ভালোবাসা, মাদকাসক্তি এবং সময়ের প্রেক্ষাপট । পিয়ারা বেগম

  •  
  •  
  •  
  •  

এ পৃথিবীতে সফল, সার্থক লোকদেরকে সবাই ভালোবাসে। অবশ্য সাফল্যের অর্থ এক একজনের কাছে একেকরকম। কারো কাছে বিপুল সম্মান। কারো কাছে অর্থ-বিত্ত। কারো কাছে নির্মোহ সাদামাটা নির্বিঘ্ন জীবন। মূলত: মানুষ অর্থ-বিত্ত, সম্পদশালী মানুষকে ভালোবাসে। তবে ক্ষমতার দাপট আছে সে ব্যক্তি চরিত্রহীন হলেও তাকে ভালোবাসে সবচেয়ে বেশি। তার পিছে ছেঁচোরের মতো ঘুরঘুর করে তথাকথিত ব্যক্তিত্বহীন মানুষেরা। আরো ভালোবাসে প্রভাব-প্রতিপত্তি, সুনাম- যশ-খ্যাতি সম্পন্ন ব্যক্তিদের। জ্ঞানী-গুণী মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসার ঝোঁক খুব কম থাকে। একজন সফল, সার্থক ব্যক্তি সে আদৌ ভালো কিনা খারাপ সেটা ধর্তব্যেই আনা হয় না। ডিম আমাদের দৈনন্দিন খাদ্যতালিকার একটি অপরিহার্য অংশ। কিন্তু বাইরে থেকে ডিমকে যেমন বুঝা যায় না ভালো না পঁচা, তেমনি একজন  সফল মানুষকেও বুঝা যায় না সে আসলে কতটা ভালো বা কতটা খারাপ। তাহলে কি দাঁড়ালো? স্বার্থ হাসিল করা যাবে এমন ব্যক্তিকেই মানুষ ভালোবাসে সবচেয়ে বেশি। সে ভালো কি খারাপ সেটা বিবেচ্য বিষয় নয়।

আরো বিস্ময়ের ব্যাপার যে, সমাজেই কেবল নয়। স্বার্থের জন্য পরিবার, অফিস, কর্মক্ষেত্রে সবাই শুধু ভালোবাসা চায়। কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া এ সমাজের অধিকাংশ মানুষের চাওয়া-পাওয়া এক এবং অভিন্ন। অর্থাৎ অর্থ-বিত্ত, ক্ষমতার মধ্যেই মূলতঃ সেই চাওয়া-পাওয়া সীমাবদ্ধ। ভালোবাসার সংজ্ঞা এখন এটাই। ভালোবাসার প্রতিদানে ভালোবাসা। এমনটি এখন কদাচিৎ নেই বললেই চলে। বিশেষ কেউ কারো রূপে মুগ্ধ হয়ে তাকে ভালোবাসে। কিংবা তার ভালোবাসা চায়। কারো গুণের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে চাল-চুলোহীন হলেও বিশেষ কেউ তাকে ভালোবাসে। কিংবা তার ভালোবাসা চায়।  তবে এটাও এখন নেই বললেই চলে।

প্রত্যেকটা ভালোবাসার পেছনেই আছে কোনো না কোন স্বার্থ। যেমন ক্ষমতা, অর্থ-বিত্ত, শিক্ষা বা গুণ। কিন্তু এ পৃথিবীতে ব্যর্থ মানুষদেরকে কেউ ভালোবেসেছে এমন নজীর নেই ? যদিও সে গুণী বা শিক্ষিত হোক না কেন। তাছাড়া  মানুষের দোষগুলো দেখে-শুনে সেই দোষী ব্যক্তিকে কেউ ভালোবাসেছে এমন ঘটনাও বিরল। একটা বাস্তব উদাহরণ দিচ্ছি, বিশেষজ্ঞরা বলেন – “মাদকাসক্তি কোনো অপরাধ নয়। আর মাদকাসক্তরাও অপরাধী নয়। মাদকাসক্তি মূলত একধরনের মনোদৈহিক আচরণগত ও মানসিক প্রবণতার সমস্যাজনিত উদ্ভূত রোগ। তারা খারাপও নয়, পাগলও নয়। কেবলমাত্র একজন অসুস্থ ব্যক্তি, একজন রোগী।”

অপ্রিয় হলেও বাস্তবতা এই যে, এইসব নীতিকথা কেবল সমাবেশ, সেমিনার, বক্তৃতা-বিবৃতিতেই খাটে। উপস্থিত জনতা শোনা পর্যন্তই। বাড়ি পর্যন্ত আর পৌঁছায় না। তাই সমাজের সাধারণ মানুষের নিকট এগুলো ধোপে টিকানো মুশকিল। আমরা অনেকেই মুখে বড় বড় বুলি আওড়াই। মাদকাসক্তি কোনো ব্যক্তির সমস্যা নয়। এই সমস্যা সমাজের, রাষ্ট্রের। সুতরাং আমরা কেউ দায়িত্ব এড়াতে পারি না। কারণ, এটা মনুষ্যসৃষ্ট একটি সামাজিক ব্যাধি। মনীষীরা আরো বলে থাকেন, “পাপকে ঘৃণা কর, পাপীকে নয়। মাদককে ঘৃণা কর, মাদকাসক্তকে নয়।” আসলে সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব হিসেবে আদৌ কি আমরা পাপীকে বা মাদকাসক্তকে ঘৃণা থেকে মুক্ত রাখতে পারছি? পারছি কি তাদের একটু ভালোবাসা দিতে? সত্যি বলতে কী, একটা সময় আসে  মাদকাসক্ত সন্তান মা- বাবা এমন কী পরিবারের সদস্যদেরও গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়ায়। তাই তো মাদকাসক্তরা ঘরে-বাইরে অবহেলিত। সমাজে সর্বত্র উপেক্ষিত। এমন কী নিজের কাছেও নিজে বোজা হয়ে দাঁড়ায়। উপায়হীন হয়ে মানবেতর জীবন বেছে নিতে বাধ্য হয়। আর তখনি মাদকের চাহিদা পূরণে মরিয়া হয়ে চুরি-ডাকাতি, ছিনতাইয়ের পথে পা বাড়ায়।

তাই বলছি, কোন এক দূর্বল মুহূর্তের সতর্কতার অভাবে এরা নেশা শুরু করেছে। এটার জন্য এরা যতটা না দায়ী তার চেয়ে শতগুণে দায়ী সমাজ। আগেও বলেছি এ দায় সমাজ এড়াতে পারবে না। তাই তারা অবশ্যই আমাদের সকলের বিশেষ ভালোবাসা পাওয়ার যোগ্য। তাদের প্রতি শুধু সাধারণ ভালোবাসা নয়। গতানুগতিক ভালোবাসাও নয়, প্রয়োজন বিশেষ ভালোবাসা। কারণ, তারা অসুস্থ। এটা পরিবারের একক ব্যক্তির সেবা যত্নে সম্পূর্ণ ভালো হওয়ার রোগ নয়। তাতে চাই সর্বজনীন ভালোবাসা। সমষ্টিগত ভালোবাসা। কিন্তু ভালোবাসার দেওয়ার ক্ষেত্রে আমরা বড্ড হিসেবী। তাই তো ডেল কার্ণেগী বলেছেন, “এ পৃথিবীতে সবাই ভালোবাসার কাঙাল হই, কেউ কাউকে ভালোবাসা দেবার জন্য পাগল হই না।” আর মাদকাসক্তের ভালোবাসা? প্রশ্নই আসে না। বরং দুর দুর করিয়ে তাড়িয়ে দিই। আর বলি, এদের ছায়া মাড়ানোও পাপ। আমরা বুঝতে চাইনা, তাদের যদি অবহেলা করা হয়। তাদের যদি নানা দুর্নাম রটাই। মারধর করি। তাদেরকে সামাজিক ও ধর্মীয়ভাবে হেয় প্রতিপন্ন করে দূরে সরিয়ে দেওয়া হয়। তবে তারা জীবনের প্রতি আরো বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়বে। আরো বেশি অপরাধমূলক কাজে জড়িয়ে পড়বে। ক্রমান্বয়ে সে শুধু নিজেই নষ্ট হবে না। আরো অনেকের নষ্ট হওয়ার কারণ হয়ে দাঁড়াবে। সমাজ আরো কলুষিত হবে। আমাদের অবহেলার কারণে এ পৃথিবী থেকে হারিয়ে যাবে অমিত সম্ভাবনাময় অনেক প্রাণ।
অনেকদিন আগে ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছিলাম, “এ পৃথিবীতে অসুস্থ মানুষ সহানুভূতি খুব কম পান, তিনি যা পান তা হলো করুণা আর বিরক্তি”। অনেকেই তাদের চিন্তা-চেতনার, অভিজ্ঞতার আলোকে জ্ঞানগর্ভ মন্তব্য করেছেন। এখানে আমার এক সহকর্মী শেফালী আক্তার লিখেছেন, “সহানুভূতিও করুণার জন্ম দেয়”। ভেবে দেখলাম এটাও অসত্য নয়। তাহলে কি দাঁড়ালো, সহানুভূতিও প্রকান্তরে করুণাই।

যা বলছিলাম, কিন্তু মাদকাসক্তরা? দুঃখজনক হলেও, এটা কঠিন এবং নিরেট বাস্তবতা, মাদকাসক্তরা কিন্তু এই সামান্য সহানুভূতিটুকুও পায় না। তারা যা পায় তা হচ্ছে ঘৃণা, অবহেলা, লাঞ্ছনা আর ধিক্কার! আসলে মাদকাসক্তদের এবং তাদের পরিবারের পাশে দাঁড়িয়ে ভরসা দেওয়ার লোক নেই। সামনে দাঁড়িয়ে পথ দেখানোর লোক নেই। কিন্তু পিছনে দাঁড়িয়ে সমালোচনা করার, উপহাস করার লোকের অভাব নেই। অথচ একজন মানুষের ছোট্ট একটি কথা সুগন্ধি ফুলের মতই সৌরভ ছড়াতে পারে। বদলে দিতে পারে একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তির জীবন দৃষ্টি! একটু সহানুভূতি, একটু সহমর্মিতা, একটু ভালোবাসা তো দিতেই পারি। এমনি একটু আশার বাণী যদি তাদের দেওয়া যেত তাহলে তারা হয়তো পেত বাঁচার অনুপ্রেরণা। সত্যি কথা বলতে কি, মাদকাসক্তরা পরিবার, সমাজ এবং আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে  সবসময় অবহেলা, তিরস্কার পায়। আর এই নেতিবাচক কথা শুনতে শুনতে তারা নেতিবাচকতায় আসক্ত হয়ে পড়েছে। কেবল মাদকই তাদের ভালোবাসে এটাই তাদের বদ্ধমূল ধারনা জন্মাতে বাধ্য করছি আমরা। আসলে, মাদকাসক্তরাও চায় তাদেরকে একটু ‘মানুষ’ বলে ভাবা হোক। তারাও চায় সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে। চায় সমাজের মূল স্রোতে ফিরে আসতে। কিন্তু আমরা কী সে সুযোগ দিচ্ছি? আমরা মাদকাসক্তকে কেবল নয়, মাদকাসক্ত পরিবারকেও কোনঠাসা করি। এতে এক প্রকার কুটিল আনন্দে মেতে ওঠি। তাতে কিন্তু আর যাই হোক মাদক নিয়ন্ত্রণে কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না।

সুতরাং মাদকের উৎস, এর সরবরাহের পেছনে কারা তা খোঁজে বের করতে হবে। কেবল  ঢাকঢোল পিটিয়ে চুনোপুঁটিদের ধরার প্রচারে আদৌ কোন কাজ হয় না। এদের নেপথ্যে চমকপ্রদ অভিযানের ফিরিস্তি প্রচারে যে লাউ, সে কদুই থেকে যাবে। মাদকাসক্ত পরিবারের ওপর ক্ষোভ ঝাড়লেও কোন লাভ নেই। তবে বাস্তবতা এই যে, পানি তো নীচের দিকেই গড়ায়, ওপরের দিকে নয়। এটাই বড় আফসোস।
তাই বলছি, আধমরা সাপকে মেরে হাত ব্যথা করে কী লাভ? এ কৃতিত্বে মূলত আর যাই হোক নিজের মনের কাছে বড় হওয়া যায় না। তার চেয়ে উত্তম কাজ, আমাদের চারপাশে যারা মাদকাসক্ত, আসুন আমরা তাদেরকে সারিয়ে তোলার জন্য সহানুভূতির হাত বাড়াই। যারা মাদকাসক্ত তারা তো আমাদেরই কারোর না কারো আপনজন। সুতরাং তাদের সুচিকিৎসা দিয়ে পরিবার ও সমাজে পূর্ণবাসন করার পথ সুগম করতে এগিয়ে আসি। আমাদের সন্তানদের সুস্থ মাদকমুক্ত পরিবেশে বেড়ে ওঠার সর্বাত্মক চেষ্টা করি। মাদকের ছোবল থেকে তাদেরকে রক্ষার নৈতিক দায়িত্ব  কিন্তু আমাদের সকলেরই।
তাং- ১৬/০৮/২০২১।

পিয়ারা বেগম
কথাসাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক
বাংলাদেশ।

বিজ্ঞাপন
0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments