বৃক্ষহীন মানুষের জন্য কোনো আরতি নেই আমার -প্রতীক ইজাজ

  •  
  •  
  •  
  •  

 178 views

আমরা রোজ উনো খেলি। লুডু, দাবা, সায়েন্স বক্স। এক চিলতে ডাইনিংয়ে স্ট্যাম্প সাজিয়ে ক্রিকেট। গ্লাস ভাঙি, জগ, পানির বোতল। বল কখনো কখনো ড্রয়িং রুম, অন্ধকারে লুকোয়। আমরাও। এভাবে খেলতে খেলতে ক্লান্ত মুখ হেসে ওঠে জয়ে, আনন্দে। আমরা ঠান্ডা মেঝেতে লুটোপুটি খাই।

সকাল থেকে রাত, রোজ হাসি আর খেলি। চলতে ফিরতে, বাসে ট্রামে, গল্প করি। আমাদের গল্পগুলো শব্দ হয়, রঙ মাখা শব্দ, কথা হয় না। আমরা কথা বলি না। কথা মানে- মেঘ চিরে, এক হাটু জলে আদ্যোপান্ত স্নান।

একবারই জলে ভিজেছিলাম, ছাদের কার্ণিশে দাঁড়িয়ে মুষল বৃষ্টিতে চুপচুপে জল। চুল চুইয়ে জল গড়িয়েছিল পায়ের পাতা অবধি। স্নান হয়নি। চোখের ভেতর হাজার তারার মেঘ, ভিজতে গেলেই শুকিয়েছে খটখটে রোদে। কানে মুখ রেখে বলেছে- সব জলে নাইতে নেই। আমি হেসেছিলাম।

তাকে কত করে বারণ করলাম, যাসনে, ও পথে রোজ শেয়াল কুকুরে ঝগড়া বাঁধে। খুকখুকে কাশির লোকটা বিশ্রি শব্দে ওদের শাসায়। রাতকানা যে ভিক্ষুক, অপ্রয়োজনেই হামলে পড়ে গায়ে। বিষ্ঠা, ছেড়া পলিথিন, মুরগির ছালবাকল চারপাশে। বলা নেই কওয়া নেই, কোত্থেকে মরাপচা খেয়ে কুকুরটা উগরে দেয় সব।  বাতাসে উৎকট গন্ধ। পথ ছেড়ে পা গিয়ে পড়ে ডোবানালায়। ও শোনেনি। আমি বলেছিলাম, মরগে!

কাল রাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে যায় শব্দে। কে যেন কাঁদছে। জানালা খুলে বাইরে তাকাতেই চোখ ভিজে যায় কুয়াশায়। ঝাপসা মুখ। মুখ, নাকি অন্ধকার- ঠাওর হয় না ঠিক। যেইমাত্র পেছন নেব, অমনি বাজখাই এক লোক গলা খাকিয়ে উঠলো: ‘চিনলে না? আমি কুমুর বর। কাঁদি না, হাসি। কান্নার মতো করে হাসতে আমার ভালো লাগে। লোকে বোঝে না। বোকা ভাবে, সরল। কুমু ভাবে, আমি ওর জন্য কাঁদি।’আমি ভয় পেয়ে যায়। ভাবি, লোকটা পাগল নাকি!

ঝড়ঝাপটা পেরিয়ে একদিন এক সকালে ঢেউ ভেঙেছিলাম। নৌকো ভিড়িয়ে খানিকটা দাঁড়িয়েছিলাম পাড়ে। পা ডুবেছিল কাদা মাটিতে। জল আছড়ে পড়ছিল মুখ, চুল অবধি। হাত খানেক দূরেই লস্করের পাটের গুদাম। মরচে পড়া টিনের ছাদ। কাঠের পাটাতন। চার ধাপ সিঁড়ির প্রথমটাতে পা দিতেই, ভেতর থেকে কে একজন বলে উঠলো, জল ছিটাইনি এখনো, উঠবেন না।

ফিরে এলাম। আমার তখন কেবলই হাটে দেখা ওই বাজিগরের কথা মনে পড়ছিল। সাদা আলখাল্লা, মাথায় লালসালুর পট্টি, গুটানো আস্তিন। লোকজন ভীড় করেছিল ওকে। কাঠের বাক্স থেকে উকি দিচ্ছিল সুতোর মতো লিকলিকে এক সাপ। নিস্তব্ধ। নিস্তরঙ্গ মানুষের ঢেউ। আমি হেসে উঠলাম। লোকটা লালচোখ তুলে বললো, ‘ঘুম হয় না, ঘরে শান্তি নাই, ব্যবসায় মন্দা।’আমি বললাম, না। ‘বউ বন্ধ্যা, লোকের চক্ষু টাটায়, ঘরে খিল পড়ে না।’ না, তাও না। ‘কারো চোখ পড়ছে ঘরে, টান দেয় রাত-বিরাতে, শিথান খালি।’ আমি কথা বলি না।
লোকটা এবার শকুনের মতো টান দেয় স্বরে, ফু দেয় শুণ্যে: ‘যা, পারবি না। এমন বোকাসোকা মুখ্যু লোকের বাস আমার দারাজে নাই। আমি বস করি মন্ত্রতন্ত্রে। ভালবাসার কারবার এইখানে না’!

সেই থেকে বৃক্ষহীন মানুষের জন্য কোনো আরতি নেই আমার।
সেই থেকে প্রাণহীন মানুষের জন্য কোনো বন্দনা নেই।

৫ জানুয়ারি ২০২০
পশ্চিম মালিবাগ, ঢাকা।

অলংকরণ: আসমা সুলতানা মিতা 

 

0 0 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments