বিএনপি কে জনগণ প্রত্যাখ্যান করেনি-তারেক ইসলাম 

  •  
  •  
  •  
  •  

আহমেদ ছফা একটা কথা বলতেন , আওয়ামী লীগ যখন জিতে একাই জিতে আর যখন হারে তখন সবাই কে নিয়েই হারে। গত নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আওয়ামীলীগ সবাই কে নিয়ে শুধু ডুবেই যায় নি ;একটি বিপজ্জনক পথে  বাংলাদেশকে নিয়ে চলা শুরু করেছে ! আওয়ামীলীগের এই তথাকথিত বিজয় ছিল জনগণের বিরুদ্ধে, দেশের মানুষের বিরুদ্ধে,বিএনপি বা ঐক্য ফ্রন্টের বিরুদ্ধে নয় । একটা দেশ তখনই বিশ্বের মধ্যে মাথা উচুঁ করে দাঁড়ায় যখন সেই দেশে মানবাধিকার , সুশাসন ও গনতন্ত্রের শাসন ব্যবস্থা থাকে। কিন্তু শেখ হাসিনার ক্ষমতা লোভ ও লাভের কাছে দেশ ও জনগন আজ পরাজিত এবং বিশ্ববাসীর কাছে কলঙ্কিত। গতকয়েক দিনের বিশ্ব মিডিয়াতে যেভাবে বাংলাদেশকে ছোট করা হচ্ছে তাতে যে কোন সচেতন নাগরিক লজ্জিত বোধ করবে সে বিষয়ে আমার সন্দেহ নেই।

অবশেষে বিশ্বের গনতান্ত্রিক দেশের তালিকা থেকেও বাদ গেল বাংলাদেশ। ৩০ লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে আমরা কি এই লাঞ্চিত বাংলাদেশ চেয়েছিলাম ? অথচ আমাদের মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনাই ছিল গনতন্ত্র । ভাবতে অবাক লাগে এই দলেই ছিল শহীদ সহরাওয়ার্দী, শেরে বাংলা  ফজলুল হক, মজলুম জননেতা মাওলানা ভাসানী , তাজউদ্দিন ও শেখ মুজিবুর রহমান , মাস্টার শামছুল হকের মতো গুনী ও ত্যাগী নেতারা । অনেকে বলে বিএনপি আন্দোলন করতে পারে না কিন্তু আমার প্রশ্ন বিএনপি কেন আন্দোলন করবে ? গনতান্ত্রিক ভাবধারায় দেশ চললে আন্দোলনের প্রয়োজন কেন ? পাঁচ বছর পর পর জনগনের ম্যান্ডেট নিলেতো আন্দোলনের দরকার নাই । আওয়ামীলীগের মতো দল কেনই বা জনগণের থেকে দূরে সরে মিডিয়া স্বর্বস্ত আর পেশী শক্তির একটা দলে পরিনত হতে হবে ?
গতকয়েক দিনের সংবাদ পত্র দেখে আমার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের লেখা “কারাগারের রোজনামচা” বইয়ের কয়েকটা লাইন মনে পড়ল। তিনি লিখেছেন, “খবরের কাগজে পড়ার কিছু থাকে না সব একঘেয়ে সংবাদ । প্রেসিডেন্ট আইয়ুব কি করলেন ? কোথায় গেলেন ? কি বললেন ? কার সাথে দেখা করলেন ?দেশের উন্নতি , অগ্রগতি ,গুদাম ভরা শস্য , অভাব নাই ,বিরাট বিরাট প্রযেক্ট গ্রহন করা হয়েছে , কাজ শুরু হয়েছে ইত্যাদি ইত্যাদি ।কেহ কেহ মুরব্বিয়ানা চালে দেশ প্রেমিকের সার্টিফিকেটও দিয়ে থাকেন ।দুনিয়াতে পাকিস্তানের সম্মান এত বেড়ে গেছে যে নাকি আসমান ধইরা ফেলছে । নানান বেহুদা প্রশংসা , তবুও তাই পড়তেই হবে।”

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে রাজনীতি করা এই আওয়ামীলীগের হাতেই মুক্তিযোদ্ধারা আজ সবচেয়ে বেশী লাঞ্চিত। তাদের নিজস্ব স্বার্থের ধান্ধায় মুক্তিযুদ্ধের অতি ব্যবহারে অতিষ্ঠ ও বিরক্ত অধিকাংশ মানুষ। যাকে তাকে এমনকি বীরত্বের জন্য খেতাব প্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধাদেরকেও তারা অসম্মান করে রাজাকার বানানোর যে রাজনীতি আওয়ামী লীগ শুরু করেছে  তার হাত ধরে দ্রুত মারা গেছে দলটির মুক্তিযুদ্ধ কেন্দ্রিক রাজনীতির মোরালিটি ।আজ বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকিও ক্ষোভে বলেন “আমি যদি হই রাজাকার, বঙ্গবন্ধু হচ্ছে রাজাকারের কমান্ডার”।

গত নির্বাচনে আওয়ামীলীগ এটা কিছুটা বুঝতে পেরে, এবার আর মুক্তিযুদ্ধের গল্প না বলে, উন্নয়নের গল্পকেই তার নির্বাচনের মূল শক্তি হিসেবে ব্যবহার করেছে ।কিন্তু আওয়ামীলীগের উন্নয়নের গল্পেও আছে শুভংকরের ফাঁকি। উদাহরণস্বরূপ বলতে পারি, গত ১০ বছর কয়েকটা ফ্লাইওভার আর অনুৎপাদনশীল খাতে বড় বড় ব্যয় দেখিয়ে লুটপাটের যে আয়োজন করেছে, আজ তা তথাকথিত “উন্নয়ন” নাম হয়েছে । অথচ দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির অবস্থা অনেক ভয়াবহ ; দেশের অধিকাংশ ব্যাংক গুলোই আছে মারাত্মক দেওলিয়ার ঝুঁকিতে ! দুই বিলিয়ন ডলার রিজার্ভ ব্যাংক বেসরকারি ব্যাংক গুলোকে বেলআউট করেছে গতবছরই । বর্তমানে সরকারি খাতের ৭০ ভাগ অর্থই বেসরকারি ব্যাংকে রাখছে শুধু অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখতে । আজ থেকে দশবছর আগেও বাংলাদেশের জাতীয় দেনা ছিল ১৬ বিলিয়ন ডলার বর্তমানে আমাদের জাতীয় দেনা ৮০ বিলিয়ন ডলারে এসে ঠেকেছে । অর্থনীতির এত বাজে অবস্থা। এছাড়া দেশের রিজার্ভ এখন নেগেটিভ গিয়ারে । শাসকদের শীর্ষ পর্যায়ের ইঙ্গিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ পর্যন্ত লুটপাট হলো কিন্তু কোন বিচার হলো না । শেয়ার বাজারের লুটপাটের কথা নাইবা বললাম । দেশের রিয়েল এস্টেট খাতও মারাত্মক হুমকির মুখে ।

শুধু তাই তা নয় আওয়ামীলীগ তার দীর্ঘদিনের ধর্ম নিরপেক্ষতার পুঁজিও হারিয়েছে দেশের ৭০ টি ইসলামী দলের মধ্যে ৬৩টি কে নিজের জোটে অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে।
বিরোধী মতের মানুষকে দমন নিপিড়নে আওয়ামী লীগ অতীতের সকল রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে , ক্ষেত্র বিশেষে পাকিস্তানিদেরও হার মানিয়েছে তারা ।
গত দশ বছরে বিএনপির ২৬০০ জনের অধিক নেতা কর্মী নিহত হয়েছে আর প্রায় লক্ষাধিক কর্মী পঙ্গু এবং ৩০৫ জন গুম হয়েছে যাদের এখনো কোন খোঁজই পাওয়া যায় নি ।
গত নির্বাচনে বিএনপির হতাশা বা লজ্জিত হওয়ার কিছু নেই , কারন বিএনপি কে জনগন প্রত্যাখ্যান করেনি , শেখ হাসিনার অপরাজনীতি ও মিথ্যা প্রহসনের কাছে প্রতারিত হয়েছে মাত্র । আর এই প্রতারনা আওয়ামীলীগ দৃশ্যত ঐক্য ফ্রন্টের সাথে করেছে বলে মনে হলেও মূলত প্রতারনা করেছে জনগনেরই সাথে। এই থেকে বরং বিএনপি আরো লাভবান হয়েছে, তারা তাদের অবস্থানটা জনগনের কাছে পরিস্কার করতে পেরেছে । এখন সময়ের অপেক্ষা সময়ই এর জবাব দিবে ।

আর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব কেন বাংলার নেলসন মেন্ডেলা হতো পারল না তার উত্তর আপনি ৭৩ এর নির্বাচনের ইতিহাসে পাবেন অথবা ৭৪ এর দূর্ভীক্ষের মাঝে ! কাকতালীয়ভাবে ৭৩ এর নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু বিরোধী দলকে ৭টি আসনই দিয়েছিলেন , যে খন্দকার মোস্তাককে  জেতাতে বঙ্গবন্ধু কুমিল্লা থেকে হেলিকপ্টারে ব্যালটবাক্স ঢাকা এনে গননা করে জিতিয়ে দিয়ে ছিলেন তার ষড়যন্ত্রের কাছেই প্রান হারিয়েছিলেন তিনি। অথচ স্বাধীনতা পূর্ব কালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ত্যাগ বাংলাবাসীর কাছে দেব দূতের মতোই ছিল । স্বাধীনতা পরবর্তীকালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের অপরিপক্ক ও দূর্বল শাসন তাকে বিতর্কিত করেছে । বঙ্গবন্ধুর ভুল গুলোও ছিল ভয়াবহ আর মূল্যও দিয়েছেন তেমনিই । মুজিব কন্যা সেই ভূলটিই করছে আবার ।

আওয়ামী লীগ দেশ ও নিজের কর্মীদের মাঝে আলাদা করে বিচার করতে পারে না , তারা মনে করে তাদের দলের মানুষেরা ভাল আছে তো দেশ ভাল আছে ! গেল নির্বাচনে অনৈতিকার যে গাছ লাগানো হলো , যে ভাবে প্রশাসন ও পুলিশ কে দিয়ে বেআইনি কাজ করা হলো তার প্রভাব দেশের সামগ্রিক শাসন ব্যবস্থায় পড়তে বাধ্য । এই নির্বাচনে সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দেশ ও দেশের মানুষ । শাসকরা ক্ষমতার  দম্ভে ভুলে গেছে সেই পুরনো গুরুবাক্য “নগরে যখন আগুন লাগে তখন দেবালয়ও বাঁচেনা ।

তারেক ইসলাম
সিডনি, অস্ট্রেলিয়া।