ভাষান্তরিত গুচ্ছ কবিতা: সোনাটা ও ভাটিয়ালির টান -বদরুজ্জামান আলমগীর

  •  
  •  
  •  
  •  

 

বদরুজ্জামান আলমগীর

কহলিল জিবরান

বৃষ্টি কাহারবা

আমি আল্লার বাগান থেকে ঝরে পড়ি
সাদা শুভ্র দানা।
সংসার আমাকে তুলে নেয় তার করপুটে,
মাঠ, ঘাট, প্রান্তরে অতঃপর ছড়িয়ে দেয়
আমার প্রাণকণা।

ভোরের প্রতিমা ইশতারের মুকুটে ঝলমল আমি
মিহিপলা মুক্তাজরি।

আমি কেঁদে কেঁদে ঝরি- পাহাড় হেসে ঝলকায়;
আমার আকুতি আনে ফুলের বাগানে সৌরভ,
আমার ভক্তি প্রসাদ উদ্যানে হাসি উচ্ছ্বাসের গৌরব।

নিচে বিছানো বিস্তারী মাঠ, উপরে কৃষ্ণচরিত মেঘ-
দু’জন প্রেমের ভাবে মজে চণ্ডিদাস রজকিনী।
আমি তাদের মাঝখানে সিঞ্চি করুণাধারা;
আমি একজনের লাগি তৃষ্ণার জল, আরেকজনে
ব্যথার উপশম।

বজ্রনিনাদ জানায়, আমি এসেছি
রঙধনু বলে, আমার যাবার সময় হলো দাও বিদায়!

আমি জাগতিক জীবনের বাঁক
যার শুরু কড়কড়ে টানা বাস্তবে,
আর যবনিকা মৃত্যুর উড়ানিয়া পাখায়।

আমি বয়ে যাই সমুদ্রে বাতাসের দমকায়
ছুঁয়ে আসি, নুয়ে বসি শুকনো ফুলে মর্মের গুণ।
গাছেদের ভরকেন্দ্রে জড়িয়ে থাকি
কতো না লক্ষ যোজন পথে অনুপথে!

আমি নরম আঙুলে বাতায়নে সুর তুলি
রিমঝিম আলিঙ্গণের রাখিবন্ধনে বাঁধি।

আওয়াজের শব্দ শোনে আমজনতা সবজনা
শব্দের রুহানি মর্ম বোঝে কোনজনা!

নারী যেমন পুরুষেরই শৌর্যে জয় করে পুরুষ প্রকৃতি;
উত্তাপ আমাকে জন্ম দেয়,
শেষাবধি আমিই উত্তাপ হরণ করি।

আমি সমুদ্রের দীর্ঘশ্বাস, প্রান্তরের লাস্যধ্বনি
আমি স্বর্গের চোখের জল।

ভালবাসার নাভিমূলে অশ্রুর ফোঁটা
বহুবর্ণিল মাঠের উদ্ভাসে আমি হাসির নকশা।

সতত স্রোতোস্বিনী স্মৃতির তোড়ে ভাসে
আদম হাওয়ার বাগান-
বাজে চোখের জলে তারানার আগাম!

ব্যথা সম্পর্কে

শক্ত খোলস না ভাঙলে
কোনভাবেই ভিতরের শাঁস পাওয়া যায় না;
আমাদের ব্যথাও তেমন এক উদ্বোধন।
বেদ্নার ভিতর দিয়েই উপরের আবরণের নিচে
মজ্জার দেখা মেলে।
অনেক ফলের মধ্যে পাথর এক ব্যূহ।
ব্যূহের আড়ালে অন্তরাত্মা বুঝি
এক কয়েদখানায় আটকে আছে,
কঠিন বেড় ভেঙে দিলেই তার প্রাণ সূর্যাভায়
ঝলমল করে ওঠে!

তোমার অন্তর যদি দরোজার মত অবারিত
করে রাখো- তাহলে সহজেই হয়তো বুঝতে পারো
ব্যথাও আসলে আনন্দের চেয়ে কম আনন্দময়ী নয়।

ব্যথার তোরণেই ঘটে আনন্দের অভিষেক।

নিসর্গের স্বভাবে মনমনুরা করে
গ্রীস্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত ও বসন্তবরণ!
হৃদয় খুলে রাখো- দেখো ঋতুবাহার ফুটে ওঠে
মনের গহীন মোকামে!
শীতের নিকষ যাতনায় একে আসতে দিও ভিতরে।

নিম তিতা নিশিন্দা তিতা আরো তিতা দাওয়াই
তিতার পরে তাকদ মিঠা, মিঠা মনের হাওয়াই।

আত্মার প্রসন্নতার খোঁজে মাঝেমাঝে একাকিত্ব
পরিধান করে নিও।

আনুষ্ঠানিক অনান্তরিক হাতটিই
শেষ কথা নয়, তার লাগোয়া আরেকটি হাত আছে
অদেখায়- মায়ার অনুকূল, বরণব্যাকুল!

হতে পারে খুব গরম একটি মগ
আরো ঠাঠা গরম চা-
চুমুকে হয়তো বা ঠোঁটই গেল পুড়ে!

একবার কী ভেবে দেখেছো-
জন্মগতভাবেই কাপটি এতো শক্তপোক্ত নয়;
কঠিন মাটির মৃত্তিকামূলে ব্রহ্মা তার চোখের জল
মিশিয়ে দিয়েছেন, তাই নির্দয় রূপ নিয়েছে দয়ায়!


খালি প্রফেট কথাটি বললে বিশ্বপরিসরে নবী মোহাম্মদ, আর দি প্রফেট বললে কহলিল জিবরানের বইয়ের সঙ্গে সংযুক্তি তৈরি করে। বাইবেলের গভীর মূলে প্রোথিত নৈয়ায়িকতার ধাঁধার জগতে জিবরানের ব্যক্তি অভিজ্ঞানের হাড্ডাহাড্ডি বোঝাপড়ার ফলে তাঁর মনে যে জিজ্ঞাসা ও অমীমাংসার দোলাচল তৈরি হয় এর-ই বয়ান তাঁর লেখা ও চিত্রকর্ম। তিনি নিজেকে অধিকতর সাব্যস্ত করেছিলেন চিত্রশিল্পী হিসাবে, কিন্তু লোকের কাছে প্রধানত গৃহীত হন অধ্যাত্মবাদী লেখকের মর্যাদায়। পারিবারিক দুঃসহ দারিদ্র্যের কারণে শৈশবে কহলিল জিবরান মূলধারা শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হতে পারেন নি; ফলে খ্রিস্টীয় মক্তবের প্রিস্টদের একতরফা নৈতিক বয়ানে জিবরানের শিশুমন এক অপরিসীম অদৃশ্য ভারের নিচে চাপা পড়ে থাকে। তাই তাঁকে সারাজীবন সিসিফাসের মতো একটি পাথর সরানোর, কখনো বা আঁকড়ে থাকার মনস্তাত্ত্বিক শ্রমে যুক্ত থাকতে দেখা যায়। খ্রিস্টান পরিবারে জন্মালেও জীবনের একপর্যায়ে তিনি সুফি ঘরানার নৈকট্যে আসেন। কহলিল জিবরান জন্মেছিলেন লেবাননে ১৮৮৩ খ্রিস্টাব্দে, মৃত্যু তাঁকে রাখীবন্ধনে বাঁধে ১৯৩১ সনে নিউ ইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্রে।

 

ইয়োনে নোগুচি

কবি

দিনের একচ্ছত্র মন্থন সারাৎসার,
পুরু তমসার আমূল মরমিয়া
সংকেতে চমকায় তার চোখের সীমায়-

এমনই সে এক যাদুর গোপন,
শ্বাস তার সুবাসে মৌমৌ;
মুখম-লে আবীর মৃদুমন্দ হাওয়ার সহজিয়া।

তার পিছনে ঝিলমিল জান্নাতি শোভা
চলাচলে অনির্ণয়- বাতাসে দোলে বুনিয়াদি তোড়
থোরাই সে পরোয়া করে পারলৌকিক মোড়।

ভোরের প্রথম আলো তার বসতের ডোর,
কথা বুঝি গানের বুনন- গড়ে তোলে
গোধূলি বেলার ঘোর!

তার চাহনির মোহে মৃতজন
এক মোচড়ে জেগে ওঠে পতিত কবরের ধুলায়
গায়েবী রুহু অতঃপর হেঁটে যায় বনভূমির ছায়ায়!

টিলার উপরে

মৌনতার শিয়রে জীবনের চুমুক
আমি দাঁড়িয়েছি টিলার উপর,
ডোবায়মান সূর্যের দুয়ারের দিকে ফুটেছে আমার
হাসির রেণু;
আমি হারাণুন্মুখ দিনে অঞ্জলি রাখি গানের কলি।

ভাবনা আমার সন্ধ্যার আবছায়া সনে বাঁধে
রহস্য যমজ,
গোধূলি আবীর সোনালি ধূসর,
সাঁঝের খয়েরি পূরবী চুলে হাওয়ার সোনাটা
অতি দূর কোন নিঃসীম নগরীর থেকে আসে!

সায়াহ্ন বুঝি সুগন্ধি লোককথা।
সমস্ত দিনের উজাগরি শেষে- ও আমার
হারানো নোঙর, ও দ্বিধার ইন্দ্রজাল-
তোমার কিনারে দাঁড়িয়েছি দূর উড়ানের বেশ!

এখানে দাঁড়িয়ে বলেছি আমি : দূর হ তরবারি,
সরিয়েছি শহরনাশী ব্ল্যাক ম্যাজিক, কুফরি কালাম।

সূর্য ডোবে সাগরে কল্লোলিত স্তব্ধতার গহীন পারে,
দিবাকর রেখে যায় মায়াবী কোমল দাগ-
কমলা রঙের উন্মনা পিছুটান!

বৃক্ষের সুদীর্ঘ ছায়ারা বিলীন; কেবল ঘনঘোর
নৈঃশব্দ্য, নৈঃশব্দ্য, মৌনতার ছাতিম তলা,
আমার প্রাণে ফোটে মল্লিকা টুপটাপ-
কাঁপাকাঁপা নীরব মনতারা বুদ্বুদ!

নক্ষত্র নীলিমা, আত্মায় রোপন করে সাত্ত্বিক গান;
তামাম দুনিয়ার উপর আমার যে শালপ্রাংশু ছায়া
স্বপ্নে হারায় খোয়াবের ভিতর- আমি উপরের
দিকে হাসি, নীরবতায় জড়–য়ার সনে ভাসি;

সন্ধ্যা গলেগলে নামে মোমের পুতুল,
মৌনতার ভুবনে ধানদুর্বা, উদিত দুঃখের চাঁদ-

এসো প্রাঙ্গণে মোর!

ডাকো যে তুমি, পাইন গাছ

নিরালা পুকুর- আরো নিস্তব্ধতায় যেথা
ফুটে থাকে পদ্মফুল
তার পাড়ে দাঁড়িয়ে শুনি
পাহাড়ের মাথা থেকে ডাকো তুমি, পাইন গাছ!
বৃষ্টি পড়ে অধীর, বাতাস বহে একা,
আর তারামঞ্জরি মুখ বাড়ায়- তুমি তখনই ডাকো,
আমারে কেমন করে যে ডাকো পাইন গাছ!

কিন্তু আমি তো চক্ষুহারা;
জানি না কীভাবে তোমার পরশে যাবো,
কে-বা হাত ধরে নিয়ে যাবে তোমার কাছে?


ইয়োনে নোগুচি ডিসেম্বর ১৮৭৫ সনে জাপানের সুশিমায় জন্মান; ১৮৯৩ সনের নভেম্বর মাসে ১৮ বছর বয়সে প্রথমবার স্যান ফ্রেনসিসকো, যুক্তরাষ্ট্রে আসেন। নোগুচি অতঃপর ভালো করে ইংরেজি শেখেন, সাংবাদিকতা পেশায় যুক্ত হন; অন্যান্য অভিবাসীর দোটানায় মাতৃভূমি আর পালকমাটির মধ্যে যাওয়া আসা করে তিনিই সৃজনশীল প্রথম টাটকা জাপানী লেখক যিনি ইংরেজিতে লেখেন। তাঁর প্রাণের গহীনে ঋদ্ধ হাইকুর প্রবহমান স্থিতি, বহিরঙ্গে আধুনিক কবিতার বিন্যাস। ইয়োনে নোগুচি জুলাই ১৩, ১৯৪৭ টোকিওতে মারা যান।

বদরুজ্জামান আলমগীর: নাট্যকার, কবি, অনুবাদক। ২১শে অক্টোবর, ১৯৬৪ সনে জন্মেছিলেন বাংলাদেশের ভাটি অঞ্চল কিশোরগঞ্জের বাজিতপুরে। পড়াশোনা বাজিতপুরে, পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ২১ বছর ধরে রয়েছেন দেশের বাইরে- যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়ায়।
বাঙলাদেশে নাটকের দল- গল্প থিয়েটার- এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য; নাট্যপত্রের সম্পাদক। নানা পর্যায়ে আরও সম্পাদনা করেছেন- সমাজ ও রাজনীতি, দ্বিতীয়বার, সাংস্কৃতিক আন্দোলন, পূর্ণপথিক, মর্মের বাণী শুনি, অখণ্ডিত।
প্যানসিলভেনিয়ায় কবিতার প্রতিষ্ঠান- সংবেদের বাগান-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য।
প্রকাশিত বই:
আখ্যান নাট্য: নননপুরের মেলায় একজন কমলাসুন্দরী ও একটি বাঘ আসে।
কবিতা: পিছুটানে টলটলায়মান হাওয়াগুলির ভিতর।
আখ্যান নাট্য: আবের পাঙখা লৈয়া।
প্যারাবল: হৃদপেয়ারার সুবাস।
কবিতা: নদীও পাশ ফেরে যদিবা হংসী বলো।

অলংকরণ: আসমা সুলতানা মিতা