বিধ্বংসী ভালোবাসা: নিঃসঙ্গ সূর্যকমল – আসমা সুলতানা

  •  
  •  
  •  
  •  

আসমা সুলতানা, ভিজ্যুয়াল আর্টিষ্ট; চিত্রকলা, শিল্পকলা এবং শিল্পকলার ইতিহাসে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন ঢাকা, লন্ডন ও টরোন্টোতে। দেশে বিদেশে বেশ কিছু একক এবং যৌথ প্রদর্শনী ছাড়া শিল্পকলার ইতিহাস নিয়ে লেখালেখি করেন তাঁর নিজস্ব ব্লগে। । ‘দেখার দৃষ্টিভঙ্গি এবং `সভ্যতা-একটি ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি’ নামে তাঁর দু’টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে।

“আমার আগ্রহ শুধুমাত্র ভালোবাসায়” রুশ শিল্পী মার্ক শাগাল বলেছিলেন, “আর আমি সেই সব বিষয়গুলোর সংস্পর্শে আসতে পচ্ছন্দ করি যাদের সৃষ্টির কেন্দ্রে আছে ভালোবাসা”। হয়তো এটাই পৃথিবীর সব শিল্পীরই মনের কথা।  ভালোবাসা ছাড়া সৃষ্টি অসম্ভব। শিল্পীদের ভালোবাসার প্রকৃতি যদিও বেশ অদ্ভুত হয়ে থাকে, অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, তারা সব কিছুকে ভালোবাসতে পারেন, আবার হয়তো অনেক ক্ষেত্রে কোনো কিছুকেই ভালোবাসতে পারেন না। কিছুটা হলেও একধরনের আত্ম-অভিনিবিষ্টতা কাজ করে তাদের মনের গভীরে, এমন ভাবাটাও অমূলক নয়। এমন এক অদ্ভুত টানাপোড়েনের মধ্যে হৃদয়ের গভীরে জমে থাকা যন্ত্রণা, হতাশা, কষ্ট আর না পাওয়ার বেদনায় তিলে তিলে তারা সৃষ্টি করতে থাকেন এক একটি শিল্পকর্ম। যেনো অদৃশ্য কোনো মাতৃজঠরে জন্ম নিচ্ছে নিত্য নতুন শিশু। শিল্পীরা চিরপ্রেমিক, তারা প্রেমে বুঁদ হন প্রতিনিয়ত, সে প্রেম হতে পারে প্রকৃতির জন্য, মানুষের জন্য, এমনকি শিল্পের জন্যেও। শিল্পীদের ভালোবাসার বা প্রেমের সেই রহস্যময় জগতটি কেমন হতে পারে সেটা হয়তো অনেকটাই অজ্ঞাত। কিন্তু কোনো শিল্পীকে এবং তার শিল্পকর্মকে জানতে বা বুঝতে গেলে, তার জীবন সম্পর্কে অবশ্যই ধারণা থাকা প্রয়োজন। ভালোবাসা ছাড়া কোনো শিল্পীই শিল্পী হয়ে উঠতে পারেন না। সেদিক থেকে বিবেচনা করলে শিল্পী সত্তাকে তার প্রেমিক সত্তা থেকে আলাদা করে দেখবার কোনো অবকাশ নেই ।

চিত্র ১: ভিনসেন্ট ভ্যান গোর শিল্পকর্ম নিয়ে নতুন প্রজন্মের এক শিল্পীর স্হাপনাশিল্প, প্যারিস, ২০০৫

১৮৮৮ সালের ডিসেম্বরের তেইশ তারিখের এক শীতের রাত, দক্ষিণ ফ্রান্সের একটি শহর, আর্ল; সেই রাতে, ডাচ শিল্পী ভিনসেন্ট ভ্যান গো তাঁর হাতে কাগজের একটি টুকরোর মধ্যে কিছু একটা জাড়িয়ে দ্রুত পায়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তাঁর পায়ের ধাক্কায় রাস্তার নুড়ি পাথরগুলো ছিটকে পড়ছিলো এদিকে সেদিক, টালমাটাল চলার ভঙ্গি দেখে অনুধাবন করা সম্ভব যে, তিনি খানিকটা অপ্রকৃতিস্থ। অন্ধকারের ভেতরে লক্ষ করলে হয়তো দেখা যাবে যে, তাঁর কানের পাশ দিয়ে চুইয়ে চুইয়ে রক্ত ঝরে পড়ছে। তিনি তাঁর গন্তব্যে এসে থামেন এবং একটি বন্ধ দরজায় ধাক্কা দেন। একজন রমণী দরজা খুলে দিলে, শিল্পী ভিনসেন্ট সেই রমণীর হাতে তাঁর হাতের কাগজের টুকরোটি গুঁজে দিয়ে দ্রুত পায়ে ফিরে যান। অতঃপর রাতের নীরবতা ভেঙ্গে একটি নারী কন্ঠের চিৎকার ভেসে আসে…

চিত্র ২: কানে ব্যান্ডেজ বাঁধা আত্মপ্রতিকৃতি, ভিনসেন্ট ভ্যান গো, ১৮৮৯

ভিনসেন্ট তাঁর কানের খানিকটা অংশ কেটে সেই তরুণীকে সে রাতে উপহার দিয়ে এসেছিলেন, কিন্তু ভিনসেন্ট কেন তাঁর নিজের কান কাটতে যাবেন? সেটা আজো সবার অজানা। পুরুষেরা ভালোবাসার রমণীকে ফুল উপহার দেন, দেন মূল্যবান কোনো বস্তু; ভিনসেন্ট কেন নিজের কান কেটে দিতে যাবেন? সে থেকে প্রমাণিত হয়, তিনি মূলত ভিন্ন চিন্তার একজন মানুষ ছিলেন। যদিও সেই ঘটনার কোনো সুস্পষ্ট তথ্য জানা সম্ভব নয়, অনেকের ধারণা, হয়তো শিল্পী বন্ধু পল গগ্যাঁ’র সাথে তাঁর তর্কবিতর্কে বা হাতাহাতির ফলে এমন দুর্ঘটনা ঘটেছিলো যে, ভিনসেন্ট তাঁর কানটাকে বাঁচাতে পারেননি। ভিনসেন্ট ও শিল্পী গগ্যাঁ দুজনই খুব চাপা স্বভাবের ছিলেন বলে কোনোদিনও সেই রহস্যের সমাধান হয়নি। এমনও মনে করা হয় ভিনসেন্ট হিংসাবশত নিজেই নিজের কান কেটে দিয়ে এসেছিলেন সেই তরুণীকে, যাকে তিনি পেতে চেয়েছিলো খুব আপন করে(?)। অথবা অসহনীয় মানসিক যন্ত্রণাকে ভুলতে গিয়ে, তিনি তাঁর শারীরিক কষ্টকে বাড়িয়ে নিতে চেয়েছিলেন শতগুণে। ভিনসেন্ট একের পর এক আত্মঘাতী প্রচেষ্টার মাধ্যমে প্রত্যাখ্যানের বেদনাগুলোকে ভুলতে চেয়েছিলের তাঁর জীবদ্দশায়। যদিও এই দুর্ঘটনার কারণেই ১৮৮৯ সালের শুরুর দিকে তিনি আমাদের উপহার দেন, অসাধারণ একটি শিল্পকর্ম; যার শিরোনাম ছিলো – ‘কানে ব্যান্ডেজ বাঁধা আত্মপ্রতিকৃতি’। ভিনসেন্ট ভ্যান গো আরো একবার পৃথিবীকে জানিয়ে দিলেন, কষ্ট ছাড়া সৃষ্টি সম্ভব নয়।

খানিকটা অতীতের দিকে তাকালে দেখা যাবে, ১৮৭৫ সালে ভিনসেন্ট যখন তাঁর চাচার লন্ডনের গুপিল গ্যালারিতে একজন সাধারণ শিল্পকর্ম বিক্রেতা হিসেবে  কর্মরত ছিলেন; তখন তিনি সেখানে একজন পৌঢ় বিধবা মহিলার বাসায় লজিং থাকতেন, যিনি তার মেয়ের সাথে একটি বাচ্চাদের স্কুল পরিচালনা করতেন সেই বাড়ীতেই। ভিনসেন্ট সেই সময় উরসুলা লয়ারের কন্যা ইউহেনিয়া লয়ার-এর অনুরাগপ্রার্থী হন। ভিনসেন্ট জানতেন না যে, গোপনে ইতোমধ্যে অন্য কারো বাগদত্তা হয়ে আছেন ইউহেনিয়া, বা জানলেও ভিনসেন্ট তাঁর নিজের অদম্য আগ্রহ নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরেই তরুণী ইউহেনিয়াকে তাঁর প্রেম নিবেদন করেছিলেন। কিন্তু হায়! তাকে শুধু প্রত্যাখ্যানই করা হয়নি, সেটি করা হয়েছিল অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে, অপমানও করা হয় নির্মমভাবে। যদিও ভিনসেন্ট ইউহেনিয়াকে অনুরোধ করেছিলেন সেই সম্পর্ক ছিন্ন করে তাঁর জীবনে চলে আসতে, কিন্তু তারপরেও রাজি না হলে, ভগ্নহৃদয় ভিনসেন্ট মানসিকভাবে বেশ ভেঙ্গে পড়েছিলেন। পরিণতিতে ভিনসেন্ট নিজেকে সবার থেকে দূরে সরিয়ে নেন, একা হয়ে পড়েন। কোনো একটি পর্যায়ে তিনি ভাই থিওকে চিঠিতে লিখেছিলেন ‘আমি হয়তো সারাজীবন চিরকুমার রয়ে যাবো’।

যদিও ছোটো ভাই থিওকে ভিনসেন্ট নিয়মিত চিঠি লিখেতেন, কিন্তু তাঁর ভালোবাসা বা প্রণয়ের বিষয় কদাচিৎ সেখানে উল্লেখ করেছিলেন। ১৮৮১ সালের নভেম্বর মাসে, ভিনসেন্ট থিওকে একটি চিঠিতে তাঁর ক্ষোভের কথা ব্যক্ত করতে গিয়ে লিখেছিলেন, “আমি একজন নারীকে চলে যেতে দিয়েছি, সে অন্যকে বিয়ে করছে। আমি তার কথা ভোলার জন্য অনেক দূরে চলে এসেছি, ভুলতে পারিনি। বিধ্বংসী”। কথাগুলো ছিলো মূলত ক্যারোলাইনকে উদ্দেশ্য করে।

যদিও মনে করা হয় ইউহেনিয়া ভিনসেন্টের প্রথম প্রেম, তবে মতান্তরে ভ্যান গো এর আগেও একজন তরুণীর প্রেমে পড়ে বলে মনে করা হয়। তার নাম ছিল ক্যারোলাইন হানবেক। নেদারল্যান্ডের রিজউইকে তাদের সংক্ষিপ্ত এক সাক্ষাতে ভিনসেন্ট এই তরুণীর প্রেমে পড়ে যান, যাকে তিনি  নাম দিয়েছিলেন, ‘সব থেকে কোমল বুনোফুল’। কিন্তু যখন জানতে পারেন তাঁরই এক  জ্ঞাতি ভাইয়ের বাগদত্তা সে তখন, ভিনসেন্ট তাঁর অনুজ থিওকে লিখেছিলেন, “আমি যদি কোনো ভালো রমণী খুঁজে না পাই, তবে খারাপই সই’- আমি একা থাকতে পারবো না, কোনো পতিতা হলেও চলবে”। ভিনসেন্ট সব সময় শারীরিক চাহিদার কারণে তাড়িত হবার চেয়ে বরং মানসিক আশ্রয় খুঁজতেন, খুঁজতেন সমমনা কোনো নারীকে, যাকে তিনি তাঁর চিন্তা-চেতনার সঙ্গী করতে পারবেন। ক্যারোলাইনের কথা ভিনসেন্ট তাঁর চিঠিতে নানা স্থানে উল্লেখ করেছেন। এমনকি তিনি ক্যারোলাইন এবং তার স্বামী ভিলেমকেও চিঠি লিখতেন। থিওকে কোনো একটি চিঠিতে ভ্যান গো উল্লেখ করেছিলেন, অল্প বয়সের সেই প্রেম ও প্রত্যাখ্যানের কথা, সেই প্রত্যাখ্যানের বেদনা যে বৃথা যায়নি সেটাও তিনি নিশ্চিত করেছেন। ভিনসেন্টের সাহসী সব পদক্ষেপ এবং জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দিয়েও তিনি তাঁর সৃষ্টিকে রেখেছিলেন সচল, জীবনের সব ব্যর্থতাকে পিছনে ফেলে তিনি শিল্পকলাকে আপন করে নিয়েছিলেন।

ইউহেনিয়া লয়ারের কাছ থেকে প্রত্যাখ্যাত হয়ে এবং মানসিকভাবে বিভ্রান্ত ভবিষ্যৎ শিল্পী যখন নেদারল্যান্ডে ফিরে যান তখন আবার ভিনসেন্ট প্রেমে পড়েছিলেন; এবারের প্রেমিকা তাঁর জ্ঞাতি বোন কি ভস। ১৮৮১ সালের আগষ্ট মাসে কি ভস সদ্য বিধবা হয়ে ঘরে ফিরেছেন তার পুত্রকে সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে। এবং ভিনসেন্ট প্রেমে ব্যর্থ হয়ে আবারো নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন। তিনি তাঁর জ্ঞাতি বোন কি ভসকে প্রেম নিবেদন করলেন এই বলে যে; ‘আমি তোমাকে ততটুকুই ভালোবাসি যতটুকু নিজেকে’-‘তুমি কি আমাকে বিয়ে করার ঝুকি নেবে’? স্বাভাবিকভাবেই পারিবারিকভাবে বাধা আসে। কারণ, উনবিংশ শতাব্দীতে নেদারল্যান্ডে চাচাতো-মামাতো ভাই বোনের মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক নিষিদ্ধ ছিল। কি ভসের বাবা তার মেয়ের সাথে ভিনসেন্টকে দেখা করতে না দেয়ায়, ভিনসেন্টের ধারণা হয়েছিল, মেয়ের ইচ্ছার বিরুদ্ধে তিনি কাজটা করছেন। সেকারণেই ভিনসেন্ট জোর করে, কি এর সাথে একদিন দেখা করতে চেয়েছিলেন এবং একটি জ্বলন্ত মোমবাতির শিখার উপর হাত রেখে বলেছিলেন, “ আমাকে ওর সাথে দেখা করতে দাও, তা না হলে আমি আমার হাত সরাবো না এই আগুন থেকে”।

চিত্র ৩: ভিনসেন্টের জ্ঞাতি বোন কি ভস ও তার পুত্র, ১৮৮০

নিয়তির লিখন খণ্ডানো অসম্ভব। কি ভস আবারো নির্মমভাবে এই ক্ষেপাটে শিল্পীকে প্রত্যাখ্যান করে। এবং চিৎকার করে বলেছিলো ‘না, নাহ, কখনই না !’ শিল্পী ভ্যান গোকে কোনো নারী সঠিকভাবে চিনতে পারেনি কোনোদিন। কারণ সময়ের আগে জন্ম নেয়া প্রতিভাধর মানুষকে বোঝার ক্ষমতা, তাঁর সমসাময়িকদের মধ্যে থাকে না। তবে আজ ভিনসেন্টের মৃত্যুর শত বছর পরেও তিনি হয়েছেন শত শত রমণীর প্রেরণা ও ভালোবাসার কেন্দ্রবিন্দু। সেই অর্জন গুটিকয়েক সাধারণ রমণীর ভালোবাসা পাবার থেকে শতগুণে বেশী।

ভিনসেন্টকে মনে করা হতো, শিশুসুলভ একজন মানুষ, যিনি সমাজের বাকি দশজন মানুষের মতো চিন্তা করতে জানতেন না। যাঁর কোনো বৈষয়িক জ্ঞান ছিলো না, লোভ কিংবা লালসা কোনোটাই তাঁর ছিলো না। তিনি মানুষকে চিনতে বা বুঝতে পারতেন না সঠিকভাবে। থিওকে তিনি একবার চিঠিতে লিখেছিলেন যে “সম্পর্কতো শুধু নেবার জন্য নয়, দেবার জন্যেও”। ভিনসেন্ট সব সময় সবক্ষেত্রে নিজেকে উজাড় করে দিতে চেয়েছিলেন। তাঁর সাথে কয়েকজন পেশাদার পতিতার সম্পর্কের কথাও জানা যায়। তাদের মধ্যে সিন হুরনিকের নাম সব থেকে পরিচিত। ১৮৮১ থেকে ১৮৮৩ সালের মধ্যেকার ঘটনা। ভিনসেন্ট ভ্যান গোর অনেক শিল্পকর্মে আমরা সিন হুরনিককে দেখতে পাই। তিনি তাঁর কাজের মডেল হিসেবে তাকে ব্যবহার করেছিলেন। সিন হুরনিক তখন অন্তঃসত্ত্বা ছিলো, এক পর্যায়ে ভিনসেন্ট সিন হুরনিকের সাথে একসাথে বসবাস করতে শুরু করেন। পরবর্তিতে সিন হুরনিক একটি পুত্র সন্তানের জন্ম দেন এবং সেই শিশুটিকেও দেখতে পাওয়া যায়,  ভিনসেন্টের চিত্রকলায়। পাগলাটে শিল্পী পরিবার ও সমাজের বিরুদ্ধে গিয়েও  সেই শিশু এবং তার পাঁচ বছরের একটি বোনসহই সিনকে বিয়ে করতে চেয়েছিলেন, অবশেষে ভাই থিওর অনুরোধে তিনি সিন হুরনিককে পরিত্যাগ করেন। এর সঙ্গে অবসান হয় ভিনসেন্টের একমাত্র সংক্ষিপ্ত সংসার জীবনের। “ হ্যাঁ আমি একটা বেশ্যা! – আমার সাথে জীবন কাটানো আর নদীতে ঝাপ দেয়া একই কথা।” সিন হুরনিক বলেছিলো ভিনসেন্টকে।

চিত্র ৪ : ভিনসেন্টের আঁকা লিথোগ্রাফ ‘দুঃখ’ (সিন হুরনিক) ১৮৮২

ধীরে ধীরে ভিনসেন্ট নিজ ভাগ্যের মানচিত্রটা পড়তে পেরে, মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিলেন যে নারী জাতির মন যখন স্বয়ং ঈশ্বরও বুঝতে পারেননি তখন বৃথা চেষ্টা  না করাই উত্তম। পরবর্তীতে তিনি শিল্পচর্চায় ও বই পড়ায় মনোযোগ দিয়েছিলেন। যাযাবরের মতো ঘুরে ঘুরে আবিষ্কার করতে শুরু করেছিলেন চারপাশের জগতটাকে।  তিনি সম্পূর্ণরূপে আত্মসমর্পণ করেন প্রকৃতি এবং শিল্পকলার কাছে। অতঃপর মাত্র দশ বছরের অবিরাম চেষ্টায় তিনি নিজেকে বিশ্বের প্রথম সারির শিল্পীদের একজন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিলেন।

শিল্পী ভিনসেন্ট ভ্যান গো কেন পাগলের মতো রমণীদের ভালোবাসা পাবার জন্য ছুটেছিলেন? কেনইবা তিনি হাহাকার করতেন, প্রেয়সীর নারীর স্পর্শের জন্য। খুব সংক্ষিপ্ত করে বললে বলতে হবে, শৈশব থেকে ভিনসেন্ট ছিলেন মাতৃস্নেহ থেকে বঞ্চিত। ভিনসেন্টের জন্মের ঠিক এক বছর আগে তাঁর এক ভাইয়ের জন্ম হয়েছিলো এবং শৈশবেই যিনি মারা যান, তার নামও ছিলো ভিনসেন্ট। এ কথা জানার পর থেকেই ভিনসেন্ট নিজেকে, মনে মনে দায়ী করতেন সে ঘটনার জন্য। শুধু তাই নয়, ভিনসেন্ট তাঁর মায়ের কাছ থেকে কোনো স্নেহ বা ভালোবাসা না পেয়ে ধীরে ধীরে দূরে সরে আসেন। এবং আমৃত্যু তিনি একটি কথাই বোঝার চেষ্টা করেছিলেন সেটা হলো, কেনো তাঁর মা, তাঁর শিল্পকর্মকে ‘দুঃসহনীয়’ বলেছিলেন এবং কেনই বা কোনোদিনও কোনো প্রশংসা করেননি। ভিনসেন্ট ভ্যান গোর সাথে তাঁর মায়ের সম্পর্কের দূরত্বটি টিকে ছিলো তাঁর সারাটি জীবন; তাই ভিনসেন্ট রমণীর ভালোবাসা, মমতা, স্নেহ, আদর পাবার জন্য ব্যকুল ছিলেন। ভিনসেন্টের আয়ু মাত্র সাইত্রিশ বছর হলে কি হবে, তাঁর মা তিন পুত্র সন্তানের অকাল মৃত্যুর পরেও দীর্ঘদিন বেঁচে ছিলেন।

চিত্র ৫: ভিনসেন্টের হাতে লেখা চিঠিতে নিজের স্বাক্ষর

নারীদের সঙ্গে ভিসেন্টের সম্পর্ক  নিয়ে এই আলোচনায় যে নারীর অবদানের কথা না বললে অসম্পূর্ণ থেকে যাবে, তিনি হলেন, ইয়োহানা ভ্যান গো। ভিনসেন্টের ছোটো ভাই থিও ভ্যান গো’র স্ত্রী ও সন্তানের মা। ইয়োহানার সঙ্গে ভিনসেন্টের সম্পর্কের ব্যাপ্তি খুব সংক্ষিপ্ত। কিন্তু এর স্থায়ীত্ব ছিল আজীবন। ইয়োহানা যদিও ছিলেন তাঁর ছোটো ভাইয়ের স্ত্রী ছিলেন, তবুও ভিনসেন্টের সাথে ছিলো তাঁর বন্ধুত্বের সম্পর্ক। এক পর্যায়ে ইয়োহানাই নেন ভিনসেন্টের মায়ের স্থান। ইয়োহানা তাঁর শিশু পুত্রকে বুকে নিয়ে, ভিনসেন্টের শিল্পকর্ম আকড়ে ধরে, থিও ও ভিনসেন্টের চিঠিপত্রগুলোকে আগলে রেখে সামনে এগিয়ে গেছেন এবং ভিনসেন্টের মৃত্যুর ১৬ বছর পরেও হলে তাকে বিশ্বের কাছে পরিচিত করেই তবে ক্ষান্ত হয়েছেন। যে সব রমণীরা ভিনসেন্টে ফিরিয়ে দিয়ে নারী জাতির কলঙ্ক হয়ে রয়ে গিয়েছিলো, ইয়োহানা এক হাতে সেই দাগ মুছে দিয়েছিলেন। আর শিল্পকলার জগতের আকাশে আমাদের উপহার দিয়েছিলেন সবচেয়ে উজ্জ্বলতম নক্ষত্রটিকে ।

চিত্র ৬: ফার্স্ট স্টেপস, চিত্রটিতে শিল্পী ভিনসেন্টের নিজের  একটি পরিবারের স্বপ্নের আকাঙ্খা প্রকাশ পেয়েছে।

তারপরেও ভালোবাসা বেঁচে থাকে। শিল্পীরা প্রেমে পড়েন, সৃষ্টি করেন অনবদ্য সব শিল্পকর্ম। মানব বা মানবীর প্রতি প্রেম শিল্পীর জীবনকে লণ্ডভণ্ড করে দিলেও সৃষ্টির প্রশ্নে ও সৃজনশীলতার চর্চায় সে থাকে অনঢ় এবং অবিচল। আত্মসমর্পণে শিল্পী নিজেকে ভাসিয়ে দেন না সমাজ সংসারের চিরায়ত সংস্কারের মাঝে। সে ভেসে চলে ভিন্ন স্রোতে, একা, বিচ্ছিন্নভাবে। তার চলার সঙ্গী তার হৃদয় মাঝে বয়ে চলা ভালোবাসার ঝর্ণাধারা, ভালোবাসা ও প্রেমই তার সৃষ্টিশীলতার চালিকা শক্তি। ভিনসেন্ট ভ্যান গো যেমনটি বলেছিলেন, “ অনেক কিছুকে একসঙ্গে ভালোবাসা ভালো, ভালোবাসার মধ্যেই শক্তি লুকিয়ে থাকে, যে বেশী ভালোবাসতে জানে সে বেশী পরিশ্রম করতে পারে এবং বেশী অর্জন করতে পারে এবং ভালোবাসায় যে কাজ করা হয় তা হয় সর্বশ্রেষ্ঠ’’।