বেশ্যাকে ধর্ষণ করাও সমান অন্যায় । ফারিনা মাহমুদ

  •  
  •  
  •  
  •  

শিক্ষাজীবনে যখন বিতর্ক করতাম, আমার পছন্দের একটা প্রোটোটাইপ ছিলো বিষয়ের ব্যবচ্ছেদ দিয়ে শুরু করা এবং আমি বিপক্ষ দলের বক্তা হলে, একটা কাউন্টার অপিনিয়ন প্রতিষ্ঠা করা। বিষয়টা একটু বুঝিয়ে বলি।

ধরেন বিতর্কের দুটি দল, একটি নারী দল অন্যটি পুরুষ দল। বিতর্কের বিষয় –

“ভালোবাসা মোরে ভিখারী করেছে তোমারে করেছে রানী”

পক্ষে – পুরুষ দল এবং বিপক্ষে – নারী দল ।

ধরে নিচ্ছি পুরুষ দল তাদের বক্তব্যে, প্রেমে পড়লে নিজের মানসিক অবস্থা দিয়ে শুরু করবেন এবং শেষ করবেন ক্রেডিট কার্ডের স্টেটমেন্ট দিয়ে ।
নারী দলের বক্তা হয়ে আমি যেটা করবো তা হচ্ছে শুরু করবো বিষয়ের ব্যবচ্ছেদ দিয়ে এবং শেষ করবো প্যারালাল বা কাউন্টার ওপিনিয়ন দিয়ে। বিষয়ের ব্যবচ্ছেদ অর্থাৎ সংজ্ঞা ধরে টান মারা হবে। বোঝানো হবে “ভালোবাসা”, “ভিখারী” ও “রানী” বলতে আসলে কি বোঝায় এবং ঠিক কি কারণে পুরুষ দল না নিজেরা ভিখারী না আমাদেরকে রানী বানিয়েছেন ! এবং কাউন্টার অপিনিয়নে আমি সম্ভবত স্টাব্লিশ করার চেষ্টা করবো
– ভালোবাসা তোরে শিকারী করেছে আমারে করেছে নারী (রানী’র উল্টা আর কি) !

“ মডেল তিন্নি হত্যা থেকে অভির শরীরের প্রতিটি পশম বেঁচে গেছে, কাজেই পরিমনি কোন ছার?

মুনিয়ার চৌদ্দ গুষ্টির চরিত্র বিশ্লেষণ শেষ হবার আগেই আবার মিডিয়া উত্তাল ! চিত্রনায়িকা পরীমনি কে সিনেমায় সই করানোর কথা বলে ডেকে নিয়ে ধর্ষণ ও হত্যাচেষ্টা নিয়ে। ইতিহাস আমলে ধরলে, এরশাদ শাসনামলের পাওয়ার প্লে যেহেতু পরবর্তী সব সরকারের আমলে সুউচ্চ রেখে মডেল তিন্নি হত্যা থেকে অভির শরীরের প্রতিটি পশম বেঁচে গেছে, কাজেই পরিমনি কোন ছার? দুই পয়সার নায়িকা, একে ভোগ করতে পারা তো নাগরিক অধিকার, তাইনা?

কোথায় যেনো পড়েছিলাম, আইন মাকড়সার জাল, বড় জিনিস ওই জাল ছিঁড়ে বের হয়ে আসে, ধরা পড়ে ছোট জিনিস ! সত্যি বলতে এই ঘটনার কোনো বিচার হবে আমি আশা করি না । কারণ এখানে ঘটনা সত্য কিন্তু সাক্ষ্য প্রমান নাই। প্রথম রাতে মামলাই নেয়া হয়নি। মামলা নেয়াও যদি হয়, আমি জানিনা আইনে ‘এটেম্পট টু রেইপ’ এর শাস্তি আসলে কি এবং এটা প্রমান হয় কি দিয়ে?

আইনী বিশ্লেষণ পরের কথা, পরিমনির আহাজারি আর সাহায্য চেয়ে লেখা স্ট্যাটাসে ভিডিওতে আমি যে পরিমান পটেনশিয়াল ধর্ষকের কমেন্ট দেখেছি, তাতে আমি স্তব্ধ! টিকেট কেটে বড় পর্দায় কাউকে দেখা যায় মানেই কি সে পাবলিক প্রপার্টি? কমেন্টকারী মোরাল পুলিশ এবং ধর্ষিকামী ইতরেরা কি জানে আইনে
ধর্ষণের সংজ্ঞা কি ? আরে! এইসব খারাপ কথা তো আবার তাদের জানার কথা না, আফটার অল তারা হইলেন “ফেরেশতা উষ্টা খাইয়া তার কোল থেইক্যা ছিটকায়া মর্ত্যে পড়া ভালা মানুষ”, তাই না? যাক, মর্ত্যে যখন আইসাই পড়সেন, শুনেন ধর্ষণের সংজ্ঞা কি।

আইনে বলা আছে (বন্ধুতালিকায় অনেক ভিনদেশী আছে তাই বাংলা উচ্চারণে লিখলাম),
“রেপ ইস এ টাইপ অফ সেক্সুয়াল আসাল্ট ইউজুয়ালি ইনভলভিং সেক্সুয়াল ইন্টারকোর্স অর আদার ফর্ম অফ সেক্সুয়াল পেনিট্রেশন ক্যারিড আউট এগেইনস্ট এ পার্সন, উইদাউট দ্যাট পার্সনস কনসেন্ট”

শেষ অংশটা পড়েন – ক্যারিড আউট এগেইনস্ট এ পার্সন, উইদাউট দ্যাট পার্সনস কনসেন্ট।

আসেন সংজ্ঞা ব্যবচ্ছেদ করি-

১) এগেইনস্ট – বিপক্ষে
২) পার্সন – ব্যক্তি | এখন ব্যক্তি ছেলে হইতে পারে, মেয়ে হইতে পারে, হিজড়া হইতে পারে ,নায়িকা, উকিল, ডাক্তার, জজ, বিবাহিত, অবিবাহিত, কালো, লম্বা, ফর্সা, বেশ্যা যে কিছুই হইতে পারে।
৩) উইদাউট দ্যাট পার্সনস কনসেন্ট – ওই ব্যক্তির সম্মতি ব্যতীত । এই “ইচ্ছার বিরুদ্ধে” ব্যাপারটা দিয়ে বোঝায় তাৎক্ষণিক অবস্থা অর্থাৎ ওই ঘটনার সময় ব্যক্তির মানসিক তথা শারিরীক সম্মতি ছিলো কি না ।

পেশা যার বেশ্যাবৃত্তি, একটি সংসর্গে যদি তার সম্মতি না থাকে, সেটারে ধর্ষণ না বলার কোনো সুযোগ কিন্তু নাই আইন অনুসারে। খেয়াল করেন , ফুটনোট দিয়ে ধর্ষণের সংজ্ঞার কোথাও বলা নাই যে “দি ওয়ার্ড #পার্সন এক্সক্লুডস প্রস্টিটিউটস, গার্লফ্রেন্ডস এন্ড ওয়াইফস”! কানুনের সংজ্ঞায় কোথাও বলা নাই পূর্বপরিচিত এমনকি সম্পর্কে জড়িত থাকলেও তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে সংসর্গ জায়েজ!

আমার ভাবতে খুব কষ্ট হয়, বাংলাদেশে সাইবার ক্রাইম ইউনিট নামে একটা ইউনিট আছে।
আজকে যদি কেউ প্রধানমন্ত্রীরে নিয়ে একটু উনিশ বিশ কিছু লিখে, তার চৌদ্দগুষ্টিরে তো ধরবেন। আর এইসব বিকৃত কীবোর্ড ধর্ষক যে দিনের পর দিন অনলাইনে নোংরামির চাষ করে যাচ্ছে, এর জায়েজীকরণ বন্ধে কি কোনো কাজ করবেন না আপনারা?

ধরেন না ভাই, কমেন্টকারী ১০ পিস পটেনশিয়াল রেপিস্টরে ধরেন। প্যারেড গ্রাউন্ডে নিয়া বলেন জিহবা দিয়া চাইটা এক কিলোমিটার করে রাস্তার পিচ পরিষ্কার করতে। শেষ হইলে পরে জায়গা বরাবর কয়েকটা বুটের লাত্থি দেন। টোটাল ভিডিওটা আপলোড দেন, জাতি এই নয়া দামানদের দেখুক!

নাকি, ওই ক্ষমতা নাই আপনাদের? যদি কিছু নাই করতে পারেন, তো রাস্তার পিচ পরিষ্কারের দায়িত্ব নাহয় নিজেরাই নেন… আর কি করা!

ফারিনা মাহমুদ
প্রদায়ক সম্পাদক, প্রশান্তিকা
মেলবোর্ন, অস্ট্রেলিয়া।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments