ভালোবেসে সখী নিভৃতে যতনে… -অজয় দাশগুপ্ত

  •  
  •  
  •  
  •  

 348 views

ভালোবাসা কারে কয়? এ প্রশ্ন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের। প্রেমিক পুরুষ কবি রবীন্দ্রনাথের জীবনে বিদেশিনী প্রেমিকা এমনই ভূমিকা রেখেছিলেন- পরে তিনি তার টানে ভারতে এসেছিলেন আর্জেন্টিনার রাজদূত হয়ে। আর সেই বিদেশিনী ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর জন্যে হয়তো রবীন্দ্রনাথ দুই-দুইবার ঘুরে এসেছিলেন সেই দেশ। ভালোবাসার আরও কত কাহিনী আমাদের লেখকদের। নজরুল তো ঢাকায় এসে রানু সোম পরবর্তীকালে যিনি প্রতিভা বসু, সেই বিদূষীর প্রেমে পড়ে লিখলেন- “আমার কোন কূলে আজ ভিড়লো তরী কোন সে সোনার গাঁয়।”

সেই প্রেম যুগে যুগে চলছে, চলবে। তবে আমাদের যৌবনেও কোনও বিশেষ দিন ছিল না ভালোবাসার। এটা মানি এমন একটা বিশেষ দিন থাকা মন্দ কিছুনা। বরং ভালো। যে যুগ পড়েছে কাজের চাপ আর নানা ধরনের উটকো ঝামেলায় মানুষ সব ভুলতে বসেছে। মা-বাবাকে মনে করারও তাই দিন থাকতে হয়। আমাদের জাতির একটা ভালো দিক তারা যখন কোনও কিছুতে মজে বা ভালোবাসে তখন তাকে উৎসবমুখর করে তোলে। এই ফেব্রুয়ারি মাসে ভালোবাসা দিবস যেমন রঙিন তেমনি ফাগুনের প্রথমদিনটাও লালে লাল। এমনকি শহীদের রক্তমাখা একুশের দিনটিতেও আমরা ভাষার বিজয়ে উৎসব করি বৈকি।
ভালোবাসার দিনে ঢাকা ও দেশের এই জেগে ওঠা বিদেশের বাঙালিকেও প্রভাবিত করে। এমনিতেই এসব দেশে ভ্যালেন্টাইন ডে জনপ্রিয়। কিন্তু দেশের শেকড়ে বাঁধা নাড়ির টানে জাগা বাঙালি দিনটিকে আরও নিবিড় করে পায় দেশের কল্যাণে। আমার মনে হয় মানুষ যত ভালোবাসার দিকে ঝুঁকবে সমাজে ততবেশি মঙ্গল আর শান্তি নেমে আসবে। আমাদের সমাজে কোনকালে ভালোবাসার কমতি ছিলনা। বলাই হয় মায়ার দেশ আমাদের। ‘ভায়ের মায়ের এত স্নেহ কোথায় গেলে পাবে কেহ?’- এই সমাজে আজ কেন এ হানাহানি? তার আগে একটা কথা বলি, ‘মায়া’-র আরেক নাম জাদু। এই জাদু আছে বলেই দুয়ারে দাঁড়ানো মায়ের টানে দূরদেশ থেকে উড়ে আসে সন্তান। এই জাদুতে স্বামী দিনরাত পরিশ্রম করে বাড়ি ফেরে স্ত্রীর মুখের দিকে তাকিয়ে ক্লান্তি ভুলে যায়। এই জাদুর টানে প্রেমিক পাগলের মত ভালোবাসে প্রেমিকাকে। আর চোখের জলে রাত জেগে মেয়েটি ভাবে কখন দেখা হবে আবার। এই সত্য ও সহজবোধগুলো মরে যায়নি। কখনো মরেনা।
কিন্তু এগুলোকে কৌশলে মেরে ফেলার চক্রান্ত চলছে। কর্পোরেট বাণিজ্যের অনেকগুলো দিক আছে ভালো। আবার এমন কিছু কিছু দিক আছে যার ভেতর ভাঙণের পদধ্বনি। একসময় ভারতের মেয়েদের ধরে ধরে বিশ্বসুন্দরী ঘোষণা করা হয়েছিল। কারণ বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর চোখ তখন ভারতের নব্য ধনী আর মধ্যবিত্তের মানিব্যাগে। এখন তা থেমে গেছে। তার মানে কি ভারতের নারীরা আর সুন্দরী নন? তারা আগের চেয়ে সুন্দরী হলেও ব্যবসা যে এখন আরেকদেশে, আরেকমুখি। তাই সেভাবে সৌন্দর্য বা ভালোবাসার বিচার করা যাবেনা। ভালোবাসার মূল জায়গাটা তৈরি হয় মনে। চোখ তার পাহারাদার। আর যদি উল্টোটা হয়, মানে- চোখে ভালোলেগে মনে খারাপ কিছু, তখন আমরা দেখি মেয়েটির কালো মুখ। দেখি অপমানিত কিংবা সম্ভ্রম হারানোর অপার বেদনা। ভালোবাসার এমন কোনওদিক থাকতে পারেনা। এটা মুদ্রার উল্টো পিঠ। এর নাম ঘৃণা। অজান্তে আমাদের সমাজে ভালোবাসার বদলে এর চাষাবাদ বেড়েছে। তাই “আজ ফুলে ফুলে ঢলে ঢলে” বাস্তবতায়ও মানুষ এক স্ত্রী বা স্বামীতে সন্তুষ্ট থাকতে পারছেনা। প্রশ্ন উঠতে পারে ভালোবাসা কি একমুখি না তার কোনও দেয়াল আছে? নাই। আর নাই মানে এই না যে ঘনঘন সঙ্গী বদলিয়ে ভালোবাসাকে নবায়ন করতে হবে। দাম্পত্য এক বিষয়, ভালোবাসা আরেক। এই কারণে আমাদের জানা উচিৎ ভালোবাসার সংজ্ঞা আসলে কী?

ভালোবাসা কেবল একটি মেয়ে বা ছেলের ভেতর আটকে থাকার বিষয় না। মনোবিজ্ঞানী ফ্রয়েড থেকে ইডিপাস সর্বত্র যে আকর্ষণ তার সূচনায় আদম আর ইভ। তাও কিন্তু নিষিদ্ধ ফলের টানে এক খোলা ইতিহাস। ফলে শরীর থাকবেই। কিন্তু এর ব্যবহার আর পরিমিতি বোধ জানার নাম সভ্যতা। একারণে মানুষের মনযোগ ও ভালোবাসায় আরো অনেক বিষয় যোগ করে নিতে হয়। একটা সময় আমাদের অগ্রজরা দেশকে মায়ের মত ভালোবাসতেন। স্ত্রীর চেয়ে অধিক টানতো বলেই দেশের জন্য তারা মুক্তিযুদ্ধে যেতে পেরেছিলেন। জীবনের পরম সম্পদ যে জান, সেটি দিতেও কসুর করেননি। আমরা দেখেছি একসময় রাজনীতিবিদেরা বিয়ে করতেন না। তাদের কি সুখবোধ ছিল না? ছিল না নারীপ্রীতি? ছিল। কিন্তু তারা সে ভালোবাসাকে উৎসর্গ করেছিলেন দেশের জন্য। এমন ভালোবাসার পাগলামি না থাকলে মানুষ এগোতে পারতো? বিজ্ঞানী, আবিষ্কারক, কবি-সাহিত্যিক, আঁকিয়ে এমন কত সৃজনশীল পুরুষ-নারী জীবনে বিয়ের জন্য কাউকে সঙ্গী করার সময়ই পাননি। কারণ তাদের ভালোবাসা ছিল তাদের কাজ। জীবন্ত কিংবদন্তী লতা মুঙ্গেশকর বিয়ে করেননি। বিয়ে করার দরকার পড়েনি তাঁর। তাই বলে কি তাঁর জীবনে প্রেম আসেনি?
তাই বলছিলাম ভালোবাসা কারে কয়? এ প্রশ্ন চিরন্তন। কবি লিখেছিলেন, “ভালোবাসা মিলনে মলিন হয়, বিরহে উজ্জ্বল।” সে বিরহবোধ আর বিরহবেদনা মানুষ স্ত্রীর কাছ থেকেও পেতে পারে। থাকে যদি তেমন টান। আসলে ভালোবাসার এক বিশাল শক্তির নাম পৃথিবী। এখানে কত ঘটনা, কত অঘটন। মানুষের কত ওঠা-নামা। কখনো কখনো মনে হবে মানুষের জীবনে ভালোবাসা আজ আর নাই। মানুষ এখন দানব। ঠিক নয় এই ভাবনা। এরপর পরই আমরা দেখি মানুষের পাশে মানুষেরাই দাঁড়ায়। ভালোবাসার কত ধরনের চিহ্ন সারা দুনিয়ায়। দেশে যখন রানা প্লাজার ঘটনা ঘটেছিল, এক বৃদ্ধের কথা কখনো ভোলা যাবেনা। নিজের খাবারের জোগাড় নাই অথচ হাতে খাবার আর পানির বোতল নিয়ে অশ্রুমাখা চোখে দাঁড়িয়েছিলেন সারারাত। এর নাম ভালোবাসা।
আজ যে মেয়েটির প্রথম ঋতুস্রাব হবে সে যেমন নতুন করে চোখে কাজল মাখতে শিখবে, তেমনি যার বয়স আজ সত্তরের কাছে তার মনেও ফাগুনের আনন্দ দোলা দেবে। মানুষের জীবন একটাই। সে জীবনে তার যদি ভালোবাসা না থাকে তো আসলে কিছুই নাই। আমাদের নদীগুলো ভালোবাসার এক আনন্দ ধারা। আমাদের এমন পাখি আছে যে শুধু বসন্তে গান শোনায়। আমাদের এমন কবি আছে, যার গানে বসন্ত জাগ্রত হয় দুয়ারে। এমন কবিতা আছে, ছবি আছে, নাটক আছে, যাত্রা আছে, সাহিত্য আছে, যার জন্য আলাদা দিন বা সময়ের দরকার পড়েনা।
তবু তারুণ্যের হাত ধরে আসে ভালোবাসা দিবস। রাঙিয়ে দিয়ে যায় মানুষের মন। এত রাজনীতি, এত কঠিন জীবন, এত মারামারি, এত গুম-খুন, এত ধর্ষণ- তারপরও জেগে থাকে প্রেম। আর সে ভালোবাসার আলোয় মায়াবী দেশ বলে সব ভুলে আমার কাছে এসো। দেশের ও দেশের বাইরের বাঙালির ভ্যালেন্টাইন দিবসে যে কারও ভালোবাসার পাশে থাকুক বাংলাদেশ। আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি।

অজয় দাশগুপ্ত
: কবি, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক
সিডনি,অস্ট্রেলিয়া।

0 0 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments