বিড়ালের শহরে । হারুকি মুরাকামি । অনুবাদ: মিতা চৌধুরী

  •  
  •  
  •  
  •  

 284 views

[ গল্পটি প্রিয় লেখক হারুকি মুরাকামির ‘1Q84’র ‘বিড়ালের শহর’ পরিচ্ছেদের ছায়া অবলম্বনে। কিছুদিন আগেই এই বইটা শেষ করলাম, দীর্ঘ উপন্যাসটি পড়তে আমার বেশ ভালো লেগেছিলো। বইটি পড়া অবস্থায়ই যখন ‘বিড়ালের শহর’ অধ্যায়টি পড়ছিলাম তখনি এর অনুবাদ লেখার জন্য মনের ভেতর কিছু একটা তাড়া দিচ্ছিলো। পরে ঠিক করলাম অনুবাদ নয় এর ছায়া অবলম্বনে লিখবো। ভুলত্রুটি মার্জনীয়। ভালো লাগলে আমার এই ক্ষুদ্র চেষ্টা সার্থক।- অনুবাদক।]

ট্রেনটা যখন টোকিও স্টেশন ছাড়ে তখন সকাল ১১:৩০। মধ্য গ্রীষ্মের সকাল, ব্যস্ত টোকিও, কারো দিকে কারো ফিরে তাকাবার এতটুকু ফুসরত নেই। যে কামরায় ট্যাংগো তা এই শেষ সকালে প্রায় খালিই বলা যায়। ট্যাংগো তার পকেট থেকে একটু আগে কেনা বইটা বের করে। শিরোনাম “বিড়ালের শহরে” এক জার্মান লেখকের লেখা গত শতাব্দীতে ঘটে যাওয়া দুই বিশ্ব যুদ্ধের মাঝামাঝি সময়ে। এই লেখকের বই এর আগে কখনো পড়েনি না লেখকের নামও শোনেনি ট্যাংগো। ট্যাংগো বেশ কিছু সময় ধরে তাকিয়ে থাকে বইটার শিরোনামের দিকে। ‘বিড়ালের শহরে’ নামটা মনে মনে বারবারই পুনরাবৃত্তি করে ট্যাংগো। নামটার মধ্যেই কেমন যেনো একটা শুন্যতা আর ভারী নিঃশ্বাস টের পাওয়া যায়। একটা নিকষ ভারী স্থিরতা, যেন গ্রীষ্মের তপ্ত রোদে হারিয়ে যাওয়া কোনো পথে স্থির শুন্য দৃষ্টি নিয়ে কোনো ক্লান্ত পথিক তার চারপাশ পর্যবেক্ষণ করে দূরে মরীচিকা দেখে ভ্রম হয়, ঠিক তেমন এক শুন্যতা !

বইটার প্রচ্ছদের দিকে আরো কিছু সময় তাকিয়ে থাকতে থাকতে ট্যাংগো’র হঠাৎই মনে পড়ে যায় আওমামে’কে ! শৈশবের সেই সময়ে, যেদিন ক্লাস শেষে সবাই যখন বের হয়ে গিয়েছিলো হঠাৎই আওমামে ট্যাংগো’র হাত দুটি চেপে ধরেছিলো প্রচন্ড শক্ত করে, আওমামের চোখের দৃষ্টি ছিলো কাঁচের মতো স্বচ্ছ আর স্থির। সেই স্বচ্ছ স্থির চোখ দিয়ে আওমামে ঠিক কি সেদিন দেখছিলো বা খুঁজছিলো ট্যাংগো আজও বুঝে উঠতে পারেনি। একটি শব্দও বলেনি আওমামে বা ট্যাংগো কেউ। কিন্তু সেদিনের পর আওমামে ট্যাংগোকে খুব সতর্কভাবে এড়িয়ে গিয়েছে। যখন গ্রেড সিক্সে উঠলো, ট্যাংগো আর আওমামে আলাদা ক্লাসে পড়লো। এরপর হঠাৎই ট্যাংগো আবিষ্কার করলো আওমামে হারিয়ে গিয়েছে। কোথায় হারিয়েছে কেউ জানে না, আর সেই এগারো বছর বয়সের একটা ছেলের জন্য হারিয়ে যাওয়া এক বন্ধুকে খুঁজে পাওয়া মোটেও সহজ না। ট্যাংগো প্রতি রবিবারে যখন প্রচন্ড অনিচ্ছা সত্ত্বেও তার বাবার সঙ্গে টিভির সাবস্ক্রিবশন ফী সংগ্রহে বের হতো ট্যাংগো শুধুই প্রার্থনা করতো পথে হয়তো তার হঠাৎ আওমামের সঙ্গে দেখা হয়ে যাবে। আওমামের মা বাবা ছিল উইটনেস সোসাইটির বিশ্বাসী আর তাই প্রতি রোববার আওমামে’কে অনিচ্ছা সত্ত্বেও তার মা’র সঙ্গে বের হতে হতো, এলাকায় বাড়ি বাড়ি যেয়ে দরজায় কড়া নেড়ে মানুষকে অন্তিম শান্তি আর খ্রীষ্টের রাজত্বের আমন্ত্রণ জানাতে।

ট্যাংগো ধীরে ধীরে বইটার মলাট ওল্টায়:
শুধুমাত্র একটা ব্যাগ নিয়ে যুবক লোকটি একা একা নিরুদ্দেশভাবে ভ্রমণ করে বেড়ায় নিদৃষ্ট কোনো গন্তব্য ছাড়াই। সে একা একজন মানুষ, কোনো পরিবার নেই, বন্ধু নেই, প্রেমিকা নাই , নেই কোনো গাটছড়া বা পিছুটান। তার ছুটির সময়গুলো তাই সে এভাবেই কাটায়, ট্রেনে উঠে পরে তারপর যেতে যেতে হঠাৎই যে স্টেশন তার কাছে কৌতহলপূর্ণ বা এডভেঞ্চার মনে হয় সেখানেই নেমে পরে। সারাদিন ঘুরে সন্ধ্যায় কোনো মোটেলে একটি রুম নিবে, যতদিন ইচ্ছে ততদিন থেকে সেই এলাকার সবকিছু ঘুরে দেখার চেষ্টা করে। যখন তার মনে হয় সে হাঁপিয়ে উঠছে বা যথেষ্ট হয়েছে তখন আবার আরেক ট্রেনে উঠে ফিরে যায়। প্রতিটি ছুটির সময় সে এভাবেই কাটায়।

এরকমই এক ভ্রমণের মাঝে সে ট্রেনের জানালা থেকে একটি অসাধারণ নদী দেখতে পায়। সবুজ শ্যামল সমারোহের পাহাড়ের সারি, তার নিচেই ছিমছাম শান্ত একটি ছোট টাউন, যার পাশেই একটি ছোট অসম্ভব সুন্দর নদী, নদীর উপরে সাবেকী সময়ের পাথরের একটি সাঁকো। এই ছবির মতো আঁকা দৃশ্য যুবকের মনে আটকে যায়। সে এক অসম্ভব আকর্ষণ বোধ করে এই ছোট্ট টাউনটির জন্য। সে মনে মনে ভাবে এই নদীর মিষ্টি পানিতে নিশ্চই অনেক সুস্বাদু মাছ আছে, যা এই শহরে পাওয়া যাবে। ট্রেন যখন স্টেশনে থামে যুবকটি তার একমাত্র সঙ্গী তার ব্যাগটি নিয়ে নেমে পড়ে। সে ছাড়া আর কেউ এই স্টেশনে নামে না। যুবকটি স্টেশনে পা রাখা মাত্রই ট্রেনটি আবার ছুঁটে চলে কোনো রকমের কালক্ষেপন না করে।  কোনো যাত্রীও এই স্টেশন থেকে ট্রেনে উঠলো না।

যুবক স্টেশনে নেমে চারপাশে চোখ বুলায়, স্টেশনের কোনো কর্মী, স্টেশন মাস্টার বা লোকজন বা অন্য কোনো যাত্রী কিছুই নেই এই স্টেশনে! একেবারেই জনশুন্য। চারদিক যেন স্থির , ঘড়ির কাটা যেন এখানে থেমে গিয়েছে। যুবক সেই নদীর ওপরে তৈরী সাবেকী আমলের পাথরের সাঁকো দিয়ে হাটতে থাকে ছবির মতো ছিমছাম সেই টাউনের দিকে। কিন্তু ছোট্ট এই শহরটিও অসম্ভব রকমের স্থির , যেন কেউ দম আটকে চুপ করে বসে আছে। চারপশে কোনো মানুষের উপস্থিতি নেই। চারিদিকে যতদূর দৃষ্টি যায় কারো উপস্থিতি নজরে পরে না যুবকের। রাস্তার পাশের সব দোকানের ঝাঁপি নামানো, এমনকি দোকানের সাইন বোর্ডে কোনো কিছু লেখাও নেই। যুবক হেটে এগুতে থাকে, হয়তো সামনে মানুষের দেখা পাওয়া যাবে, কিন্তু না , কোনো মানুষের কোনো উপস্থিতিই সে পায় না, বা কোনো ধরণের কোনো শব্দ বর্ণ তার নজরে আসে না ! যুবক ভাবে টাউন হলে যাবে , যেখানে মানুষজনের উপস্থিতি নিশ্চই আছে।  টাউন হলের কোনো টেবিলে কেউ নেই, বেঞ্চগুলো খালি, টাউন হলের অভ্যর্থনা টেবিলে রাখা ঘন্টাটি যুবক বাজায় এই আশায় যে কেউ হয়তো ভেতরে আছে, ঘন্টার শব্দে বাইরে আসবে ! কিন্তু কারো আগমন ঘটে না, কেউ এসে জানতে চায় না এখানে কি চায় এই যুবক ? কেউ জানতে চায় না তার আগমনের কারণ বা স্থান বা কেন ধরণের কামরা সে চায় রাত্রি যাপনের জন্য।

জায়গাটি যুবকের কাছে একটি বসতিহীন পরিত্যাক্ত স্থান মনে হয়। হয়তো সবাই দূরে কোথাও দুপুরের ঘুম গুমাচ্ছে। কিন্তু ঘড়িতে বেলা মাত্র সকাল দশটা তিরিশ। এই অবেলায় কেন একটা পুরো শহরের সকল বাসিন্দা একযোগে ঘুমাতে যাবে তা ভেবে পায় না যুবক। আচ্ছা তবে কি এমন কিছু ঘটেছে যে কারণে এই শহরের সবাই এই শহর ছেড়ে পালিয়েছে ? যুবক ভাবে, কিন্তু যদি এখন সে ফেরত যেতে চায় তবে তাকে আগামীকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে , আগামীকাল সকালে পরবর্তী ফিরতি ট্রেন। সুতরাং তার যতই বিদঘুটে লাগুক, তাকে আজ রাত এখানেই কাটাতে হবে যেকোনোভাবে। উপায়ন্তর না পেয়ে যুবক সময় নষ্ট করার জন্য চারপাশ দেখতে বেরোয়।

রাস্তায় বেরিয়েও যুবক চোখে কোন জনমানবের চিহ্ন দেখতে পায় না, শহরের রাস্তায় কোনো প্রাণের চিহ্ন নেই, যেন কবরের নীরবতা চারপাশে। যুবক হাত দিয়ে কপালের উপর চোখের রোদ আড়াল করে আকাশের দিকে মাথা তুলে চায় এই আশায় ; হয়তো এখনই পাশের গাছ থেকে ডানা ঝাপটিয়ে কোনো অচিন এক পাখি উড়াল দেবে অথবা বিকট চিৎকারে নিজের উপস্থিতি যুবককে জানাবে ! কিন্তু যুবক কোনো কাকপক্ষির’ও দেখা পায় না। আকাশটা যেন এক স্বচ্ছ নীল কাঁচের এক সাগর, এক ফোঁটা মেঘের উপস্থিতি চোখে পরে না। স্থীর শান্ত নিথর এক আকাশ, যে আকাশে কোনো ভেসে বেড়ানো সাদা বা কালো বা কোনো মেঘ’ই নেই, নেই কোনো উড়ে যাওয়া পাখি।

যুবক ধীর পায়ে হাটতে থাকে সেই রাস্তা ধরে , রাস্তার পশে গাছগুলোর দিকে তাকালে মনে হবে গাছগুলো হয়তো কোনো ক্যানভাসে আঁকা চিত্র শিল্পীর  নিখুঁত এক শিল্পকর্ম, গাছগুলো সব এতটাই স্থীর। বাতাসে কোনো পাতায় কোনো সামান্যতম দুলোনির বা কাঁপনের উপস্থিতি চোখে পরে না। এভেন্যুয়ের মতো পথটি অনেক দূর চলে গিয়েছে, কিন্তু যতদূর দৃষ্টি যায় কেউ নেই , না কোনো মানুষ না কোনো কাক পক্ষী , না অন্য কোনো প্রাণী। যুবকটি খুব খুব করে চাচ্ছিলো কিছু একটা প্রাণী তার চোখে পড়ুক, এই শহরে যে প্রাণের উপস্থিতি আছে তার অন্তত একটা কোনো নমুনা ! পাশেই একটি পার্কের মতো হয়তো শিশুদের খেলার জায়গা ! যুবক সেই পার্কে একটি বেঞ্চে যেয়ে বসে। কোনো ছোট শিশু এখনই হয়তো তার বলের পেছনে ছুটবে বা পাশে ঝুলানো দোলনায় এসে দুলবে !

বেলা ঠিক কত যুবক বোঝার চেষ্টা করে, তার হাতের হাত ঘড়িটির দিকে তাকিয়ে লক্ষ্য করে ঘড়িতে এখনো বেলা সকাল সাড়ে দশটা ! কিন্তু যুবক নিশ্চিত সে অন্তত ঘন্টা দুয়েক ধরে এই শহরের রাস্তায় রাস্তায় হাটছে। অনেক সময় নিয়ে তাকিয়ে থেকে লক্ষ্য করলো ঘড়ির কাটাও আসলে ঘুরছে না। কিন্তু এ কেমন করে হয় ? অনেক সময় বসে থেকে  যুবক বেঞ্চ থেকে উঠে দাঁড়ায় , কিন্তু ঠিক কত সময় পরে যুবক তা ঠাহর করে উঠতে পারে না ! কিন্তু সেই দীর্ঘ সময়েও কোনো শিশু বা নারী বা পুরুষ কেউই আসেনা সেই পার্কে ! মৃদু বাতাসে দুলুনি ওঠা একটা ফুলও চোখে পরে না, বা সেই ফুলে একটা প্রজাপতি। যুবক এখনো বুঝে উঠতে পারে না এমন একটা সময়ে। একটা শহরের সমস্ত লোক ও প্রাণী ঠিক কোথায় গিয়েছে একসঙ্গে আর কেনোই বা গিয়েছে। তবে কি এই শহরে সে অনাকাঙ্খিত অবাঞ্ছিত, নাকি এ শহরের প্রাণের জন্য সে ভয়ঙ্কর কেউ যে কারণে হয়তো সবাই অন্য কোথাও লুকিয়ে আছে !

রাস্তার পাশের কোনো নাম ফলকে কোনো লেখা বা অক্ষর বা বর্ণ তার চোখে পরে না! যুবকে হেঁটে হেঁটে শহরের এই গলি সেই গলি হয়ে ঘুরতে থাকে। হয়তো কোনো বাড়ির দরজা খোলা পাবে বা কোনো বাড়ির সামনে জটলা পাঁকিয়ে পুরুষের দলকে সিগারেট খেতে দেখবে, অথবা পাশাপাশি দুই বাড়ির কোনো দুই নারীকে দাঁড়িয়ে হালকা খোশ গল্প করতে দেখবে, অথবা বাড়ির আঙিনায় কেউ হয় বাগানের পরিচর্চা করছে, বা কোনো ছোট শিশুর কান্নার গলা ভেসে আসবে !  প্রতিটি বাড়ির দরজা বন্ধ , জানালার কপাট টানা ! কিন্তু বাড়িগুলো ঠিক পরিত্যাক্তও নয় আবার ভেতরে কেউ আছে বলেও মনে হচ্ছে না।

হঠাৎই যুবকের মনে পড়লো, এত সময় ধরে সে পথে পথে হাটছে কিন্তু তার ক্ষুধা তৃষ্ণা বা ক্লান্তি কিছুই বোধ হচ্ছে না। যুবক মনে মনে ভাবলো , ভালোই হয়েছে কারণ এত সময় ঘুরেও সে কোনো রেস্তোরা বা পানশালা খোলা দেখতে পায়নি। যুবক ভাবে হয়তো এই শহরের মানুষ প্রাণী সবাই নিশাচর, সারাদিন ঘুমিয়ে কাটায় আর রাতে জেগে থাকে।

কিন্তু প্রকৃতপক্ষে, এটা ছিল একটা বিড়ালের শহর ! সূর্য ঠিক যখনই হেলে পরে সন্ধ্যা নামতে শুরু করলো, বিড়ালেরা সেই সাবেকি আমলের ব্রীজ পার হয়ে শহরে ঢুকতে লাগলো ! নানা ধরণের নানান রঙের বিড়াল। বিড়ালগুলি দেখতে অন্য সাধারণ বিড়ালের চেয়ে আকারে বেশ বড়, তবে এগুলি বিড়ালই এটা নিশ্চিত।  যুবক এমন দৃশ্য দেখে প্রায় বাকরুদ্ধ, আর যাই হোক এমন কিছুর জন্য সে মোটেও প্রস্তুত ছিল না ! কি করবে বুঝে উঠতে না পেরে যুবক সেই টাউন হলের দিকে দৌড়াতে থাকে। টাউন হলে পৌঁছে সিঁড়ি ভেঙে দ্রুত সে ওপরে উঠতে থাকে লুকানোর জন্য ! বিড়ালেরা তাদের দৈনন্দিন কাজ শুরু করে নিয়ম মাফিক, কেউ দোকানের ঝাঁপি খুলে ব্যাবসায় মন দেয় , কেউ হয়তো টাউন হলের কাউন্টারে বসে তাদের কাজে মনোযোগ দেয় , কেউ হয়তো রেস্তোরা বা পানশালার ঝাঁপি উঠিয়ে ক্রেতার জন্য অপেক্ষায় থাকে। শীঘ্রই সেই ব্রীজ পার হয়ে আরো অনেক বিড়াল শহরে আসতে থাকে, এই বিড়ালরাও আগের বিড়ালগুলোর মতোই আকারে বেশ বড়, তবে নিশ্চিতভাবেই বিড়াল। এরা বিভিন্ন দোকানে ঢুকে বাজার সদাই করতে থাকে, কেউ রেস্তোরায় ঢুকে খাবারের অর্ডার দেয়, কেউবা সিগারেটের দোকান থেকে সিগারেট কিনে তাতে আগুন দিয়ে ফুঁকতে থাকে, কেউ কেউ টাউন হলে আসে নানারকমের দাপ্তরিক কাজ ও ঝামেলা মিটাতে, কেউ কেউ পানশালায় ঢুকে কোনো বিয়ার বা হুইস্কি পান করতে বসে কোনো জনপ্রিয় বিড়ালসঙ্গীতের সঙ্গে মাথা দুলাতে থাকে। পানশালায় কেউ বাদ্যযন্ত্র বাজাতে থাকে আর তার তালে তালে কেউ কেউ নাচতে থাকে। যেহেতু বিড়াল রাতের অন্ধকারে বেশ ভালো দেখতে পায়, তাই তাদের এই শহরে কোনো আলোরই প্রয়োজন পড়ে না ! কিন্তু ঠিক ওই রাতে আকাশ ছিল পূর্ণিমার আলোতে ভেসে যাওয়া, সমস্ত শহর যেন ভেসে যাচ্ছিলো পূর্ণিমার আলোয়, আর তাই টাউন হলের ঘন্টার আড়ালে লুকিয়েও যুবক এইসকল কর্মকান্ড সবই পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছিলো।

একসময় যখন ভোর হয়ে এলো, আকাশে চাঁদ নেমে গিয়ে সূর্যের আলো দেখা দিলো, বিড়ালেরা তাদের দৈনিক কাজের ইতি টেনে যে যার মতো ফিরে যেতে লাগলো। সূর্য যখন পুরোপুরি উঠে গেল, তখন আর কোনো বিড়ালের দেখা মিললো না। সেই একলা যুবক নিচে নাম এলো সিঁড়ি বেয়ে। তারপর হোটেলের একটা রুমে ঢুকে শুয়ে পড়লো, নির্ঘুম সারারাত পরে তার দুচোখে খুব শীঘ্রই ঘুম এসে হানা দেয়। ঘুম থেকে ঠিক কখন উঠলো বা ঠিক কত সময় ঘুমালো তার সঠিক কোনো আন্দাজ যুবক ঠাহর করতে পারে না। তার মনে হলো কিছু খাওয়া দরকার, সে হোটেলের হেঁসেলে ঢুকে বিড়ালদের বেঁচে যাওয়া রুটি আর কিছু মাছ রান্না করে খেয়ে নেয় ! যখন আবারো সন্ধ্যা নামে যুবক আবারো টাউন হলের সেই বিশাল ঘন্টার আড়ালে লুকিয়ে বিড়ালদের কাজকর্ম দেখে ভোর পর্যন্ত।

এই স্টেশনে ট্রেন দুবার থামে, দুপুরের আগে একবার আর বিকালের আগে একবার। যদি সে সকালের ট্রেনটি ধরে তবে সে তার এই যাত্রা চালিয়ে যেতে পারবে, সামনে কোনো পছন্দসই জায়গায় নেমে পড়লেই হবে। আর যদি সে বিকালের আগের ট্রেন ধরে তবে তাকে তার এবারের ভ্রমণে ইতি টেনে ফিরে যেতে হবে সে যেখান থেকে এসেছিলো সেখানে। কোনো যাত্রী এই স্টেশনে নামে না বা কেউ এই স্টেশন থেকে উঠেও না। তারপরও প্রতিবেলাই  ঘড়ি ধরে এক মিনিট ট্রেন থামে এখানে, যাত্রী উঠানামা করার জন্য। সে এখান থেকে যেকোনো একটা ট্রেন ধরলেই পালাতে পারবে এই অদ্ভুত বিড়ালের শহর থেকে, পিছনে ফেলে রেখে যাবে এই উদ্ভট শহর। বয়সে তরুণ হওয়ার কারণেই হোক বা কৌতহলপ্রেমী হওয়ার কারণেই হোক, যুবক   এই শহরের প্রতি একটা আকর্ষণ বোধ করে। সে এই উদ্ভট বিড়ালের শহরের আরো অদ্ভুত কর্মকান্ড দেখার এক এক তীব্র আকর্ষণ বোধ করে। এবং যদি সম্ভব হয় তবে তাকে উদ্ঘাটন করতে হবে কবে এবং কিভাবে এই শহর বিড়ালের শহর হলো, এই শহর কে শাসন করে, কিভাবে চলে , আর এই বিড়ালদের জীবন আসলে কেমন। এবং খুব সম্ভবতঃ সে’ই প্রথম কোনো মানুষ যে এই অদ্ভুত বিড়ালের শহরে পা রেখেছে এবং এই অদ্ভুত শহর নিজ চোখে দেখেছে।

ঠিক তৃতীয় রাতে টাউন হলের ঘন্টার নিচে এক জটলা থেকে হঠাৎ এক চিৎকার আসে। “এই , তোমরা কি কেউ মানুষের কোনো গন্ধ পাও?” হঠাৎ চিৎকার করে এক বিড়াল। “তুমি যখন বলেই ফেললে তাই বলছি, আমার মনে হচ্ছে আমি গত কিছুদিন থেকে একটা অন্যরকম গন্ধ আসলে পাচ্ছি ” আরেক বিড়াল যোগ করে তার একটি থাবা দিয়ে নাক ঘষতে ঘষতে। “আমিও ” তৃতীয় আরেক বিড়াল বলে উঠে।  “এটাতো খুবই অদ্ভুত , এখানে কোনো মানুষ তো থাকার কথা না ” কোনো আরেক বিড়াল যোগ করে। এই শহরে মানুষ আসার কোনো উপায়ই নেই, কোনভাবেই সম্ভব না। “কিন্তু তারপরও এই গন্ধই বলে দিচ্ছে এখানে কোনোখানে মানুষ আছে নিশ্চই”।

বিড়ালেরা বিভিন্ন দলে ভাগ হয়ে খুঁজতে শুরু করে, শহরের এমাথা থেকে ওমাথা। টাউন হলের প্রতিটি কোণা, প্রতিটি রুম, আনাচে কানাচে। বিড়ালের ঘ্রান শক্তি অত্যন্ত প্রখর যখন বিড়াল এটা তার প্রয়োজনে ব্যবহার করে। কাজেই বিড়ালদের খুব বেশি সময় ব্যয় করতে হয় না খুঁজে পেতে যে, টাউন হলের বিশালাকৃতির ঘন্টা এই গন্ধের মূল উৎস। সিঁড়ি বেয়ে নিঃশব্দে বিড়ালেরা উপরে উঠে আসছে , চাঁদের আলোয় যুবক দেখতে পায়। যুবক নিঃশাস বন্ধ করে ভাবে, এই শেষ এরা আমাকে এখুনি পেয়ে যাবে। অনাহুত অনাকাঙ্খিত মানব সন্তানের উপস্থিতি স্বাভাবিকভাবেই বিড়ালের দলকে ক্ষেপিয়ে তোলে। তার বিশাল থাবা আর চকচকে সাদা তীক্ষ্ণ ধারালো দাঁত দেখে যুবকের সমস্ত শরীরে হিম ধরে আসে। মানব সন্তানের এখানে পা দেয়ার কোনো অধিকার নেই, তারা কোনো ক্রমেই এখানে স্বাগত নয়। যুবক ভাবতেও পারছে না তার জন্য কতটা ভয়াবহ ভাগ্য ও পরিস্থিতি অপেক্ষা করছে, তবে সে এটা নিশ্চিত, এই বিড়ালেরা তাকে এই শহর থেকে জীবিত ফিরতে দিবে না যেহেতু সে এই গোপন অদ্ভুত শহরের কথা জেনে গিয়েছে।

বিশাল আকারের তিনটি বিড়াল ঘন্টার কাছে উঠে আসে নিঃশব্দে সিঁড়ি বেয়ে, আর চারপাশ শুঁকতে থাকে। যুবক দম আটকে পাথর হয়ে বসে থাকে তার নিশ্চিত মৃত্যু এই তিন বিড়ালের হাতে জেনে। “আশ্চর্য ” গোঁফ নাড়তে নাড়তে এক বিড়াল বলে ওঠে। “আমি নিশ্চিত আমি মানুষের গন্ধ পাচ্ছি কিন্তু এখানে কেউ নাই “। “খুবই আশ্চর্যজনক ” আরেক বিড়াল বলে”, কিন্তু এখানে কেউ নেই এটা নিশ্চিত”, চলো বরং অন্য দিকে খুঁজে দেখি এখানে সময় নষ্ট না করে। “আমি কিছুই বুঝতে পারছি না”, ধন্ধে পড়া চোখ নিয়ে তিন বিড়াল চারদিক দেখতে থাকে, তারপর সিঁড়ি বেয়ে ধাঁধা ভরা দৃষ্টি নিয়ে নেমে যায়। ঘন্টার পাশে বসে থাকা যুবক বিড়ালদের পায়ের শব্দ মিলিয়ে যেতে শোনে, এবং ধীরে ধীরে বিড়ালেরা অন্ধকারে মিলিয়ে যায়।

যুবক হাঁফ ছেড়ে বাঁচে, যেনো ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়লো , কিন্তু সে নিজেও বুঝে উঠতে পারছে না আসলে ঘটলো কি ? সে মোটামুটি বিড়ালদের কাছ থেকে সুতা পরিমান দূরত্বে ছিল, তার নিঃশাসের আওয়াজও এই ঘুপচি জায়গায় বিড়ালদের টের পাওয়ার কথা। এত ছোট একটা জায়গায় তাকে বিড়ালের দেখতে পাবে না তা হতেই পারে না। কিন্তু যেকোনো কারণেই হোক বিড়ালেরা তাকে দেখতে পায়নি। নিজের হাত দুটো চোখের সামনে ধরে পরীক্ষা করে যুবক, না সে পরিষ্কার দেখতে পারছে নিজের দুই হাত, পা, সব। কোনোকিছুই গ্লাসের মতো স্বচ্ছ বা অদৃশ হয়ে যায়নি। অদ্ভুত ব্যাপার। সেযাই হোক, সে সিদ্ধান্ত নেয় সকাল হলেই সে স্টেশনের দিকে রওয়ানা দিবে, সকালের ট্রেনই সে ধরবে, এই অদ্ভুত বিড়ালের শহর তাকে যত দ্রুত সম্ভব ছাড়তে হবে, পরেরবার যে তার ভাগ্য তার সহায় হবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।

পরদিন সকালে যুবক স্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকে ট্রেনের অপেক্ষায়। একসময় রেললাইন কাঁপিয়ে হুঁইসেল বাজিয়ে বিকট আওয়াজে সকালের ট্রেনটি আসতে থাকে স্টেশনের দিকে। কিন্তু যুবক ট্রেনের গতির কোনো পরিবর্তন লক্ষ্য করে না, যেমন দ্রুত গতিতে ট্রেনটি ছুতে আসছিলো স্টেশনের দিকে, ঠিক তেমন গতিতেই ট্রেনটি পার হয়ে যায় স্টেশনটি ডান পাশে ফেলে। যুবক ঠায় দাঁড়িয়ে ট্রেনের চলে যাওয়া দেখে, ছোট থেকে আরো ছোট হতে হতে একসময় ট্রেনটি বিন্দুতে পরিণত হয় এবং দৃষ্টির আড়ালে হারিয়ে যায়। যুবক কোনো ঝুঁকি নিতে চায় না। তাই সে স্টেশনেই বসে থাকে বিকালের ট্রেনের অপেক্ষায়। বিকালের ট্রেনেও সে থামার কোনো লক্ষন দেখে না, এবং একসময় একই রকম দ্রুততায় এই ট্রেনও স্টেশনটি ফেলে একসময় দৃষ্টির আড়ালে হারিয়ে যায়। যুবক তার পাশ দিয়ে চলে যাওয়া ট্রেনের চালক, ইঞ্জিনিয়ার, কামরায় বসে থাকা যাত্রীদের সবাইকে দেখতে পায়। এমনকি চালকের, যাত্রীদের মুখের অভিবাক্তিও স্পষ্ট দেখতে পায়।  ট্রেন চালকের তাকে না দেখার কোনো কারণ’ই নেই , তবুও কোনো চালক’ই তাকে দেখে ট্রেন থামালো না। বিকালের ট্রেনটি চলে যাওয়ার পর চারপাশের নিঃস্তব্ধতা যেন আরো বহুগুণে বেড়ে যায়, কবরের নিঃস্তব্ধতা বুঝি এমন হয় নাকি এরচেয়েও বেশি যুবক চিন্তা করে।  একটু পরেই সূর্য হেলে পড়বে, নেমে আসবে সন্ধ্যা। বিড়ালের এই শহর আবারো বিড়ালে মুখরিত হয়ে উঠবে, ব্যাস্ত হয়ে উঠবে এই শহর।

যুবক বুঝতে পারে সে আসলে চিরদিনের মতো হারিয়ে গেছে। এটা আসলে বিড়ালের শহর নয়। এই সেই জায়গা যেখানে তার হারিয়ে যাওয়ার কথা অবশেষে। এটা আসলে পৃথিবীর বাইরে এমন এক স্থান, যা তার জন্যই বিশেষভাবে তৈরী করা হয়েছে যেখানে সে হারিয়ে যাবে। আর কোনোদিনই কোনো অবস্থাতেই পৃথিবীর কোনো ট্রেন এই স্টেশনে আর থামবে না, যা তাকে ফিরিয়ে নিতে পারবে আগের সময়ে।

স্টেশনে ট্রেন থামতেই ট্যাংগো উঠে দাঁড়ায় নামার জন্য। স্টেশনের প্লাটফর্মে ট্যাংগো’ই একমাত্র যাত্রী, অন্য কোনো যাত্রী এই স্টেশনে নামে না তাকে ছাড়া বা কেউ এই স্টেশনটি থেকে ওঠেও না। ট্যাংগো ট্রেনের দরজা দিয়ে প্লাটফর্মে পা দেয়া মাত্রই ট্রেনটি আমার ছেড়ে দেয়। একা জনমানব শুন্য এই স্টেশনে ট্যাংগো দাঁড়িয়ে থাকে, যেদিকে চোখ যায় শুন্য, নিথর স্থির এই স্টেশন। ট্যাংগো পা বাড়ায় সামনের দিকে।


মিতা চৌধুরী
লেখক, চিত্রশিল্পী এবং সংগঠক
মেলবোর্ন প্রধান, প্রশান্তিকা।

0 0 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments