বি ডি আর কিলিং; শেষ কফিনে শেষ পেরেক-এ এফ এম এনায়েত উল্লাহ

  •  
  •  
  •  
  •  

জন্মের শুরু থেকেই বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি দুর্ভাগ্যজনকভাবে আজন্ম শত্রুর কোপানলে পড়ে। ঘরে বাইরে ষড়যন্ত্রের নিপুণ নীল নকশা যেনো এই রাষ্ট্রের এক করুণ বিধিলিপি। বিশ্বের মানচিত্রে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় তাই প্রকাশ্য এবং অপ্রকাশ্য শত্রুর জন্য পরাজয়ের এক অনিঃশ্বেষ মনোবেদনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সম্ভবতঃ একারণেই সর্বপ্রথম আঘাত আসে এই নবীন রাষ্ট্রের একগুঁয়ে, নিরাপোস স্রষ্টা বংগবন্ধু শেখ মুজিবের ওপর। তারপর জেলখানায় জাতীয় চার নেতা। নবীন এই রাষ্ট্রটিকে রাজনৈতিক নেতৃত্বশূন্য করার পালা শেষ হওয়ার পর শুরু হয় নিধণের দ্বিতীয় পর্বের ট্র্যাজেডি। আর এবারের টার্গেট সশস্ত্র স্বাধীনতা যুদ্ধের মাধ্যমে গঠিত আমাদের গর্বিত সেনাবাহিনী।
একক গোষ্ঠী হিসেবে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এর সদস্যরা। পরস্পরের প্রতি ভ্রান্তিময় অবিশ্বাস, ব্যক্তিগত উচ্চাবিলাস এবং দেশী-বিদেশী শত্রুর ভয়ানক ক্রীড়নকের ভুমিকা এ গোষ্ঠীর বিপুল প্রাণশক্তিকে ক্রমাগত নিঃশেষ করেছে। ভাইয়ের বিরুদ্ধে ভাইকে, বন্ধুর বিরুদ্ধে বন্ধুকে লেলিয়ে দিয়ে একে অন্যের হৃদপিন্ডকে টার্গেট করে গুলি ছোঁড়াছুড়ি হয়েছে দীর্ঘদিন। ফলে সেনাছাউনিতে মৃত্যুর মিছিলে সংখ্যা শুধু বৃদ্ধি পেয়েছে দিনের পর দিন।
বিয়োগের এই ক্রমঃধারাবাহিকতায় ফাঁসিতে ঝুলানো হয়েছে সক্রিয় যুদ্ধে অংশ নিয়ে পা হারানো পঙ্গু কর্ণেল তাহেরকে, স্টেনগানের ব্রাশফায়ারে ঝাঁঝরা হয়েছেন মুক্তিযুদ্ধকালে জেড ফোর্সের অধিনায়ক জেনারেল জিয়া, প্রতিশোধ নিতে একদম কাছ থেকে ঠান্ডা মাথায় করোটীতে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে সেনাবাহিনীর বুদ্ধিজীবী খ্যাত জেনারেল মঞ্জুরকে। বিপ্লব, বিশ্বাসঘাতকতা আর উচ্চাভিলাষের শিকার হয়েছেন গেরিলা যুদ্ধের অন্যতম রুপকার এবং কে ফোর্সের অধিনায়ক জেনারেল খালেদ মোশাররফ, কর্ণেল হুদা, মেজর হায়দারসহ অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধা অফিসার। পাশাপাশি বিচারের নামে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করা হয়েছে ব্রিগেডিয়ার নওয়াজিশ সহ আরো অনেক দেশপ্রেমিক তেজী মুক্তিযোদ্ধা অফিসারকে।
বিপ্লব প্রতিবিপ্লব, ক্ষমতারোহণ এবং ক্ষমতা হরণ, ক্যূ-পালটা ক্যূ ইত্যাদি নানাবিধ গর্হিত, অন্যায্য কর্মে লিপ্ত হয়ে আমাদের সেনাবাহিনী একদিকে নিজেদের ভাবমূর্তিকে যেমন অনুজ্জ্বল করেছে তেমনি নিজেদের অমিত শক্তিকে ক্রমাগত ক্ষয় করেছে। অপচয় করেছে অবুঝ অবিবেচকের মতো। তবে লক্ষ্যনীয় বাস্তবতা হচ্ছে হত্যার এই ক্রম-পরিক্রমার শিকার হয়েছেন বিশেষতঃ মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশ নেওয়া দেশপ্রেমিক সদস্যরা। কেন এই অংশকে টার্গেট করে একে একে নিঃশেষ করার যাবতীয় আয়োজন করা হয়েছে তা হয়তো একদিন নিষ্ঠাবান সত্যনিষ্ট গবেষণায় উন্মোচিত হবে।
তবে এই শবযাত্রার শেষ কফিনে শেষ পেরকটি সম্ভবতঃ ঠোকা হয় ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০০৯-এ বিডিআর কিলিং মিশনের মাধ্যমে। সেনাছাউনীর শান্ত স্থিতিশীলতা, দেশে বিদেশে ধারাবাহিক প্রশংসা এই বাহিনীর চরিত্র্কে যখন গৌরবান্বিত করছে দিনে দিনে, ঠিক তখনি দীর্ঘদিন বাদে ঘটে সর্বনেশে বিডিআর হত্যাযজ্ঞ। যে গোপন শত্রু আমাদের সেনাবাহিনীর জন্মক্ষণ থেকে প্রতিশোধ আর ধ্বংসের মিশন নিয়ে পিছু নিয়েছে, তা্র শেষ(?)মরণ কামড় এই দিনে। পরস্পরের প্রতি এতোটা ঘৃণা কারা উগড়ে দিয়েছে, এমন জঘন্য ভয়াবহ প্রতিশোধ স্পৃহা কারা সঞ্চারিত করেছে সাধারণ সৈনিকদের মনে তা জানা আমাদের উচিৎ। নয় মাসের স্বাধীনতা যুদ্ধেও এতো সেনা কর্মকর্তার এমন একত্র নৃশ্বংস মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি। কেন তবে এমন মর্মান্তিক ঘটনা সংঘটিত হলো, কারা ঘটালো, এর নেপথ্যের কুশীলব কারা- রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য সেসব জানা আমাদের অধিকারেরর অন্তর্গত।
আমাদের জাতীয় ইতিহাসের অনেক ঘটনা-দুর্ঘটনা এখনও ধোঁয়াশাক্রান্ত, অমীমাংসিত এবং অসমাপ্ত। সমসাময়িক বিশ্বে বিরল ইতিহাস-কাঁপানো বিডিআর ট্র্যাজেডী এমনই একটি দূর্ঘটনা। আমাদের মুক্তির যুদ্ধে সেনাবাহিনীর উজ্বল ভাবমূর্তিকে নিষ্প্রভ করার যে ধারাবাহিক অপপ্রয়াস এবং নানা অজুহাতে সম্ভাবণাময় দেশ-প্রেমিক কর্মকর্তাদের নিধণের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা, বিডিআর হত্যাযজ্ঞ সে পরিকল্পনার সফল সমাপ্তি রেখা।
২৫ ফেব্রুয়ারি বিডিআর হত্যাযজ্ঞ দিবস। এই দিনে আমাদের বীরদের স্মরণ করি গভীর শ্রদ্ধায়।
কাপূরুষেরা বার বার মরে। বীরেরা মৃত্যঞ্জয়ী।

এ এফ এম এনায়েত উল্লাহ
প্রতিষ্ঠাতা, পিদিম পাঠাগার; সম্পাদক, প্রত্যয়।