বিশ্বের শীর্ষ বিজ্ঞানীর তালিকায় ড. মাহমুদ ও তাঁর সাক্ষাৎকার

  •  
  •  
  •  
  •  

ড. মোহাম্মদ মাহমুদুর রহমান সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রকাশিত বিশ্বের দুই শতাংশ শীর্ষ বিজ্ঞানীর তালিকায় স্থান পেয়েছেন। বর্তমানে তিনি অস্ট্রেলিয়ার নিউক্যাসল ইউনিভার্সিটিতে সিনিয়র রিসার্চ ফেলো হিসেবে কাজ করছেন। এর আগে ছিলেন ইউনিভার্সিটি অব সাউথ অস্ট্রেলিয়ায়। রসায়ন শাস্ত্র নিয়ে পড়াশুনা করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। পিএইচডি করেছেনে ভারতের যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে। অস্ট্রেলিয়ায় তাঁর তত্ত্বাবধানে পিএইচডি করছেন বা করেছেন প্রায় ১৪ জন বাংলাদেশী ছাত্র ছাত্রী । কাগজে কলমে তিনি ড. মাহমুদ হলেও বন্ধু ও পরিজনেরা তাঁকে ভালোবেসে পল্লব নামে ডাকেন। স্ত্রী কবিতা এবং মেয়ে রিতি ও ছেলে রিশভকে নিয়ে বাস করছেন সিডনির অদূরে নিউক্যাসল শহরে। আমরা প্রশান্তিকার পক্ষ থেকে কৃতি এই বিজ্ঞানীর মুখোমুখি হয়েছিলাম। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন প্রশান্তিকা সম্পাদক আতিকুর রহমান শুভ।

ড. মোহাম্মদ মাহমুদুর রহমান, নিউক্যাসল ইউনিভার্সিটি, অস্ট্রেলিয়া।

প্রশান্তিকা: সম্প্রতি স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রকাশিত বিশ্বব্যাপী বিজ্ঞানীর তালিকায় আপনারনাম এসেছে। আমরা আপনাকে নিয়ে গর্ব বোধ করি। এই অর্জনকে আপনি কিভাবে দেখছেন?

ড. মাহমুদ: সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটি ৭ মিলিয়ন সায়েন্টিষ্টদের নিয়ে বিজ্ঞানের ২২টি প্রধান শাখার ওপর ভিত্তি করে এবং বিভিন্ন সূচক নির্নয় করে (১৯৯৬-২০১৯ গবেষনার ডাটা ব্যবহার করে) ১৬০,০০০ উচ্চ প্রভাবশালী বিজ্ঞানীদের তালিকা প্রকাশ করেছে। এই তালিকায় আমার নাম দেখে খুব আনন্দিত হয়েছি। একজন বাংলাদেশী হিসেবে বিশ্বের শীর্ষ ২% Scientist list এ জায়গা করে নেওয়াটা অবশ্যই গর্বের। আমি মনে করি পরিশ্রম এবং অধ্যাবসায় থাকলে অনেক কৃতি বাংলাদেশী গবেষক বা বিজ্ঞানীরা এই তালিকায় স্থান করে নেবেন। এর জন্য আমাকে সামাজিক ও পারিবারিক ভাবে অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে। এটা একটা মানদন্ড এবং এটাকে Maintain করতে হলে আমাকে আরও পরিশ্রম করতে হবে, গবেষণায় সময় দিতে হবে যাতে আমি এই কোয়ালিটি Maintain করতে পারি। আমাদের রিসার্চ সেন্টার হতে ৪ জন Scientists এই তালিকায় স্থান করে নিয়েছে, তার মধ্যে ৩ জনই অনেক নামকরা প্রফেসর এবং আমি একজন Mid-Career Scientist হয়েই এটা পেয়েছি।

প্রশান্তিকা: বিজ্ঞানী হিসেবে আপনার নিজের ক্যারিয়ারের ধাপ সম্পর্কে জানতে চাই।

ড. মাহমুদ: আমি বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অফ নিউক্যাসল এর গ্লোবাল সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল রেমিডিয়েশন (GCER)-এ সিনিয়র রিসার্চ ফেলো হিসেবে কর্মরত আছি। পূর্বে (২০০৪-২০১৫) আমি ইউনিভার্সিটি অফ সাউথ অস্ট্রেলিয়াতে গবেষণায় নিয়োজিত ছিলাম। আমি মূলত এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স এবং এগ্রিকালচারালের বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণায় নিয়োজিত। আপনারা জানেন, বাংলাদেশে আর্সেনিক দূষণ বিশ্বের সবচেয়ে বেশী গুরুতর। সেই লক্ষ্যে আমি ২০০০ সাল হতে এই বিষয়ে গবেষণা শুরু করি এবং এ বিষয়ে একজন গবেষক হিসেবে বিশ্বে অধিক পরিচিত। আমার অনেক গবেষণা বিশ্বের অসংখ্য নামকরা জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। বর্তমানে আমার ১৪০ টির অধিক গবেষণাপত্র আছে। আমার প্রকাশিত গবেষনাপত্র ৮০০০ বারের মত সাইটেশন হয়েছে। আমার এইচ ইনডেক্স (সূচক, যা একজন গবেষক এর গবেষনায় নিবন্ধ হার এবং সাইটেশন ইনডেক্স নির্নয়ে ব্যবহৃত হয়) ৪৫, যা অনেক নামকরা অস্ট্রেলিয়ান Professor এরও নেই। আমার প্রকাশিত গবেষণা অন্য গবেষকদের কাজে ব্যবহৃত হয়েছে। বর্তমানে আমি ৯ জন বাংলাদেশী ছাত্র-ছাত্রীর পিএইচডি গবেষণার সুপারভাইজার হিসেবে নিয়োজিত আছি। আমি বাংলাদেশী ছাত্র ছাত্রীদেরকে পিএইচডি কোর্সে অস্ট্রেলিয়াতে প্রমোট করে থাকি। এ পর্যন্ত ১৪ জন বাংলাদেশী ছাত্র ছাত্রী আমার সাথে গবেষণায় নিয়োজিত আছেন বা ছিলেন।

ড. মাহমুদের তত্ত্বাবধানে গবেষণায় নিয়োজিত রয়েছেন অসংখ্য বাংলাদেশী ছাত্র- ছাত্রী।

প্রশান্তিকা: স্ট্যানফোর্ড শীর্ষ বিজ্ঞানীদের তালিকায় আপনার কোন বিষয়টিকে সবচেয়ে গুরুত্ব দিয়ে দেখেছে বলে আপনি মনে করেন?

ড. মাহমুদ: একজন গবেষকের আজীবন সাইটেশন ইনডেক্স নির্নয় করে এই তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে বলে আমরা ধারনা করতে পারি। অর্থাৎ একজন সায়েন্টিষ্টদের গবেষণা নিবন্ধগুলো অন্য সায়েন্টিষ্টরা তাদের গবেষণার কাজে কতবার ব্যবহার করেছে সেটাকে ভিত্তি করে এই তালিকা প্রকাশিত হয়েছে। এখানে Self-citation exclude করা হয়েছে।

প্রশান্তিকা: আমরা জানি বিশ্বের নামকরা জার্নালে আপনার অনেক আর্টিকেল প্রকাশিত হয়েছে সে সম্পর্কে জানতে চাই।

ড. মাহমুদ: বর্তমানে আমার ১৪০ টির অধিক গবেষনাপত্র বিশ্বের বিভিন্ন হাই ইমপ্যাক্ট জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি জার্নাল হচ্ছে-
Chemical Society Reviews (IF 42.846, 2/177 in Chemistry); Water Research (IF: 9.130, 6/277 in Environmental sciences); Journal of Hazardous Materials Research (IF: 9.038, 8/277 in Environmental sciences); Environmental Health Perspectives (IF 8.382, 11/277 in Environmental sciences); Environment International (IF: 7.757, 18/277 in Environmental sciences); Environmental Science and Technology (IF 7.864; 15/277 in Environmental sciences); Bioresource Technology (IF 7.539, 12/156 in Biotechnology and Applied Microbiology); Talanta (IF 5.339, 11/86 in Chemistry, Analytical); Molecular Nutrition and Food Research (IF 5.309, 8/139 in Food Science and Technology); Journal of Analytical Atomic Spectrometry (IF 3.498, 5/42 in Spectroscopy) etc.

প্রশাম্তিকা: আপনার বালকবেলা, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে জানতে চাই।

ড. মাহমুদ: আমি মুন্সিগঞ্জ জেলার লৌহজং থানার মেদিনী মণ্ডল গ্রামে ( পদ্মাসেতুর নিকটবর্তী) একটি মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করি। আমাদের এলাকার অধিকাংশ মানুষ বিভিন্ন ব্যবসার কাজে নিয়োজিত বিশেষ করে ঢাকায় ইসলামপুরে কাপড়ের ব্যবসা। আমার বাবা বদলি চাকরির সুবাদে দেশের বিভিন্ন জায়গায় কাজ করেছেন। তাই এরকম একটা পরিবেশ থেকে আমাদের ৭ ভাই বোনকে পড়াশোনা করানো আমার মায়ের জন্যে একটা বিরাট চ্যালেঞ্জ ছিলো। আল্লাহর রহমতে আমরা সব ভাই বোন সম্মানসহ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করতে পেরেছি। এর পুরো কৃ্তিত্ত্ব আমি আমার মাকে দিতে চাই।
বালক বেলা- মেদিনী মণ্ডল গ্রামে।
হাই স্কুল- খিলগাঁও মডেল স্কুল, ঢাকা
কলেজ- ঢাকা সিটি কলেজ।
বিশ্ববিদ্যালয়- রসায়ন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
পিএইচডি – যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়, ভারত।

প্রশান্তিকা: আপনার পরিবার সম্পর্কে জানতে চাই।

ড. মাহমুদ: স্ত্রী কবিতা ও ২ সন্তান ( কন্যা রিতি ও পুত্র রিশভ) কে নিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় (প্রথমে অ্যাডিলেডে এবং পরবর্তীতে নিউক্যাসলে) ২০০৪ সাল থেকে বসবাস করছি।

স্ত্রী কবিতা, কন্যা রিতি এবং পুত্র রিশভের সঙ্গে ড. মাহমুদ।

প্রশান্তিকা:অস্ট্রেলিয়ার নামকরা বিশ্ববিদ্যালয় নিউক্যাসেলে কাজ করছেন বহুদিন। সেই আলোকে যদি বলেন-বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা এতো কম হয় কেন? যে কারণে কি বিশ্ব ranking এ আমরা পিছিয়ে পড়ছি? 

ড. মাহমুদ: ধন্যবাদ। আমি গত ১৭ বছর যাবৎ অস্ট্রেলিয়ার দুটি বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতার আলোকে একটা কথা বলতে চাই যে, QS Ranking of University সাধারনত গবেষণা নিবন্ধ, প্রজেক্ট ফান্ডিং এগুলোর উপর নির্ভর করে। উন্নত বিশ্বে শিক্ষকতা ৪০% এবং গবেষণা ৬০% এবং প্রতি বছর Academic দের Performance এর Review হয়। ফলে একটা জবাবদিহিতা থাকে।
বাংলাদেশের গবেষণা নিয়ে বলতে হয়-আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামোগত ও মনমানসিকতার পরিবর্তন করতে হবে। আমাদের মেধা আছে এবং এখন অনেক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক উন্নত মানের যন্ত্র আছে যা দিয়ে উন্নত গবেষণা এবং উচ্চমানের গবেষণা নিবন্ধ তৈরি করা সম্ভব। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় গবেষণা খুবই সীমিত, যদিও আমি মনে করি Master এ Thesis এ আমাদের গবেষণার হাতে খড়ি হয়। কিন্তু আমরা উচ্চমানের গবেষণার জন্য Training পাই না, যেহেতু PhD হচ্ছে গবেষণার Training এবং আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোতে PhD ছাড়াই Job পাওয়া যায় এবং তাদেরকে কোন মানদন্ড বেধে দেয়া হয় না ( অর্থাৎ প্রতি বছর একজন শিক্ষক কতগুলো গবেষণা নিবন্ধ উচ্চ প্রভাব মানের / Impact Factor Journal–এ প্রকাশিত করা, কতজন Student Supervision এবং কত প্রজেক্ট ফান্ড আসছে তার উপর ভিত্তি করে প্রমোশন হবে)। যেহেতু আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় গবেষণার Training নেই (PhD), তাই আমাদের গবেষণাও অনেক কম হয় এবং কোনো জবাবদিহিতা নেই। একারণে আমরা অনেক দেশ থেকে পিছিয়ে পড়েছি। যদিও বাংলাদেশে গবেষণার অনেক সুযোগ রয়েছে। অনেক বাংলাদেশী বিজ্ঞানী উন্নত দেশে গবেষণায় নিয়োজিত রয়েছেন। বাংলাদেশ তাদের মেধাকে কাজে লাগাতে পারে, তাদের সহযোগিতায় গবেষণার মান উন্নত করতে হবে। আমরা আশাবাদী অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশে সেই চর্চার অনুশীলন হবে।

প্রশান্তিকা: আপনার উত্তরোত্তর সাফল্য কামনা করি। প্রবাসে বা দেশে আপনি বাংলাদেশের মুখ উজ্জ্বল করেছেন। আপনার এই প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকুক- এই প্রত্যাশা করি। প্রশান্তিকাকে এতক্ষণ সময় দেবার জন্য আপনাকে অশেষ ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা।

ড. মাহমুদ: আমি গবেষণায় নিয়োজিত রয়েছি। আমার অধীনে রিসার্চ করছেন অধিকাংশই বাংলাদেশের ছাত্র-ছাত্রী। যে কোন কাজে আমি বাংলাদেশ বা দেশের মানুষের উপকার করতে ভালোবাসি। প্রশান্তিকার পুরো টীম এবং আপনাকেও ধন্যবাদ।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments