ভালো থাকার সহজ উপায়: প্রসঙ্গ তুচ্ছাতিতুচ্ছ ঘটনা । পিয়ারা বেগম



  •  
  •  
  •  
  •  

 634 views

জীবন চলার পথে পরস্পর কতশত তুচ্ছাতিতুচ্ছ ঘটনা ঘটে থাকে। অপ্রত্যাশিতভাবে এই তুচ্ছাতিতুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে কখনো তর্কাতর্কি হয়। তর্কে তর্ক বাড়ে। কথার পিঠে কথা বলতে বলতে একসময় ঝগড়ায় রূপ নেয়। প্রথমত উভয় পক্ষই গলাবাজিতে জেতার চেষ্টা করে। কথার মারপ্যাঁচে প্রতিপক্ষকে নাস্তানাবুদ করতে থাকে। তারপরে হাতাহাতি, এমন কী মারামারি পর্যন্ত গড়ায়। এতে অনেক মানুষ জড়ো হয়। আমাদের সমাজে ভালো কাজে ডেকেও মানুষকে সংগঠিত করা যায় না। অথচ ঝগড়ায় কাউকে ডাকতে হয় না। রবাহুতের মতো অনেকেই নিজের জরুরী কাজ ফেলে চলে আসে। কেউ কেউ এসেই ধর-রে, মার-রে কথা বলে উসকে দেয়। মূলত তাদেরকে শান্ত করার পরিবর্তে প্রকারন্তরে ঝগড়ায় ইন্ধন জোগায়। এতে তারা আরো ফুঁসে উঠে। সে ফুঁসে ওঠার মধ্যে ফাঁক তালে গরম তেলে ফোঁড়ন দেওয়ার মানুষেরও অভাব নেই এই সমাজে। কেউ বা এতে ঢেলে দেয় ঘি! জ্বলন্ত আগুনে ঘি দিলে যেমনটি হয়। তেমনটি ঝগড়াও তুঙ্গে উঠে। আর কেউ বা তা দেখে মজালুটে তৃপ্তির ঢেঁকুর তোলে। কারণ, বাঙালীদের মধ্যে অনেকের স্বভাব হলো অন্যকে সমস্যাগ্রস্ত দেখে খুশি হওয়া। আর তামাশা দেখে উপভোগ করা। এদিকে উভয়পক্ষ একদম নাছোড়বান্দা। কেউ কাকে এতটুকু ছেড়ে কথা বলে না। যদিও কেউ উপযাচক হয়ে ঝগড়া থামাতে বলে, তবে হয়েছে! উপযাচক ব্যক্তিকে প্রতিপক্ষের চামচা হিসাবে আখ্যায়িত করা হয়। উপরুন্তু দু’চারটা নগদ কটু বলে তার মুখ বন্ধ করে দেয়।

এভাবে আর কতক্ষণ? একটা সময় আসে উভয়েরই চাপার জোর কমতে থাকে। শারীরিক ভাবেও একটু নিস্তেজ হয়ে পড়ে। তখন নিজ থেকেই হম্বিতম্বি, আস্ফালন কমিয়ে দেয়। আহা রে! বেচারী-রা! কী কষ্টটা-ই-না করল এতক্ষণ। শেষ পর্যন্ত জেতার ঘর দেখে একেবারেই শূন্য। কিন্তু, জেতা তো তাদের চাই- ই- চাই। আর উপদেষ্টারাও এই সুযোগেরই অপেক্ষায় ওৎ পেতে আছে। শুরু হয় উপদেষ্টাদের সলাপরামর্শ। এতে প্রলুদ্ধ হয়ে ওঠে তারা। ছানাবড়া হয়ে ওঠে চোখ! বিচার সালিশীর মাধ্যমে জেতার অলিখিত সনদ পেতে মরিয়া হয়ে ওঠে। উসকানির কারবার শেষে হলে উপদেষ্টারা কৌশলে সটকে পড়ে। প্রবাদ আছে,” খড় কুটায় আগুন দিয়া পেত্নী থাকে দুরে বইয়া”
শুরু হলো ঝগড়ার দ্বিতীয় ধাপ। ঝগড়ার বিষয় তুচ্ছ হলেও এখন আর তুচ্ছ রইল না। ডাল- পালা গজিয়ে মহিরুহে পরিণত হওয়ার পথে। কারণ, যে কোন তর্ক-বিতর্কে প্রতিক্রিয়াই অনুভূতির তীব্রতা বাড়ায়। আর অনুভূতির তীব্রতাই সাধারণ বিতর্কও অনেক সময় অপ্রীতিকর ঘটনার সম্মুখীন করে। কথায় বলে,”বিশাল অগ্নিকান্ডের সৃষ্টি হয় ক্ষুদ্র স্ফুলিঙ্গ থেকেই।”

আর সালিশী? সালিশী মানে বিচারকদের কাছে দৌঁড় ঝাপ করা। তোষামোদি, তেলমারা যত রকম কায়দা-কৌশল সব প্রয়োগ করতে হয়। কারণ, ঐ যে বললাম জেতা চাই। জেতার শতভাগ নিশ্চিতকে আরো পাকাপোক্ত করতে দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয়। সাক্ষী-সাবুদ সংগ্রহ করতে হয়। কিন্তু খালি হাত কি আর মুখে যায়? এ পৃথিবীতে লাভ ক্ষতির কথা না ভেবে কয়জনই বা সাক্ষী দিতে রাজী হয়? তখনই শুরু হয় লেনদেনের কায়-কারবার। এমন কী, সত্য-মিথ্যার সাক্ষী রফা-দফা করতে গিয়ে অমানুষদের পা চাটতে হয় কখনো-সখনো। কী অদ্ভুতুড়ে কাণ্ড রে বাবা! ভাবা যায়?
ভোগান্তির তো মাত্র শুরু! সালিশী বসালে আগের চেয়ে আরও বেশি মানুষ জানাজানি হবে। এর পক্ষে-বিপক্ষে জনমত তৈরি হবে। পথে-ঘাটে, রাস্তার মোড়ে, চা- স্টলে মুখরোচক আলোচনা-সমালোচনার ঝড় বইবে। রাস্তায় দেখা হলেই ঝগড়ার প্রসঙ্গ ওঠাবে। এতে টেনশনে মানসিক অস্থিরতা বাড়বে। সম্পর্কের অবনতি ঘটবে। দুঃখবোধ ও দুশ্চিন্তায় মনের ভারসাম্য ও শান্তি দুই-ই নষ্ট হবে। খাওয়ায় অরুচি আসবে। ঘুমে বিঘ্ন ঘটবে। আরাম হারাম হয়ে যাবে। এতে স্বাস্থ্য-স্নায়ু দু’টোই ভেঙ্গে পড়বে। অশান্তি হবে নিত্যসঙ্গী। মূলত অশান্তি যুদ্ধ হতেও গুরুতর।
কী ভয়ংকর ব্যাপার-স্যাপার! তিল থেকে তাল? আসলে কী ঝগড়া করার আদৌ কোন প্রয়োজন ছিল? একটু গভীর ভাবে ঠান্ডা মাথায় ভাবলেই বুঝা যাবে। আবেগ তাড়িত হয়ে তর্কে যাওয়াটা কত বড় ভুল ছিল। এবার সালিশীর প্রসঙ্গ। সালিশীর রায়ে গালি-গালাজের বিচার বড়জোর মাফ চাওয়ানো হয়। আর মারামারির  রায়ও মাফ চাওয়াই হয়। তবে জখম জনিত কারণে হয় তো চিকিৎসা বাবদ টাকা জরিমানা করা হয়। এই পর্যন্তই। কিন্তু অশালীন কটূক্তি যা বলা হয়ে গেছে। যা সবাই শুনেছে তা তো আর কোন কিছুর বিনিময়ে ফেরত পাওয়ার কোন পথ নেই। কারণ, কথা ও বন্দুকের গুলি একবার বের হয়ে গেলে আর ফেরানো যায় না। আর মারামারির ক্ষতিপূরণ হিসেবে জরিমানা আদায় করাও কিন্তু দুষ্কর। কারণ, ফেও পার্টিরা হা করে থাকে ভাগ বসাতে। শেষমেশ জরিমানার টাকা হাতবদল হতে হতে বাদীপক্ষ পায় সিকি ভাগ। তাছাড়া, আঘাতের বা জখমের কষ্টের দুর্ভোগের ভোগান্তি? এটার ভাগ তো একা ষোল আনাই বহন করতে হয় ভুক্তভোগীর। এমন কী,এই কষ্টের ভোগান্তি কখনো পূরণ হবারও নয়। তাছাড়া যে কোন ঘটনায় বা অপঘটনায় সাধারণত সুষ্ঠু বিচার অনেকক্ষেত্রেই প্রভাবিত হয়। কারণ ‘টু- পাইস’ কামানোর ব্যাপার-স্যাপার থাকে। কিংবা পেশি শক্তির বলে সুবিধা ভোগ করে ফায়দা লুটার অপচেষ্টা চালায় তথিকথিত সুবিধাবাদীরা। এহেন অপতৎপরতায় বিচার প্রক্রিয়া মূলত নিরপেক্ষ হওয়ার কোনো সুযোগই থাকে না। পক্ষান্তরে, আর্থিকভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত হয় উভয়পক্ষই।
এবার জেতার হালখাতায় চোখ বুলাই। আসলে, তর্কে জেতার প্রশ্ন একেবারেই অবান্তর। এ পৃথিবীতে তর্কে কোন পক্ষ জিততে পেরেছে বলে আমার মনে হয় না। এতে সুবিধাবাদীরাই লাভবান হোন। আর উভয়পক্ষের যতটুকু সুনাম আছে তা ক্ষুন্ন হওয়ার আশংকাই বেড়ে যায়। কারণ,ছোট হোক বা বড় হোক আমরা মন থেকে নিজের ভুল স্বীকার করি না অনেকেই। ফলে সহজে ক্ষমা করতেও পারি না। সালিশীর নির্দেশে যদিও ক্ষমা চাওয়ানো হয় বটে। সত্যিকার অর্থে সেটা ক্ষমা হয় না। ক্ষমা মানে কারো প্রতি অনুগ্রহ বা দয়া নয়। বরং তাকে জয় করা। অতীতের অপ্রীতিকর ঘটনার স্মৃতি হৃদয় থেকে মুছে ফেলা। অর্থাৎ কারো দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হলে মন থেকে ক্ষমা করতে হবে। কারো আচরণে কষ্ট পেলে সে কষ্ট ভুলে তার সাথে সদ্ভাব বজায় রাখতে হবে। মুখে ক্ষমা চাইল, অন্যপক্ষ ক্ষমা করে দিল এটা  মূলত হয় না। অন্তরের গভীর থেকে সকল রাগ,ক্ষোভ, যন্ত্রণা দূর করে ক্ষমা করতে হয় মূলত স্বেচ্ছায় প্রণোদিত হয়ে। আর ক্ষমা চাইতেও হয় নিজের ভুল স্বীকার করে। অনুশোচনায় প্রায়শ্চিত্ত করে,পরিশুদ্ধ হয়ে। সালিশীর চাপে, বা বাধ্যবাধকতার কারণে ক্ষমা চাওয়ানো হলে মূলত ক্ষমা প্রার্থীর মনে প্রচুর ক্ষোভ জমা হয়। ফলে আক্রোশবশত প্রতিশোধ স্পৃহা তৈরি হয়। যা মানসিক সুস্থতাকে, প্রশান্তিকে নষ্ট করে দেয়। তবে এটা সত্য যে, মাঝে মাঝে জয় হয় বটে তবে সেই জয় বিরাট শূন্যতায় ভরা। কারণ, প্রতিপক্ষের মন পায় না কখনো। আর যদি জরিমানার প্রশ্ন জড়িত থাকে তবে তো আরো ক্ষোভ জমে। এতে ভেতরটা আরো কদাকার রূপ ধারণ করে যা বিদ্বেষ ও তিক্ততায় ভরা থাকে। কারণ,তর্ক করে জেতা যায় বটে, তাতে প্রতিপক্ষের সাথে স্বাভাবিক সম্পর্ক তৈরি হয় না।

এবার জেনে নেই, এ সব উটকো ঝামেলা থেকে সহজে ভালো থাকার উপায় কী? আসলে, তুচ্ছ ঘটনাকে তু্চ্ছ ভেবে উড়িয়ে দেওয়াটাই সমীচীন। কারণ, কটুক্তি বা অশালীন কথার কোন ভিত্ নেই। তাছাড়া কথা তো গায়ে মাখার সাবান নয় যে, গায়ে মাখতে হবে? কথা হলো বাতাসের মতো, হু করলেই হাওয়া। তবে এর প্রতিক্রিয়ায় ঝগড়া আরো তীব্র হয়। এই জন্যই বলা হয়, তর্ক ব্যাপারটা বিষধর সাপের মতো। তাই একে এড়িয়ে চলাই শ্রেয়। আর শাস্ত্রের কথা, তর্কে জেতার সেরা উপায় হলো তর্ক না করা। প্রয়োজনে ছাড় দিয়ে ভালো থাকাই উত্তম। যখন বুঝবেন, প্রতিপক্ষ মরিয়া হয়ে ঝগড়ায় তেড়ে আসছে। তখন নতজানু হোন। বিনয়ী হোন। এতে আপনার মানসম্মান ধূলোয় মিশে যাবে না। বরং আপনার লাভে লাভ। এতে আপনার শারীরিক, মানসিক এবং আত্মিক প্রশান্তি বজায় থাকবে। মানসম্মান হারাবার কোন ভয় রইল না। যা ঘটে গেছে, সহজে মেনে নিন, স্বাভাবিক ভাবুন। কেননা, আমাদের বোঝা উচিত কয়েকটি হাঁড়ি পাতিল একসাথে রাখলে  ঠোকাঠুকি লাগতেই পারে। তাই বলে হাঁড়ি ভেঙ্গে যায় না। তেমনি মানুষ মাত্রই একটু ভুল বুঝাবুঝি হয়। এতে মন-মালিন্য বা তর্কাতর্কি হতেই পারে। তবে, ঝগড়া চরমে ওঠার আগেই থেমে যেতে হবে।

তাই তো ডেল কার্ণেগী বলেছেন, “এ সব তুচ্ছ বিষয়গুলোকে শরীরের ছোটখাট ক্ষত হিসেবে দেখা উচিত। বড় আঘাত হিসেবে নয়।” তাছাড়া, ঝগড়ায় জিতলেও কোন লাভ নেই। ছাড় দিয়ে পরাজয় হলেই বরং মনের শান্তি বজায় থাকে। স্বল্পায়ু জীবনটাকে কেন বিষাদময় করে তুলবেন? আসুন, ঝগড়াঝাঁটি  বাদবিসম্বাদ এড়িয়ে চলি। যাহাই ঘটুক সময়ের উপর ছেড়ে দিন। ভুলে যান সবকিছু। ক্ষমা করে দিন। আসলে সময়ই সবকিছু ভুলিয়ে দিবে আপনাকে, আমাকে, সবাইকে। আর সবাই ভুলেও যাবো একদিন। সুতরাং অতীতকে ভুলে যান, ক্ষমা করে দিন। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বলেছেন, “ক্ষমার মতো অস্ত্র আর নেই। যে ঠিক ক্ষমা করতে জানে, সেই শেষ পর্যন্ত জিতে যায়। ক্ষমা এক হিসাবে মহান প্রতিশোধও বটে”। তাপরেও বলব। জীবন তো একটাই! তাই প্রতিশোধের প্রশ্ন আর নাই বা তুললাম। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেই অমীয় বাণী দিয়ে শেষ করছি।
“যাহারা তোমার বিষাইয়ে বায়ু, নিভাইছে তব আলো,
তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ,তুমি কি বেসেছ ভালো?

পিয়ারা বেগম
কবি, কথাসাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক
নারায়ণগঞ্জ, বাংলাদেশ।

 

0 0 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments