ভালোবাসায় বসবাস – আরিফুর রহমান

  •  
  •  
  •  
  •  

গল্প 

ভালোবাসায় বসবাস 

আরিফুর রহমান 

হ্যালো
হ্যালো, হ্যালো,
হ্যালো শুনতে পাচ্ছো !
কি আশ্চর্য ! কথা বলনা কেন? আমি ড্রাইভ করা অবস্থায় ফোন ধরেছি অথচ তুমি চুপ। তোয়া প্লিজ কথা বল।এরকম আমি পছন্দ করিনা তুমি তো জানো? তবুও কেন বার বার এমন কর। ঐদিনও তুমি এমন করলে! ফোন দিয়ে আমাকে এক ঘন্টা লাইনে রেখে তুমি শাওয়ার শেষ করে তারপর কথা বললে। তুমি দিন দিন অদ্ভুত আচরন করছো।তুমিতো জানো আমার দুর্চিন্তা হয়। আমি তো দূরে থাকি। সিডনি তো গোলকোস্টের কাছাকাছি নয় যে ইচ্ছে করলেই তোমাকে দেখে আসতে পারবো।ইচ্ছে করলেই তোমার চোখের সামনে আপাদমস্তক দাঁড়িয়ে বলব এই যে আমি হাজির।কোনটাই সম্ভব নয়। একটি দেশে বসবাস করা সত্বেও দুজন দুই মেরুতে থাকি।প্লিজ তোয়া আর চুপ থেকো না। আমার ভয় হচ্ছে।অদ্ভুত ভয়! ভীষন রকমের দুর্চিন্তা।

এই তোয়া! তোয়া সোনা। তোয়া শুনতে পাচ্ছো। আমি তোমায় ডাকছি। ফয়সাল ফোন কেটে পূনরায় তোয়াকে ফোন দিল। ফোন বেজে যাচ্ছে তোয়া ফোন ধরছে না।কল শেষ হয়ে ফোনে রেকর্ডিং বাজছে। আবার নাম্বার ডায়াল করল। আবারও একই অবস্থা। ফয়সালের বুকের ভেতর মোচর দিয়ে উঠল। ক্রমশই বুকটা যেন ভারি হতে লাগলো।গাড়ির স্পিড বাড়িয়ে দিয়ে বাসায় গিয়ে ব্যাগটা গুছিয়ে নিল। ডাইনিং টেবিলে থাকা কাঁচের জগ থেকে এক গ্লাস পানি ঢেলে ঢক ঢক করে গিলল। গলা শুকিয়ে যেন মরুভূমি হয়ে গেছে।আবারও তোয়ার ফোনে ডায়াল করল।এবারও ফোন বাজছে। বাজছে তো বাজছেই। তোয়ার প্রতি ভীষন রাগ হতে লাগলো। কি অদ্ভুত মেয়েরে বাবা। ফয়সালের মাথা ঘূর্নামান ফ্যানের মতো ঘুরতে লাগলো।

তোয়া ব্রিসবেনের গোল্ডকোস্টে থাকে। একা থাকে,ভীষন একা। তোয়া অনেকটাই introvert মেয়ে।ভীষন গম্ভীর।তোয়া শুধু নিজেকে জানে অন্য কাউকে জানেনা বা জানার চেস্টা করেনা কখনও।একজন অজি মেয়ে ছাড়া তোয়ার কোন বন্ধু নেই। ফয়সাল এ বিষয় নিয়ে বহুবার বলেছেও কয়েকজন বন্ধু বান্ধব করতে।কিন্তু কে কার কথা শোনে। সে তো গভীর মনোযোগি নিজের ভেতরে।নিজের মনের ভেতরে ডুবে থাকে সারাক্ষন।

তোয়ার সঙ্গে প্রথম যেদিন দেখা সেদিনও এমনই ছিলো।ঢাকা এয়ারপোর্টে বর্ডিংপাস নিতে লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলো বেগুনি রঙের কামিজ পড়ে।ফয়সাল ছিলো তোয়ার পেছনে দাঁড়ানো।যখন বর্ডিং পাসের জন্য মেয়েটি পাসপোর্ট এগিয়ে দিচ্ছিল মেয়েটির হাতটা কাঁপছিল।ইমিগ্রেশন অফিসার নাম ধাম জিজ্ঞেস করাতে কি অদ্ভুত রকমের ভয় পাচ্ছিল।ফয়সালের খুব মায়া হচ্ছিল ।অপরিচিত মেয়ে তবুও ফয়সাল বলেছিল ভয় নেই।এতো ভয় পাচ্ছেন কেন। আমি আছি। আমিও যাচ্ছি সিডনিতে। তোয়া ঘার ঘুরিয়ে এমন করে তাকিয়ে ছিলো যে ফয়সাল তার অতি পরিচিত। অতি আপনজন।বহুকালের চেনাজানা।ভয়ভরা চোখ দুটো যেন নিমিশের মধ্যে একরাশ ভীতিহীন চোখে পরিনত হয়েছিল।ফয়সাল কিছু বলার আগেই তাকে অবাক করে বলেছিল আর আমার ভয় নেই। আসলে আমি কোনদিন দেশের বাইরে যাইনি তো তাই!কিন্তু আব্বুর ইচ্ছেয় পড়াশুনা করতে যাচ্ছি অস্ট্রেলিয়াতে।ইমিগ্রেশন পাড় হয়ে দুজন এক সঙ্গে প্লেনে উঠেছিল। পাশাপাশি সিটে বসেছিল।বার বার তোয়া ঘুমিয়ে যাচ্ছিল তবুও চোখ টানা টানা করে ফয়সালের গল্প শুনছিল।সেদিন তোয়ার চোখে মুখে আর কোন ভয়ের চিহ্ন দেখা যায়নি সিডনি আসা পর্যন্ত।সিডনি নেমে দুজন একই টেক্সিতে উঠেছিল। ফয়সাল তার বন্ধুর বাসায় উঠার আগে তোয়াকে নেমে দিয়েছিল তার বাবার অফিসের কলিগের মেয়ের বাসায়।তোয়া সেদিন বার বার অসহায় দৃষ্টিতে পেছন ফিরে তাকিয়ে ছিলো।আর বলেছিলো, ‘ আপনি কি আমাকে ২৪ তারিখে গোলকোস্টের প্লেনে তুলে দিতে পারবেন?ফয়সাল আনন্দভরা মুখে হ্যা বলেছিলো। সিডনিতে সেবার তোয়া এক সপ্তাহ ছিলো।এক সপ্তাহে তোয়ার সঙ্গে বেশ কয়েকবার দেখা হয়েছিলো।এটা সম্ভব হয়েছিল ফয়সালের ইচ্ছেতে।অপেরা হাউজ, হারবার ব্রিজ, লা-পেরুজ সহ তাসমান সাগরের উপকূলে গড়ে উঠা সিডনি শহর ঘুরে ঘুরে রেড়িয়েছিল।ফয়সাল তোয়ার মাঝে এক ধরনের মায়ার পরশ খুঁজে পেয়েছিল।বন্দাই বিচে তোয়া তার যুগল পা পানিতে ভিজিয়ে প্রানবন্ত হাসিতে কাগজের সাম্পান ভাসিয়ে স্পর্শ করেছিল অবারিত ভালোবাসা।সেদিন দেখে মনে হয়েছিল ভালোবাসা আসলেই তোয়ার ভেতরে একা একা ঘুরে ঘুরে উঁড়ে বেড়ায়।

খুব দ্রুত গতিতে গাড়ি চলছে।বাইরে মেঘধ্বনি।যদিবা ঢাকার মত খড়কুটো,ধুলো,গাছের পাতা, হাজারও ছাদ থেকে উঁড়ে আসা মেয়েদের ওড়না উঁড়ে না আসলেও এখানে বাতাসে জলগন্ধ আসছে।বৃষ্টির একটি দুটি প্রথম ফোটা পড়ে গাছের পাতায়। একটা আহত নীল বাঘ ঝাঁপিয়ে মাটিতে না পড়লেও তবে তীব্র গর্জনে প্রকম্পিত হয় পুরো শহর। গাড়ির সামনের গ্লাস বৃষ্টির জলে ঝাপসা হয়ে গেছে তবুও ফয়সাল wipers দিতে ভুলে গেছে। মনের ভেতরে কেবলি তোয়ার জন্য দুশ্চিন্তা হচ্ছে। ভয়াবহ ভয় বার বার টুটি চেপে ধরছে।মনে হচ্ছে ভয়ঙকর কিছু অপেক্ষা করছে ফয়সালের সামনে।কেবলি মনে হচ্ছে। কেউ একজন জানালা দরোজা বন্ধ করে দিয়েছে।দুর্যোগের আভাস পেয়ে ঢাকার কুকুরের মতো ঘেউ ঘেউ করে ডাকছে এখানকার কুকুর, সঙ্গে শেকলের ঠুন ঠুন শব্দ।আজ কুকুরটাকে বেঁধে রেখেছে বন্ধ ঘরে।সিডনির বাতাস আজ ভাষাহীন কোলাহল।বন্ধ কপাট বার বার নাড়া দিচ্ছে মূহুর্মহু শব্দে।সিডনির আকাশে ভয়ঙকর কালো বাঘেরা ঝাঁপিয়ে পড়ছে মাটিতে।
দীর্ঘ দশ ঘন্টা ড্রাইভ করে যেতে হবে।সারাদিনের কাজের পরও দুর্চিন্তায় ফয়সালের ট্যায়ার্ড লাগছেনা। গাড়ির গতি ক্রমশই বেড়ে দিয়ে চলছে।তোয়া শেষবার যখন সিডনিতে এসেছিলো।সেই সব স্মৃতি বার বার মনে পড়ছে। কি পাগলি মেয়েটা। কিছুতেই থাকবেনা দিনশেষে ফিরতি ফ্লাইটে চলে যাবে।কত কত বার বুঝানোর পর অবশেষে রাজি হয়। কিন্তু থাকা নিয়ে বা রাতে ঘুমানো নিয়ে ঘোর আপত্তি তার।সে ফয়সালের বাসায় থাকবেনা। অথচ তোয়া আসবে বলে। সারা বাসা কামিনী ফুলের সুবাসে মুখরিত করে রেখেছিলো। ভালো বেডশিট ছিলো না, ছিলো না কোন প্রসাধনী জিনিস পত্র। সবই কিনে খুব পরিপাটি করে ঘরখানা সাজিয়ে রেখেছিলো। তোয়ার পছন্দ সাদাত হোসাইনের বই। বই গুলো ছিলোনা। অনেক কস্টে সংগ্রহ করতে হয়েছে। সকল আয়োজন যেন শেষ হতে বসেছিল। অবশেষে বাসাটায় ঢুকে এমনই তার ভালো লেগে যায় । তখন না করতেই মেয়েটি ভুলে গিয়েছিল। সারারাত অবধি কত কত গল্প হয়েছিল সেই কয়েক রাত। বেলকনিতে বসে জোছনা দেখা, বাসার সামনে বিশাল টিলার উপরে আলো আবছায় ঘরটি
নিয়ে মুগ্ধকর স্বপ্ন দেখা। ফয়সাল তোয়াকে স্বপ্নের কথা বলেছিল।তাদেরও কোন একদিন এমন কিছু হবে। যদিও ফয়সালের দৃঢ স্বপ্নের কথা তোয়া খিলখিল হাসিতে বাতাসে উঁড়িয়ে দিয়েছিল।

অনর্গল বুক থেকে কথা বের হয়ে যায়। আটকানো যেতনা।
কিন্তু তোয়াকে নয়। পৃথিবীর তাবৎ মানুষ কে বলা যাবে অথচ যার কথা তাকে নয়। কি আশ্চর্য জনক বিষয়।তোয়াকে বিশেষ কথাটা বলা যে ফয়সালের জন্য কতটা জটিল।অনেকেই প্রেম করলে ইনিয়ে-বিনিয়ে বুঝায়,ফয়সালের সেই মুরুতও ছিলো না।যখনই বলতে যাবে তখনই মনের ভেতরে এক ধরনের ক্লান্তি অনুভব করতো। এই ক্লান্তি ভালোবাসা না পাওয়ার ক্লান্তি। এই ক্লান্তি ভয়ের ক্লান্তি।এই ক্লান্তি সুন্দর হাতের স্পর্শ না পাবার ক্লান্তি। কিন্তু সেদিন তোয়া অবাক করে দিয়ে ফয়সালের সামনে কফি করে নিয়ে এসে কফির মগ ফয়সালের সামনে ধরে বলেছিলো, ‘ এতো ভালোবাসো বলতে ভয় পাও কেন?’কি তোমার ভালোবাসা ? তোয়া কথাটা বলে হাসির কল্লোলে ঘরখানা আলোকিত করেছিল।কিন্তু
ফয়সালের মুখটা সঙ্গে সঙ্গে লজ্জায় বর্ণিল হয়ে গিয়েছিলো। সে একটা কথাও বলতে পারছিলনা। কিন্তু তোয়া ছাড়েনি। তোয়া এমন অবিস্বাশ্য পাগলামি করেছিলো। যেন তার ঘরে ভাগ্যের দেবী স্বশরীরে হাজির। তোয়া জোর করেই ফয়সালের মুখ দিয়ে উচ্চারন করিয়ে ছেড়েছিলো। এই নিয়ে তোয়ার চিবুকে সে কি অদ্ভুত হাসি।জীবনের কখনও কোন সময় সেই রাতের কথা ভুলতে পারবেনা ফয়সাল। জোছনাও যেন ভালোবাসার আলো ছড়াচ্ছিলো।কাউকে বুঝানো যাবেনা সেই রাত্রির নিদ্রাহীনতার স্পর্শময় ভালোবাসার কথা।

বাংলাদেশে এখন পৌষ মাস।শীতের আগের মাস।কিন্তু সিডনিতে শীত বিদায়ের মাস।পৌষের আকাশ ঝকঝকে থাকে।নির্মেঘ থাকে।সিডনিতে ঝর বাদলা হলেও আকাশের রঙ পরিবর্তন হয়না।কঠিন নীল আকাশ। নিচে নেমে আসা নীল আকাশ। তোয়া গোলকোস্টের আকাশ টাই বেশি পছন্দ করে এবং বার বার বলে ঠিক যেন বাংলাদেশর পৌষের আকাশ।কি যে মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে থাকে আদিগন্ত আকাশের দিকে। তাকিয়ে থাকে বাংলাদেশের কৃঞ্চচূড়ার মতো দেখতে জাকারান্ডা গাছের দিকে।আরও পছন্দ করে ধবধবে জোছনা রাতে সমুদ্রে পাড়ে বসে কফি খেতে।একদিন সারারাত ফয়সাল আর তোয়া বসে ছিলো।পূবের আকাশে সূর্য লাল হওয়ার সময় তোয়ার মুখে সে কি আনন্দ ফুটে উঠেছিল।ফয়সাল পলকহীন চোখে তোয়ার প্রানবন্ত হয়ে উঠা ছুঁয়ে দিয়েছিল।

গোলকোস্টের কাছাকাছি চলে এসেছে গাড়ি। জিপিএস বলছে আর মাত্র এক ঘন্টা চল্লিশ মিনিট।কিন্তু ফয়সালের কাছে দীর্ঘ পথ।এর ভেতরে অনেক বারই ফোন দেওয়া হয়ে গেছে। আগের মতোই ফোন ধরছেনা তোয়া।বৃষ্টিও শেষ।ফয়সাল জাকারান্ডা একটা গাছের নিচে গাড়িটা পার্ক করল। এক লাফে ফুল সহ একটি ডাল ভেঙ্গে নিয়ে ফয়সালের পাশের সিটেই রাখল খুব যতœ করে।ভোর হয়ে গেছে। একটু পরই আযানের সময়।ফজরের আয়ান।কতদিন হলো আযান শোনা হয়না।ঢাকায় যখন এক সঙ্গে সব মসজিদে আযান হতো মাঝে মাঝে বিকট শব্দের মতো কানে এসে লাগতো।বিরক্তবোধ হতো।কিন্তু এখন সেই আযানটাই যেন সুমধুর মনে হয়।ফজরের আযান অবশ্য শুনতে ফয়সালের সবসময় ভালো লাগতো। আজ বেশ শুনতে মন চাচ্ছে।ফয়সাল ইউটিউবে ঢুকে বাংলাদেশের বায়তুল মোকারমের মুয়াজ্জিনের আযান গাড়ির সাউন্ড বক্সে প্লে করল।কি অদ্ভুত সুন্দর করে আযান দিচ্ছে।ফয়সালের মা প্রায় বলতো আযান শুনে নামাজ পড়তে হয়।আর সেটা যদি গভীর মনোযোগ দিয়ে শোনা হয় তাহলে নামাজ পড়লে সকল মছিবত দুর হয়ে যায়। ফয়সাল আবারও গাড়ি পার্ক করল। রাস্তার ফুটপাতে দাড়িয়ে নামাজ পড়ছে সে।
এ যেন গভীর মনোযোগী ইবাদত। আশেপাশের ভোরে কাজে যাওয়ার হন্তদন্ত ছুটে চলা মানুষ জন একবার পরখ করে দেখছে। কেউ কেউ হাসছে কিন্তু কোনদিকে ফয়সালের কর্নপাত নেই।

আবারও গাড়ি চলছে। গাড়ি তোয়ার বাসার কাছাকাছি। ফয়সাল গত দুমাস আগে এসে বাসাটা ঠিক করে দিয়ে গিয়েছিল।গ্রিফিত ইউনিভার্সিটির পাশেই বাসাটা।অজি বুড়া দম্পতির বাসা। বুড়োবুড়ি থাকে।একটা রুমে তোয়া থাকে।তোয়াকে বুড়াবুড়ি বেশ আদরও করে।

বাসার সামনে গাড়ি পার্ক করে ফয়সাল স্থির হয়ে দাঁড়ায় কিছুক্ষন। চুপচাপ দেখে বাড়িটা। একতলা নির্জন নিস্তব্ধ বাড়ি। হঠাৎ করে দৌড়ের মতো করে হেঁটে বাড়ির গেটের কাছে যায়। একবার নক করে। পরক্ষনই মনে হলো এদেশের বেশির ভাগ বাড়ির গেট খোলা থাকে। প্রথম প্রথম এই ব্যাপারটা নিয়ে ফয়সালের অবাক লাগতো। কিন্তু কিছুদিন যাবার পর স্বাভাবিক লাগে। মনে হয় যেদেশে চোর নেই পাড়ার মাস্তানি নেই তাহলে কেন বাড়ির গেট বন্ধ রাখবে। বাড়ির গেট খুলে তোয়ার ঘরের সামনে এসে দাঁড়ালো। ঘরের বাইরে তোয়ার একটা স্যান্ডেল দেখে মনের ভেতরে খাঁমচে উঠল। শরীর শিরশির করে উঠল।স্যান্ডেল টাকে খুব অসহায় লাগছে। গেটে নক করলো কয়েকবার।
‘ তোয়া আমি এসেছি। তুমি ফোন ধরছো না কেন। দরজা খোল।
কয়েকবার একই ভাবে ডাকতে ডাকতে দরজার কড়া নাড়ল। কিন্তু দরজার এপাশটা নিরব নিস্তব্ধ। যেন কতদিন হলো এই দরজায় কোন শব্দ হয়নি। কতদিন হলো দরজার ওপাশটা খোলা হয়নি। কয়েকবার কড়া নাড়ার শব্দে বিদেশী বৃদ্ধ মানুষটা পাশের রুম থেকে বের হলো। ফয়সাল কে দেখে সে চিনে ফেলল।এগিয়ে এসে বলে।
‘Come down first & then listen to me’
ফয়সাল বৃদ্ধের কথাটা শুনে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে।বৃদ্ধ ফয়সালের ঘাড়ে হাত রেখে বলে।
Toa admitted hospital last night. Here is address for hospital.
It is very important you to be with her all time.
ফয়সাল কোন সারাশব্দ না করে বের হয়ে যায়।গাড়ি ঘুরিয়ে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে যায় হসপিটালে।

স্থির হয়ে তোয়ার সামনে দাঁড়িয়ে থাকে। কখন তোয়া চোখ খুলবে।মায়াবি চোখ দুটো বড়ই ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে আছে। ডাক্তার বলেছে কিছুক্ষন পরই চোখ খুঁলবে। কিছুক্ষন পরই কথা বলতে পারবে।মাথায় অতিরিক্ত চোট পাওয়ার কারনে অজ্ঞান হয়ে যায়।তোয়া বাথরুমে মাথা ঘুরে পড়ে গিয়েছিলো বলে ডাক্তারের কাছে জানতে পায় ফয়সাল।তবে এখন সে আউট অফ ড্যান্জার।
তোয়া চোখ খুলে ঝাপসা চোখে ফয়সাল কে দেখে। ফয়সালের চোখ দিয়ে ঝরঝর করে জল পড়ে। তোয়া আরও খানিক জোর খাটিয়ে পুরোপুরি চোখ খোলে। ফয়সালের মুখটা তার কাছে অনেকটাই পরিস্কার। এতোক্ষন মনে হচ্ছিল আবছায়া।তোয়া হাত দিয়ে ইশারা করে। ফয়সাল কাছে যায়। তোয়া হেসে উঠে বলে।
‘ এতো কিভাবে ভালোবাসো’ খুব ভয় পেয়ে দিয়েছিলাম নাহ? হঠাৎ করেই এমন হলো। ফয়সাল ওসব কথা বলতে তোয়ার মুখে হাত দিয়ে বারন করে।তোয়া নিরব হয়ে তাকিয়ে থাকে। আরও বেশি মায়াময় লাগে সমস্ত মুখখানা। ফয়সালের চোখের জল তবুও স্থির হয়না। অবিরাম গতিতে পড়তে থাকে।
‘গাধাটা কেন এখনও কাঁদছো।’আমি তো তোমারই আছি,’বলে তোয়া ফয়সালের হাতটা চেপে ধরে।

জানালার পর্দার ফাঁক দিয়ে দুপুরের আলো এসে পড়ে তোয়ার মায়াময় মুখখানার উপর।দেখতে যেন উজ্জল বর্নের মায়াবতী। ভালোবাসার সুখ গুলোই বুঝি এমনই হয়। এমন করেই বুঝি বেঁচে থাকে ভালোবাসার মূহুর্ত গুলো। যে মূহুর্ত গুলো বাঁচিয়ে রাখে ফয়সালের মতো আদিগন্ত স্বপ্ন দেখার মানুষদের।