বাচ্চু ভাইয়ের সাথে কিছু অমূল্য স্মৃতি!!!

395

একজন কিংবদন্তী শিল্পী, বাংলাদেশের ব্যান্ড জগতের সবচেয়ে উজ্জ্বলতম নামের একটি, বলা হয়ে থাকে উপমহাদেশের অন্যতম এক গিটারিস্ট, আইয়ুব বাচ্চু। তিনি আমাদের মাঝে নেই, আমরা সবাই জেনে গেছি এই নিষ্ঠুর সত্যিটা। গত ১৮ অক্টোবর ২০১৮ কোটি ভক্ত শ্রোতাকে কাঁদিয়ে চলে গেছেন না ফেরার দেশে। তাঁর অনন্ত যাত্রায় গোটা বাংলাদেশ থমকে গেছে, সেইক্ষণ থেকে বুকের মাঝে একটা কষ্টের নোনাজল নিয়ে অনেকেই দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে চোখ মুচছেন আজও!!!

দেশে বিদেশে সকল সংবাদ মাধ্যম তাঁকে নিয়ে প্রতিদিন করে যাচ্ছে বিশেষ আয়োজন, শোকগাঁথা, এলিজি, নানান সংবাদ মাধ্যম নানানভাবে তুলে ধরছেন শ্রদ্ধাঞ্জলি, অনেকেই বলছেন, নক্ষত্রপতন, বলছেন, রুপালী গিটার হাতে ঘুম ভাঙা শহর থেকে চিরবিদায় নিলেন কিংবদন্তি এ গায়ক…

আসলেই কী নক্ষত্রের পতন হয়? আসলেই কী তাঁর রেখে যাওয়া কাজগুলোই আমাদের এই একজীবনের যত আয়োজন তার জন্যে যথেষ্ট নয়?

শিল্পী আইয়ুব বাচ্চুকে নিয়ে অনেকেই লিখেছেন, লিখছেন এবং লিখবেন। অসংখ্য লেখার সাথে আমি আরো একটি যোগ করতে চাই।  চাইছি আমার একান্ত কিছু অনুভব তাঁকে ঘিরেই থাকুক সময়ের এই দলিলে।

তাঁকে নিয়ে কেন লিখছি ছোট্ট করে একটু বলেই নেই। বাংলাদেশের শিল্প সংস্কৃতি জগতের অনেক অনেক প্রিয় প্রিয় গুণী মানুষ আছেন যাদের আমরা খুব পছন্দ করি, ভালোবাসি, ভালোবাসি শর্তহীন। সেইসব শিল্পীদের সাথে কোটি ভক্তদের ব্যাক্তিগত কোন যোগাযোগ থাকেনা বা এক জীবনে কাছ থেকে দেখার সৌভাগ্যই হয়না, অনেকে খুব করে চাইলেও।

কেউ কেউ খুব সৌভাগ্যবান, কোন না কোনভাবে শিল্পীর সান্নিধ্যে আসতে পারে, হতে পারে অনেক সময় সেটা খুব স্বল্প সময় তারপরও পায়। তারকা শিল্পী বা আমরা যাদের বলি সেলেব্রেটি। বলাই বাহুল্য তাঁদের সাথে ভক্তদের যোগসূত্র যেভাবেই হোক বেশীর ভাগ সময় অভিজ্ঞতাটা খুব কাংখিত বা স্মরণীয় নাও হতে পারে।

আইয়ুব বাচ্চুর গান শুনি বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকে, তাঁর ‘কষ্ট’ ভালোবেসেছিলাম। খুব বেশী। কতো রাত যে কষ্ট শুনে শুনে ভালোলাগা একটা কষ্ট নিয়ে রোকেয়া হল জীবনে ঘুমের সাগর দিয়েছি পাড়ি… আবার তারা ভরা রাতের অপেক্ষায় থেকেছি তাঁর রুপালী গিটারের মুর্ছণায় ঘুম ভাঙ্গা শহরে একা হবো, কাঁদবো বলে খুব নীরবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রায় ৬/৭ বছরে অনেক ব্যান্ডের কনসার্ট উপভোগ করার সুযোগ এলেও আইয়ুব বাচ্চুকে উপভোগ করার সুযোগ আসেনি আমার।

আমার বিয়েতে তাঁর পরিবারের সবাই ছিলেন,  বিয়ের পরই জানতে পারি, উনি আমার শ্বশুর বাড়ীর দিকের বেশ কাছের আত্নীয়। তাঁর পরিবারের সাথে বেশ কাছের একটা সম্পর্ক হয় আমারও এবং অবশেষে অক্টোবর ২০১৫তে তাঁর অস্ট্রেলিয়া আসার সুবাদে সুযোগ আসে খুব কাছের আসবার। কোটি ভক্তদের যেমন ইচ্ছে থাকে প্রিয় কোন শিল্পীকে নিজের হাতে রান্না করে খাওয়াতে কিছু সময় কথা বলতে একান্তে… এডেলেড, সাউথ অস্ট্রেলিয়ায় আমার এই সুযোগটি হয়!!!

বাচ্চু ভাই, এডেলেড নামলেন যেদিন, আয়োজকরা হোটেলে থাকার ব্যাবস্থা করেছিলেন। আমার হাজব্যান্ড অরুপ সম্পর্কে উনার শ্যালক, একটা ভালো আন্তরিক সম্পর্ক ছিলো তাঁদের মাঝে অনেক আগে থেকেই। তাঁকে এয়ারপোর্টে রিসিভ করতে যাওয়ার সময়ই আমি বক্সে করে কিছু খাবার দিয়ে দিয়েছিলাম অরুপের হাতে, আমি যাইনি। এসেই মাছ মুরগী ডাল এসব দিয়ে অল্প ভাত খেতে পেরে উনি আন্তরিক ধন্যবাদ জানিয়েছিলেন সে রাতেই। শো এর আগের দিন রাতে আমার বাসায় ডিনার করবেন। আমি যা যা করতে পারি, চেষ্টা করেছি সবই করতে, কাছের বন্ধুদের একজন নাহিদও একটা রান্না নিয়ে এসেছিলো। উনি অল্প ঠান্ডা সমস্যার কথা জানিয়েছিলেন এডেলেড নেমেই এবং অরুপকে জানিয়েছিলেন সম্ভব হলে একটু সরিষা ভর্তা বানাতে। আমি সেটা লাস্ট আওয়ারে জানায় কিছুতেই করতে পারছিলামনা…

এডেলেড ছোট শহর আমার কাছের বন্ধুদের সবাইকে জানানোর পর দেখা গেলো দুই জায়গা থেকে সেটা চলে এসেছে উনি আমার বাসায় পা রাখার আগেই!!!

বাচ্চু ভাই খুব পরিবারভক্ত আন্তরিক মানুষ ছিলেন। আমার বাসায় পা রাখতেই যা হয়, কাছের বন্ধু বান্ধব ছাড়াও বেশ কিছু মানুষ শুধু উনাকে হ্যালো বলে, একটা ছবি উঠাতেই চলে এসেছিলেন আমাদের আমন্ত্রণ ছাড়াই। বাসায় ঢুকতেই বাচ্চু ভাইকে অপ্রস্তুত আমি পা ছুঁয়ে সালাম করতে এগিয়ে যাই, উনি বাঁধা দিলেন… বললেন আরে পাগল বোন আমার করে কী… আমার ৯ বছর বয়েসী ছেলে নভঃকে কাছে টেনে নিয়ে আমাদের সাথে দাঁড়িয়ে সবাইকে বললেন আমাদের ফ্যামিলি ছবি উঠিয়ে নেই আগে, অরুপ আয়…

ভাইয়ার সেই এডেলেড টূরের আরো একটি মজার স্মৃতি বলি। এডেলেড শো এর পরদিন বোধ হয় অরুপ জিজ্ঞেস করেছিলো, আমি জানতে চেয়েছি উনার জন্যে আর কিছু রান্না করবো কিনা, (আমার রান্নার এতো প্রসংশা করলেন) উনি জানালেন পারলে আলু ভাজি আর পরোটা করতে। আমি মনের মাধুরী মিশিয়ে মাঝ রাত্রিরে আলু ভাজি করতে বসলাম সকালে হোটেলে পাঠাবো বলে। শেষ করে ভাবলাম সকালের জন্যে ডিপের পরোটা প্যাকেট গুছিয়ে, চায়ের ফ্লাস্ক রেডি করে রাখি… ডিপ খুলে আমার রীতিমত মাথায় হাত। পরোটা বেশী নেই…

রাত বোধ হয় ১২/১টা। এডেলেড এর একমাত্র জালাল ভাইয়ের বাংলা দোকান, তাঁকে কল দেয়া হল, ভাইয়া ঘুমাতে যাচ্ছেন। এই কাহিনী শুনে বললেন, বাচ্চু ভাই পরোটা খাবেন আর আমরা সেটা দেবোনা, এক্ষুনি আসেন আপনারা নিয়ে যান। ভাগ্যিস উনার বাসা আর দোকান পাশাপাশি। এই হচ্ছে আমাদের প্রিয় শিল্পীদের ঘিরে আমাদের মতন সাধারণ মানুষদের অসাধারণ ভালোবাসা… শিল্পীদের অনেকেই সেটা জানেন, অনেকেই বোধ হয় ওভাবে সেটা অনুধাবনই করতে পারেননা।

বাচ্চুভাই আমার বাসা থেকে যেয়েই সম্ভবত আমাকে ফেসবুকে বন্ধু রিকোয়েস্ট পাঠান। আমি আসলে আত্মীয় হলেও সাহস পাইনি তার আগে পাঠাতে। ফেসবুকে যুক্ত হয়েই বুঝলাম উনি খুব সহজ একজন মানুষ।

এল আর বি, কোটি মানুষের প্রিয় এই ব্যান্ডের প্রথম কনসার্টটি আমার এতো কাছ থেকে উপভোগ করার সুযোগ এলো অবশেষে। এর আগে এই অস্ট্রেলিয়া এসেই আমার সুযোগ হয়েছে অনেকগুলো বাংলাদেশী লিডিং ব্যান্ড উপভোগ করার। কিন্তু বাচ্চু ভাইয়ের, মানে এল আর বির এডেলেড শো আসলে এক কথায় অনবদ্য ছিলো। অনেক চেনা গানে বাচ্চুভাইয়ের গলা একটু এদিক ওদিক হলেও একটা ব্যান্ড শো যে সবমিলেই উপভোগ্য হয়ে উঠে নুতন করে জানলাম।

আমার জীবনে দেখা অন্যতম সেরা কনসার্ট এটি। কনসার্টের পরদিনের ফেসবুক স্ট্যাটাসটি ছিল আমার এমন… পাঠক কিছুটা হলেও বুঝতে পারবেন আমার উচ্ছ্বাসটা।

‘’এটা ঠিক আমাদের বইদেশ জীবনে ‘’বাংলাদেশ থেকে উড়ে আসা কোন শিল্পী সাহিত্যিক, যে কোন সাংস্কৃতিক ব্যাক্তিত্বকে যখন আমরা কাছে পাই, আমাদের কাছে তখন সেই হয়ে উঠে পুরো বাংলাদেশ বা মা মাটির ক্যানভাস!!! আমরা যখন বাংলাদেশ থেকে আসা কোন শিল্পী বা শিল্পী গোষ্ঠীর ‘’সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগ করি বলাই বাহুল্য সব কিছুতেই আমাদের থাকে আরো একটু বেশী ভালোলাগা, বেশী বেশী ভালোবাসা। সাউথ অস্ট্রেলিয়ার শহর এডিলেড এ আছি প্রায় ৭ বছরের বেশী সময়। এর মাঝে সৌভাগ্য এবং দুর্ভাগ্য হয়েছে অনেক শিল্পী, ক্রিকেটারকে কাছ থেকে দেখার। গতকাল ছিল এডিলেড এ গ্রেট লিজেন্ড এবি ও এল আর বি’র প্রথম কনসার্ট। সবকিছু মিলে অনেকদিন ধরে আমার মন-মানসিকতা খুব ম্যারম্যারে একটা অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। ‘’বাচ্চু ভাই এর সাথে আত্মীয়তা সূত্রের জন্যেই হোক বা অন্য কোন অজানা কারনেই হোক এই কনসার্টকে ঘিরে তাই সব মিলিয়েই একটা অতিরিক্ত উত্তেজনা কাজ করছিল। চাইছিলাম আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে দেখা কনসার্টের সেই পাগল পাগল দিনগুলোকে নিজের বয়েস ৪০ পার হওয়ার আগেই আরো একবার খুব করে ছুঁয়ে দেয়ার একটা (অপ) চেষ্টা করা যেতেই পারে, কাল করেছিও সেটা। ‘’অনেক দিন পর অচেনা অন্য ভুবনের একটা নদী’’ ভীষণ ভাবে মেলে ধরেছিল কাল নিজেকে!!! গতকাল এডিলেড এ ‘’এল আর বি’’র কনসার্ট আমার কাছে তাই এখন নিছক একটা ব্যান্ড সন্ধ্যা না, অন্য কিছু অন্য একটা খুলে যাওয়া অধ্যায়!!!’’

শিল্পী বাচ্চু ভাইয়ের কাছে আসা সেই প্রথম, কনসার্ট শেষ করার পর ভাইয়া আমাদের গাড়ীতে করেই হোটেলে ফিরলেন। আমি তখন রেডিও বাংলা এডেলেড এ কাজ করি। ভাইয়ার ছোট একটা সাক্ষাৎপর্ব  এক জুনিয়র কলিগের সাথে আমিই সেট করে দিয়েছিলাম আমারই বাসায়। কারণ ছিল, ভাইয়া আমার স্পেশাল গেস্ট হয়ে বাসায় এসেছেন আমি শুধু তাঁকে আমার আপ্যায়নের সেরাটুকুই দিতে চেয়েছি।

শো শেষে গাড়ীতে উঠেই ভাইয়া শুনেন লো ভলিউমে তাঁরই গানের প্লে লিস্ট চলছে। এ এক অসাধারণ অনুভূতি… শিল্পী আমাদেরই পাশে। কথা প্রসঙ্গে ভাইয়া বললেন আমার ফেসবুকে যুক্ত হয়ে দুই একটা লেখা পড়েছেন, আমার লেখা উনার ভালো লেগেছে। এতো বড় একজন শিল্পীর মুখে এইটুকুন শোনাই একটা অনেক বড় পাওয়া…

ভাইয়াকে সাহস করে জানালাম, আমি আপনাকে নিয়ে লিখবো, মানে লিখতে চাই। লেখাটা অবশ্যই আর দশটা ইন্টারভিউ এর মত হবেনা… আমি ছোট করে জানতে চাই, একজন শিল্পী আইয়ুব বাচ্চু, পরিবারে থাকা মানুষটা… মাকে ঘিরে তাঁর অসম্ভব টানের কথা… এবং জীবন দর্শন নিয়ে তাঁর ভাবনাগুলো। স্টেজের বাচ্চু ভাই এবং পরিবারের মাঝে থাকা বাচ্চু ভাই… উনি প্রাণ খুলে বলতে থাকেন। আমি শুনি…

না এডেলেড খুব ছোট শহর, ভেন্যু থেকে মাত্র ৩০ মিনিটের দূরত্বে আমাকে থামতেই হয়। পরদিন আরেক আত্মীয়ের বাসায় আমাদের দেখা হবে এবং বাকি কথা হবে… এমন আশা নিয়ে ভাইয়ার কাছ থেকে বিদায় নেই… কিন্তু নানান কারণে আর যাওয়া হয়নি আমার উনার সাথে দেখা করতে অন্য কোন বাসায়।

তবুও আমি এডেলেড ছাড়ার আগে ফোনে বলি, ভাইয়া আপনি আমাকে যেটুকুন সময় দিলেন, এই নিয়েই লিখবো… না আমি এই কথাটাও রাখতে পারিনি, যেভাবে লিখতে চেয়েছিলাম নানান কারণে সেটা কেন যেন আমার আর কোন পত্রিকার জন্যে লিখতেই ইচ্ছে করলোনা… কিন্তু কখনও যে লিখবোনা সেটাও ভাবিনি। কিন্তু ‘সময় আর দিলোনা সে সময়’।

বাচ্চু ভাইকে আসলে কিছু বলতে চাইছিলাম… আজ কষ্ট নিয়েই বলি তা!!!

‘’বহুদূর যেতে হবে
এখনো পথের অনেক রয়েছে বাকি
ভালোবাসার বিশ্বাস রেখো
হয়তো অচেনা মনে হতে পারে আমাকে’’

ভালোবাসায় বিশ্বাস থাকলেও, হঠাৎ আপনাকে হারিয়ে আমাদের পৃথিবী যেন অনেকটাই অচেনা। নিজ ভুবনে কেউ সুখী, কেউ কেউ চির দুঃখী। আপনার একান্ত কিছু কষ্ট ছিল। সেই কষ্টের রঙ দিয়ে এঁকেছেন সুরের যাদু… মায়া। কষ্ট পাওয়া দুঃখী মানুষেরা আপনার সাথে অসংখ্যবার গলা মিলিয়ে, কখনও বা চিৎকার করে গেয়েছে… সব আলো নিভিয়ে দিয়ে, পালাতে চাই, একা… ফেরারী এ মনটা নিয়ে। গেয়েছে… তারা ভরা রাতে বুঝাতে না পারার নীল বেদনা নিয়ে… অভিমান নিয়ে… ও পাখি!!!

আমার বিশ্বাস কিছু কষ্ট না থাকলে, কষ্টের আগুনে না পুড়লে প্রকৃত শিল্পী বোধ হয় শিল্পী হয়ে উঠতে পারেনা।কষ্ট কিছু ছিল বলেই এতোটা মনের গভীর থেকে গাইতে পেরেছিলেন, কোন সুখের ছোঁয়া পেতে নয়, নয় কোন নুতন জীবনের খোঁজে,  আমি কষ্ট পেতে ভালোবাসি, তাই তোমার কাছে ছুটে আসি।

শিল্পীরা অভিমানি হয়, অভিমান নিয়েই মানুষের এক পৃথিবী ভালোবাসা পেয়েও মাঝে মাঝে ভীষণ একা হয়ে যান, গভীর বেদনায় ডুবে যেতে যেতে বলে উঠেন, আমার আর কিছু দেয়ার নেই, আমি ক্লান্ত আমি ঘুমাতে চাই, বা পালাতে চাই…

গেয়ে উঠেন …

‘’সবাইকে একা করে
চলে যাব অন্ধ ঘরে,
এই শহর গাড়ী বাড়ি
কিছুই যাবে না।
আর কত এভাবে
আমাকে কাঁদাবে,
আর বেশী কাঁদালে
উড়াল দেবো আকাশে।‘’

সত্যি সত্যিই আজ উড়াল দিলেন ?

ভালো থাকেন অনন্ত পথের এ যাত্রায়… আমাদের অচেনা এই ভুবনে আপনি থাকুন আজ চির সুখী হয়ে। আমরা আপনার গান শুনে আমাদের হঠাৎ দুঃখের ভুবন আলোকিত করতে শুনতেই থাকবো, শুনতেই থাকবো আপনার রেখে যাওয়া সব সৃষ্টি…

‘’সেই তুমি কেন এতো অচেনা হলে’’!!!

‘’রকস্টার, শিল্পী, গিটারিস্ট এসব হচ্ছে বাহ্যিক বিষয়। একটা কথা আছে, মানুষ হয়েও মানুষ হওয়ার প্রবল ইচছা মানুষের পিছু ছাড়েনা। আমার ক্ষেত্রেও তাই। ভালো মানুষ হতে চাই। সবসময় ভালো মানুষের জায়গায় নিজেকে ভাবতে ভালো লাগে’’ ——- এটা শিল্পী  আইয়ুব বাচ্চু নিজেই বলে গেছেন…

উনি হয়তো তাই শুধু একজন রকস্টারই ছিলেননা, নিজের জীবনের অনেক অনেক ত্যাগ তিতিক্ষা সাধনা তাঁকে একজন দার্শনিকও করে তুলেছিলো। মানুষ তাদের যাপিত জীবনের চাপ কষ্ট, কাছের মানুষকে কাছে না পাওয়া মুহুর্তে খুব আবেগেই তার সুরেই সুর মেলাতো নিজেদের অজান্তেই।

বাচ্চু ভাই, আমার ফেসবুক জগতে ছিলেন। গত ৯ সেপ্টেম্বর ১৮ আমার একটা স্ট্যাটাসে লিখেছিলাম, রুদ্র গোস্বামীর কবিতা থেকে

‘’এ পৃথিবী একবার পায় তারে, পায় নাকো তারে আর’’

বাচ্চু ভাই চলে যাওয়ার মাত্র এক মাস আগে, একদিন ‘’সেই তুমি কেন এতো অচেনা হলে’’ গানের সুরটি বাঁশি বাজানো এক তরুণের একটি ভিডিও উনি শেয়ার দিয়েছিলেন। আমি কমেন্ট করেছিলাম এবং এটি নিয়ে আমার সাথে বেশ আন্তরিক কিছু কথা হয়েছিলো।

সর্বশেষ আমার কথা হয় বাচ্চু ভাই জীবনের শেষ শো যেটি করে গেলেন, রংপুর। বাংলাদেশ সময় বেশ সকাল। আমি অস্ট্রেলিয়া বসে উনার স্ট্যাটাসটি দেখছিলাম, উনি রংপুর যাচ্ছেন… আমি বললাম, হ্যাভ এ সেইফ এন্ড নাইস ট্রিপ ভাইয়া। উনি ধন্যবাদ দিলেন, বললেন, ভালো থেকো বোন আমার!!!

এবং সে রাতের পর একটা রাত… হারিয়ে গেলেন চিরদিনের মত সবাইকে একা করে!!!

আজ তবে শেষ করি,

তোমার মাঝেই স্বপ্নের শুরু
তোমার মাঝেই শেষ, জানি
ভালোলাগার ভালোবাসার তুমি
আমার বাংলাদেশ,

তুমিই বাংলাদেশ…  শিল্পী আইয়ুব বাচ্চু আপনিই বাংলাদেশ হয়ে বেঁচে থাকুন।
ঘুমান শান্তির ঘুম, ওপারে ভালো থাকুন… জীবনের সকল ক্ষুদ্রতার উর্ধে উঠে।
কষ্ট ভালোবেসে আপনারই গান গাইবো… কেউ দেখুক আর না দেখুক সে কান্না। আমরা কেউ কেউ মনে রাখবো,

‘‘মনে রেখো তুমি কতো রাত কতো দিন
শুনিয়েছি গান আমি ক্লান্তিবিহীন
অধরে তোমার ফোটাতে হাসি চলে গেছি আমি সুর থেকে কতো সুরে’’……

আপনার খুব জানার ইচ্ছে ছিলো, গানে গানে জানতে চেয়েছেন… ‘’খুব বেশি জানতে ইচ্ছে করে আমি চলে গেলে কি নিয়ে তুমি থাকবে? বড় বেশি জানতে ইচ্ছে করে ভুলে যাবে নাকি আমায় মনে রাখবে? বৃষ্টি ভেজা কোন দুপুরে, ভেবে কি তুমি কাঁদবে না? জোছনা ধোঁয়া কোন রাতে …বিষণ্ণ কি হবে না? তুমি তাজমহল গড়ো… হৃদয়ে তোমার কখনো হারালে …চোখেরই জল মুছে ফেলো …কোলাহল থেকে একটু আড়ালে’’!

হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসাটুকু দিয়েই আজ আপনার  গানে ডুবছি, ভাসছি, কাঁদছি… আরো একবার!!!

বাংলাদেশ যতদিন থাকবে, আপনার ভক্তরা এভাবেই চোখ ভেজাবে, ভালোবেসে।

আমরা জানি আপনি এই গিটারের নেশায়, পকেটে মাত্র ৬০০ টাকা নিয়ে ঘুমন্ত শহরে এসেছিলেন, কিন্তু যাবার বেলায় সাথে নিয়ে গেলেন কোটি-কোটি মানুষের ভালবাসা।
#Rest_in_Peace_AB

নাদিরা সুলতানা নদী

কলামিস্ট, সাংস্কৃতিক কর্মী, প্রাক্তন ছাত্রনেতা

উপস্থাপক, রেডিও বাংলা মেলবোর্ন

সহযোগী সম্পাদক, প্রশান্তিকা