ভাল থাকার সহজ উপায়: প্রসঙ্গ কটূক্তি । পিয়ারা বেগম

  •  
  •  
  •  
  •  

মানুষ মাত্রই সামাজিক জীব। তাই তো জীবন এবং জীবিকার প্রয়োজনে আমরা পরস্পর কাছাকাছি হই। কুশল বিনিময় করি। নানা বিষয় সম্পর্কে আলোচনা করি। কখনো সখনো সমালোচনাও স্থান পায়।
এমনি এক মুহূর্তে আপনার কোনো প্রিয় ব্যক্তি, প্রিয় প্রতিষ্ঠান কিংবা আপনার নিজের সম্পর্কে   হঠাৎ কেউ বিরূপ মন্তব্য করে বসল, যা মিথ্যা, বানোয়াট এবং ভিত্তিহীন। ঘটনার আকস্মিকতায় আপনি হতচকিত। মূলত ধারণাতীত ভাবে আপনি বিব্রত এবং অপ্রস্তুতও। কারণ, মানুষের সামনে আপনাকে  অপদস্থ বা হেয় প্রতিপন্ন করা হচ্ছে। এ মুহূর্তে এটা মেনে নেওয়া আপনার পক্ষে কষ্টসাধ্য বটে। ফলে, আবেগের প্রতিক্রিয়া বশত হয় তো আপনার ব্রহ্মতালু গরম হয়ে ওঠছে। মেনে নিচ্ছি, তবুও বিনয়ের সাথে বলছি, মাথাটা এতটা গরম না করে একটু শান্ত হয়ে ভাবুন। এই যে, আপনার প্রিয় মানুষ বা প্রিয় প্রতিষ্ঠান কিংবা আপনার সম্পর্কে  তিনি যে বিরূপ মতামত ব্যক্ত করেছেন তা কিন্তু এমনি এমনিতেই বলেননি। হতে পারে কোন কারণে সংশ্লিষ্টদের প্রতি তার বদ্ধমূল খারাপ ধারণা জন্মেছে। এতে তাদের সম্পর্কে ব্যক্তির মনে একটা ভ্রান্ত বিশ্বাসও তৈরি হয়েছে। আর তার মতামতটুকু তার এ ভ্রান্ত বিশ্বাসেরই বহিঃপ্রকাশ। কারণ, হতে পারে,পরশ্রীকাতরতা, ঈর্ষা কিংবা ব্যক্তিগত কোন আক্রোশ। কিংবা উদ্দেশ্য প্রণোদিত ভাবে কারো প্ররোচনায় এমন উদ্ভট মন্তব্য করেছেন। শুরুতেই আপনার দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে তাকে বুঝিয়ে বলুন। অপারগতায় থেমে যান। কিন্তু তা না করলে সম্ভাব্য কী কী সমস্যা হতে পারে তা একটু খতিয়ে দেখি।

ধরে নিচ্ছি, এমন উত্তেজিত মুহূর্তে আপনি বিতর্কে গেলেন। আপনি তার মতামতের বিপক্ষে অকাট্য তথ্যনির্ভর যুক্তি উপস্থাপন করলেন। কিন্তু, শুধু গলার জোরে যুক্তির ভিতটা দুর্বল করা যায় না। দরকার তা খণ্ডনের জন্য তার চেয়েও জোরালো যুক্তি। তারপরও ধরে নিলাম, আপনি আপনার বুদ্ধিমত্তায় প্রকাশিতব্য বিষয়ে তার চেয়েও জোরালো যুক্তি প্রয়োগ করে খণ্ডনও করতে পারলেন। প্রকারন্তরে আপনি প্রমাণ করতে পারলেন যে, তার ধারণা, তার মতামত ষোল আনাই ভুল। যেহেতু  যুক্তিহীন কথা বাজারেও চলে না। তাই বলে কিন্তু প্রতিপক্ষ চুপ থেকে ভদ্রোচিত ভাবে নীরব শ্রোতা ছিলেন না? তবে একচোট বাকবিতণ্ডা যে হয়ে গেল এটা আর বুঝার বাকী নেই।
তবুও আপনি জেতার আনন্দে একেবারে আপাদমস্তক উল্লসিত। তবে আসল কথা এই, যে কোন বিতর্কের শেষ পরিণতিতে দু’পক্ষই থাকে অটল, অনড়। তারা আরো জোরালো ভাবে গলা উঁচিয়ে বলে থাকেন তার কথাটাই সঠিক। তাই বলছি, বিতর্কে হেরে গেলে তো হেরেই গেলেন। কিন্তু  আপনি জিতলেও হারবেন। কারণ,জেতার আনন্দে আপনি হয় তো জোশ-মুডে হৃদয় আকাশে আতশবাজি পুড়াচ্ছেন। কিন্তু? ঐ ব্যক্তির মনের অবস্থা কী রকম হতে পারে ভাবা যায় ? ভুল প্রমাণ করাতে গিয়ে আপনি তাকে ছোট প্রমাণিত করেছেন। তার অহমিকায় আর আত্মসম্মানের ওপর আঘাত করেছেন। এমতাবস্থায় সে কী  মন থেকে আপনার জয় মেনে নেবে? কখনো না। আপনি হয় তো ভাবছেন, ঐ ব্যক্তি তার মতামত বা ধারনার পরিবর্তন করেছে। কিন্তু আসলে তা নয়। আপনি কোনভাবেই তার নিজস্ব মতামত থেকে তাকে একচুল পরিমাণও নড়াতে পারেন নি। বাস্তবতা এই যে, বিতর্কে মানুষের মতামতের স্বপক্ষের বা বিপক্ষের যুক্তিকে খণ্ডন করা যায় বটে। কিন্তু তার বিশ্বাসের পরিবর্তন করা যায় না কখনো । কারণ,এ পৃথিবীতে সাধারণ মানুষই কেবল নয়, প্রায় ক্ষেত্রেই শিক্ষিত মানুষও অপরিসীম ভ্রান্ত বিশ্বাস আর সংস্কারের নিগড়ে আবদ্ধ থাকে। তাদের মতাদর্শের বাইরে কোন যুক্তি প্রতিষ্ঠার প্রতিও তাদের সামান্যতম শ্রদ্ধাবোধ বা বিশ্বাস নেই। এমন কী সাধারণ কোন ব্যক্তিকেও তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে কিছু মেনে নিতে বাধ্য করালেও কিন্তু সে তার মত পাল্টায় না। যেহেতু আপনি তার অনুভূতিতে আঘাত করেছেন। তাছাড়া, মতবিরোধ এমন একটা বিষয় এটা নিয়ে যতই বিতর্ক চলুক না কেন। কিংবা মুখে যতই নমনীয় ভাব দেখাক না কেন। এতে তাদের ইস্পাত কঠিন হৃদয় এতটুকুনও টলে না। মূল কথা, বিচার মানি তবে তালগাছটা আমার!! মতবিরোধ বিতর্ক খুব স্পর্শকাতর একটা বিষয়। তাছাড়া, আমাদের সমাজে খুব কম সংখ্যক লোকই যুক্তি মেনে চলে। সাধারণত বেশির ভাগ মানুষই হুজুগে বিশ্বাসী, একরোখা  আর একপেশে।
আসলে, আমাদের সমাজে দুই ধরনের মানুষকে পরাজিত করা কঠিন। এক –  যে বোঝে না যে, সে আসলেই কম বুঝে। দুই – বোঝেও না বুঝার ভান করা।” এক নং কারণের পরিপ্রেক্ষিতেই হয় তো সক্রেটিস একবার তাঁর সময়কালের এক আত্মম্ভরি স্বঘোষিত জ্ঞানীর উদ্দেশ্য বলেছিলেন, “তোমার সঙ্গে আমার পার্থক্য এখানে যে, আমি যে মূর্খ তা আমি জানি। কিন্তু তুমি যে মূর্খ, তুমি সেটাও জাননা।”  আর দুই নং প্রসঙ্গে বলছি, কেউ না বুঝার ভান করে ইচ্ছে করে। কারণ, সে নিজেও জানে তা সঠিক আর এ জানাটাই তার বড় সমস্যা। অন্যের মতাদর্শের প্রতি সাপোর্ট করা মানে তার কাছে হেরে যাওয়া। আর এটা সে কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না। আবার কেউ হঠাৎ নেগেটিভ মন্তব্য বলে ফেলায় তা আর ফেরাতেও পারছে না, তার অহংভাবের কারণে। অর্থাৎ তাই তিনি তার মতাদর্শে অবিচল, অনড় থাকেন। তবে এটা মানুষের একটা সহজাত প্রবৃত্তিও বটে। তাই তো অধ্যাপক ওভারস্ট্রীট তাঁর বই  “ইনফ্লুয়েন্সিং হিউম্যান বিহেভিয়ার” – এ বলেছেন, “না” কথাটা একবার বললে তাকে কাটানো কঠিন কাজ। কোন লোক “না” বললে তার সব আত্মঅহমিকা তাকে ওটাই আঁকড়ে থাকতে বলে। সে হয় তো পরে বুঝতে পারে ‘না’ বলাটা ঠিক হয় নি। তা সত্ত্বেও তার অহমিকাই তাকে তার মত বদলাতে দেয় না।”

সত্যটা এই যে, প্রতিবাদ করে, যুক্তিতর্ক প্রয়োগ করে জয় হয় বটে তবে তা তিক্ততায় ভরা। এটা মূলত ভেতেরে ভেতরে একটা দীর্ঘস্থায়ী বিরোধের সৃষ্টি করলেন। আর এতে করে আপনার পরিমার্জিত ব্যক্তিত্ব ও ইমেজ কিছুটা হলেও সুধী মহলে যে তা সমালোচিত হবে এটাও সত্য। তাছাড়া আপনি সাময়িক আনন্দ পেলেও আপনার চিত্তের শান্তি বিঘ্নিত হবে নিঃসন্দেহে। কারণ,আপনার ভেতরে ক্ষোভের বীজটা আপনি নিজেই রোপন করে তা সযতনে পেলেপুষে রাখছেন। কেননা, মানুষ আঘাত ভুলে গেলেও অপমান সহজে ভুলে না। ফলে তাকে দেখলেই আপনার মনেও নির্ঘাত একটা প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হবে। কারণ,ক্ষোভ হলো কারো মুঠোতে ধরা আগুনের জ্বলন্ত অঙ্গারের মতো। তাই বলছি, একে ক্ষমা করার মধ্য দিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিন। নতুবা আপনি নিজেই ক্ষোভের আগুনে জ্বলে-পুড়ে ছাই হবেন।এমন কী আপনার প্রতিপক্ষও। এখানেই শেষ নয়, কখনোসখনো প্রতিশোধ গ্রহণের ইচ্ছা জাগ্রত হওয়াটাও অস্বাভাবিক কিছু নয়। কেননা, মতান্তরকে কেন্দ্র করে মনান্তর হওয়া মোটেও উচিত নয়। সঙ্গত কারণে প্রশ্ন দাঁড়ায় তাহলে কী করা উচিত? এমন পরিস্থিতিতে আমাদের উচিত একেবারে নির্লিপ্ত, থাকা। এ মুহূর্তে শান্ত থাকাটাও এক ধরনের প্রতিবাদ। তাছাড়া অন্যের মন্তব্যের প্রেক্ষিতে উত্তেজিত হয়ে পদক্ষেপ নেওয়া মানে ক্রিয়া নয়, তা হয় প্রতিক্রিয়া। প্রতিক্রিয়া অনেকক্ষেত্রেই মঙ্গল বয়ে আনে না। বরং এটা ধৈর্যের সাথে সয়ে যাওটাই ভালো।

কারণ, সময় একটা বড় বিচারক। জীবনে এমন একটা সময় আসে কারো প্রতি অন্যায়, অযৌক্তিক আচরণ করলে তার মনে অনুশোচনার জন্ম নেয়। তার চিন্তা,চেতন ও বিবেকবোধ তাকে পীড়ন করে। তখন কৃতকর্মের জন্য নিজেই অনুতপ্ত হয়ে নিজ থেকেই বদলাতে শুরু করে নিজেকে।
তাই বলছি, সাধারণ বিষয়টাকে ঘোলাটে না করে  প্রতিপক্ষের সাথে স্বাভাবিক থাকুন, সুসম্পর্ক বজায় রাখুন। এতে আপনার ঔদার্য আর মহত্ত্বই প্রকাশ পাবে। প্রবাদ আছে, “গুপ্ত কথা পোক্ত, ব্যক্ত করলে তিক্ত”। আসলে, এমন পরিস্থিতিতে কখনো যুক্তি উপস্থাপন করে কাউকে হারাতে যাওয়া ঠিক নয়। তাই কিছু কিছু ক্ষেত্রে হেরে যাওয়া মানেই জিতে যাওয়া। এ হারের মাঝে আপনার জিত শতগুণে ফিরে পাবেন। যেহেতু আপনি সত্যের পথে আছেন, ন্যায়ের পথে আছেন। তবে কীসের ভয়? কেন তাকে জোর করে স্বমতে আনতে অকাট্য যুক্তিতর্কের অবতারণা করবেন? বিতর্কে যাওয়া মানেই নিজের দুর্বলতা প্রকাশ করা। তাছাড়া ক্ষেপে বিতর্ক যাওয়া মানে আরো মানুষ জানাজানি হওয়া। এতে প্রকান্তের প্রতিপক্ষের বিরোধিতাকে জাগিয়ে তোলা হয়। সেক্ষেত্রে তার মন বদলানো আরো কঠিন হয়ে ওঠবে। অতএব তাকে কঠিন করে তুলে লাভ কী? এতে তো তার উদ্দেশ্যই সফল হবে। তাহলে কেন ই বা আপনি তার উদ্দেশ্যেকে সফলকাম হতে দেবেন? আর কেন-বা নিজেকে ক্ষতিগ্রস্ত করবেন?
তার চেয়ে উত্তম পথ হচ্ছে চুপ থেকে তা সময়ের উপর ছেড়ে দেয়া। সময় যেন সারিবাদি সালসার মতো উৎকৃষ্ট  দাওয়াই। কারণ – সময়,পরিবেশ, পরিস্থিতি, কখনোকখনো মানুষের মতামত কেন, মানুষের পুরো ধ্যান-ধারণাটাকেই পাল্টে দেয়। শুধু তাই নয়, কখনো বা পুরো মানুষটাকেই বদলে দেয়। কথায় বলে না, মানুষের মন আকাশের রঙ। হ্যাঁ, মানুষ কখনো কোন রকম বাধা বা বড় রকমের আবেগ ছাড়াই নিজের মন এমনিতেই  বদলে ফেলে। তাই বলছি, জীবন তো একটাই!! আসুন, আমরা মন কষাকষি, হ্রেষাহ্রেষি এড়িয়ে চলি। অন্যকে জিতিয়ে হারের মাঝে যে চমকপ্রদ চিত্তসুখ আছে তা উপভোগ করি। কেবল চিত্তে প্রাচুর্যবান ব্যক্তির কাছে বিত্তের প্রাচুর্য ছাড়াও উপভোগ্য হয়ে ওঠে জীবন। তবে আর দেরি কেন? আসুন, উজার করা ভালোবাসা, ক্ষমা ও দয়ার ঐশ্বরিক গুণে সমৃদ্ধ হই। ক্ষমার মধ্য দিয়েই আমাদের হৃদয়কে প্রেমে পরিপূর্ণ করি। স্রষ্টা ক্ষমাশীল মানুষকে পছন্দ করেন। প্রেমময় হৃদয়কে ভালোবাসেন। এভাবেই আমরা আমাদের চিত্তের প্রশান্তি নিশ্চিত করি। যে কোন পরিস্থিতিতে প্রো-অ্যাকটিভ থাকি। নিজেও ভাল থাকি এবং অন্যকেও ভাল থাকতে সহায়তা করি।

পিয়ারা বেগম
কবি, কথাসাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক
নারায়ণগঞ্জ, বাংলাদেশ।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments