বিধ্বংসী ভালোবাসা : শাশ্বত প্রেমের এপিটাফ

  •  
  •  
  •  
  •  


আসমা সুলতানা, ভিজ্যুয়াল আর্টিষ্ট; চিত্রকলা, শিল্পকলা এবং শিল্পকলার ইতিহাসে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন ঢাকা, লন্ডন ও টরোন্টোতে। দেশে বিদেশে বেশ কিছু একক এবং যৌথ প্রদর্শনী ছাড়া শিল্পকলার ইতিহাস নিয়ে লেখালেখি করেন তাঁর নিজস্ব ব্লগে। । ‘দেখার দৃষ্টিভঙ্গি এবং `সভ্যতা-একটি ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি’ নামে তাঁর দু’টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে।

‘ভালোবাসা’ শব্দটি  অভিধানের অন্য আর যেকোনো শব্দের থেকে বহুল ব্যবহৃত এবং বোধকরি সবচেয়ে থেকে ভুলভাবে ব্যাখ্যায়িত একটি শব্দ। অনেকেই এই শব্দটির গভীরতা  সহজে উপলব্ধি করতে না পারলেও, প্রায় সবার জীবনে ভালোবাসার উপস্থিতি জানিয়ে দেয় এর গুরুত্বটা। যতটা গভীর বলে মনে করা হয়, হয়তো তার থেকেও  অনেক বেশী গভীর ও তাৎপর্যপূর্ণ এই শব্দটি। ভালোবাসার জন্য অনেকেই  যেমন জীবনে অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছে, তেমনি অনেক কিছু উৎসর্গও করেছে । আর যদি সেই ভালোবাসা  হয় কোনো শিল্পী যুগলের, তবে হয়তো তাতে থাকতে পারে সর্বোচ্চ ত্যাগ ও সাধনা। পৃথিবীর বাকি সবাই, শিল্পী যুগলের সেই অপার্থিব ভালোবাসার অর্থ বুঝতে না পেরে, বাড়াবাড়ি রকমের পাগলামি ভাবতে পারে।

যান এবুতার্ন ( ৬ এপ্রিল ১৮৯৮ – ২৫ জানুয়ারি ১৯২০ )

পৃথিবীর কোনো বাধাই তাদেরকে ভালোবাসাতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে না। প্রয়োজন হলে তারা তাদের ভালোবাসার সুউচ্চ চূড়াতে আরোহণ করে জীবনের মায়া ত্যাগ করে ঝাঁপ দিতে পারে শাশ্বত অন্ধকারে। এমনকি তাদের সেই প্রস্থানও অনেক সময় হয় শৈল্পিক। সেই ভালোবাসার স্মৃতি পরিণত হয় একটি হৃদয়স্পর্শী গল্পে এবং পৃথিবীর মানুষের হৃদয়ে বিস্ময় হয়ে  রয়ে যায় চিরকালে জন্য । মহাকালের সময়ের রয়ে যায় অমর হয়ে। কবি বায়রনের (১৭৮৮ -১৮২৪) উদ্ধৃতিটি উপযুক্ত হতে পারে এই প্রবন্ধের সাথে: ‘পুরুষের ভালোবাসা তার জীবনের একটি অংশ মাত্র, নারীর ভালোবাসা তার অস্তিত্বের পুরোটাই’। ভালোবাসার খাতিরে নারী-পুরুষ, কে কতটুকু উজাড় করে দিতে পারবে, সে প্রশ্ন বেশ জটিল ও অসমাধানযোগ্য হলেও, আমার ব্যক্তিগত মতামত, নারীরা অনেক ক্ষেত্রে নিরাপত্তাকে ভালোবাসা ভেবে ভুল করে থাকে।  যান এবুতার্ন (Jeanne Hébuterne: ৬ এপ্রিল ১৮৯৮ – ২৫ জানুয়ারি ১৯২০ ) ছিলো এর ব্যতিক্রম এবং বায়রনের কথাই সঠিক ছিলো তার ক্ষেত্রে । যান তাঁর সর্বস্ব উজাড় করে ভালোবেসেছিলো শিল্পী মদিলিয়ানীকে (Amedeo Clemente Modigliani: ১৮৮৪-১৯২০), যাকে তিনি ভালোবেসে ‘আমার মদি, আমোরে মদি’ বলে ডাকতো।

১৯২০ সালের ২৫ জানুয়ারী।  কনকনে শীতের শেষ রাতে, প্যারিসের বুকে তখনও তুষার জমে ছিলো হয়তো, নিদ্রাচ্ছন্ন শহরে, হিমশীতল থমথমে একটা পরিবেশ। মৃত্যুপূরী বললেও হয়তো ভুল বলা হবে না। কারণ একটি মৃত্যুশোক প্যারিস এখনও কাটিয়ে উঠতে পারেনি, আবার আরো একটি মৃত্যুর জন্য চির আমুদে প্যারিস প্রস্তুত ছিলো না সেই রাতে। ভাই আন্দ্রে এবুতার্ন তার আদরের ছোটো বোনটিকে পাহারা দিয়ে রেখেছিলো সারাক্ষণ। যানকে সে কোলের উপরে হাত রেখে বসে থাকতে দেখেছিলো জানালার পাশে, একদৃষ্টিতে বাইরের দিকে তাকিয়ে ছিলো সে শূন্য দৃষ্টি মেলে। বোনটি তার শান্ত হলেও জেদী স্বভাবের, সেজন্য স্বভাবের কোনো ভিন্নতা লক্ষ্য করেনি ভাই আন্দ্রে সেই রাতে। তবুও জানতো বোনের তরুণ প্রেমিক মন, সদ্য স্বামী হারানোর কষ্টকে সামলে নিতে পারবে না খুব সহজে। সে কারণে আন্দ্রে পাহারা দিয়ে রেখেছিলো বোনকে, কিন্তু শেষ রাতের দিকে তার দুই চোখও ক্লান্তিতে বুজে আসে। আন্দ্রে খেয়াল করেনি হয়তো, যানের চোখে ছিলো অদ্ভুত এক শূন্যতা, যেনো সে দেখতে পারছিলো মদির চলে যাওয়ার দৃশ্যটা। ঘাড়টা একটু বাকিয়ে সে তাকিয়ে আছে অজানা সেই গন্তব্যের দিকে । মদির চিত্রকলার মডেল হবার সময় যেভাবে চেয়ারে বা বিছানার পাশে বসে থাকতো,  ঠিক সেভাবে সে  বসেছিলো সারা রাত। যে পথে মদি হেঁটে গিয়েছে মাত্র একদিন আগে, যানও পা বাড়ায় সেই একই পথে। সে আর পারবে না মদিকে ছাড়া একা বেঁচে  থাকতে, সে পারবে না মদি থেকে বিছিন্ন হতে। চারতলার জানালা দিয়ে সে আকাশে পাখা মেলে দিয়েছিলো, অনন্তের দিকে নিঃশব্দে, নিভৃতে। প্যারিসের কোনো মানুষ তার চলে যাওয়াকে একটুও বুঝতে পারলো না। নিদ্রাচ্ছন্ন শহরটি আরো তলিয়ে গেলো নিস্তব্ধ অন্ধকারে। যান যাবার সময় সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলো গর্ভের আট মাসের অভূমিষ্ঠ শিশুটিকেও।

শিল্পী মোদিলিয়ানি (১২ জুলাই ১৮৮৪-২৪জানুয়ারি ১৯২০)

দরজায় টোকা দেবার শব্দে আন্দ্রে জেগে উঠেছিলো তার ঘুম থেকে, তড়িঘড়ি করে দরজা খুলে দেখে, আঙ্গিনায় পড়ে আছে, বোনের ক্ষতবিক্ষত শরীর। শরীর চিরে বের হয়ে গেছে তার অভূমিষ্ঠ শিশুটির কোমল শরীর। আন্দ্রে এই দৃশ্য কোনোভাবেই দেখতে দিতে চায়নি তাদের মাকে। আন্দ্রে বোনের লাশটিকে বাড়ীর আঙ্গিনা থেকে সরানো ব্যবস্থা করে। পরিবারের সদস্যরা ও কাছের অল্প কয়েকজন বন্ধুরা যানকে সমাধিস্থ করেছিল প্যারিস থেকে খানিকটা দূরে, ছোট্টো একটি সমাধিক্ষেত্র, সিমেতিয়ের দো বানইয়ো-তে, খুব নিরবে এবং খুব গোপনে। কেউ যেন জানতে না পারে। কারণ আত্মহত্যা ক্যাথলিকদের জন্য মহাপাপ, আরো বেশী, যদি সেটি ঘটে অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় । আর সেই সন্তান যদি হয় বিবাহপূর্ব ভালোবাসার ফসল, তাহলে তো সমাজে মুখোরোচক গল্পের জন্য কোনো উপাদানের অভাব হবে না। যানের বাবা-মা সারা জীবন তাদের মেয়ের এই নাটকীয়তাকে লুকিয়ে রাখতে চেয়েছিলেন, মদির জন্য তাদের মেয়ের ভালোবাসাকে স্বীকৃতি দিতে তারা সবসময়ই কুণ্ঠাবোধ করতেন। এমনকি ভাই আন্দ্রে, যে নিজেও একজন চিত্রশিল্পী, বোনের মৃত্যুর পর আর কোনো দিনও যানকে নিয়ে একটি বাক্যও ব্যয় করেনি । যদিও সে বেঁচেছিলো আরো বহু সময়, সফল চিত্রশিল্পী হিসেবে প্যারিসে কেটেছিল তার বাকিটা জীবন ।

যানের জন্ম প্যারিসে। একই শহরের মোপারনাস-এ ভাই আন্দ্রের হাত ধরে সে পা রেখেছিলো শিল্পকলার জগতে । সেখানে তার পরিচয় হয়েছিল সেই সময়কার অনেক চিত্রশিল্পীদের সঙ্গে। পরবর্তীতে যান ভর্তি হয়েছিল আকাদেমি কোলারসি’তে , যেখানে ভাস্কর শানা ওরলফ তাকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলো শিল্পী মদিলিয়ানির সঙ্গে। সেখানে মদি যেতো বিনামূল্যে মানব শরীরের রেখাচিত্র আঁকতে। খুব অল্পদিনেই, যান এবং মদি একজন আরেকজনের খুব কাছে চলে এসেছিলো। নিজেদের ভেতরটাকে চিনতে তাদের একটুও ভুল হয়নি। তারা দুজনে একসাথে বসবাস করা শুরু করে তারপরে শুরু হয় নিয়তির নিষ্ঠুরতার অধ্যায়। তাদের একের পর এক পার করতে হয় সেই সব কালো অধ্যায়গুলো, যদিও  শেষ রক্ষা করতে পারেনি নিজেদেরকে। যতটুকু সময় তারা পেয়েছিলেন জীবনের কাছ থেকে, পরস্পরের প্রেরণা হয়েই বেঁচে ছিলো।

মোদির তুলিতে আঁকা যান, ১৯১৭

যদিও যানের আগে মদির জীবনে আরো অনেক নারীদের উপস্থিতি এবং ঘনিষ্ঠতা ঘটেছিল । তারপরেও মদি যানের প্রতি যেমন তীব্র ভালোবাসা অনুভব করেছিলো, তেমন যানও মদিকে পাগলের মতো ভালোবাসতে শুরু করেছিল। মদির জীবনে নারীর ভালোবাসায় পূর্ণ ছিলো সর্বদা। রুশ কবি আনা আখমাতোভার সঙ্গেও মদির ছিলো সংক্ষিপ্ত কিন্তু গভীর সম্পর্ক । মদি আনার অনেক রেখা চিত্র নির্মাণ করেছিলো তাদের সম্পর্ক চলাকালীন সময়ে। ডাচ শিল্পী ভিনসেন্ট ভ্যান গো (১৮৫৩ – ১৮৯০) এবং ইতালিয়ান শিল্পী আমেদেও মদিলিয়ানির জীবন ও শিল্পকর্মের মধ্যে অনেক মিল খুঁজে পাওয়া যায়, আবার অমিলও কম নয় । তাদের মধ্যকার প্রধান যে সাদৃশ্য লক্ষণীয় সেটি হলো, তারা দুজনই মানুষ হিসেবে অসম্ভব সৎ এবং  সাহসী । শিশুসুলভ সরলতায় ভরা তাদের মন ও শিল্পকর্ম । তাদের দুজনের শিল্পকর্মই সাধারণ মানুষের হৃদয়ে পৌঁছে গেছে, সহজবোধ্যতার কারণে । অন্যদিকে অমিলের মধ্যে, মানুষ হিসেবে ভিনসেন্ট যেমন অস্থির, মদিলিয়ানি বোহেমিয়ান হলেও তাঁর মধ্যে অদ্ভুত এক স্থিরতা কাজ করতো। ঠিক ভিনসেন্টের বিপরীত, মদির জীবন ছিলো বহু নারীর প্রেমে সিক্ত, নারীরা তাকে পেলে লুফে নিতে দ্বিধা করতো না তাঁর আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের জন্য। তাঁর সৃজনশীলতার খ্যাতি ছিলো চারিদিকে। ভবঘুরে, একরোখা, দৃঢ় চরিত্রের অধিকারী এই শিল্পী পুরুষটি, নারীদের মধ্যে বেশ জনপ্রিয় ছিলো তাঁর সমসাময়িক সময়ে । এবং আমরা জানি ভিনসেন্টের ক্ষেত্রে ঠিক উল্টোটা ঘটেছিলো ।

মদি ও যানের প্রথম সন্তান ‘যান মদিলিয়ানি’র জন্মের পরে যান যখন আবারো অন্তঃসত্ত্বা হয়েছিলেন তার দ্বিতীয় সন্তানসহ। কিন্তু একদিনও সে বেঁচে থাকতে চায়নি মদিকে ছাড়া; যান  নামের সেই  সুন্দরী তরুণীর ভালোবাসায় মদির জীবন হয়েছে অমরশেষ পর্যন্ত। যান ছিলো ভিতরে ও বাহিরে অত্যন্ত সুন্দর একজন মানুষ। তাদের ভালোবাসাকে শ্বাশত করতে, যান মদিলিয়ানি মারা যাবার পরে আর এক মুহূর্তও বেঁচে থাকতে পারেনি; সেই শাশ্বত প্রেমের স্বপ্ন বুকে নিয়ে গর্ভের সন্তানকে নিয়ে আত্মহত্যা করেছিলো স্বামী মদির  সাথে  যোগ দেবেন বলে । এমন ভালোবাসা কোন পুরুষই না প্রত্যাশা করবে একজন নারীর কাছ থেকে! মদি যানকে এঁকেছেন অসংখ্যবার।  মদির চিত্রকলার বিষয়বস্তু মূলত মানুষ, তাদের প্রতিকৃতি। চিত্রকলা ও ভাস্কর্য ছিল মদিলিয়ানির প্রিয় মাধ্যম। ভ্যান গো’র মতো মদিলিয়ানি অসম্ভব জনপ্রিয় একজন শিল্পী। তবে মদিলিয়ানির জনপ্রিয়তা ঘটেছে স্বতঃস্ফূর্তভাবে। মিউজিয়ামে বিক্রি হয় তার কাজের হাজার হাজার পোস্ট কার্ড, তার একটাই কারণ,  মদিলিয়ানির সহজ সরল উপস্থাপনা। শিল্পকলার জগতে সরলীকরণের সর্বশ্রেষ্ঠ উদাহরণ  মদিলিয়ানির কাজ। মদিলিয়ানি তাঁর সংক্ষিপ্ত জীবনে যতগুলো চিত্রকর্ম সৃষ্টি করতে পেরেছেলে তার সবগুলোই আজ মাস্টারপিস। সে সব কাজের বেশীর ভাগই প্রতিকৃতি, নগ্ন এবং মানব অবয়ব। মদিলিয়ানির প্রতিকৃতি বা অবয়বের প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিলো তাদের বাঁকানো শরীর, রাজহাসের মতো অস্বাভাবিকভাবে লম্বা, বাঁকানো ঘাড়, এবং চোখ। মদিলিয়ানি মানুষের চোখকে মনের দরজার মতো ব্যবহার করেছে, কারো চোখ শূন্য, আর কারো চোখ কালো বা সম্পূর্ণ। মদিলিয়ানি তাঁর সামনে বসা মানুষটিকে ঠিক যেখাবে পড়তে পারতো তাকে তিনি সেই ভাবেই এঁকেছিলো। বলা হয়ে থাকে যদি কারো ভেতরটা মদিলিয়ানি পড়তে পারতো তবেই তার চোখ আঁকতো। মদিলিয়ানির চিত্রকলা দেখলে কবি পাবলো নেরুদার প্রেমের কবিতার সাথে মিল খুঁজে পাই আমি। এমন সাধারণভাবে অসাধারণ ও গভীর প্রেমের কথা আর কে বলে যেতে পেরেছে ? মদিলিয়ানির চিত্রকলা জাপানি হাইকুর মতো। আঁটসাঁট অল্প শব্দে, পুরো গল্পটা বলে দেয়া হয় যেখানে।

যানের আঁকা জলরং, ডেথ, ১৯১৯

মদিলিয়ানির শিল্পকলায় ভালোবাসার কথা বলা হয়েছে। সেই ভালোবাসা একপাক্ষিক। স্থির, অচল, যেমন, যান গভীর ভালোবাসা ভরা চোখ নিয়ে তাকিয়ে আছে মদির দিকে। মদি তাকে আঁকছে, তাদের দুজনকে একসঙ্গে দেখা যায় না কোনো চিত্রে। মদিলিয়ানি নিজেকেও চিত্রিত করেছে। রঙের ব্যবহারেও রয়েছে তার স্বতন্ত্রতা। মূলত ধূসর, মেরুন, বাদামী, কালো, ছাই রঙের ব্যবহার দেখা যায়। পার্থিব রঙের ব্যবহার সেখানে বেশী। খুব সহজ সরল কম্পোজিশনে করা তার শিল্পকর্মগুলো দেখলে মনে হয় যেন সে  জানতো তার জীবনের সময় খুব কম। খুব দ্রুত  এঁকে গেছে একের পর এক চিত্রকর্ম।  যানও শিল্পকলার শিক্ষার্থী ছিলো। মাত্র ২১ বছর বয়সের সংক্ষিপ্ত জীবনে তাদের ভালোবাসাটা বেড়ে উঠতে পারেনি শেষ পর্যন্ত।  মদিলিয়ানি শৈশব থেকেই রুগ্ন শরীরের ছিলো। মায়ের খুব কাছের ছিলো, মা তাকে অনেক আদরে বড় করেছিলেন, মা জানতেন ছেলে বড় হয়ে চিত্রশিল্পী হবে একদিন। নিয়তির পরিহাসে পরিবারের অর্থনৈতিক অবস্থার অবনতি হলেও, মদিলিয়ানিকে তাঁর মা অনেক কষ্টে শিল্পী হতে সাহায্য করেছিলেন শেষ পর্যন্ত।

যত সহজে মদিলিয়ানি আর যানের ভালোবাসার কথা বলা যায়, তত সহজ ছিল না তা মোটেও। অনাহারে, অর্ধহারে কাটিয়েছে মদি। অভুক্ত শিল্পী, উষ্ণতাহীন ঘরে যে দিনের পর দিন কাটিয়েছে, মদ্যপানে আসক্তি, ভালোবাসায় বুদ হয়ে এক প্রেমিক শিল্পীর জীবনের অবসান ঘটে। শৈশব থেকেই মদির টিউবারকিউলাস মেনিনজাইটিস ছিলো। সেটা আরো বাড়িয়ে দেয় তার অনিয়ম ও অবহেলা। পৃথিবীতে অল্প সংখ্যক শিল্পী, দারিদ্রতায়, অসুখে, কষ্টে ভুগে মৃত্যু বরণ করেছে  কিন্তু নিজের আত্মাকে বিকিয়ে দেয়নি । মদিলিয়ানি তাদের মধ্যে ছিলো অন্যতম একজন । যিনি শিল্পকলাকে করে গেছে সমৃদ্ধ, ভালোবাসাকে করে গেছে অমর ও উজ্জ্বল। শিল্পী ও প্রেমিকা হিসেবে কবি বায়রনকে অস্বীকার করবার মতো শক্তি হয়তো আমার হবে না। শিল্পী বা প্রেমিক হারিয়ে গেলেও ভালোবাসায় ভরা শিল্পকর্মগুলো রয়ে যায়, চিরকাল যা সাক্ষ্য বহন করে সেই পাগল করা ভালোবাসার কাহিনীগুলোকে।

একজন মানুষ জীবনের কাছে কি প্রত্যাশা করে ? একজন নারীই বা কি প্রত্যাশা করে বা  একজন শিল্পী ? হয়তো অনেকে অনেক কিছু অর্জন করে নেয়, পার্থিব সুখ, শান্তি, সম্পদ ও সফলতা। খুব অল্প সংখ্যক মানুষ ভালোবাসাকে বেছে নেয় জীবনের গভীর প্রশান্তির খোঁজে । এবং তার জন্য যে কোনো ধরনের ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত থাকে । সে ভালোবাসা পাওয়ার ভাগ্য কয়জনের থাকে ?  অনেকে হয়তো পেয়েও চিনতে ভুল করে বলে পাওয়া হয় না আর। অনেকে হয়তো পেলেও বুঝে ওঠার আগে, ঘটে যায় অনেক ঘটনা, গড়িয়ে যায় সময়।

মাদিলিয়ানি ও যানের সমাধি, পের লাশেজ, প্যারিস, ফ্রান্স

এমন সুতীব্র ভলোবাসাকে হয়তো প্রকৃতিও সফল হতে দেয় না। কারণ, সত্যিকারের ভালোবাসাতেই নিহিত আছে সমস্ত সমস্যার সমাধান। পৃথিবী সফল হতে দেয় না এমন ভালোবাসা, কারণ পৃথিবীতে তাহলে অশান্তি বলে কিছু থাকবে না। এছাড়াও মনে করা হয় মৃত্যুর পরে ভালোবাসার মানুষের সাথে পাড়ি জমাবে শাশ্বত ভালোবাসার রাজ্যে, সেখানেও বাধ সাধে মানুষের নিয়তি। মৃত্যুর পরেও সেই ভালোবাসাকে আপন করতে লেগে যায় আরো এক দশক। সেই নিষ্পাপ, গভীর, সত্যিকারের ভালোবাসা পাওয়ার  সৌভাগ্য হয়েছিলো মদির মতো এমন একজন প্রেমিক পুরুষের, যার প্রথম প্রেম ছিলো শিল্পকলা। যিনি আধুনিক  শিল্পকলায় দিয়ে গিয়েছে, শিশু সুলভ সরলতার ছোঁয়া। যার সহজ, সরল, সাবলীল রেখা ছুঁয়ে যায় প্রেমিক মন। যে প্রেম শিল্পের জন্যে ও যে প্রেম ভালোবাসার জন্যে । যানের মৃত্যুর এক দশক পরে তাঁর দেহাবশেষকে স্থানান্তরিত করা হয়, পের লাশেজ সমাধিক্ষেত্রে। প্রিয় মদির সমাধির পাশে যানকে শুইয়ে দেয়া হয় চিরকালের মতো, আর তাঁর সমাধি ফলকে খোদাই করে দেয়া হয়- “‘চূড়ান্ত আত্মবিসর্জনে যে একনিষ্ঠ সঙ্গী”’।