বিদায় ভারতের বাঙালি রাষ্ট্রপতি । শিউলি আফছার

  •  
  •  
  •  
  •  

 113 views

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রণব মুখার্জিকে ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করেছিল। সেই সময়ের চ্যান্সেলর জিল্লুর রহমানের আমন্ত্রণে তিনি বাংলাদেশ সফরে এসে চমৎকার এক বক্তব্য দিয়েছিলেন। বাংলাদেশের পক্ষ হতে উনাকে লিবারেশন পুরস্কারে সম্মানিত করা হয়। শেখ হাসিনা, বঙ্গবন্ধুর প্রতি তার গভীর টান ছিল। প্রায় বক্তব্যেই তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও বঙ্গবন্ধুর নিহত হবার বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন। তিনিই ছিলেন ভারতের একমাত্র বাঙালি রাষ্ট্রপতি। বাংলাদেশের দু:সময়ে আমাদের পাশে, বঙ্গবন্ধুর পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি বারবার।

শ্রী প্রণব মুখার্জি ভারতের ১৩তম রাষ্ট্রপতি ছিলেন। বয়স হয়েছিলো, তারপরও কোভিড পজিটিভ নিয়ে তিনি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। বেশ কিছুদিন ভেন্টিলেটর সাপোর্ট নিয়ে আশা নিরাশার দোলাচলে চিকিৎসা চলছিল। ভারতের এভিপি নিউজ বলছে, ৮৪ বছর বয়স এবং তার ব্রেন সার্জারি শেষ পর্যন্ত ! ভার বহন করতে পারেননি। নক্ষত্রের পতন ঘটালো। অসাধারণ, অনন্য এক রাজনৈতিক পটভূমিকা রেখে গেলেন তিনি ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে।

 প্রণব মুখার্জিকে প্রদান করা হয় বাংলাদেশ লিবারেশন এয়ার অনার

১৯৩৫ সালের ১১ ডিসেম্বর বীরভুমে বাঙ্গালি পরিবারে জন্ম নেয়া প্রণব মুখার্জির রাজনীতির প্রতি আগ্রহ ছিল ছোট বেলা হতেই। বাবা কামদা কামকার মুখার্জি স্বদেশী ছিলেন। আইন, ইতিহাস, রাস্ট্রবিজ্ঞান নিয়ে পড়া শেষ করে তিনি পোস্ট অফিসের সাধারণ চাকুরে হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন। ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে দলমত সবার কাছে তিনি সম্মানের আসনে ছিলেন। বর্তমান ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর একটি ছবি ব্রেকিং নিউজে ভাইরাল হয়েছে, প্রণব মুখার্জিকে পা ছুঁয়ে প্রনাম করছেন ! কংগ্রেসের কাছে তিনি ছিলেন সংকট মোচনের কাণ্ডারি। সহকর্মী পি চিতাম্বর স্মৃতিচারণ করে বলছেন, ইন্দিরা সময়কালে তিনি ছিলেন ইন্দিরা গান্ধীর কাণ্ডারি। ইন্দিরা গান্ধীর ঘনিষ্ঠ এবং বিশ্বস্ত হিসেবে তিনি ছিলেন কংগ্রেসের আলোকবিন্দু দাদা।

সাধারণ চাল চলনে কিন্তু খুবই কেয়ারিং হিসেবে তিনি ভারতীয় মিডিয়ায় পরিচিত। ইন্ডিয়া টুডের সাংবাদিক রাজদীপ সারদেশাই প্রণব মুখার্জির ইন্টারভিউ নিতে গিয়ে তার স্মৃতি জাগানিয়া কথা বলছিলেন, তিনি ছিলেন ‘শর্ট টেম্পারড বাট লং মেমোরি এন্ড কেয়ারিং টু আদারস !’ সন্দেশ না খেয়ে উঠা যাবেনা। তাঁর স্মৃতি শক্তি ছিল খুবই প্রখর।

সোনিয়া গান্ধীকে রাজনীতিতে আনার পেছনে তার অনেক ভূমিকা ছিল। রাজীব গান্ধীর সাথে খানিকটা দুরত্ব হলেও তিনি রাজীব গান্ধীর সাথে ইন্দিরা পরবর্তী কংগ্রেসকে কিনারা হতে তীরে এনেছিলেন। ইন্দিরা গান্ধীর মতোই সোনিয়া গান্ধী পুরোপুরি নির্ভর ছিলেন প্রণব মুখার্জির ওপর। কেবিনেটে ডিফেন্স, ফরেন, প্লানিং কমিশন সহ আন্তর্জাতিক অনেক পদে তিনি কাজ করেছিলেন। কংগ্রেস দলকে তথা ভারতীয় রাজনীতিতে ৪০ বছরের রাজনৈতিক সেবা দিয়েছিলেন। সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রতিভা পাতিল বলছিলেন, ‘ তিনি ছিলেন আমার রাখী ভাই। আমি যে কোনো বিষয় নিয়ে রাষ্ট্রপতি থাকা কালে তার সাথে আলাপ করতাম। খুব শার্প মেমোরি ছিল উনার। আমার খুব খারাপ লাগছে। আমাকে ফোনে সাবধানে থাকতে বলে তিনিই চলে গেলেন। আমার খুব কষ্ট হচ্ছে।’

তিনি জীবদ্দশায় অনেক পুরস্কার অর্জন করেছেন। পদ্মশ্রী, ভারত রত্ন, ২০১০ সালে ফাইনান্স মিনিস্টার অফ এশিয়া ইত্যাদি। তিনি লিখতে, পড়তে এবং গান শুনতে ভালোবাসতেন। তার বিখ্যাত দুটি বই হলো: Beyond surviva Emergency Dimensions of India এবং Saga struggle and sacrifice (indian National congress) Mukherjee. P.
তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানিত ডক্টর ডিগ্রি লাভ করেছিলেন।

তাঁর অনেক গবেষণা রয়েছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের উপর এই প্রসঙ্গে অনেক কথা বিভিন্ন বইয়ে পাওয়া যায়। রাজনীতিবিদ গোলাম নবী আযাদ বলছিলেন, প্রণব মুখার্জি তার চিন্তা চেতনায় কিভাবে ভারতের মানুষকে, দেশকে প্রাধান্য দিয়েছিলেন। এক বক্তব্যে তিনি বলছিলেন, when i shut my eyes and think of India 1.3 billion prople in their daily lives, using 200 Languages having 7 religions……… Under only one system and one flag…

কিছু মানুষের জন্মই হয় মানুষের সাম্য প্রতিষ্ঠার জন্য, সেবার জন্য। ১৯৩৫ এ যে শিশু নক্ষত্র হয়ে জ্বলেছিল, ২০২০ এর আগস্টের শেষ দিনে সেই নক্ষত্র খসে পড়লো। উপমহাদেশের অপুরনীয় এক বেদনার ক্ষত সৃস্টি হলো। বিনম্র শ্রদ্ধা! ভারতের প্রথম বাঙ্গালি রাষ্ট্রপতি। শ্রী প্রণব মুখার্জি, বিদায়।

৩১ আগস্ট ২০২০।

শিউলি আফছার
উপ রেজিস্ট্রার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
সাবেক বিতার্কিক, লেখক।

0 0 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments