বুদ্ধদেবের কালপুরুষ: চলচ্চিত্র, কবি ও কবিতা -সোহান শরীফ

  •  
  •  
  •  
  •  

 221 views


শিল্পের কাজ হলো আমাদের দেখা বা আমাদের যাপিত জীবনকে ফুটিয়ে তোলা। সকল শিল্প একটি কথাই বলে আর সেটি হলো গল্প বলা। কবি ও চলচ্চিত্রকার বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের কালপুরুষ চলচ্চিত্রটি দেখে কিছু কথা লেখার ইচ্ছে হলো। আজকাল একটা চলচ্চিত্রে এতোগুলো দৃষ্টিকোণ পাওয়া যায় না।
বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত’র চলচ্চিত্র দেখতে গিয়ে একটা নিমগ্নতা কাজ করে। কোথায় যেনো হারিয়ে যাই, কোনো এক অজানা সুর বাঁজে কিংবা অজানা কোনোকিছু খুঁজতে থাকে চোখ, সর্বোপরি একটি কবিতা বুনে মন। ঠিক যেমনটা ঘটে বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত’র কালপুরুষ চলচ্চিত্রে সুমন্তের মনে।
কালপুরুষ চলচ্চিত্র শুরুটা এমন, ‘রাতের কলকাতা শহর, আলোয় উঁচুতে প্যাঁচানো ইলেকট্রিক তাঁর, লোক ভর্তি ট্রাম যাচ্ছে। দুজন পুরুষ অদ্ভুতভাবে ট্রাম থেকে নামে। একজন একটু আগে এগিয়ে যায়, অন্যজন একটু দূর থেকে অনুসরণ করে। দুইজন পুরুষ রাস্তার দুধারে পরস্পর হেঁটে চলে। তাদের জুতোর শব্দও একই সুর সৃষ্টি করে। পেছনে থাকা পুরুষটির নাম অশ্বিনী, আর সামনে থাকা পুরুষটি একটি বাড়িতে ঢুকল তার নাম সুমন্ত, সম্পর্কে তিনি সুমন্তের বাবা। ক্যামেরায় এবার অশ্বিনীকে চকচকে জুতো পায়ে হেঁটে যেতে দেখায় এবং পাশেই একটা কুকুর এসে দাড়ায়। কোথায় যেন একটা মিল রয়েছে তাদের। তারপর দেখি অশ্বিনী বলছে, ‘ওই যে গেল তার নাম সুমন্ত, আমার ছেলে।’ বলার ভঙ্গিটাও রহস্যময়। এতোক্ষণেও কোনো রহস্য উম্মোচন হবে না, যেন শুরু হলো একটা রহস্যের।
সুমন্ত ঘরে ঢুকে। স্ত্রী সুপ্রিয়া ঘুমে। সুমন্ত নিজের ঘরে যায়। বাচ্চারা জেগে আছে বাবার জন্যে। সুমন্ত ওদের নিয়ে ঘুম ঘুম খেলে। একটি সুর তার কানে আসে, কোথায় যেন হারিয়ে যায় সে। যখনি সুমন্তর অন্যরকম বোধ হয়, ভালো লাগা কিংবা নতুন করে নিজেকে পাওয়া, তখনি কিশোর বয়সে শোনা একটি বাঁশির সুর কানে এসে লাগে তার। এসুরটা একান্ত সুমন্তের, সে ছাড়া কেউ বোধ হয় শুনতে পায় না।
সুমন্ত অশ্বিনী এবং পুতুলের ছেলে। যার কৈশোর তাকে সারাজীবন তাড়িয়ে বেড়ায়। বহরমপুরে তার কৈশোর কাটে। অশ্বিনী ডাক্তার ছিলেন। সেখানে নিজ বাড়িতে তাদের সুখের সংসার ছিল। ওই সময় সুমন্ত যেমন ছিল, পরে সে যখন তরুণ কিংবা মাঝ বয়সের যুবক, তখনও কিশোর বয়সের কৌতূহল তার মনে থেকে যায়। তাই দেখা যায় কখনো সে যেন অস্বাভাবিক মানুষের মতো আচরণ করছে। কখনো অন্যায়ের প্রতিবাদ করছে সেই কিশোর বয়সে রেগে গেলে যেমনটি করত।এটাই হলো সুমন্তের জীবন। সুমন্ত যেন এমনই এক জীবনের মালা গেঁথেছে। কিন্তু না, সুমন্ত কিশোর বয়সে বাবাকে বন্দুক দিয়ে গুলি করে, অন্য নারীর সাথে বাবার ভালোবাসার সর্ম্পকের কথা মায়ের কাছে শুনে। গুলিটি অশ্বিনীর হাতে লাগে। তারপর ওই নারীকে মারতে যায়, যাকে তার বাবা ভালোবাসতো। তাদের সুখের সংসারটা ভেঙ্গে যায়, ভুল বোঝাবুঝির কারণে। এখন সুমন্ত সবকিছু বোঝে। একদিন সুমন্ত যায় পতিতালয়ে কিন্তু পতিতাকে র্স্পশও করেনা, যেমনটা তার বাবা বিবাহিত এজন্য র্স্পশ করেনি আভাকে(অশ্বিনীর প্রাক্তন প্রেমিকা)। পুরো সিনেমা জুড়ে একটা ছবির মতো অসম্ভব সুন্দর স্থানের কথা আছে, কারো কাছে তা কুসুমপুর আবার কারো কাছে তা অন্য কোথাও, আসলে ওটাই আমাদের পরিনতি। যেখানে গেলে পূ্র্ণতা পাওয়া যায়। এটার কথা শান্তাও বলে একদিন তার ভাইকে। শান্তা সুমন্তের মেয়ে। এখানে যেন পরম্পরায় স্থানটা চায় অশ্বিনীর পরিবার।
চলচ্চিত্রটি আসলে একজন লোকের বেঁচে থাকা কিংবা টিকে থাকা নিয়ে। চলচ্চিত্রটিতে প্রধান চরিত্রে দেখা যায় সুমন্ত ও অশ্বিনীকে।
চলচ্চিত্রটির নাম কালপুরুষ বা Memories in the Mist. ‘কালপুরুষ’ যমের অনুচরবিশেষ; ইনি দেবগণের আজ্ঞায় লক্ষণ-বর্জনের পূর্বে রামের সঙ্গে গোপন সাক্ষাৎ করেন। আবার ‘Memories in the Mist’ মানে স্মৃতিতে স্মৃতি। চলচ্চিত্রটির নামকরণে আমরা দুইটা বিষয়ই লক্ষ্য করি। প্রথমত সুমন্তের সাথে তার বাবার যেমন অনেক কথা আছে, বাবারও তেমনি কিছু অব্যক্ত কথা আছে। এভাবে জীবনযাপন করতে পারার জন্য, কারণ ক’জন পারে যৌনতা, ঈর্ষা, বোধ থেকে সরে এসে ঋষির মতো হয়ে উঠতে ! আবার তারা কথা বললেও তা কাল্পনিক, কারণ তিনি মারা গেছেন।
শিল্প হিসেবে চলচ্চিত্র যেমন একটি মাধ্যম তেমনি কবিতাও। সবকিছু ছাঁপিয়ে শিল্পী একটা গল্প বা কাহিনি বলতে চায়। বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত শুধু চলচ্চিত্রকারই নন, তিনি একজন কবিও বটে।
তার নির্মিত চলচ্চিত্রে কবিতায় যেমন অজস্র সিম্বল থাকে তেমনি প্রতিটি শর্টে সিম্বল আছে।
সুমন্ত জানে তার ঔরসজাত সন্তান নয় শান্তা ও শান্তনু, সুপ্রিয়ার পরকীয়ার ফল। তিনি যেনেও চুপচাপ মেনে নিয়ে ভালোবাসেন। কেন বাসেন তা আমরা দেখতে পাইনা, তবে বলতে পারি, সে তার শৈশবের ভুলটা হয়ত তাকে পীড়া দেয়? তাই হয়তো বুঝতে দেননি লেখিকা এবং উচ্চবিলাসী স্ত্রীকে। এখানে নারীবাদ অতিক্রম করে ব্যক্তি সুমন্তের জয় হয়েছে নীরবভাবে। সুিপ্রয়া একটি সিম্বল, যে মনেপ্রাণে আমেরিকান হতে চায়। সুিপ্রয়ার প্রিয় আমেরিকা তথা পাশ্চাত্য, যেখানে শুরু হয়েছে নারীবাদ’র। তাই একথা নির্ধিদায় স্বীকার করা যায় যে সুমন্তের জয় হয়েছে নিরবভাবে। কালপুরুষ চলচ্চিত্রে একটা দৃশ্য টিভিতে আমেরিকা নিয়ে দেখছে সুমন্ত। সুমন্তের খেয়াল টিভিতে নয়, তার ফেলে আসা শৈশবের বাঁশির সুরে। যখন বাঁশি বাজানো দৃশ্যায়ন করেছেন চলচ্চিত্রকার তখন কামেরায় তিনি জুতোর মধ্যে ইঁদুরের খেলা এনেছেন। কবি শামীম রেজার হৃদয়লিপি’র ‘প্রেমিক-প্রেমিকাদের বলি’ কবিতায় দেখতে পাই “পুরনো বুট জুতার মধ্যে জন্মেছে সাদা ইঁদুর” অর্থ্যাৎ আমেরিকাকে বলছে, বুট জুতোর(কলোম্বাস এর জুতো) মধ্যে জন্ম নেওয়া দেশ। দৃশ্যটি দেখে বোঝা যায় যে আমেরিকা আমার দেশের ঐতিহ্যের কাছে কিভাবে নিম্নস্তরের।
বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের চলচ্চিত্র যেহেতু বাস্তবধর্মী তাই প্রতিটি দৃশ্যই ন্যাচারাল এবং জীবনঘনিষ্ট। যদি হঠাৎ এলোমেলোভাবে একটা দৃশ্য দেখি তার কোনো চলচ্চিত্রের বুঝতে সময় লাগে না যে এটা বুদ্ধদেব এর চলচ্চিত্র। কালপুরুষ চলচ্চিত্র জুড়ে কলকাতার প্রকৃতির বাতাবরণ। কলকাতার জীবন আর আমেরিকান জীবনের হাতছানির মুখামুখি বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত। বহরমপুর, কলকাতা তারপর আমেরিকা। কলকাতার জীবনে আমেরিকা স্বপ্নের দোলাচলে ঘুরতে থাকে। সুপ্রিয়হলো উচ্চাকাঙ্ক্ষী বর্তমান আমেরিকার স্বপেড়ব বিভোর একটি সিম্বলিক ক্যারেক্টার। কলকাতার নিজস্ব একটি সুর আছে। সঙ্গম আছে। সব ছাপিয়ে কলকাতা বড় মায়াময় নেশা ছড়িয়ে রাখে। কলকাতার নিজস্ব চরিত্র ট্রাম, বাস আর মানুষের অসম্ভব ভিড়ের মাঝে নিজস্ব একটি রূপ আছে। নিজের কথা, নিজের সুর। সুমন্ত’রা সেই সুর শুনতে পায়।
মাঝে মাঝে স্ত্রীকে দেখতে যায় অশ্বিনী। দুজনে অনেক কথা বলে। অশ্বিনী পুতুলকে বলে, ‘তুমি আমাকে নয়, আমাদের সম্পর্ককে বড় করে দেখেছ।’ এরপর ক্যামেরা সুমন্তকে ক্লোজ করে। সুমন্তর কল্পনায় সবটুকু বর্ণিত হতে থাকে। হিংসার ক্লেদ পেরিয়ে সুমন্ত স্বপেড়ব বাবাকে ক্ষমা করে দেয়। আবার অন্য র্শট। বাবা ছেলের সাথে সমুদ্র তীর ধরে পাশাপাশি হাঁটে, কথা বলে। বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত সাগরকে কেন বেছে নিলেন দুই পুরুষ যখন পাশাপাশি আলাপ করে? সাগরের বিশালতার কাছে সুমন্ত তার বাবার সাথে কী আত্মবিশ্বাসের সাথে নিজের কথা বলে যায়! অশ্বিনী বলে সুমন্তকে, ‘তুমি অন্যরকম’। সুমন্ত সুখী, কারণ সুমন্ত গন্ডিবদ্ধ চিন্তায় ডুবে যায় না। সে পৃথিবীর সন্তান। এই পৃথিবীর যে-দিকে তার চোখ পড়ে, চাইলে সে সুখ খুঁজে নিতে পারে। তা শিশুর হাসিতে হোক, বৃষ্টির জলে ভিজে হোক কিংবা কারো প্রেমলীলা দেখে হোক। সুমন্ত ইগোইস্টিক মানুষ নয়। সে সুখী হতে পারে, কারণ তার মন বলে তাকে সুখী হতে। শুধু টিকে থাকার ক্ষুদ্রতা থেকে সুমন্ত’র মতো মানুষরা বেরিয়ে আসে। যৌন, ঈর্ষা, ক্রোধ থেকে সরে ঋষির মতো হয়ে ওঠে।
পরিশেষে বলার অপেক্ষা রাখে না, যে কবির নির্মিত চলচ্চিত্র কবিতার বাইরে কিছু হতে পারে। এ চলচ্চিত্রটি সুমন্তের যাপিত জীবনের কাব্য যার পূর্ণতা পেয়েছে বেঁচে থাকার আনন্দে যা দৃশ্যায়িত হয়েছে সূর্যাস্তে। সিনেমার সৌন্দর্যে ছন্দকে কি উপেক্ষা করা যায়? ছবিটি দেখতে দেখতে মনে হয় শান্তনুর মতো করে পৃথিবীর বুকে যারা বাস করে তারাই সুখী হতে পারে।
 
সোহান শরীফ
শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
সোহান শরীফ
0 0 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest