বুড়িগঙ্গার আদ্যোপান্ত – দীপংকর গৌতম

  •  
  •  
  •  
  •  

 175 views

[ দীপংকর গৌতম: কবি, প্রাবন্ধিক, গবেষক। জন্ম গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায়। ঢাকা থেকে প্রকাশিত একটি দৈনিকে কর্মরত । বাংলাদেশের বামপন্থী রাজনীতির সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের সঙ্গে ঘনিষ্টভাবে যুক্ত। লিখেন দেশ-বিদেশের কাগজে। কবিতা, প্রবন্ধ, অনুবাদ, গবেষণাসহ প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ১৬।  সাংবাদিকতা ও সাহিত্যের জন্য পেয়েছেন একাধিক পুরস্কার। ই-মেইল : dipongker@gmail.com,]

বুড়িগঙ্গা নিয়ে কিংবদন্তি রয়েছে। বুড়িগঙ্গার নাম ছিলো গঙ্গা। পরশুরামের হাত থেকে কুঠার ছুটে যায় প্রমত্তা ব্রহ্মপুত্র নদে। ব্রহ্মপুত্রের সন্তান শীতলক্ষ্যা খবর পায় একদিন, ঢাকাসংলগ্ন এক অপরূপা নদী আছে,  নাম গঙ্গা। শীতলক্ষ্যার সাধ জাগে গঙ্গাকে বিয়ে করার। তাই বীর পরাক্রমে সে ইছামতি নদী পথে আসতে থাকে গঙ্গার দিকে। কিন্তু গঙ্গা এ বিয়েতে রাজি নয়। তাই সে জরাজীর্ণ বৃদ্ধা সেজে থাকে। বুড়ি সেজে থাকার কারণে গঙ্গার নাম হয় বুড়িগঙ্গা। গঙ্গা এই  বুড়িগঙ্গা থেকে আলাদা হয়ে গেছে অনেক আগেই। গঙ্গোত্রী হিমবাহ থেকে জন্ম নেয়া সেই গঙ্গার সঙ্গে লেনদেন চুকে গেলেও নামের সঙ্গে গঙ্গা শব্দটি কয়েক শ’ বছর ধরে জুড়ে রেখেছে এই নদী। বুড়িগঙ্গার তীরেই  এক সময় গড়ে উঠতে থাকে জমজমাট ঢাকা নগরী।

মোঘলদের খুব প্রিয় ছিলো বুড়িগঙ্গা নদী। তাই এ নদীর তীরে ঘেঁষে গড়ে উঠা এই জনপদকে আরেকটু রাঙিয়ে দিতে রাতে নদীতীরে আলোকসজ্জার ব্যবস্থা করেছিলেন মোঘল সুবাদার মুকাররম খাঁ। বর্ষাকালে এই নদীতীরের জনপদকে জলমগ্ন ভেনিস নগরীর সঙ্গে গুলিয়েফেলতেন অনেক ইউরোপিয়ান বণিক। এমনকি গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকেও বুড়িগঙ্গার স্বচ্ছ পানি ঢাকার সেই আদি জনপদকেই বিনামূল্যে ভেনিস দেখার ব্যবস্থা করে দিতো। ঢাকার নদীতীরের স্থানের নামের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে নদীর ইতিহাস। নদীর অদূরে এখন যেখানে ‘নারিন্দা’, ঢাকার ইতিহাসে আদিকালে সেই এলাকার নাম ছিলো ‘নারায়ণদিয়া’ বা ‘নারায়ণদি’।

মোঘল আমল থেকেই নদীকে ঘিরে গড়ে ওঠা ঢাকা শহরের উন্নয়ন করা হয়েছিলো। কিন্তু সেই আমলের খরস্রোতা বুড়িগঙ্গার তীরে স্থায়ী বসতি স্থাপন করা ছিলো বেশ মুশকিল। তাই ঢাকার কমিশনার চার্লস থমাস বাকল্যান্ড বুড়িগঙ্গার তীরে বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা নিলেন। ১৮৬৪ সালের সেই সময়টাতে তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন নদীর তীরে যে বাড়িঘরগুলো আছে তাদের সামনের দিক অনেকখানি বাঁধাই করে দেয়া হবে। এতে নদীর পাড় দেখতে অনেকটা স্ট্যান্ডের মতো দেখাবে। কেমন দেখাবে, তার চেয়ে বড় কথা ছিলো এই বাঁধ কাজ করবে কি না। বাঁধের শুরু হওয়ার পর দেখা গেলো নদীর পাড় পুরোপুরি বাঁধিয়ে দিলে শহরের লেভেল নদী থেকে বেশ উঁচুতে থাকবে। প্রথম বছর বাঁধ হাঁটিহাঁটি পা পা করে নর্থব্রুক হল ঘাট থেকে ওয়াইজঘাট পর্যন্ত এগিয়ে যায়।

ঢাকার বেশ কিছু লিখিত ইতিহাস থেকে জানা যায়, সরকারিভাবে পুরো বাঁধ নির্মাণের খরচ কুলিয়ে উঠতে না পারায় ঢাকার ধনী ব্যক্তিরা বাঁধ নির্মাণে সহায়তা করার জন্য এগিয়ে আসেন। সেটাই  বাকল্যান্ড বাঁধ। বাকল্যান্ড বাঁধ এক সময় শহরের বিত্তবানদের বৈকালিক ভ্রমণের জায়গা ছিলো। কালক্রমে দিনবদল হয়েছে। দখল-দূষণে বুড়িগঙ্গা এখন নিশ্বাস ছাড়তে পারছে না। একদিনের প্রমত্তা বুড়িগঙ্গা এখন বাংলাদেশের সবচেয়ে দূষিত নদী। অবশ্য পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) চেয়ারম্যান আবু নাসের খান মনে করেন, ঢাকার উপকণ্ঠের নদীগুলো সবচেয়ে বিপন্ন। ঢাকার চার পাশের গুরুত্বপূর্ণ চারটি নদী- বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, বালু ও তুরাগ অব্যাহতভাবে দখল ও দূষণের শিকার হচ্ছে। প্রভাবশালীদের দখলে ছোট হয়ে গেছে এই চার নদী। নদীগুলো দখলমুক্ত করতে মাঝে-মধ্যেই অভিযান চালানো হয়।

কিন্তুঅভিযান শেষ করার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ফের আগের অবস্থায় ফিরে যায়। বর্জ্য নিষ্কাশনের অব্যবস্থাপনার কারণে নদীগুলোর পানি দূষিত হচ্ছে। কলকারখানার রাসায়নিক বর্জ্যও দূষণের অন্যতম কারণ। মোঘল, ব্রিটিশ আর পাকিস্তান আমল পেরিয়ে গেছে। বুড়িগঙ্গার সন্তান ঢাকার বয়স ছাড়িয়ে গেছে ৪০০ বছর। বাকল্যান্ড বাঁধের তীরে গড়ে উঠা এই শহরের উন্নয়নের জঞ্জাল এই নদীকে একটু একটু করে ধ্বংস করে দিয়েছে। চামড়া শিল্পে বাংলাদেশ পৌঁছে গেছে এক অনন্য উচ্চতায়। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে চামড়া রপ্তানিতে বাংলাদেশ এক বিলিয়ন মার্কিন ডলারের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়েছে। কিন্তু এই চামড়া শিল্পের মেরুদণ্ড হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা হাজারীবাগের ট্যানারিগুলো থেকে অশোধিত বর্জ্য এসে পড়ছে বুড়িগঙ্গায়।

বুড়িগঙ্গার পাশ দিয়ে যেখানে হেঁটে যাওয়াই মুশকিল, সেখানে কি আদৌ কোনো প্রাণীর বেঁচে থাকা সম্ভব? সদরঘাট সহ বিভিন্ন এলাকার পানির নমুনা সংগ্রহ করে দেখা যায়, দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা আশঙ্কাজনকহারে কমে গেছে, বেড়ে গেছে বিষাক্ত পদার্থের পরিমাণ। শুধু দ্রবীভূত অক্সিজেন নয়, পানির বিশুদ্ধতা নির্ণয়ে যত ধরনের সূচক আছে সব সূচকেই বুড়িগঙ্গার পানি জলজপ্রাণী বসবাসের অনুপযোগী। এই পরিমাণ বিষাক্ত পদার্থ আর ভারী ধাতুর অভয়ারণ্যের মধ্যে কোনো জলজপ্রাণীর পক্ষে বেঁচে থাকা আসলেই কঠিন। মাছ তো দূরে থাক, সাধারণ অন্য কোনো জলজপ্রাণীর অস্তিত্বও চোখে পড়ে না এই নদীতে।

২০১৮ সালের ২৭ অক্টোবর বাপা আয়োজিত এক সম্মেলনে পরিবেশবিদরা বলেন, নদীতে ব্যাপক শিল্পবর্জ্য ফেলার কারণে পানি আজ দূষিত হতে হতে বিষময় হয়ে উঠেছে।  নদীর আশপাশে যারা বাস করে, লাখ লাখ মানুষ পরিবেশ দূষণের শিকার হয়ে জন্ডিস, ডায়রিয়া, উচ্চ রক্তচাপ, মূত্রনালী ও কিডনিজনিত রোগ, চর্মরোগসহ ক্যান্সারের মতো ভয়াবহ রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ছে। ফলে বিষাক্ত তরল বর্জ্যে জনজীবন হয়ে পড়েছে বিপন্ন। বিষাক্ত বর্জ্যে নদ-নদীর পানির স্বাভাবিক রঙ পাল্টে গেছে।

দেখা দিয়েছে মাছের মড়ক। বিষাক্ত বর্জ্যের বিষক্রিয়ায় আবাদি জমির ফসলের ফলনও অনেকগুণ কমে গেছে। এককালে রাজধানীর পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া এসব নদ-নদী এলাকার আশীর্বাদ ছিল। এখন অভিশাপে পরিণত হয়েছে। নষ্ট হয়ে গেছে জমির উর্বরতা। ধ্বংসের পথে মৎস্য ও পানিসম্পদ। এছাড়াও বিষময় এ পানিতে তরি-তরকারি, শাক-সবজি ধোয়ায় নীরবে জনস্বাস্থ্য নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। তারপরও এই নদীর উপর মানুষের নির্ভরতা কতোটা, তা না দেখলে বোঝার উপায় নেই। দেশের দক্ষিণাঞ্চলের বড় বড় জাহাজসদৃশ জলযান এখানেই এসে ভিড় করে। এটাই তাদের ঘাট- সদর ঘাট । দেশজুড়ে সদরঘাটের খ্যাতি। খ্যাতি বুড়িগঙ্গারও আছে। কিন্তু সে খ্যাতির অভিজ্ঞতা ভালো নয়। দক্ষিণাঞ্চল থেকে যারা ঢাকায় আসেন, তারা সবাই রাতে ঘুমিয়ে ঢাকায় আসেন। ধলেশ্বরীতে পড়তেই তাদের অধিকাংশের ঘুম ভেঙে যায়। কারণ বুড়িগঙ্গার পানিতে দুর্গন্ধ।

এক সময় এই বুড়িগঙ্গায় ইলিশ মাছসহ বিভিন্ন রকমের মাছ পাওয়া যেত। কেরানীগঞ্জের জেলে পাড়ায় গেলে এখনও এসব গল্প শোনা যাবে। কিন্তু এখন সেসব রূপকথার মতো মনে হয়। দখল-দূষণে বুড়িগঙ্গা এখনবুড়িয়ে গেছে। বড় বড় জলযান এখানে ঘোরানো কষ্ট। অনেক জলযানের ব্যস্ততা চলে ভোর থেকে সকাল আর বিকের থেকে রাত ১১ টা।তারপর জড় নীরবতা নেমে আসে। এসময়ে নৌকা চলাচল করে স্বাচ্ছন্দ্যে। কেরানীগঞ্জের মানুষেরা সাধারণত বুড়িগঙ্গা পার হয়ে নিজ এলাকায় যায়। ওয়াইজঘাট,বাবুবাজার ব্রিজ বা বুড়িগঙ্গা সেতু পার হতে সময় অনেক বেশি লাগে। এছাড়াও অর্থ বাঁচাতে এ অঞ্চলের মানুষ নিয়মিত জীবনের ঝুঁকি নেয়। এদিকে স্বল্প আয়ের মানুষের আধিক্য। গাড়িতে গেলে খরচ বেশি, তাই তারা নৌকায়, ট্রলারে যায়। এজন্য তারা বেছে নেয় বুড়িগঙ্গার ঘাট। সদরঘাটের আশপাশে প্রায় অর্ধশতাধিক নৌকার ঘাট। এসব ঘাট থেকে নৌকাযোগে নদী পারাপার হচ্ছে এ অঞ্চলের মানুষ। এর মধ্যে নৌ বন্দরের বুক চিরে যেসব নৌকা অপর পারে যায়, ঝুঁকিতে বেশি তারাই। আজ (২৬ জুন) দৈনিক জাগরণে প্রকাশিত এক খবরে দেখা গেছে, পুরনো ঢাকার প্রধান নদীবন্দর সদরঘাটের খেয়াঘাটে নৌকা পারাপারের ক্ষেত্রে নৌযান দুর্ঘটনায় প্রতি বছর ৩০ জনেরও বেশি লোকের অকাল মৃত্যু ঘটছে। এ পারাপার ঝুঁকিপূর্ণ হলেও বৃহত্তর কেরানীগঞ্জের সিংহভাগ বাসিন্দাই বিষয়টি উপেক্ষা করে চলেছেন।

এ বিষয়ে সরকারদলীয় নেতাকর্মীদের প্রভাবে বিআইডব্লিউটিএর প্রশাসন তেমন কোনো উদ্যোগ নিতে পারছে না। অথচ লঞ্চের ধাক্কায় প্রায়ই ঘটছে নৌকাডুবি, হচ্ছে প্রাণহানি। পুরনো ঢাকার  সদরঘাট থেকে ওয়াইজ ঘাট। প্রতিদিন এই পয়েন্টে যাতায়াত করে কয়েক হাজার মানুষ। যাত্রীবাহী বড় বড় লঞ্চ ও পণ্যবাহী
নৌযানকে পাশ কাটিয়ে তাদের পার হতে হয় খেয়া নৌকায়। নিষেধাজ্ঞা থাকলেও প্রতিনিয়ত খেয়া নৌকা নিয়ে মাঝ নদীর লঞ্চে ওঠে যাত্রীরা। এ প্রবণতা মারাত্মক হারে পরিলক্ষিত হয়। এ সময় প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে।  বুড়িগঙ্গা নদীর কুড়া ঘাট, নলগলা মসজিদ ঘাট, রাজার ঘাট, ইমামগঞ্জ ঘাট, পান ঘাট, ছোট কাটারা ঘাট, চাম্পাতলি ঘাট, মাছ ঘাট, সোয়ারি ঘাট, বালু ঘাটসহ প্রায় সব ঘাটেই অবাধ নৌকা চলাচল দেখা গেছে। নৌপরিহনে ওঠাকে কেন্দ্র করে বুড়িগঙ্গার মতো নদীতে মানুষ কিভাবে মারা যায়? তাহলে নৌ পুলিশ কী করে? এ প্রশ্ন দেখাদেয় বার বার । নৌ-পুলিশ বলছে, মাত্র ১৫ সদস্য দিয়ে নজরদারি করা সম্ভব হচ্ছে না। এই খেয়াঘাটটি প্রতি বছর ইজারা দেয়বিআইডব্লিউটিএ।

অথচ খেয়া নৌকা নিয়ন্ত্রণে তাদেরও কোনো উদ্যোগ নেই । ঢাকা শহর ভেনিস হয়ে উঠতে পারতো। প্রাকৃতিক ও নৈসর্গিক সৌন্দর্য তার ছিলো; কিন্তু এই সৌন্দর্য বিকাশের কোন উদ্যোগ কারো নেই। ইছামতি, তুরাগসহ অধিকাংশ খাল দখল হয়ে গেছে বহু আগে। বুড়িগঙ্গার মতো একটি নদী যা এখনও ঢাকা শহরকে বাঁচিয়ে রাখছে, তাকে মারার চেষ্টায় কোনো ত্রুটি নেই। কিন্তু রাষ্ট্রযন্ত্র নির্বাক। নদীসংকুচিত হচ্ছে, গরিব মানুষ বাড়ছে, বাড়ছে নৌকার সংখ্যাও। ফলে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে সাধারণ মানুষ। এখন বুড়িগঙ্গা  মৃত্যুকূপ। তার পাড়ে বসবাস করলে রোগাক্রান্ত হওয়া অনিবার্য। ঘটবে নৌপারাপারে মৃত্যুও। এর কোন ক্ষতিপূরণ নেই। এসব মৃত্যু নিয়ে কারো মাথা ব্যথা নেই। নেই বুড়িগঙ্গা নিয়েও। বুড়িগঙ্গাকে নতুন রূপে ফিরিয়ে নেয়া যায় না? যায় । কিন্তু কারা নেবে? কাদের দায় পড়েছে? অথচ এ শহরটিকে ভেনিসের কাছাকাছি নেয়ার সব ব্যবস্থা প্রাকৃতিক ভাবেই রয়েছে। তারপরও দখল-দূষণে মৃত্যুমুখে পতিত বুড়িগঙ্গা। বর্ষায়
এই দূষণ কমে গেলেও কমে না বর্জ্য ফেলার পরিমাণ। কিভাবে বুড়িগঙ্গাকে বাঁচানো যায় তাও কারো অজানা নয়। কিন্তু বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে কে? সংশ্লিষ্ট মহল কি এ জবাবটা দিতে পারেন না?

0 0 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments