বাবার কাছে আমার শৈশব কৈশোরের অমূল্য সময়গুলো । নাদিরা সুলতানা নদী

  •  
  •  
  •  
  •  

 211 views

নানু বাড়িতে জন্ম আমার। বাবা তখন কর্মস্থলে। জন্মের পর পর, বাবা চোখে দেখার আগেই খবর নিয়ে যাওয়া আত্মীয়ের কাছে শুনলেন আমি দেখতে নাকি মায়াময় হয়েছি এবং যথারীতি আমার মা খালার গায়ের রং পেয়েছি! প্রচলিত ধারণা বা বিশ্বাসে ফর্সা রং হওয়াটা নবজাতকের জন্যে এই সময়ে এসেও ম্যাটার করে আর আমার জন্মসময়টা তো বলাই বাহুল্য। মা খালা রূপবতী। সে অর্থে, জন্মের ঠিক পর সময়ে আমায় দেখে পরিবার পরিজন ধরে নিয়েছিল আমিও বোধ হয়…  কিন্তু বাবা নাকি একটু মন খারাপ করেছিলেন এই রকমটা জেনে!

না, সবার সেই ভুল ভেঙ্গে অল্প কিছুদিন পর থেকেই আমি প্রমাণ করে দিলাম আমি বাবার মেয়ে। মানে গায়ের রঙ বদলে বাবার মতোই হতে থাকলো। কালো এক কন্যা সন্তান। যদিও পরিবারের কেউ কেউ তারপরও ভালোবেসে ছোট থেকেই বলতো মেয়ে একটু শ্যামা বরন, বাবা নাকি রীতিমত খুশী হয়েছিলেন এই পরিবর্তনে!
বলে নিই আমি আমার বাবাকে আব্বা বলতাম।
আমার ছেলেবেলা কেটেছে হোগলা গ্রামে। এক সময়ের ময়মনসিংহ জেলা এখন নেত্রকোনার পূর্বধলা উপজেলায়। আশির দশকের গ্রাম বা তাকে ঘিরে বাজার এবং জীবন যাত্রা যেমন ছিল সেই সময়ের বাংলাদেশের কোন না কোন গ্রামে থাকা মানুষেরা অনেকটাই অনুধাবণ করতে পারবেন। আমি আমার শৈশব কৈশোরের  বাবাকে ঘিরে কিছু সময় শেয়ার করবো খুব প্রাসঙ্গিক ভাবেই এই সময়ের সাথে একটা তুলনামুলক চিত্র তুলে ধরবো বলেই। আমাদের বাবারা কেমন করে আমাদের গড়ে দেয়ার চেষ্টা করেছেন এই জগত সংসারের জন্যে!
আমাদের গ্রাম জুড়ে বসবাস ছিল হিন্দু, মুসলিম, খ্রিষ্টান এবং গারো এমন সকল সম্প্রদায়ের। বন্ধুরা ছিল এমন সকল পরিবার থেকে উঠে আসা। একটু বুঝে উঠার পর আমাদের রুটিন ছিল, সকালে উঠে একটু পড়ালেখা, স্কুলে যাবার আগে নদীতে যখন পানি থাকতো ভোঁ দৌড়ে যেতাম খেলার সাথীদের নিয়ে সেখানে ঝাপাঝাপিতে মেতে উঠতে। এরপর স্কুল। বিকেলে বাসায় ফিরে আবার সন্ধ্যা নামার আগ পর্যন্ত আরো একবার খেলায় মেতে উঠা।

বাবা, মা ও ছোট ভাইয়ের সাথে লেখক নদী।

শুক্রবার দিনটা হতো একটু অন্যরকম। খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠেই ভালো একটা জামা, পাজামা আর ওড়না মুড়িয়ে কায়দা/সিফারা নিয়ে পড়তে যেতাম মসজিদের ইমাম, তাঁর কাছে। এরপর বাসায় ফিরেই অপেক্ষা কখন হবে রেডিওতে শিশু কিশোরদের জন্যে অনুষ্ঠান  ‘কলকাকলি’। দুপুরে রেডিওতে বিজ্ঞাপন তরঙ্গ, সিনেমার এ্যাড, গাজী মাযহারুল আনোয়ারের কন্ঠে মন্ত্রমুগ্ধ কিছু সময়… সেই ঘোর নিয়েই কোন কোন দিন আম্মা আব্বা এবং অন্য বড়দের সাথে শুনে ফেলতাম প্রচারিত নাটক বা সৈনিক ভাইদের জন্যে অনুষ্ঠান ‘দুর্বার’। এছাড়া অন্যান্য সকাল এবং রাতে ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান হতো, গোলাম মোস্তফা, প্রজ্ঞা লাবণী, কাজী আরিফ এমন শিল্পীদের ভরাট কন্ঠের আবৃত্তি। রাতে সেই সময়ের তারকা ফেরদৌসি মজুমদার, রামেন্দু মজুমদার, আলি যাকের, সারা যাকের, রাইসুল ইসলাম আসাদ, সুবর্ণা মুস্তফার মত গুণী শিল্পীদের নিয়ে সাপ্তাহিক নাটক। পরিবারের সবাই গোল হয়ে বসে শুনতাম।  তখন এই ছিল অন্যতম বিনোদন।

তবে আমাদের সন্ধ্যাগুলো ছিল অন্যরকম। সন্ধ্যার পর পড়া লেখায় বসে থেকেও টের পেতাম আব্বার সাথে আমাদের ফার্মেসীতে বসতো বিবিসি বাংলা শোনার এক আসর। আব্বা ছিলেন (প্যারামেডিকেল) ডাক্তার। সেই স্থানীয় বাজারে থাকা আরেক ডাক্তার কাকু (ভানু বাবু বলতেন সবাই) রণজিৎ কাকা, অজিত কাকা, স্থানীয় হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক খালেক স্যার, সালাম স্যার। কাছেই থাকা আমার বেশ কজন মামা, আবু মামা, লাল মামা এবং এর বাইরেও অনেক অল্প চেনা বেশী চেনা বা কোন কোন দিন অচেনা কারো যোগদান। বাসা থেকে চা-বিস্কুট ছাড়াও বাজারের স্টল থেকে আসতো মিষ্টি, সুমোচা, সিঙ্গারা বা পেঁয়াজু আর সাথে আড্ডা। পড়তে বসেও কান পেতে থাকতাম ওদিকে সেই গমগমে আড্ডা আওয়াজে।

খবর শুনার পালা শেষে রেডিও চলে আসতো আম্মার দখলে। সন্ধ্যা রাতের অনুষ্ঠান শোনা শেষে সেই সময়ের সিনেমা দেখে এসেছে এমন কোন গল্প… আমার আম্মা এবং মামাদের দুই একজন এত সুন্দর করে সেই গল্প বলা শুরু করতেন আমি সকলের অগোচরে যেয়ে পেছনে বসে যেতাম। শাবানা, রোজিনা বা ববিতার কোন কষ্ট চিত্র বর্ণনা করা হচ্ছে আমি শুনছি, শুনছি, হঠাৎ হয়তো হিচকি উঠে কান্না শুরু করে দিতাম নায়িকার কষ্টে।
শুরুতেই আম্মার এই আড্ডায় এক অনাহুতের অনাকাঙ্ক্ষিত ছেদ তাই নিয়ে খানিক ভ্যাবাচ্যাকা। এরপর পড়া ছেড়ে উঠে কেন এলাম তাই নিয়ে একটা আইন ও সালিশীর পাঁয়তারা আমার বিরুদ্ধে!!
এইরকম প্রেক্ষাপটেই আব্বা ফার্মেসী থেকে এসে হাজির হতেন এবং রায় ঘোষণা আমার পক্ষেই যেত এবং পরবর্তীতে এই সব নিয়ে আমার দুই একজন মামা রসিকতা করতেও ছাড়তেননা। অভিনয় করে দেখাতেন। এই আমি পিতার অতি আদরের কন্যাটি নাকি ‘আব্বা’ ডাকতে যেয়ে কখনই সেটি স্বাভাবিক স্বরে বলতামনা। বদলে যেতে গলার স্বর, সুর এবং মুখের জ্যামিতি। যাই হোক সেই সময় মামারা যাই বলে থাকুক সাময়িক কৌতুক খাতিরে তবে এটা জানতাম আমার বাবা আমার সবচেয়ে বড় প্রশ্রয়ের এক নাম। কিশোরী নদীর।

আমার জন্মের প্রায় ৫ বছর পর ছোট ভাইয়ের জন্ম। ছোটবেলায় খাবার নিয়ে ভীষণ জ্বালানো বাচ্চারা যেমন হয় আমি ছিলাম তার এক জলন্ত উদাহরণ। শাক সবজি মাছ ভাত কিছুই প্রিয় না। প্রিয় শুধু সকাল বিকাল একটু দুধের সর, মলাই, কাপ ভর্তি। ছোট ভাইয়ের জন্মের পর আব্বার দুই একজন রসিক বন্ধু, যারা আমার কাকু, মামা, তাঁদের কেউ বোধ হয় শুরুতেই আমাকে ভয় দেখালো এখন আমার কী হবে, আর তো আদর করে দুধের সর খেতে দেবেনা। ভাই এসেছে ওই সব পাবে।

আমার ছোট পৃথিবী হঠাৎ মনে হল এতোটা নিষ্ঠুর। আজ যে এলো তার জন্যে আমার মা বাবা অন্য সবাই আমাকে আর আদর করবেনা। হায়। কোথায় যেন লুকিয়ে কান্না করতে চলে গেছি। দিন শেষে আব্বা ঠিক খুঁজে এনে সবাইকে বুঝিয়ে দিলেন আমাকে এভাবে আর কেউ বলতে পারবেননা, কিছুতেই না। আহ শান্তি, বুঝলাম আব্বা আছে তো আমার পৃথিবী কেউ বদলে দিতে পারবেনা।

আমার আব্বা খুব চাইতেন আধুনিকতার রেশ যেন তাঁর পরিবার কিছুতেই মিস না করেন। গ্রামের বাজারে বসবাস কিন্তু ঢাকা ময়মনসিংহ যেতেন ফার্মেসীর ঔষধ পত্র কিনতে এবং যতবার শহর থেকে ফিরতেন আমাদের জন্যে ব্যাগ থেকে বের হত, লাল টুকুটুকে আপেল, টফি চকলেট, গল্পের বই এবং ইত্যাদি নানান নূতন কিছু না কিছু।

মা, বাবা এবং পরিবারের অন্যান্য প্রিয় মানুষগুলোর সাথে লেখক।

আব্বা একবার এমন কিছু নিয়ে এলেন, যা আমরা এর আগে কখনই দেখিনি। ছোট রঙিন প্যাকেট, হলুদ মায়া মায়া মুরগীর বাচ্চা, ডিম এবং ধনে পাতার ছবি। ভেতর থেকে বের হল অন্য রকম এক সেমাই সদৃশ কিছু এবং ছোট আরো এক প্যাকেট তেল… সেই রাতেই স্টোভ জ্বালানো হল, আমরা অধীর আগ্রহে বসে আছি প্যাকেট দেখে দেখে আব্বার নির্দেশ অনুযায়ী রান্না হচ্ছে। বাটিতে নিয়ে খেলাম, আহ কী সেই স্বাদ, ভুলবার নয়। পরদিন পাড়ায় দুই একজন বলাবলিও করছে আমরা শহর থেকে আনা ঝাল ঝাল সেমাই খেয়েছি। (ও আচ্ছা যারা বুঝেননি তাদের বলি, ওটা ছিল জীবনের প্রথম আমাদের নুডুলস খাওয়া)
মুক্তিযুদ্ধের ঠিক পরের বছরই আমার মা এস এস সি পাশ করেন এবং বিয়ের ঠিক পর পর। আম্মা পড়ালেখাটা চালিয়েছেন, শিক্ষকতার চাকরী নিয়ে অন্য শহরে গেছেন। পড়তে চান এবং শিল্প সংস্কৃতির প্রতি তাঁর আগ্রহের জন্যেই আব্বার উদ্যোগেই আম্মাকে ‘’বেগম’’ পত্রিকার গ্রাহক করে দিলেন।

সপ্তাহে একদিন ডাক যোগে পেতাম ‘বেগম’। আব্বা শহরে গেলে আসতো বেশ কিছু সিনেমা পত্রিকাও আম্মার জন্যে। এই ধারাবাহিকতায় ‘দেশ’ ‘সানন্দা’ এবং আব্বা ‘মাসিক মদিনা’ এমন কিছুও পড়তেন বোধ হয়।
সাংস্কৃতিক একটা আবহ পেয়েছি বলেই, স্কুলের সকল রকম সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করার জন্যে মা বাবার তাগিদ থাকতো ভীষণ রকম। নাচ, গান, খেলাধুলার সকল শাখা এবং বিশেষত কোন শিক্ষকের বিদায়ে মানপত্র পাঠ বা এলাকার কোন সম্মানিত মানুষকে গলায় মালা দেয়ার কাজটা কেন যেন আমাকেই করতে হত।
ঠিক সেই সময়, একদিন বড় ভাই আপাদের স্কুলের বার্ষিক অনুষ্ঠান গাইলাম আমি,
“এ দেশ বাংলা, স্বাধীন বাংলা
রুপের পসরা এই বাংলা।
খাল বিল নদী নালায় এ দেশ ভরা
বন মাঝে কুহু তান আকুল করা”!!
বোধ হয় ১৯৮৫/৮৬ সালের কথা, এটা আমার বাবার লেখা, আমার মা আর বাবা দুজন মিলে সুর দিয়েছিলেন!

আমার বাবা, পরিপাটী থাকতেন, একটা সময় পর্যন্ত ফুটবল খেলেছেন। মাকে নিয়ে সিনেমা দেখতেন হলে যেয়ে। ছোট বেলায় দেখেছি শীতের সময় ব্যাডমিন্টন খেলা হতে আমাদের বাসার পিছনের খোলা জায়গায়, মা খেলতেন, বাবা কখনও কখনও। ক্যারাম খেলা, লুডু দাবাও হতো প্রায়ই, আমার বাবা, উনার কিছু বন্ধু, আমার বেশ ক’জন মামা আর কাজিন ভাইবোনরা সেই খেলায় অংশ নিতো, আমি ও আমার ছোট ভাই বোনেরা দর্শক একটা সময় পর্যন্ত।
বাসায় রেডিও শোনা হতো খুব বলেছি, সাদা কালো টিভি কেনার আগ পর্যন্ত। খুব প্রাচুর্য ছিলোনা। ছিল চিত্তকে শান্তি দেয় এমন আয়োজন। মা-বাবাকে পেয়েছি খোলা মনের সংগীতপ্রিয় লেখালিখি ভালবাসে, বন্ধু আড্ডা পছন্দ করেন এমন আন্তরিক মানুষ হিসেবেই। একটা পারিবারিক ছবি শেয়ার করছি, শুধু সেই সময়ের আবহ বুঝানোর জন্যে। এবং এই পারিবারিক ছবিতে আছে মামা, কাজিন, মা বাবা এবং আমরা ভাই বোন সবাই। এবং এটি শহর থেকে অনুরোধ করে আনা হয়েছিল ঢাকায় থাকা এক ফটোগ্রাফার আত্মীয়কে।
ঈদে বা অন্য সব উৎসবে আব্বা সব সময়ই শহর থেকে কোন না জামা কিনে নিয়ে যেতেন এবং সেই সময় সেই গ্রামে সেই জামা পরে বের হলে বুঝতে পারতাম আমি কোন না কোন ভাবে একটু আলাদা কেউ। বাবা মায়ের মনোযোগ পাওয়া আদরীনি কন্যা।
সেই কিশোরী কন্যা, হোগলা গ্রাম ছেড়ে, শহরের স্কুল, হোস্টেল এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে পা রাখার সৌভাগ্য অর্জন করেছে এমন একটি মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম নিয়েই শুধু তাঁদের উৎসাহের জন্যেই।

যদিও স্কুল কলেজ পাশ করার পর শুরুতে ভর্তি হয়েছিলাম ময়মনসিংহ আনন্দমোহন কলেজে অর্থনীতি বিষয়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বার সুযোগ এলো, কেন যেন শুরুতে বাবা চাইলেননা ঢাকা দিতে। সেই একবারই বাবার একটু অনিচ্ছা, না কোনদিন জিজ্ঞেস করা হয়নি সেটা কী শুধু বাবার কাছে রেখে দেবার জন্যেই আরো কিছু দিন?!  না অন্য কিছু…
এটা ঠিক বাংলাদেশে নানান কারণে, হয়তো মেয়েরা বিয়ে করে একদমই অন্য পরিবারের ‘কেউ’ হয়ে যায় বলেই একটা সময় পর্যন্ত পরিবারে কেউ কেউ মধ্যমণি হয়েই বেড়ে উঠে এবং বিশেষ করে ‘বাবার আদরের মেয়ে’ এই রকম একটা বিষয় অনেক মেয়েদের জীবনেই কাঙ্ক্ষিত একটা অধ্যায় হয়েই থাকে। আমি এমন এক মেয়ে… একটা সময় পর্যন্ত মা বাবা পরিবারের বিশেষ ভালোবাসা পেয়েছি এবং জীবনের এ বেলায় এসে ভীষণ করে বুঝতে পারি, কী ভীষণ ‘ব্লেসড আমি’।

আজকের সামাজিক, পারিপার্শ্বিক পরিবর্তনগুলো চোখে আঙ্গুল দিয়ে যখন দেখাচ্ছে মেয়েদের বেড়ে উঠার সাথে কতকিছুই না সম্পর্কিত, বাধ্যতামূলক, পরিবার, সমাজ চাপিয়ে দিচ্ছে…  আর সেই সময়ে আমার মা-বাবা আমাকে, নিজের মত করে ভাবনার একটা জগত গড়তে দিয়েছেন, শিল্প সংস্কৃতির প্রথম পাঠটা দিয়েছেন। যা আমাকে জীবনের এ বেলায় এসেও নানান ভাবে শিখিয়ে দেয় বৈরী সকল আবহাওয়া মোকাবেলার শক্তি হিসেবেই।
আমি কিছু সময় প্রকৃতির মাঝে হারাতে হারাতে বুঝতে শিখেছি, জীবনের আঁকে বাঁকে ছড়িয়ে আছে অনেক অনেক আলো। আমাকে সেই আলোর পথেই হাঁটতে হবে… থোকা থোকা জোনাক পোকা, ছোট্ট ঘাস ফুলকে আঁকড়ে ধরেই বলতে চেয়েছি জীবন সুন্দর। এই এই বোধের জন্যে আমার কৈশোরের কাছে ঋণী এবং ঋণী আমার মা বাবার কাছে।
আমার বাবা মানুষ হিসেবে তাঁর আলাদা করে হয়তো অনেক ব্যার্থতা আছে, সীীমাবদ্ধতা আছে… কিন্তু একজন বাবা হিসেবে চেষ্টা করেছেন তাঁর প্রতিটি বাচ্চাকে সেরাটুকু দিতে…
আমার বাবা (আমরা আব্বা বলি) আমাদের ভাই বোনদের ওভাবে শাসন করা বা বকা দিতেননা। মজার ব্যাপার হচ্ছে সবাইকে তাঁর জীবনে ২/৩দিন বারই কেবল কঠিন শাসন করেছেন যা সারা জীবন মনে রাখার মত। আমাকেও তাই…
আমাকে আব্বার প্রথম দেয়া বকা…  ‘হুতুম প্যাঁচার দল” ভাবা যায়!!

বিশ্ববিদ্যালয়ে পাড়ি দেয়ার পরই আমার পরিবারের সাথে একটু দূরত্ব। ছুটিতে অল্প সময়ের জন্যেই বাড়ি ফেরা, খুব আদর আদর কিছু সময় নিয়ে আবার ফেরার তাড়া। পড়ালেখা শেষ হতে না হতেই বিয়ে চাকরী মা হওয়া এবং আমার কাজ পাগল মা বাবা সব সময় যা চাইতেন আমরা যেন কাজের মাঝেই থাকি। যদিও বড় একটা আফসোস মা বাবা বোধ আমাকে অন্যরকম একটা পেশায় বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন বা খুশী হতেন সেটি পারিনি।
পরবাসে চলে এলাম। দূরত্ব শুধু হাজার মাইল না যেন অন্য কোন খানেও ক্রমশই বাড়ছিল… একটু একটু করে। বদলে যাওয়া বাংলাদেশের অনেক অনেক পরিবারের মতোই আমার পরিবারে থাকা অন্যদের উপরও ছিল তার প্রভাব।
দেশে গেছি গত প্রায় ১১ বছরে মাত্র ৩ বার।
২০১৬ এবং ২০১৯ এ মনে হল, আমার সেই বাবা, এই বয়েসে এসে কেমন যেনো নির্জীব হয়ে গেছেন, শারীরিক ভাবে অল্প কিছু সমস্যা থাকলেও, মনের দিক থেকে কেন যেন আমাদের দেখা সেই শৈশব কৈশোরের বাবাকে পাচ্ছিনা।
অস্ট্রেলিয়া থেকে ফোনে কথা বললেই নিজের বুকের মাঝে শ্বাস কমতে থাকে যেন আমার। কান্না পেত প্রায়ই। আমি কী করতে পারি, কী করা উচিৎ এই নিয়ে ভাবতাম চাইতাম আব্বাকে উৎজীবিত করতে, হতেনও সাময়িক। সকলকে বলতেন তিনি একজন সুখী মানুষ। তৃপ্ত তাঁর ছেলে মেয়েকে নিয়ে, কোন অভিযোগ নেই জীবন নিয়ে!!
নিজেকে অপরাধী লাগতো আমার, তারপরও, যে মা-বাবার কাছ থেকে ‘জীবনকে ভালোবাসতে শিখলাম’ জগতকে অন্তর চক্ষু দিয়ে ছুঁতে শিখলাম সেই বাবাকে এমন দেখতে যে কি অসহায় লাগতো মাঝে মাঝে, বলে বুঝাতে পারবোনা। কেন উনার পাশে থেকেই গেলামনা বাকিটা জীবন।

মা-বাবারা সুস্থ থাকবে, সুন্দর করে ভাববে (অবশ্যই কোন ভাবেই মৃত্যু চিন্তা নয় শুধু), ভালো বই পড়বে, সময় করে বন্ধুদের সাথে কথা বলবে, যে বন্ধুরা জীবনের কথা বলে, ভালো গান শুনবে, পৃথিবীর সেরা গল্প কবিতা সুন্দর জায়গা’র কথা জানবে শুনবে, ঘাস, ফুল, প্রজাপতির সাথে কাটাবে কিছু না কিছু সময়, সবুজে হাঁটবে এবং ভালোবাসবে, এমন সব সময় হয়না কেন বাংলাদেশের সব মা-বাবার জন্যে! এমন ভাবনাগুলোও গত দুই চার বছর ধরে ক্রমাগত ভুগাচ্ছিলো আমায়।
চোখের সামনে মা-বাবাদের ভিতর এবং বাহির খুব বেশীই বদলে যাচ্ছে কি, বাংলাদেশে!!
আমি এমন এক বাবাকে দেখেছি যিনি তারুণ্যে ‘’গীতাঞ্জলী’’ পড়তেন নিজে গুন গুন গাইতেন… সেই বাবা নিজের আত্মীয় মেয়েকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ এসেছে শুনে মানা তো করলেনই, চারুকলায় পড়বেন শুনে বলেই দিলেন এই মেয়ে ওখানকার বারান্দায় বসে গাঁজা টানা ছাড়া কিছুই করবেনা!

ক্লাস সেভেনে পড়ার সময়ই সিদ্ধান্ত হলো, ময়মনসিংহ গার্লস ক্যাডেটে ভর্তি পরীক্ষার জন্যে প্রস্তুতি নিতে হবে আমাকে। মা বাবা এবং স্কুল শিক্ষকদের বদ্ধমূল ধারণা ছিল আমাকে দিয়ে হবে…
অতিরিক্ত চাপেই হোক বা মনের গহীনে অন্য ইচ্ছার জন্যেই হোক, সেইরকম অসুস্থ হয়ে গেলাম মূল পরীক্ষার আগে। টাইফয়েড বাঁধিয়ে সব দিলাম ছ্যাড়াবেরা করে। ভর্তি পরীক্ষা খারাপ হলোনা। কিন্তু হাইট, ব্লাড টেস্ট কী কী যেন জটিলতায় হলোনা চান্স।
গ্রাম থেকে শহরে পড়বো বলে বের যখন হলামই, আম্মা আব্বা আর কিছুতেই গ্রামে ফেরত নিয়ে গেলেননা আমায়। ময়মনসিংহ শহরের আরেক নাম করা স্কুল, বিদ্যাময়ী, সেখানে চান্স হলেও হোস্টেলে সিট নেই… ফলাফল মুসলিম গার্লস স্কুল হোস্টেলে একদম সরাসরি ঢোকা।
নাটক সিনেমার মতোই আম্মা আব্বা ময়মনসিংহ শহরের মার্কেট ঘুরে দুইটা ব্যাগ সুটকেস গুছিয়ে দিয়ে তাঁরা ফিরে গেলেন প্রথম দিন হোস্টেলে আমাকে রেখে… তখন নিয়ম ছিল সপ্তাহে একদিন এসে ঘন্টা খানিকের জন্যে দেখা করতে পারবেন শুধু পরিবারের সদস্য।
সে এক কঠিন জীবন… বাবা-মা অশ্রুসজল চোখে বিদায় জানিয়ে চলে গেলেন।
সম্ভবত সে রাতেই অল্প কজন মেয়ে যে যার বিছানায় ঘুমাচ্ছি। আধো ঘুম জাগরণে দেখি বাতাসের ঝাঁপটায় কাঠের জানালার পাল্লা খুলে সপাটে ওয়ালে আঘাত হানছে, বন্ধ হয় খুলে… বিদ্যুৎ চলে গেছে, ঠিক জানালার ওপাশেই কাঁঠাল গাছ বোধ হয় পাতাগুলো বাতাসে সব উল্টো হয়ে বিদ্যুৎ চমকের তোড়ে অদ্ভুত রং ধারণ করে দৃশ্যমান হচ্ছে…
পরিবার ছেড়ে আসার কষ্ট, মাঝ রাত, অচেনা এমন একটা আবহ, সবমিলে মনে হচ্ছে আমি অপার্থিব এক পৃথিবীতে চলে গেছি। হোস্টেলে তখন অল্প কিছু মেয়ে। সবচেয়ে ছোট যে মেয়েটা ওর নাম ‘টিউলিপ’ ও একটু দুরেই ঘুমুচ্ছিলো, হঠাৎ জেগে উঠে পাখির মত ছুটে এসে আমার কাছে এসে জড়িয়ে ধরে বসে কাঁদছে… সে এক স্মরণীয় রাত!!
পরের ছুটিতে বাসায় গেছি, গল্পে গল্পে উঠে এল, সেই ঝড়ের রাতে বাসায় ফিরে আব্বা, আমার জন্যে অনেক কাঁদছিলেন। আমার এই ছবিটা দেয়ালে ছিল তখন, ছবিটা দেখতেন প্রায়ই, কোন একদিন নাকি বলছিলেনও আমার মেয়ের চোখ… আমার মা, অনেক মায়া… বলছিলেন নাকি, এই ছবিটা দেখে এমন, আমার আব্বা!
আজ আমি আমার বাবার ছবি দেখি আর বলছি, কী মায়া বাবার চোখে… বাবা দেখতে পারছেননা আমার চোখ আজ, পারছেন কী!

গত ২৫ সেপ্টেম্বর শুক্রবার আমার বাবা চলে গেছেন না ফেরার দেশে, আমার আব্বা এই পৃথিবীর আর কোথাও কোনদিন তাঁকে খুঁজে পাবোনা, হারিয়ে ফেলেছি।
আমার ফেসবুকে থাকা সকলেই জানেন, ব্যাক্তিগত সেই শোক দুঃসময়ের মাঝে আজও আছি। তারপরও এই পরবাসে থাকা সকল বন্ধু আত্মীয় পরিজন, চেনা অচেনা এমনকী সেই অন্য কোন দেশে থাকা বন্ধুদের কেউ কেউ এমন ভাবে সকল ভালোবাসা মায়া মমতার পরশ দিয়ে পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন এই সময়গুলোর টুকরো গল্পগুলো আমাকে বলতেই হবে… লিখতে কষ্ট হচ্ছে কিন্তু বাবাও চাইতেন আমি লিখি তাঁর সেই স্মৃতির প্রতি আত্মার সকল শ্রদ্ধ্যার্ঘ জানাতেই বলবো বাবা চলে যাবার পর আমার জীবন দর্শন কী ভীষণভাবে বদলে গেছে, আগামী লেখায়।

প্রশান্তিকা পাঠকদের অশেষ কৃতজ্ঞতা যারা শোক বার্তা পাঠিয়েছেন, শুভ কামনার বর্ষণে আমায় করেছেন সিক্ত।

নাদিরা সুলতানা নদী
লেখক, সংস্কৃতি কর্মী
সহযোগী সম্পাদক, প্রশান্তিকা।
মেলবোর্ন, অস্ট্রেলিয়া

0 0 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments