ভিনদেশে বাংলাদেশী সংস্কৃতি, আমাদের লক্ষ্য ও গন্তব্য -দীন মোহাম্মদ মনির

  •  
  •  
  •  
  •  

মাতৃভূমি অথবা জন্মভূমির সংস্পর্শহীনতার সতের বছর হতে চললো। প্রবাসী জীবনকাল নাতিদীর্ঘ হলেও পূর্ণ জীবন চক্রের আনুপাতিক বিচারে কম সময় নয়। ইতিমধ্যেই বিদেশী জীবনধারায় নিজের অজান্তেই নিজেদেরকে সংযুক্ত করে ফেলেছি। এটাই বোধ হয় স্বাভাবিক প্রবনতা। মানুষ উপযোজন করে ফেলে। ভাল-মন্দের বিচারবোধের মধ্যেও অনেক পরিবর্তন এসেছে। একটা লব্ধি প্রবনতা কাজ করে সব সময়। একদিকে বিগত জীবনের ধারা, প্রকৃতি ও চর্চার প্রভাব, অন্যদিকে নতুন সমাজের ভিন্ন আদলের সবকিছু মেনে নিয়ে দৈনন্দিন জীবন যাপনে নিজেকে নিজের অজান্তেই একজন অপরিচিত মানুষ মনে হয়। এই দ্বৈত প্রভাব প্রজন্মের বিকাশেও সরাসরি প্রভাব ফেলছে। তারা আমাদের পছন্দের আদলে মানুষ হচ্ছে কিংবা তাদের পছন্দে মানুষ হচ্ছে অথবা দ্বৈত ধারার সমন্বয়ে মানুষ হচ্ছে। আমরাও আমাদের পছন্দকেই প্রাধান্য দেয়ার চেষ্টা করছি। দৈনন্দিন চর্চায় আমরা বিদেশী সংস্কৃতির পাশাপাশি বাঙ্গালীর সহস্র বছরের প্রানবন্ত সংস্কৃতির চর্চাও যতটুকু সম্ভব ধরে রাখার চেষ্টা করছি।

সংস্কৃতি বলতে কি বুঝায় তা আমরা সকলেই কম-বেশি জানি। তবুও ধারনাটি সম্পূর্নরূপে উপলব্ধি করার জন্য ব্যাখ্যা দেয়ার প্রয়োজন বোধ করি। সংস্কৃতির ব্যাখ্যা বিভিন্ন রূপে বিভিন্ন জনে বিভিন্ন সময়ে দিয়ে থাকলেও ধারনাটি মোটামুটি অভিন্ন সর্বকালেই। সহজ করে বললে বলা যায়, যে অনুশীলন মানুষ একটি নির্দিষ্ট সমাজে যুগে যুগে চর্চা করে আসছে তাই সংস্কৃতি। এটি জীবিকার সাথে, এটি জীবনকে রাঙানোর সাথে এবং মূল্যবোধের সাথে সম্পর্কযুক্ত। আমাদের বঙ্গালী সংস্কৃতিটিও একটি স্বকীয় বৈশিষ্টে সমুজ্জ্বল এবং প্রানবন্ত। দেশান্তরিত প্রতিটি মানুষ সর্বক্ষনেই জন্মভূমির ঐ প্রানবন্ত সংস্কৃতির বঞ্চনাটিকে উপলব্ধি করে। এই উপলব্ধিবোধ থেকেই তারা সুযোগ পেলেই প্রবাসী জীবনকে দেশীয় বা জাতিগত সংস্কৃতির রংয়ে ক্ষনিকের জন্য হলেও রাঙিয়ে তোলে। এর মধ্যে অন্যতম অনুশীলন গুলি হলো – মেলার আয়োজন, ঈদ উদযাপন, পূজা পালন, দাওয়াত সংস্কৃতি ,আড্ডাবাজী ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির অনুশীলন।

রক্তের মধ্যে যা বহমান, তা কি সহজেই ত্যাগ করা যায়? অস্তিত্বটি যে সকল উপসঙ্গের উপর ভর করে টিকে আছে, সে সকলকে কি প্রাধান্য না দিয়ে বাঁচা যায়? হৃদয়ে ধারন করা হাজারো স্বপ্নের পটভূমিকে কিভাবে সরিয়ে দেয়া যায়? মাতা রূপ ভূমির প্রতি মায়াতো থাকবেই ।
অতএব আমাদের গ্রহন, লালন ও অনুশীলন। ভালো লাগাটি এবং প্রজন্মকে শেকরের সংস্পর্শে নিয়ে আসার মাধ্যমে আমাদের সাথে তাদের দূরত্ব কমিয়ে আনার চেষ্টাটি হলো উদ্দেশ্য। উদ্দেশ্যটি প্রসংশনীয় তবে গন্তব্যটি হতাশায় পরিপূর্ণ অপচর্চার অপঘাতে।
বিষয়টির অবতারনা কিছুটা হতাশা থেকে। হতাশা এজন্য যে, প্রবাসী বাঙ্গালীরা বাঙ্গালী সংস্কৃতির নামে অপসংস্কৃতির বীজ বপন করছে, প্রজন্মকে দ্বিধান্বিত করছে। আমাদের সাংস্কৃতিক অনুশীলনের মাধ্যমেই তারা জানছে আমাদের সংস্কৃতির রূপটি। অনেকে মনে করতে পারেন, সংস্কৃতিতো স্থির কোন চর্চা নয়। এটা হলো সতত পরিবর্তনশীল জীবন ধারার একটি উপসঙ্গ; অতএব এটাকে আঁকড়ে ধরে রাখার দরকার নাই। পরিবর্তনের সাথে মানিয়ে চললেই যথেষ্ট। না, সংস্কৃতির রূপ সময়ের সাথে পরিবর্তিত হলেও মূল ধারাটি সব সময়ই একই রকম যা সংজ্ঞায়িত করে আমাদের জাতিস্বত্তাকে এবং এর ভিতর দিয়েই আমাদের হাসি, কান্না, আবেগ, ভাললাগা তথা আমাদের জীবন বোধ প্রকাশিত ও উপলব্ধ । জীবিকার তাগিদে অথবা আপাতদৃষ্টিতে স্বার্থপরের মত ভাল জীবনমান লাভের উদ্দেশ্যে বিদেশে স্থায়ীভাবে বসবাস করলেও বাঙ্গালী হিসাবে আমাদের অস্তিত্বকে কখনোই বিসর্জন দিতে পারবো না কিংবা উচিৎ হবে না। এতে নিজেদেরকে শেকড়বিহীন পরগাছা ছাড়া আর কি মনে হতে পারে? বিদেশের মাটিতে বাঙ্গালী সংস্কৃতির লালন কতটা পরিবেশ বান্ধব কিংবা কতটা দীর্ঘস্থায়ী এটা নির্ভর করে যথাক্রমে ঐ দেশটি কতটা উদার এবং আমাদের প্রজন্ম কিভাবে বিকশিত হচ্ছে তার উপর। এ চর্চা কতদিন অব্যাহত রাখা যাবে সেটা নিশ্চিত নয়, তবে অন্তত আমাদের ভাললাগার স্বার্থে ও প্রজন্মের সাথে আমাদের বন্ধনকে দৃঢ় করতে এ প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য।
সংস্কৃতি চর্চার প্রথম পদক্ষেপ হিসাবে মাতৃভাষা ব্যবহারে যেমন গুরুত্ব দেয়া উচিৎ ঠিক একইভাবে সন্তানদেরকে উৎসাহিত করা উচিৎ ভাষাটি আয়ত্ব করার ব্যাপারে।বেশিরভাগ প্রবাসী বাঙ্গালী বাংলা ভাষাটিকেই পারিবারিক পর্যায়ে ভাব বিনিময়ের প্রধান মাধ্যম হিসাবে ব্যবহার করছেন তবে সন্তানদের ক্ষেত্রে বাংলা ভাষা ব্যবহারে তারা অনেকটাই উদাসীন।অনেক বঙ্গালী পরিবারেই ছেলে-মেয়েরা বাংলা বলতে একেবারেই অপারগ; পড়তে কিংবা লিখতে পারাটিতো দূরের কথা।ভাষার মাধ্যমেই স্বপ্ন রচিত হয়, ভাষার মধ্য দিয়েই শেকড়ের সংস্পর্শ লাভ করা যায় এবং ভাষাটিই পারে সন্তানের সাথে পিতা-মাতার দূরত্ব কমাতে।

ওহে ভদ্রে,
কি ভাবিয়া, কি বুঝিয়া, নহে যুঝিয়া,
নহে আঁকিলা মানস তাহাদের তোমারই সুরের মন্দ্রে।
সুরটি বেসুরে হইলো বলিয়া অন্তরাত্মাটি কাঁদে,
কোকিলের ছাও কা কা করিলে কোকিল তাহারে না ভালবাসে।

একটা কিছু অর্জন করতে হলে তার পেছনে আন্তরিকতা ও চেষ্টা থাকা জরুরী। চেষ্টাটি একদিনের নয়, এটি প্রতিদিনের অভ্যস্ততায় অন্তর্ভূক্ত হওয়া দরকার। কোন কোন প্রবাসী বাঙ্গালী ঘরে ইংরেজী বলাটাকে উৎসাহিত করছেন এই ভেবে যে, এতে তারা তাড়াতাড়ি ইংরেজ বনে যাবেন। বাচ্চাটা অনর্গল ইংরেজী বলছে এটা যেন একপ্রকার গর্বের বিষয়। আমি ইংরেজী ভাষার অপ্রয়োজনীয়তার কথা বলছি না। দোভাষী বা বহুভাষী হতে পারাটা কৃতিত্বের বাহক।
তবে বাঙ্গালী হিসাবে গোড়া পত্তন বাংলা দিয়েই হোক। সময়ের সাথে সাথে আমরা অনেক অসংগতি কিংবা ভাল না লাগার সাথে অভ্যস্ত হয়ে পরি। অসংগত বিষয়টি কোন এক সময় সংগত রূপে পরিগনিত হলে জীবন তীব্র গতিতে ছুটে চলে ঠিকই, তবে এটা নিশ্চিত যে, সংগত আখ্যা দেয়ার নিমিত্তে কিংবা অভ্যাসের কারনে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন প্রক্রিয়ায় ক্রমাগত অবক্ষয়ে শেকড়ের সাথে যে বিচ্ছিন্নতা ঘটে তার পুনঃসংযোগের ইচ্ছা থাকলেও আর কোন উপায় থাকে না। অতএব, ঘরে ঘরে বাচ্চাদেরকে বাংলা বলার সংস্কৃতিটি বাধ্যতামূলক করুন।

প্রবাসে বসবাসরত বাঙ্গালীদের মধ্যে আর একটি প্রবনতা হলো দাওয়াত প্রথা। একে অন্যজনের বাড়িতে যাবে, একত্রে বসে একসাথে খাবে, গল্প-গুজব করবে, ঠাট্টা-হাসিতে মেতে উঠবে এটাই বাঙ্গালী সংস্কৃতির প্রাণ। আত্মীয়-স্বজনহীন ভিনদেশে এ সংস্কৃতিটি যেন মরুভূমিতে মরুদ্যান পাওয়ার মত ব্যাপার। এই দাওয়াত প্রথাটি এখানে গেট টুগেদার হিসাবে পরিচিত। নিজ হাতে বৈচিত্রময় খাবারের পরিবর্তে ক্যাটারিং করা হুবহু একই খাবার পরিবেশন করা হয়; অবশ্য ‘ওয়ান ডিশ’ পার্টি নামে আরও একপ্রকার গেট টুগেদারের আয়োজন করা হয় যেখানে আমন্ত্রিত প্রতিটি পরিবার একটি করে মেনু তৈরী করে নিয়ে আসে যা পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে পূর্বেই নির্ধারণ করা হয়। প্রায় ক্ষেত্রেই আয়োজককে ভাত ছাড়া আর কিছুই রান্না করতে হয় না। নিমন্ত্রনের চিরায়ত বাঙ্গালী সংস্কৃতির বৈশিষ্টটি ছিল শখ করে আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবদের মাঝে মাঝে নিজ হাতে রান্না করে ডেকে নিয়ে আসা এবং তাদের সাথে সুন্দর সময় কাটানো। জীবনকে অর্থবহ করা কিংবা সম্পর্কগুলি প্রানবন্ত করার জন্য এটা একটি সুন্দর চর্চা। একটু অন্তরদৃষ্টি দিলে বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করতে সহজ হবে। মানুষ যেহেতু সামাজিক প্রানী, সমাজের সাথে সংশ্লিষ্ট থাকা তথা সমাজে দশটি সমমনা মানুষের সঙ্গ কামনা করা ও সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি করা তার সহজাত বৈশিষ্ট । একটি মানুষ আর একটি মানুষের জন্য নিঃস্বার্থ ভাবে সময় দিবে যা কিনা আবার আন্তরিকতায় পরিপূর্ণ, এটা সুন্দরের সংজ্ঞায় সমৃদ্ধ । যার যার সামর্থ্যের মধ্যে নিজের ভালবাসা মিশ্রিত চেষ্টা প্রয়োগ করে একটা কিছু তৈরী করে একত্রে খাওয়ার আয়োজনটি নিঃসন্দেহে মূল্যবান এবং এটি বাঙ্গালী সংস্কৃতির সহস্র বছরের একটি ঐতিহ্য । এ জন্যই বাঙ্গালীদের অতিথি পরায়ন বলা হয়। বাধ্য হয়ে কিংবা লোক দেখানো চর্চাটি সহজেই ধরা পরে এবং পরিশেষে তা অবমূল্যায়ন ও অখ্যাতি বয়ে নিয়ে আসে। উপরোক্ত ‘ গেট টুগেদার ‘ ও ‘ ওয়ান ডিস পার্টি ‘ দুটিই আদর্শীক ও তাৎপর্যগত বিচারে মূল আন্তরিক চর্চা থেকে বিচ্যুত, অতএব গ্রহনযোগ্য নয়। কেউ কেউ বলতে পারেন, সংস্কৃতিতো অবস্থাভেদে সতত পরিবর্তনশীল একটি চর্চা। সুতরাং এর রূপ সময় ও চলমান সার্বিক অবস্থা অনুযায়ী পরিবর্তিত হবেই। রূপের পরিবর্তনটি যুক্তিসংগত,তবে উপরোক্ত রূপগুলিতে আন্তরিকতা বা উৎসর্গ করার মহৎ চর্চাটি অবহেলিত হওয়ার সম্ভাবনায় আচ্ছন্ন।

দিলামই যদি ভালবেসে,
হবে না তা কৌশলে বা সংক্ষেপে,
স্বচ্ছ, নির্মল, উদার আহবান,
এরূপেই ছিল বাংলা সংস্কৃতি বহমান।

প্লাস্টিকের প্লেট, কাপ, চামচ ইত্যাদি পরিহার করুন। এসবে মমতার সংস্পর্শ নেই। শতাধিক মানুষকে দাওয়াত করার প্রবনতা পরিহার করুন। আমি বাজি ধরতে পারি যে, একশত মানুষের সবাই বন্ধু হতে পারে না। যারা বন্ধু নয় তারা একটেবিলে বসে খেতে পারে না। শুধুই সামাজিকতা বা জৌলুস প্রদর্শনের জন্য শতশত মানুষকে হল ভাড়া করে পয়সা খরচ করে খাওয়ানোর এ সংস্কৃতিটি সংগত কারনেই সমর্থনযোগ্য নয়। এ প্রথাটি কোন যুক্তিসংগত কারন ছাড়াই মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়েছে বিদেশে বসবাসরত বাঙ্গালী সমাজে। এতে নেই পর্যাপ্ত পারস্পরিক ভাব বিনিময়ের সুযোগ, নেই সে আন্তরিকতার আমেজ।হিসাবটি সহজ; তা হলো তিন ঘন্টা সময় একশত মানুষকে ভাগ করে দিলে প্রতিজন মানুষ পায় ১.৮ মিনিট যা দুই মিনিটেরও কম সময়; যার ফলে সল্প সময়ের আন্তক্রিয়াটি আন্তরিকতাহীন যান্ত্রিক আচরনে রূপ নেয়, যা বাঙ্গালী বৈশিষ্ট্যের পরিপন্থি।

প্রবাসে বাঙ্গালীদের বাংলাদেশের চলমান রাজনীতি চর্চার সংস্কৃতিটি যুক্তিসংগত ভাবেই অযৌক্তিক । রাজনৈতিক মতাদর্শ থাকবে, তবে সক্রিয় ভাবে রাজনৈতিক কর্মযজ্ঞ চালানো ও দলের সাংগঠনিক রূপ দেয়ার বিষয়টি হাস্যকর। দেশপ্রেমে মাতাল হয়ে নয় বরং ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিল করার জন্যই বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তারা তাদেরকে রাজনীতিতে অন্তর্ভূক্ত করে। তবে, সচেতন বঙ্গালী হিসাবে গঠনমূলক রাজনৈতিক আলোচনা-সমালোচনা করা কর্তব্যের একটি অংশ। দেশ সেবার সুযোগের অভাবে কিংবা পরিস্থিতির কারনে প্রবাসী হলেও, প্রবাসে বসে বাংলাদেশর রাজনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখা উচিৎ এবং চাইলে তা সম্ভব। এটাকে রাজনৈতিক চর্চা বলা যায় না, এটা দেশ সংক্রান্ত অন্যান্য চর্চার মতই মুক্ত ও নিরপেক্ষ আর একটি চর্চা। প্রবাসে বসে দেশ সেবার এতটুকু অবদান রাখাটাই যুক্তিযুক্ত ।প্রবাসে থেকে বাংলাদেশী রাজনীতিতে সক্রিয় এবং সহিংস অবস্থানটি আইনগত ও নৈতিকভাবে গ্রহনযোগ্য নয়। সুতরাং দেশের জন্য কিছু করতে চাইলে করুন; যেমন- দাতব্য চিকিৎসালয়, তৃনমূল পর্যায়ে শিক্ষায় অবদান, দারিদ্র বিমোচনে সহায়তা, মানুষের নৈতিক উন্নয়নে উপযুক্ত দর্শন বিতরন ইত্যাদি। এ অনুশীলনটিকে প্রবাসে বাঙ্গালীদের সংস্কৃতিতে পরিনত করা যায়।

মেলার আয়োজন, বসন্ত উৎসব, পহেলা বৈশাখ উদযাপন, ঈদ উদযাপন, পূজা উদযাপন ইত্যাদি সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় চর্চাগুলিতো আমাদের রক্ত প্রবাহে মিশ্রিত। এসব উদযাপনে পৃথিবীর সব মাল্টিকালচারাল দেশই ভেন্যূ ও সিকিউরিটি থেকে শুরু করে প্রয়োজনীয় সব সহায়তা দিয়ে থাকে। মানুষের প্রাণের চাহিদাটি তারা বুঝে। বসবাসরত দেশটির প্রতি শ্রদ্ধা রেখে বাঙ্গালীরা শান্তিপূর্ণ ভাবেই এসব উৎসবে মেতে উঠছেন। শুধু সচেতন থাকা দরকার যে এ উৎসবগুলি যেন রাজনৈতিক প্রভাবের বাইরে থাকে। উৎসবগুলির কোনপ্রকার রাজনৈতিক মালিকানাকে পরিহার করুন। সবকিছুতেই অযৌক্তিক রাজনৈতিক সংমিশ্রন দূষনীয়। বাঙ্গালী বনাম বাংলাদেশী ধারনা নিয়ে অপ্রয়োজনীয় তর্কে জড়াবেন না, যদি আপনি আপনাকে সুস্থ ও স্বাভাবিক মনে করেন। আমার ব্যক্তিগত ভাবনা হলো- প্রথমত: আমি মানুষ, দ্বিতীয়ত: আমি বাঙ্গালী, তৃতীয়ত: আমি বাংলাদেশী, চতুর্থত: আমি আংশিক অষ্ট্রেলিয়ান। তবে আমরা লালন করি বাঙ্গালী সংস্কৃতি যা শুধুমাত্র বাংলাদেশ নামক ভৌগোলিক সীমারেখায় সংজ্ঞায়িত ধারনায় বন্দী নয়। ধারনাগুলি স্বচ্ছ ও টলমলে পানির মত পরিস্কার রাখুন, মানবতাকেই সর্বাগ্রে স্থান দিন। মাঝে মাঝে লুঙ্গি পড়ুন, ধুতি পড়ুন, পাঞ্জাবি পড়ুন, শাড়ী পড়ুন। তবে প্রাতিষ্ঠানিক ও বসবাসরত দেশটির সাধারন গ্রহনযোগ্য ড্রেস কোডকে সম্মান করুন।

প্রবাসে বসবাসরত কতিপয় শ্রদ্ধাভাজন ও মহৎপ্রান বাঙ্গালী তথা বাংলাদেশী আমাদের বাঙ্গালীদের সাংস্কৃতিক চেতনা, এ সংক্রান্ত ভাবধারা, সুখ-দুঃখ-বেদনা প্রকাশ ও ভাগাভাগির জন্য কিছু প্লাটফর্ম সৃষ্টি করেছেন। আতিকুর রহমান শুভ তাদের মধ্যে একজন যিনি প্রশান্তিকা নামে একটি প্লাটফর্ম তৈরী করেছেন। বাঙ্গালীদের সাংস্কৃতিক চেতনাকে বহমান রাখতে তার ভূমিকা প্রশংসনীয় । উল্লেখ করার মত আরো কয়েকটি প্লাটফর্ম হলো- মুক্তমঞ্চ, স্বাধীন কন্ঠ ও স্বদেশ বার্তা। এছাড়া গান বাকসো নামে একটি রেডিও স্টেশনও রয়েছে অস্ট্রেলিয়াতে। প্রবাসে বাঙ্গালী জীবন প্রকৃতি, পরামর্শ, গঠনমূলক আলোচনা ও সমালোচনা, বাংলা সাহিত্য ইত্যাদি বিষয়ে আপনারা আপনাদের ভাবধারা বা দর্শন শেয়ার করার সংস্কৃতিটি চর্চা করুন। আমি আবারও বাজি ধরে বলতে পারি এতে আপনাদের বাঙ্গালী স্বত্তাটি প্রানবন্ত হবে। নিজেকে সজীব রাখুন, সন্তানকে নিজের প্রানরসে সজীব রাখুন। তাদেরকে বিচ্ছিন্ন করবেন না, দ্বিধান্বিত করবেন না। শেকরের সংস্পর্শে থাকার অনুশীলনটি তাদেরকে নিয়েই করুন। এতে সন্তান হারানোর সম্ভাব্য ব্যথা থেকে মুক্ত থাকবেন।

গাছটিরে সুধাইলাম, তুমি কে?
আমিই তো তুমি, আমাতেই তুমি যে।
ফুলগুলি ধারন করিলাম সন্তান রূপে,
সংস্কৃতি তুল্য শেকড়ের রসে লালন করিলাম, যাতে নহে ঝড়ে।
পরিনত ফল মিটাইলো ক্ষুধা, সহজ হইলো জগতবাস,
বংশধর রাখিয়া যাইবো ধরায়, প্রজন্ম ফুল ছড়াইলো একই সুবাস।
মাটি আমার উর্বর বলিয়া, তাহারই রসে প্রাণ জুড়াইলাম,
ইহাতেই শান্তি, ইহাতেই তৃপ্তি, ইহাতেই জীবনার্থ খুঁজিয়া পাইলাম।

দীন মোহাম্মদ মনির
সিডনি, অস্ট্রেলিয়া।