিকাশের সুযোগ তৈরি করা, ধর্মান্ধতার শিকড় উপড়ে ফেলে যুগোপযোগী শিক্ষার অবকাঠামো দাড় করানো, জনগনের মধ্যে দায়িত্ববোধ সৃষ্টি করা, আইনের প্রতি তাদের শ্রদ্ধাশীলতা ও সমাজের কাছে দায়বদ্ধতার বোধ তৈরি করা। যে সমাজে জনগন শিক্ষিত, ভাবনা চিন্তায় পরিপক্ক, নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন, রাষ্ট্রীয় আইন কানুনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, নীতি নৈতিকতায় পরিণত, সেই সমাজের জনগণের বাক স্বাধীনতা যথাযথভাবে কার্যকর হয়।
বাক স্বাধীনতার অপর পিঠে রয়েছে নীরবতা, জনগন যখন নির্বাক, নিশ্চুপ হয়ে যায়। যুগে যুগে শাসকেরা জনগনকে নিয়ন্ত্রনে রাখতে বাক স্বাধীনতাকে সীমিত করে দিয়েছে। জনগণ যখনই সে সীমা অতিক্রম করেছে তখনই তাকে আটকে দিয়েছে। এজন্য অনুন্নত দেশগুলোতে প্রায়ই দেখা যায় ভিন্ন মতের মানুষদের হুমকি ধামকি দেয়া হয়, থামিয়ে দেয়া হয়, জেলে পাঠানো হয়, হত্যা করা হয়। জনগন যদি বাক স্বাধীনতা হারায় রাষ্ট্র তখন ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যায়।
সরকার গলা টিপে রাখলেও জনগনের কিন্তু তাদের কথা একেবারে থামিয়ে দেয় না। তারা তখন কথা বলে চুপি চুপি, ফিসফিস করে। এক স্ত্রী তার অত্যাচারী স্বামীকে ভীষণ ভয় পেতো। স্বামী ঘুমিয়ে থাকলে কোন প্রকার শব্দ করা নিষেধ ছিল। ঘরের সবাই তখন ফিসফিস করে কথা বলতো। একদিন দুপুরে স্বামী ঘুমিয়ে আছে। এমন সময় ঘরে আগুন লেগে গেলো। স্ত্রী তখন ফিসফিস করে সন্তানদের সতর্ক করতে লাগলো- আগুন! আগুন!! পালাও পালাও। কিন্তু ফিসফিস সেই শব্দ স্বামী ও সব সন্তানদের কানে পৌছার আগেই আগুন ছড়িয়ে পড়লো। স্বামী, সন্তানেরা পুড়ে মরলো।
জনগন যখন কথা বলার অধিকারের কথা ভুলে যায়, তখন সত্য কথাও তারা ফিসফিস করে বলে। সে সত্য সরকারের কানে পৌঁছে না। সরকারের তখন জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এবং রাষ্ট্র ভুল পথে পরিচালিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। সরকারের অপকর্মে জনগণ যখন চুপ থাকে অথবা এড়িয়ে যায়, তখন বুঝতে হবে জনগণ হয় ভীত অথবা সুবিধাবাদী হয়ে পড়েছে। এ পরিস্থিতি দেশের জন্য ভয়াবহ হয়ে যায়।

সময়ের সাথে সাথে মানব সভ্যতা যত পরিনত হচ্ছে, মানুষের কথা বলার অধিকারও ততো বাড়ছে। এমন একটা সময় ছিল যখন পাশ্চাত্যের দেশগুলোতে নিচু শ্রেণীর মানুষের বাইবেল পড়ার অধিকার ছিল না। এখন সেসব দেশের নাগরিকদের প্রকাশ্যে বাইবেলের সমালোচনা করতে দেখা যায়। দেশের প্রচলিত আইন তাদের শাস্তি দিতে পারে না। একটা সময় ছিল ধর্মে অবিশ্বাসী মানুষদের প্রকাশ্যে হত্যা করা হতো, সমকামী, কালো বর্ণের মানুষ, নারীদের অধিকার ছিল খুবই সীমিত। এ অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে যুগে যুগে পৃথিবীকে অনেক মুল্য দিতে হয়েছে। আমাদের দেশে আজ মানবিকতা যে পর্যায়ে আছে ব্রিটেনে সেটা ছিল তিনশ’ চারশ বছর আগে। হাজার হাজার বছর ধরে মানবতার চর্চা করে, অনেক লম্বা, কঠিন পথ পাড়ি দিয়ে আজ ওরা যে অবস্থানে পৌঁছেছে আমরাও একদিন সেখানে পৌঁছব ঠিকই।
বাংলাদেশে বাক স্বাধীনতা বরাবরই খুব সীমিত আকারে ছিল। এজন্য চট করে শাসকগোষ্ঠীকে দায়ী করা যায় না। অনেক সময় সংখ্যাগরিষ্ঠদেরও ভুমিকা থাকে। সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগন যে কথা শুনতে স্বস্তিবোধ করে না সে কথাই বলা বারণ বলে মনে করে। এজন্য নুতন আলোচনা, চিন্তাভাবনা, কথাবার্তা আর সামনে আগায় না। অথচ বিতর্কিত বিষয়, নুতন নুতন ভাবনা দিয়েই সমাজ, সভ্যতা এগিয়ে যায়। বিতর্কিত কোন বিষয় নিয়ে কথাবার্তা, ভাবনাকে থামিয়ে দেয়ার অর্থ হলো সভ্যতার আগ্রগতিকে থামিয়ে দেয়া।  একটা জাতি সভ্য তখনই হয় যখন প্রতিটি মানুষের নিজস্ব মত প্রকাশের স্বাধীনতা থাকে। ব্যক্তিগতভাবে কেউ একজন ব্যক্তিবিশেষকে পছন্দ নাও করতে পারে কিন্তু তার মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে শ্রদ্ধা করতে হবে। বাক স্বাধীনতার সংজ্ঞা তাই বলে। হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, সংখ্যাগুরু, সংখ্যালঘু, নারী, পুরুষ, তৃতীয় লিঙ্গ প্রতিটি মানুষের বুদ্ধিবৃত্তি আছে। সমাজের প্রতিটি ঘটনায় তার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি থাকবে। সে দৃষ্টিভঙ্গির সাথে অন্যের ভাবনার মিল নাও হতে পারে। কোন কথা বিশেষ কোন গোষ্ঠীর ভালো না লাগলে সে বক্তাকে থামিয়ে দেয়ার অর্থ হলো বাক স্বাধীনতাকে বাধাগ্রস্ত করা। কোন দেশে জনগন যখন এই পরিস্থিতির সৃষ্টি করে তখন সরকার এর সুযোগ নিতে পারে।
এই একুবিংশ শতাব্দীতে এসে বাংলাদেশের প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়য়ের আবরারকে তার নিজস্ব মত প্রকাশের জন্য করুণ এক পরিনতি মেনে নিতে হয়েছে। দেশ নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়াতে বক্তব্যর জন্য আবরারকে প্রাণ দিতে হয়েছে। আবরারের বক্তব্য হত্যাকারীদের কাছে দেশ বিদ্বেষী মনে হয়েছে। তাই তাকে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়। কিন্তু হত্যাকারীরা ভুলে গেছে যে, এ দেশের প্রতি যে অধিকার তাদের আছে, সেই অধিকার আবরারেরও রয়েছে। সে ভালোবাসা প্রকাশের অথবা প্রতিবাদের পূর্ণ অধিকার তাঁর রয়েছে। সেই প্রকাশ ভঙ্গি বিভিন্ন মানুষের বিভিন্ন রকমের হতেই পারে। দেশপ্রেম যখন অন্ধ, বিবেকবুদ্ধি শূন্য মানবতাহীন হয়ে যায়, সেই দেশপ্রেম দেশের উপকারের চেয়ে সর্বনাশই ডেকে আনে বেশী।
তবে একটি দেশের বাক স্বাধীনতা জনগনকে কথা বলার অসীম অধিকার দেয় না। এর স্পষ্ট একটা সীমারেখা আছে। বাক স্বাধীনতার অর্থ এই নয় যে জনগণ দায়িত্বহীন বক্তব্য দিয়ে সরকারকে হেনস্থা করবে অথবা বিদ্বেষমূলক ভাষণ দিয়ে সমাজে অস্থিরতা, অরাজকতা সৃষ্টি করবে। বাক স্বাধীনতা মানে সরকারকে মাত্রাতিরিক্ত বিরক্ত করা অথবা যখন তখন ক্ষমতা থেকে টেনে নামানো নয়। বাক স্বাধীনতা মানে সীমাহীন বলার অধিকার নয়। বাক যখন হিংসা, ঘৃণা, মানসিক বিকৃতি, হুমকি ধামকি মিশ্রিত হয়, সে বাক তখন স্বাধীনতা হারায়। যে বক্তব্য সমাজের জন্য হুমকি, ক্ষতিকর সে বক্তব্যকে আর স্বাধীন বলা চলে না। যে বক্তব্য সমাজে বিভেদ বাড়ায়, হিংসা ছড়ায়, মানুষে মানুষে দুরত্ব তৈরি করে তাই ঘৃণ্য বক্তব্য। বাক স্বাধীনতা মানে জনগনের উপর এক দায়িত্ব। এর যথাযথ ব্যবহার যেমন রাষ্ট্রের জন্য উপকারি, তেমনি স্বেচ্ছারিতায় রাষ্ট্রযন্ত্রকে ঝুকির মধ্যে ফেলে দিতে পারে।
আমাদের স্বাধীনতার যুদ্ধ হয়েছিল শুধুই কি এক খণ্ড ভুমি দখলের জন্য? অবশ্যই না। দেশ তো আমদের একটা ছিলই। পূর্ব পাকিস্তান ছিল যার নাম। শুধুমাত্র ভূখণ্ডটির নাম পরিবর্তন করতে নয় মাস ধরে যুদ্ধ করে ত্রিশ লক্ষ বাঙ্গালী প্রাণ দেয়নি। বিচারক আসামির উদ্দেশ্যে ‘খালাস’ শব্দটি উচ্চারণ করার পর কাঠগড়ায় দাঁড়ানো ‘খালাস’ সেই মানুষটির বুক ভরে নেয়া নিঃশ্বাসকে যেমন মুক্ত বাতাস বলে মনে হয়, আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ছিল বুক ভরে সেই স্বাধীন নিঃশ্বাস নেয়ার লড়াই। এই লড়াই ছিল স্বাধীনভাবে ভাবনার লড়াই, সে ভাবনা প্রকাশের লড়াই, নিজের অধিকার প্রয়োগের লড়াই, মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার লড়াই, মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকার লড়াই। সে লড়াইয়ে আমাদের হার হয়নি এটা বলা যায়। তবে জিতেছিলাম কতটুকু সেটা বলা শক্ত। স্বাধীনতাটাকে পুরোপুরি ধারন করতে আমাদের এখনো অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে।
বাক স্বাধীনতা হলো সভ্যতার আসল মন্ত্র, মুল চাবিকাঠি। বাক স্বাধীনতার যেখানে উন্মুক্ত হয়েছে সে সমাজ, সে সভ্যতা দ্রুত এগিয়ে গিয়েছে। এমন একটা সময় আসবে যেদিন বাংলাদেশের জনগন বাক স্বাধীনতা নিতে ও সরকার দিতে পুরোপুরি প্রস্তুত হবে। সেদিন এদেশের মানুষের চিন্তার মুক্তি ঘটবে, বাক হবে স্বাধীন হবে। সভ্যতায় আরেক ধাপ এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ।

শিমুল শিকদার
গল্পকার, নাটক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা
সিডনি, অস্ট্রেলিয়া।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments