ভিনদেশে বিজয় দিবস, হাঙ্গরের গুহায় লাল সবুজের অভিযান -ফাহাদ আসমার

  •  
  •  
  •  
  •  

আমরা যারা মুক্তিযুদ্ধের পরে জন্মগ্রহণ করেছি তাদের কাছে বিজয় দিবসের অর্থ খুব মিশ্র। আমরা মুক্তিযুদ্ধ দেখিনি, আমাদের হৃদয়ের মাঝখানে বারুদ বোমার আগুন লাগেনি, চোখের সামনে গুলির আঘাতে প্রিয় বুকের ছিটকে যাওয়া রক্তে ভিজতে হয়নি, জঙ্গল কাদাপানি মাড়িয়ে স্বজনের হাত ধরে পালাতে হয়নি, যশোর রোডের দুধারে খোলা আকাশের দিকে তাকিয়ে ঈশ্বরকে খোঁজা হয়নি, বধ্যভূমিতে শেয়াল কুকুরে ঠুকরে খাওয়া লাশের মাঝে হারানো স্বজনদের খুঁজে পেতে হয়নি, স্বাধীনতা শব্দটার প্রকৃত মানে তাই হয়তো আমাদের জানার কথা নয়। তবুও স্বজাতির খুঁজে পাওয়া কালো হাড় করোটি ছুঁয়ে আমরা খুঁজে নেই গর্বিত সেই ইতিহাস, স্মরণ করি জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের লাল সবুজের এই পতাকায়, রক্তাক্ত এই বিজয়ে হয়তো আমাদের কোন অবদান নেই কিন্তু বিজয় উদযাপনে আমাদের দুর্নিবার উচ্ছ্বাস তা চাপা দিতে পারেনি কখনোই।

শার্ক কেইভ বা হাঙ্গরের গুহা, ছবিঃ ফিস রক ডাইভ সেন্টার

এই দূর প্রবাসে, প্রশান্তপাড়ের শহর সিডনিতে বছর ঘুরে যখন বিজয় দিবসের সেই মহেন্দ্রক্ষণ হাজির হয়, নিজেদের সীমিত পরিসরে আমরা বিনম্র শ্রদ্ধায় পালন করি বাঙ্গালি জাতির সেই গৌরবজ্জ্বল দিনটিকে। গর্বিত সকল বাংলাদেশির মত এই দিনটি আমার জন্যও অনেক বিশাল এক অর্থ বহন করে তাই এ দেশে আসার পর কখনো আমি এই দিনে কাজ কিংবা ক্লাস করিনি। প্রতিবছর ভিন্নভাবে একান্তই নিজের মত করে পালন করেছি আমার বিজয় দিবস, ভিনদেশে অচেনা সব মানুষদের শোনাতে চেয়েছি আমাদের পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠার গল্প। আমি বিশ্বাস করি দেশের বাইরে বাংলাদেশের প্রতিটি সন্তান একজন করে দেশের পতাবাহক তাই বাংলাদেশের পতাকা ছাপা টি-শার্ট পড়ে, কিংবা মাথায় লাল সবুজের ব্যান্ডানা জড়িয়ে, হাতে বা সাইকেলে একটা পতাকা বেঁধে বেরিয়ে পড়ি ভিন্ন কোন শহরে, কিংবা অস্ট্রেলিয়ার ভিন্ন কোন রাজ্যে। অথবা পাহাড়, সমুদ্র কিংবা জঙ্গলে চলে যাই কোন এডভেঞ্চারের খোঁজে। রাস্তায়, স্টেশনে, এয়ারপোর্টে অথবা কোন রেস্টুরেন্টে মানুষ যখন এই পতাকা কিংবা টি-শার্টের মানে জানতে চায় তখন চোখেমুখে গর্ব নিয়ে তাদের শোনাই আমাদের বিজয়গাঁথা। এটাই আমার বিজয় দিবস পালন, এটাই আমার অহংকার।

গত ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে তেমনি গিয়েছিলাম সিডনি থেকে প্রায় ৫০০ কিলোমিটার দূরে নিউ সাউথ ওয়েলসের ছোট একটা শহর ‘সাউথ ওয়েস্ট রকস’ এ। মাত্র পাঁচ হাজার নিয়মিত জনসংখ্যার এ শহরটি দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের কোল ঘেঁষে সৌন্দর্যের এক অপরূপ লীলাভূমি। মূলত পর্যটকনির্ভর এ শহরের অন্যতম আকর্ষন ফিস রক কেইভ যা হাঙ্গরের গুহা নামে অধিক পরিচিত। মূল শহর থেকে বোটে প্রায় এক ঘণ্টার দূরত্বে নীল সমুদ্রের মাঝখানে খুব ছোট একটা খাঁড়া পাথুরে দ্বীপ যেখানে নামা যায়না। কিন্তু দ্বীপের পানির নিচেই আছে পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে আগত হাজার হাজার স্কুবা ডাইভার বা ডুবুরিদের সবচেয়ে বড় আকর্ষন, ফিশ রক বা শার্ক কেইভ। প্রাকৃতিক কারণে হাজার বছর আগে পানির নিচের পাথরে লম্বালম্বি চিড় ধরেছিল, সেখান থেকেই কালক্রমে সেটা গুহায় পরিণত হয়। লম্বা টানেলের মত গুহাটি দ্বিপের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত পর্যন্ত ৪১০ ফুট এবং পানির নিচে এর গভীরতা ৪০ থেকে ৯০ ফুট। সাধারণত একপাশ দিয়ে ঢুকে আরেক পাশ দিয়ে বের হতে হয়, কিছু কিছু জায়গায় দেয়াল এতটাই সরু যে উল্টোদিকে ঘুরে আসার কোন অবস্থা থাকে না। গুহার প্রবেশপথে এবং অন্যপাশে বেরোবার পর পানির গভীরতা সর্বোচ্চ ১২০ ফুটের মত। পুরো গুহায় নানা প্রজাতির অসংখ্য মাছ গিজগিজ করে বলে প্রথমদিকে ফিশ রক কেইভ নামে ডাকা হলেও এই গুহাটি স্থানীয় গ্রে নার্স হাঙ্গরের প্রাকৃতিক প্রজনন ক্ষেত্র বলে এটাকে শার্ক কেইভ নামেই বেশি ডাকা হয়।

যেদিন থেকে ওপেন ওয়াটার স্কুবা ডাইভিং এর লাইসেন্স পাই সেদিন থেকেই এ গুহাতে ডুব দেবার স্বপ্ন দেখছিলাম। কিন্তু এ গুহায় নামতে অনেক এডভান্স স্কুবা সার্টিফাইড হতে হয় এবং ডিপ ডাইভিং এ প্রচুর অভিজ্ঞতার প্রয়োজন হয়। অল্প অভিজ্ঞ কাউকে সেখানে নামতে দেয়া হয় না, আসলে সেটা উচিৎও না। গুহার প্রবেশপথ অত্যন্ত সরু, একজনের বেশি ঢুকতে পারে না, এবং প্রথম ৩০০ ফুটের মত অংশে থাকে ঘুটঘুটে আঁধার। এর মাঝে টর্চের আলোয় অনেকটা হাত দিয়ে নানা জাতের এবং বর্ণের মাছের ঝাঁক সরিয়ে খুব সাবধানে সাঁতরে অন্যপাশে যেতে হয়। পথে কখনো স্টিং রে, অবেগং শার্ক, অক্টোপাস, স্কুইড কিংবা ভয় ধরানো মোরে ইল দেখতে পাওয়া যায়। যদি কেউ অন্ধকারে কিংবা কোন জলজ প্রাণী দেখে ভয় পেয়ে বা আতঙ্কিত হয়ে পিছিয়ে আসতে চায় সাধারণত সেটা সম্ভব হয়না, নিজের বহন করা ট্যাঙ্কের বাতাসেই সাঁতরে পুরো গুহা পার হতে হয় যেখানে প্রায় ৪০-৬০ মিনিটের মত সময় লাগে। তাছাড়া পুরোটাই নিরেট গুহা বলে বাতাস ফুরিয়ে গেলেও সাঁতরে পানির উপরে চলে যাবার কোন পথ নেই। তাই শুধুমাত্র দীর্ঘক্ষণ পানির নিচে থাকতে পারার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এবং টেকনিক্যালি দক্ষ ডাইভার ছাড়া অন্যদের সেখানে নামতে নিরুৎসাহিত করা হয়। সাধারণত পূর্ববর্তি কমপক্ষে ৬০টি লগড স্কুবা ডাইভের অভিজ্ঞতা রেকমেন্ড করা হয় সেখানে নামার জন্য। অনেকদিনের স্বপ্ন ছিল সেই গুহাতে নামার, কিন্তু দূরত্ব সময় এবং টেকনিক্যালি প্রস্তুতির অভাবে যাওয়া হয়নি। অবশেষে ডাইভমাস্টার সার্টিফাইড হবার পর এই অভিযানের জন্য নিজেকে প্রস্তুত মনে হয়, ততদিনে আত্মবিশ্বাস তুঙ্গে। তারপর স্কুবা ইন্সট্রাক্টর কোর্স করার সময় সেখানে যাবার সুযোগ চলে আসে। মাস্টার স্কুবা ডাইভিং সার্টিফিকেটের জন্য কমপক্ষে পাঁচটি টেকনিক্যাল স্পেশালিটি কোর্স শেষ করতে হয়, এর মাঝে একটা ছিল নাইট্রোক্স বা মিক্সড গ্যাস সিলিন্ডার ডাইভিং যেখানে সাধারণ কমপ্রেসড বাতাসের বদলে অক্সিজেন সমৃদ্ধ বাতাসভর্তি ট্যাঙ্ক নিয়ে পানির একটু গভীরে ডাইভ দেয়া হয়। স্কুবা ডাইভিং এ প্রাকৃতিক বাতাসকে সিলিন্ডারে কমপ্রেসড করে ব্যবহার করা হয় যেখানে প্রায় ৮০% নাইট্রোজেন। কিন্তু নাইট্রোক্স মিক্সিং এ নাইট্রোজেনের পরিমাণ কম থাকায় বেশিক্ষণ পানির নিচে থাকা যায়। একটু বেশি খরচ হলেও দুইদিনের এই কোর্স সেখানে করার আবেদন করি এবং পছন্দমত ১৬ এবং ১৭ ডিসেম্বরের তারিখ পেয়ে যাই।

বোটে উড়ছে বাংলাদেশের পতাকা, ছবিঃ ডেভিড

১৫ তারিখ সকালে সিডনি থেকে ট্রেনে রওয়ানা করে দুপুরের শেষে ক্যাম্পসি স্টেশনে পৌছি। এটি পোর্ট ম্যাকুইরি এবং কফস হারবারের মাঝে ছোট একটি স্টেশন। সেখান থেকে বাসে যাবার কথা ছিল সাউথ ওয়েস্ট রকস, কিন্তু যেই স্কুবা সেন্টারের অধীনে কোর্স করার কথা তার মালিক জন প্রায় ৪০ কিলোমিটার ড্রাইভ করে এসে আমাকে রিসিভ করে যদিও এটা তার দায়িত্বের মাঝে পড়ে না। শুধু তাই নয়, ৬০ বছরের এই ভদ্রলোক তার সেন্টারের সাথেই লাগোয়া মোটেলে প্রায় অর্ধেক দামে চমৎকার একটা রুম বুক করে দেয়। ব্যাগপত্র রেখে ফ্রেশ হয়ে পরের তিনদিনের জন্য খাবার দাবার কিনতে চাওয়ায় আবার আমাকে কাছের একটা শপিং সেন্টারে নিয়ে যায়। এখানে আসার আগেই আমি তাঁকে ফোনে আমার উদ্দেশ্যে মানে সেখানে আমার দেশের বিজয় দিবস উদযাপনের ইচ্ছের কথা বলেছিলাম, সেটা শুনে সে নাকি খুব উত্তেজিত। এরকম কিছু নাকি আগে কখনো দেখেনি তাই আগেরদিন অনলাইনে বাংলাদেশ এবং তার স্বাধীনতা নিয়ে বেশ খোঁজ খবর নিয়ে রেখেছে যদিও এরআগে নাম ছাড়া বাংলাদেশ সম্পর্কে আর কিছু জানতো না। যেতে যেতে সেসব নিয়েই আলাপ হচ্ছিল, তার জানার ইচ্ছে এবং পড়াশোনার গভীরতা আমাকে বারবার মুগ্ধ করছিল। তাকে বীরপ্রতীক ওদারল্যান্ডের গল্প বললাম, এবার তার বিস্মিত হবার পালা। বিকেলে নাশতা শেষে থিওরি ক্লাশ শুরু হয়। আগামীকাল আমরা সব মিলিয়ে ৯ জন নামবো, একে একে সবার সাথে পরিচয় পর্ব শেষ হয়। জন নিজেই স্কুবা স্পেশালিটি ইন্সট্রাকটর, সে ছাড়া গাইড হিসেবে আরেকজন ডাইভমাস্টার যাবে আমাদের সাথে। বাকিদের মধ্যে দুজন আইরিশ, একজন কানাডিয়ান, দুজন মেক্সিকান, একজন জার্মান এবং আমি। ক্লাস শেষে মনে পড়লো যে পতাকা বাঁধার জন্য একটা ছোট লাঠি দরকার। জনকে বলার পর জানালো ৫ মিনিট হাঁটলেই জঙ্গল শুরু, সেখানে গেলে পাওয়া যেতে পারে। ততক্ষণে অন্ধকার নেমে এসেছে, বড় স্কুবা ছুরিটি নিয়ে জঙ্গলে রওয়ানা দেই। বেশ কিছুক্ষণ খোঁজার পর কাজ চালানোর মত শুকনো একটা ডাল পেয়ে যাই। মোটেলের এক কোনে চমৎকার একটা ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্ট, এ এলাকার বেশ নামকরা। সেখানে ভরপেট খাবার পর সারাদিনের ক্লান্তিতে প্রায় টলতে টলতে বিছানায় পড়ি।

ডুব দেয়ার আগে পতাকা গোছানো হচ্ছে, ছবিঃ মার্কাস

পরেরদিন সকাল ৭ টায় আমার ব্যবহারিক ক্লাশ শুরু হয়। সাধারণ বাতাসে পরিমাণমত বাড়তি অক্সিজেন মেশানো বেশ জটিল কাজ, প্রচুর সাবধানতা অবলম্বন করতে হয়। কয়েকবার করে দেখানোর পর জন সন্তুষ্ট হয়। নাইট্রোক্স মিক্সিং এর নিয়ম হল যার সিলিন্ডার তাকেই নিজ হাতে ভরাতে হয়, অন্যকেউ সেটা ছুঁতেও পারে না। সিলিন্ডারে নাইট্রোক্স ভরিয়ে নিয়ে সকাল নয়টা নাগাদ বড় জীপগাড়ির পেছনে বোটের ট্রেইলার জুড়ে যাত্রা শুরু করি। স্কুবা সেন্টার থেকে নদীর ঘাট বা বোট র‍্যাম্পের দূরত্ব বড়জোর দেড় কিলোমিটার, নদীর নাম ম্যাকলেই। আমার হাতে গাছের ডালে লাগানো পতাকা দেখে জন সেটা নিয়ে জীপের সামনে লাগিয়ে নেয়, ব্যাপারটায় সে খুব মজা পাচ্ছিল। ততক্ষণে বাকিরাও পুরো ব্যাপারটা জেনে গেছে। পতাকা নিয়ে পানির নিচে নামবো একথা শুনে সবাই দেখলাম খুব উৎফুল্ল। আমাকে অবাক করে দিয়ে মেক্সিকান মেয়েটা বাংলাদেশ নিয়ে অনেক কিছুই বলে গেল। জানলাম সে ইতিহাসের ছাত্রী, কলোনিয়াল হিস্ট্রির উপরে মাস্টার্স করছে। নদীর পানিতে বোট নামিয়ে সবাইকে লাইফ জ্যাকেট এবং সি সিকনেস ট্যাবলেট (বমি প্রতিরোধক) বিতরণ করা হয়। জন নিজেই জীপ থেকে পতাকাটি খুলে বোটের ফ্ল্যাগপোস্টে লাগিয়ে দেয়। একেতো নদীটি প্রচন্ড খরস্রোতা তার উপর মোহনার কাছে তীব্র ঢেউ। মোহনার কাছাকাছি আসতেই মনে হল বিপরীত দিক থেকে পূর্নগতিতে ধেয়ে আসা পানির পাহাড় ছোট বোটটিকে নিয়ে এক্কাদোক্কা খেলছে। ১৫ মিনিট পরেই খোলা সাগরে পড়লাম। ইতোমধ্যে ভিজে গোছল হয়ে গেছে। প্রশান্ত মহাসাগরের খোলা জলরাশিতে ঢেউয়ের সাথে যুক্ত হয়েছে বাতাস। বিশাল ঢেউয়ের ধাক্কায় ছোট বোটটি একবার বাতাসে উড়ছে আরেকবার ধপাস করে পানিতে পড়ছে। ভেজা শরীরে প্রচন্ড ঠাণ্ডায় আঙ্গুলগুলো অসাড় হয়ে গেছে। শক্ত করে রেইল ধরে রাখতে রাখতে রক্ত জমে গেছে হাতের তালুতে। এর মাঝেও যখন ফ্ল্যাগ পোস্টে পতপত করে উড়তে থাকা নিজের গৌরবের পতাকার দিকে নজর যাচ্ছিল তীব্র শীতেও হৃদয় কেমন উষ্ণ আবেশে ভরে যাচ্ছিল। একটা অস্ট্রেলিয়ান বোটে উড়ছে লাল সবুজ, সে অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়।

ফিশ রক আইল্যান্ডে গুহার প্রবেশমুখে বোট নোঙ্গর করা হয়। সবাই ট্যাবলেট খেয়েছি কিন্তু এর মাঝেই প্রথমে মেক্সিকান মেয়েটা, পরে কানাডিয়ান দুবার বমি করে ফেলেছে, কিছুক্ষণ পর আইরিশ ভদ্রলোক। আমার নিজের অবস্থাও কাহিল। অতীত অভিজ্ঞতা থাকায় সকালে সেরেলাক আর কলা ছাড়া কোন শক্ত খাবার খাইনি তাও খেয়েছি বোটে উঠার দুই ঘণ্টা আগে যাতে সব হজম হয়ে যায়। প্রচন্ড দুলুনিতে স্কুবা গিয়ার পরা খুব কঠিন কাজ, দুপাশে দুই ইন্সট্রাক্টর এবং ডাইভমাস্টার ধরে ধরে একজন একজন করে গিয়ার পরিয়ে দিচ্ছিল। ডাইভ ব্রিফিং এ আমাদেরকে দুই ভাগ করে দেয়া হল। আমি এবং সাথে আইরিশ দম্পতি ও জার্মান ভদ্রলোক সবাই ডাইভমাস্টার তাই আমরা একসাথে যাবো ডাইভ গাইডের সাথে। বাকিরা তত এডভান্স নয় তাই ইন্সট্রাক্টর তাদের নিয়ে যাবে এবং প্রথম ডাইভে তারা গুহায় ঢুকবে না, চারপাশ ঘুরে আসবে। ছবি এবং ম্যাপ (আন্ডারওয়াটার টপোগ্রাফি) দেখিয়ে ইন-আউট, ইমার্জেন্সি পরিকল্পনা, সিগন্যালিং এবং অন্যান্য সব কিছু বারবার করে বুঝিয়ে দেয়া হচ্ছিল। গুহার অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়া খুব স্বাভাবিক তাই আলাদা হয়ে গেলে কিংবা হারিয়ে গেলে কোথায় যেতে হবে বা কি করতে হবে সেটা নিয়েও আলোচনা চললো। জানলাম, আমাদের কপাল খারাপ এই সপ্তাহে প্রচুর বৃষ্টি হয়েছে, পানি ঘোলা হয়ে আছে। দৃষ্টিসীমা সর্বোচ্চ তিন মিটার। মনটাই খারাপ হয়ে গেল। ব্রিফিং শেষে কোমরে শক্তিশালী টর্চ গুঁজে, হাতে পতাকা ধরে লাফিয়ে নামলাম গভীর নীল পানিতে।

গুহার ভেতরে, ছবিঃ ফাহাদ আসমার

সাঁতরে গুহার মুখের সরাসরি উপরে পৌঁছে গাইড আরেকবার মনে করিয়ে দিল যে গুহাতে ঢোকার সময় যেনপতাকাটা গুটিয়ে বেল্টের ভেতর গুঁজে রাখি কারণ চিকন ফাটলে বেরিয়ে থাকা পাথরে আটকে যেতে পারে এমনকিগায়েও জড়িয়ে যেতে পারে। প্রচন্ড স্রোতে নিজেকে সামলাতে দুই হাত প্রয়োজন তাই এক হাতে পতাকা নিয়েসাঁতরাতে পারবো কিনা সেটা নিয়েও উদ্বেগ ছিলো, কিন্তু আমি নাছোড়বান্দা। মুখে মাস্ক লাগিয়ে ধীরে ধীরে নেমেগেলাম সোজা ২৬ মিটার (৮৫ ফুট)নীচে। গুহার সরু মুখে দ্বিমুখী প্রচন্ড স্রোত, বড় পাথর নোঙ্গরের মত আঁকড়েনিজেদের সামলাচ্ছি। এখান থেকে একজন একজন করে গুহায় ঢুকতে হবে। সবার আগে গাইড এবং বাকিদেরমাঝে সবচেয়ে অভিজ্ঞ বলে সবার শেষে আমি। জায়গাটা একেতো ভীষণ সরু তার উপর তীব্র স্রোত, উচ্চতায়কখনো কখনো ফুটের মত। ঢুকতে গিয়ে কয়েকবার আটকে গেলাম, গুহার মেঝেতে এবং দেয়ালে প্রচুর পরিমাণজলজ প্রাণী এবং উদ্ভিদ বাস করে, প্রাণপণে তাই কোথাও যেন ঘসা না লাগে, তাদের যেন কোন ক্ষতি না হয় সেচেষ্টা করতে হচ্ছিল। তাছাড়া তীক্ষ্ণ পাথর এবং প্রবালে ঘসা লাগলেই শরীরে লাগানো ওয়েটস্যুট কেটে যাবে সেটাওমাথায় রাখতে হচ্ছিল। কিছুক্ষণ পরপর এবড়ো থেবড়ো বাঁক। কিন্তু সবচেয়ে বেশি ঝামেলা করেছে মাছের ঝাঁক, এতবেশি পরিমাণ মাছ যে রীতিমত হাত দিয়ে সরিয়ে সামনে দেখতে হচ্ছিল। তাছাড়া ছোট জায়গায় নড়াচড়া করারকারণে বালি উড়ে সব ঘোলা করে দিয়েছে। দৃষ্টিসীমা সর্বোচ্চ দুই ফুট, সামনের ডাইভারের ক্ষীণ টর্চের আলো ছাড়াআর কিছু দেখা যাচ্ছিল না। কিছুক্ষণ পর গুহাটা বড় হয়ে এল, অনেকটা বিশাল এক ঘরের মত, হাঁফ ছেড়ে প্রায়দাঁড়িয়ে গেলাম। 

হঠাৎ সামনে থেকে গাইড টর্চ মেরে মেরে কি একটা সংকেত দিচ্ছিল। নিচে তাকিয়ে দেখি বিশাল কালো কি যেন একটা নড়ছে, এত বড় যে টর্চের আলোতে পুরোটা দেখা যাচ্ছে না। টর্চের আলো ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে চোখের উপর পড়তেই চিনতে পারলাম, বুকের ভেতর সবকিছু হিম হয়ে গেল। পুরো মেঝেজুড়ে বিশাল এক বুল রে (মূলত বড় আকারের স্টিং রে, বিশাল শরীর এবং কালো মাথার জন্য বুল রে বলা হয়) শুয়ে শুয়ে তার বিষাক্ত বর্ষা লাগানো লেজ নাড়াচ্ছে। আমার পায়ের ফিন তার সেই লেজ ছোঁয় ছোঁয় অবস্থা। চোখের সামনে বুল রে’র আক্রমণে মারা যাওয়া পৃথিবীবিখ্যাত অস্ট্রেলিয়ান এডভেঞ্চারার স্টিভ অরউইনের কথা মনে পড়ে গেল। ভাবছিলাম বুল রে যদি ক্ষেপে গিয়ে আক্রমণ করতে চায় আমি নড়ার জায়গাও পাবোনা। এর মাঝে কখন যেন প্যাঁচ খুলে পতাকাটা নিচে নেমে গেছে, শুধু লাঠিটা আটকানো আছে। ভয়ে ভয়ে দেখতে পাচ্ছিলাম সেটা বুলরে’টির শরীরের উপর গিয়ে পড়েছে। দুরুদুরু বুকে পতাকা গোটালাম। বাকি তিনজন দেয়ালে বিশাল লবস্টার দেখতে এতোই ব্যাস্ত যে রে এর অস্তিত্ব নিয়ে তাদের কোন ধারণাই নেই, গাইড মুখে আঙ্গুল দিয়ে তাদেরকে জানাতে মানা করে দিল। ধীরে ধীরে সামনে এগুতে থাকলাম। গুহার মাঝামাঝি ছাদের দিকে ছোট একটা বাতাসভর্তি চেম্বারের মত আছে, যদিও তা পানির প্রায় ৩০ ফুট নিচে। একসাথে দুই থেকে তিনজন ঢোকা যায়। বছরের পর বছর ধরে স্রোতে করে ভেতরে চলে এসে আটকে যাওয়া বাতাসের কণা জমে জমে একটা ব্রিদিং টিউবের মত হয়ে গেছে, বাতাস বেশ ভারী কিন্তু শ্বাস নেয়া যায়। গুহার ভেতরে হারিয়ে গেলে এটা ছিল আমাদের ইমার্জেন্সি রন্ডেভ্যু। খুব ধীরে ছবি তুলতে তুলতে সামনে এগোলাম, টর্চের আলোয় যতটা তোলা যায় আরকি। এত জাতের এত বেশি প্রকারের মাছ একসাথে আমি আগে কোনদিন দেখিনি। বিশাল বিশাল লবস্টার দেখে জ্বিবে জল চলে আসছিল। পাথুরে গর্ত থেকে হুটহাট বিশাল কুৎসিত হাঁ করে ভয় দেখাতে বেরিয়ে আসে মোরে ইল। দেখতে এতোটাই ভয়ংকর, যে কারো হার্টবিট কিছুক্ষণের জন্য বন্ধ করে দেবার জন্য যথেষ্ট।

গ্রে নার্স শার্ক, ছবিঃ ফাহাদ আসমার

কিছুক্ষণ পর সামনে আবছা আলো দেখা গেল, আমরা হাজির হয়ে গেলাম উচ্চতায় ২০ এবং পাশে ১৫ ফুটের মত প্রায় গোলাকার বিশাল একটা চেম্বারে। চেম্বারটি লম্বায় প্রায় ১০০ ফুট, এর পরেই আলোকিত খোলা মুখ দেখা যাচ্ছে। মুখের দিকে ধীরে ধীরে বড় হয়েছে। এটাই সেই বিখ্যাত শার্ক কেইভ, এখানেই গ্রে নার্স শার্ক দলবেঁধে প্রজনন এবং বিশ্রামের প্রয়োজনে আসে। একটা পাথুরে ট্রেঞ্জের মত জায়গায় আমরা চুপ করে বসলাম। খুব ধীরে ধীরে নড়াচড়া করতে হয়, এমন কিছু করা যাবে না যাতে হাঙ্গরেরা আতঙ্কিত হয়, আতঙ্কিত বুনো প্রাণী সবসময়েই ভয়ানক। এমনকি শ্বাস প্রশ্বাস একদম ধীরে ধীরে অল্প অল্প করে নিতে হচ্ছিল, পানির নিচে এই শব্দটা খুব জোরালো শোনায়, তাছাড়া ছেড়ে দেয়া বুদবুদ হাঙ্গর খুব অপছন্দ করে, ভয় পায়। বুদবুদ যতদূর যায় হাঙ্গর পুরোটাকেই একটা বিশাল প্রাণী মনে করে। হাঙ্গর এক জায়গায় স্থির থাকে না, বিশাল আকারের হাঙ্গরগুলো অনেকটা কাফেলার মত একে একে পুরো গুহাটা প্রদক্ষিণ করছে। প্রায় স্লোমোশনে এমনভাবে চলাফেরা করছে যেন আমাদের উপস্থিতিতে তাদের কিছু আসে যায় না, এত রাজকীয় সে অঙ্গভঙ্গি মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকতে হয়। এই প্রাণীটা প্রচন্ড কৌতূহলী। সাঁতরে সোজা একদম মুখের সামনে চলে আসে, তারপর একদম শেষ মুহূর্তে স্লোমোশনে পেশির হালকা নড়াচড়ায় ঘুরে চলে যায়। হঠাৎ একটা হাঙ্গর একদম মুখের সামনে এসে থেমে গেল। এত কাছে যে আমি হাত দিয়ে ছুঁয়ে ওর বুকে কাঁপন ধরানো ক্ষুরধার দাঁতগুলো গুনে গুনে দেখতে পারবো। প্রায় কয়েক সেকেন্ড সময় যেন স্থির হয়ে গেল। ছবি তোলা, এমনকি নিঃশ্বাস ভুলে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে ছিলাম ব্যাটার চোখের দিকে। কুতকুতে গভীর চোখ, তারপর নজর গেল ভয়ানক দাঁতের দিকে। মনে মনে বলছিলাম, প্লিজ ভাই তোর দোহাই লাগে, ঘুরে যা, ঘুরে যা। আমি অপুষ্টির স্বীকার, ডাক্তার বলেছে ভিটামিন সমস্যা, চামড়াও কালো, কামড়িয়ে মজা পাবি না, কসম বলছি। আমার মত বাকি সবাইও পাথরের মূর্তির মত হয়ে গেছে। মনে হল এক যুগ পর ব্যাটা নড়লো, দাঁতের দিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছিল যেন ভেংচি কেটে বলছে, ‘এসেছিস আমার বাড়িতে ভালো কথা, কোন দুষ্টুমি করবি না, তোর চেহারা চিনে রাখলাম’। হাঁফ ছেড়ে মানে বিশাল বুদবুদ ছেড়ে বাঁচলাম। হাঙ্গরদের এই অতিরিক্ত কৌতুহলের বিষয়টা জানা ছিল, তাছাড়া এখানকার হাঙ্গরগুলো বছরের পর বছর ডুবুরি দেখে অনেক ফ্রেন্ডলি হয়ে গেছে, তবুও শূন্যতার মাঝে বুকের ধুকধুকুনি শুনতে পাচ্ছিলাম।

প্রশান্ত মহাসাগরের নিচে উড়ছে বাংলাদেশের লাল সবুজ, ছবিঃ মার্কাস

পতাকাটা বের করে কিছুটা সাতরিয়ে সামনে পুতে রেখে আসলাম। তারপর বসলাম ছবি তুলতে, সিডনি থেকে ফ্ল্যাশ নিয়ে এসেছিলাম, কিন্তু বোকার মত ব্যাটারির চার্জার নিয়ে আসিনি, এদের কাছেও ছিল না। মনে মনে নিজেকে গালি দিচ্ছিলাম বারবার। টর্চের অল্প আলোয় অন্ধকারেই ছবি তোলার চেষ্টা চালিয়ে গেলাম। কিছুক্ষণ ছবি তোলার পর যাবার সময় হল, জার্মান ব্যাটার বাতাস ফুরিয়ে এসেছে। কিছুটা বিরক্ত হলাম, আরো অন্তত ২০ মিনিট থাকতে পারতাম কিন্তু কিছুই করার নেই, এটাই নিয়ম। একজনের ফুরিয়ে এলে দলের সবাইকেই একসাথে উঠে আসতে হয়। একসময় আমারো একই অবস্থা হত। পতাকা তুলে নিয়ে সাঁতরানো শুরু করলাম গুহার আলোকিত মুখের দিকে। গাইড ইশারায় ক্যামেরা চাইলো, সাঁতরানো অবস্থায় কয়েকটা ছবি তুলে ফেললো। আজকের আবহাওয়া ভালো নয়, পানি তাই প্রচন্ড ঘোলা, ক্যামেরাতেও কিছুই দেখা যাচ্ছে না। গুহা থেকে বের হতে হতে হতেই জার্মান ডুবুরির সিলিন্ডারের বাতাসের পরিমাণ বিপদজনক অবস্থায় চলে এসেছে। বাকিদের অবস্থাও কাছাকাছি। প্রচন্ড এক্সাইটেড বা আতঙ্কিত হলে বাতাস বেশি খরচ হয়। তাই গুহা থেকে বেরিয়েই ভুস করে উপরে চলে আসতে হল। এখন সাতরিয়ে পুরো দ্বিপ ঘুরে অন্যপাশে যেতে হবে, এরকম খোলা সাগরে তীব্র বাতাস এবং প্রায় মানুষ সমান উঁচু ঢেউয়ের মাঝে ব্যাপারটা মারাত্মক কঠিন। পানির নিচ দিয়ে সাঁতরানো উপরের চেয়ে অনেক সহজ। প্রায় ৪০ মিনিট লাগলো আমাদের বোটে ফেরত আসতে।

প্রশান্ত মহাসাগরের নিচে উড়ছে বাংলাদেশের লাল সবুজ, ছবিঃ ফাহাদ আসমার

শরীর থেকে দ্রবীভূত নাইট্রোজেন বের করে দেয়ার জন্য দেড় ঘণ্টার বিরতি এবং হালকা নাশতা খাওয়া হল, আরো দুজন বমি করেছে। মেক্সিকান মেয়েটা এত বেশি বমি করে ফেলেছে যে কাহিল হয়ে বোটের মেঝেতেই শুয়ে আছে। আজকের মত তার ডাইভিং শেষ। আমি ইচ্ছা করেই প্রচুর পানি ছাড়া অন্য কিছু খাইনি, ডাইভিং এ প্রচুর পরিমাণ ডিহাইড্রেশন হয়। তাছাড়া পেটে শক্ত কিছু থাকলেই বমি করার সম্ভাবনা বেশি থাকে। দ্বিতীয় ডাইভে শুধু আমাদের গ্রুপই নামলো। ইন্সট্রাক্টর রয়ে গেল বোটে বাকিদের পাহারায়। এবার গুহা থেকে একটু তাড়াতাড়ি বের হলাম। এই স্রোতে পতাকা নিয়ে সাঁতরানো মারাত্মক কঠিন কাজ, বারবার খুলে যায়। তাই এবার শক্ত করে গুহার মেঝেতে পুঁতে রেখে এলাম। আগামীকাল আবার দেখা হবে, তখন নিয়ে যাব। এবার দ্বিপের পাশটা ঘুরে দেখা হল। প্রচুর পরিমাণ মাছ এবং প্রাণী দেখলাম। ফাইন্ডিং নিমো সিনেমার ‘নিমো’র স্বজাতি (ক্লাউন ফিশ) মাছেদের সাথে দেখা হল। দর্শন দিয়ে ধন্য করেছেন বিশাল আকারের এক দাদী কচ্ছপ। অসম্ভব সুন্দর কিন্তু ভয়ানক বিষাক্ত লায়ন ফিশের দেখা মিললো। বোটে ফিরতেই নোঙ্গর তুলে তীরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা করলাম। আমার পতাকা রয়ে গেল ২৫ মিটার পানির নিচে হাঙ্গরের গুহায়।

লাল লবস্টার, ছবিঃ ফাহাদ আসমার

বিকেলে পতাকা ছাপা টি শার্ট পরে পুরো শহরে ঘুরে বেড়ালাম। চমৎকার একটা ক্রিক আছে শহরের পাশ দিয়ে, বীচগুলোও মারাত্মক সুন্দর। অনেকের সাথেই কথা হল, বন্ধুত্ব করলাম আর কেউ জিজ্ঞাসা করলেই মুখে আলো মেখে সেই গল্পটা বললাম। ক্রিকের পাশে কিছুক্ষণ এক পরিবারের সাথে মিলে মাছ ধরলাম। মাছ খেয়ে যেতে বলায় একবারও না করিনি। সুস্বাদু গ্রিল্ড বারামুন্ডি (কোরাল মাছ) খেতে খেতে বুড়ো কর্তা জানতে চাইলো, ‘তুমি বাংলাদেশ থেকে এসেছো’? বলল সে গিয়েছিল বাংলাদেশে, ৮০ সালের দিকে। ঢাকা, চিটাগাং আর খুলনার কথা মনে আছে তার, সুন্দরবনে ঘুরেছে মাসের পর মাস।  আমাদের ইতিহাস কিছুটা জানে। ক্যাম্পলাইটের পাশে গোল হয়ে বসে বাংলাদেশের গল্প চললো। আশেপাশের কয়েক গ্রুপ যোগ দিয়েছে এর মাঝে। একটা ছেলে গিটার নিয়ে এসেছে। ভদ্রলোক গল্প বলছিল, আমিও যোগ করছিলাম কিছুক্ষণ পর পর, রক্তনদী পার হবার গল্প, লাল সূর্যের গল্প। প্রশ্ন আসছিল, উত্তর দিচ্ছিলাম। এতদূর থেকে এখানে বিজয় দিবস উদযাপনের জন্য এসেছি শুনে তারা খুব মজা পেল। তাদের কাছ থেকে বারবার করে বিজয় দিবসের শুভেচ্ছা নিয়ে আবার আসবো কথা দিয়ে চলে এলাম। উইকএন্ড তাই শহর ব্যস্ত, স্থানীয় এবং পর্যটক সবাই আছে। এ দেশে নতুন কোথাও গেলে আমি স্থানীয় বার-হোটেলে যাই। স্থানীয় মানুষদের সাথে মেশা, তাদের সামনে থেকে দেখা এবং তাদের জীবনযাত্রা বুঝার জন্য এর চাইতে ভালো কোন উপায় নেই। শহর ছোট হলে প্রায় সবাইকেই সেখানে পাওয়া যায়।

নিমোর খালাতো ভাই, ছবিঃ ফাহাদ আসমার

পরদিন ১৭ ডিসেম্বর সকালে আবার রওয়ানা দিলাম। আমাদের দুটো ডাইভ দেয়ার কথা ছিল কিন্তু অনেক সকালে চলে এসেছিলাম এবং যথেষ্ট সময় ছিল, তাই একটা অতিরিক্ত ডাইভ দেয়া হল ফ্রি তে। আজকের ডাইভে আরো নতুন প্রজাতির মাছ এবং প্রাণী দেখলাম। বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির প্রাগঐতিহাসিক এক জাতের কাঁকড়া দেখলাম যারা মূলত শামুকের খোলে থাকে। প্রায় দুই মিটার লম্বা একটা ওবেগং হাঙ্গর দেখলাম, বেশ নিরীহ দাঁতহীন এ প্রাণীটি। আমি এটাকে বিলাই হাঙ্গর বলি, দেখলে বিড়ালের কথা মনে হয়। দ্বিতীয় ডাইভে পতাকা খুলে নিয়ে এসেছিলাম। তৃতীয় এবং শেষ ডাইভের আগে জন জানতে চাইলো এরকম পতাকা আমার কাছে আর আছে কিনা। আমি জানালাম আরো আছে, সিডনিতে। সে বলল আমি চাইলে পতাকাটা গুহাতেই আবার রেখে যেতে পারি, সে দেখে রাখবে। অন্য ডাইভারদের বলার জন্য নাকি অনেক সুন্দর একটা গল্প। রাজী হয়ে গেলাম। তৃতীয় ডাইভে একটা সাদা রঙের মানে অ্যালবিনো গ্রে নার্স হাঙ্গর দেখলাম, বেশ দূরে তাই ছবি তোলা গেল না। এটাকে নাকি অনেকদিন পরপর দেখতে পাওয়া যায়। মেক্সিকান মেয়েটা আজকেও বমি করেছে। বিধ্বস্ত হয়ে আমার পাশেই বসে ছিল, এক্সকিউজ মি বলে আমার পায়ের উপর মাথা রেখে শুয়ে পড়লো, মোটামুটি মূর্ছা যায় যায় অবস্থা। সিটে জায়গা খুব কম, আর কোন উপায়ও ছিল না। জন মজা করে তার বয়ফ্রেন্ডকে বলছিল, তোমার গার্লফ্রেন্ড কিন্তু চলে গেল। কিছুক্ষণ হাসাহাসি চলল, মেয়ের কোন হুঁশ নেই, ঘুমিয়ে পড়েছে।

ফিস রক কেইভ ডাইভ টিম, ছবিঃ ল্যারি

সেন্টারে ফিরে কোর্সের লিখিত পরীক্ষা হল, পাশ করে সাথে সাথেই সার্টিফিকেট পেলাম, লাইসেন্স কার্ড দুই-তিন সপ্তাহের মাঝে বাসায় পৌঁছে যাবে। কোর্স ম্যাটেরিয়ালস এবং পরীক্ষার তথ্য পাঠানোর পর এ কার্ডগুলো ইউএসএ তে ছাপানো হয়, PADI (Professional Association of Diving Instructors) হেডকোয়ার্টারে, তাই আসতে সময় লাগে। এর মাঝে মেক্সিকান সেই জুটি এসে বারবার করে আমাকে ধন্যবাদ জানিয়ে গেছে, মেক্সিকো যাবার আমন্ত্রণ এবং সেখানে গিয়ে অবশ্যই তাদের বাড়িতে থাকার আমন্ত্রণ দিয়ে গেল একদম কাগজে ঠিকানা এবং ফোন নাম্বার লিখে। জনের এক বন্ধুও আজ আমাদের সাথে ডাইভ দিয়েছে, বুড়ির পারিবারিক ব্যাবসা কৃষি এবং পশুপালন। ভদ্রমহিলা ট্রান্সজেন্ডার, মানে আগে পুরুষ ছিল এখন মহিলা হয়ে গেছেন। সাউথ অস্ট্রেলিয়ায় বিশাল এক র‍্যাঞ্চ আছে তার, সেখানেও দাওয়াত পেলাম। অন্তত এক সপ্তাহ সময় নিয়ে যাব কথা দিয়ে রাখলাম। সবাই চলে গেলে জন তার সেন্টারের একটা টি-শার্ট গিফট করলো, যদিও ৩০ ডলার করে সেটা বাকিরা স্যুভেনিয়র হিসেবে কিনে নিয়েছে। আমি সাধারণত একা ঘুরতে পছন্দ করি, এতে মানুষের খুব কাছে যাওয়া যায়, খুব সহজেই তাদের সাথে মিশে গিয়ে আপন করে নেয়া যায়। তাছাড়া PADI স্কুবা ডাইভারদের একটা মন্ত্রই আছে, ‘Go Places, Meet People, Do Things’। এবারেও তার ব্যতিক্রম হল না। টি-শার্ট উপহার দেয়ার পর জন এবং তার বৌ সন্ধ্যায় ডিনারের আমন্ত্রণ জানালো। দিনের বেশ কিছু সময় আছে, আগামীকাল চলে যাব, তাই ঘুরতে যেতে চাইছিলাম। শহর থেকে কিছুটা দূরে কলোনিয়াল ইতিহাস জড়ানো পুরানো একটা পরিত্যক্ত জেলখানা আছে, যেখানে ইউরোপ থেকে আনা দ্বীপান্তরিত কনভিক্টদের রেখে কাজ করানো হত। তাছাড়া আছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ আমলের জার্মান বন্দীশিবির। এ দেশে যেসব জার্মান বা তাদের বংশধরেরা ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে তাদেরকে এখানে এনে বন্ধী করে রাখা হত। যেতে হলে গাড়ি লাগবে তাই জনের বন্ধু নিয়ে যাবার প্রস্তাব দিল। এবারের লিস্টে ওখানে যাবার প্ল্যান ছিল না, এরকম সুযোগ দেখে আমার খুশি আর দেখে কে। বোনাস হিসেবে লাইটহাউজ দেখা হল। সন্ধ্যায় শহরের সবচেয়ে অভিজাত হোটেলে ডিনার খেতে নিয়ে গেল জন, আমরা চারজন, জনের বন্ধুও যোগ দিয়েছে আমাদের সাথে। চমৎকার কিছু সময় কাটলো, এখানে সবাই সবাইকে চেনে। জানলাম জন বেশ সন্মানিত এই শহরে, সে আবার স্থানীয় রেস্কিউ ইউনিটের প্রেসিডেন্ট। একে একে অনেকেই এসে যোগ দিচ্ছিল আমাদের টেবিলে। জন সবার সাথেই পরিচয় করিয়ে দিচ্ছিল, সেইসাথে বেশ উৎফুল্ল হয়ে আমার ব্যতিক্রমী বিজয় দিবস উদযাপনের কাহিনী বর্ণনা করলো আগ্রহী শ্রোতাদেরকে। সেখান থেকে ঠিক হয় আজ সবাই জনের বাড়িতে পার্টি করবে, বারবিকিউ হবে। একেতো ক্রিসমাসের সময় তার উপর তারা নাকি আমার বিজয় দিবস সেলিব্রেশন করবে।

আগের রাতে পার্টি শেষ হতে হতে প্রায় ভোররাত হয়ে যায়, হেঁটেই মোটেলে চলে যাই। সকালে ঘুম থেকে উঠেই সব গুছিয়ে নিলাম, যাবার সময় হয়ে এসেছে। মোটেল ছেড়ে দিলে জন এসে তার বাসায় নিয়ে যায়। আমার সাথে থাকা পতাকা ছাপা ব্যান্ডানাটা জনকে দিয়ে দিলাম। সে তার সেন্টারে সাজিয়ে রাখবে বলল। মাত্র দুই দিনে এই অসম্ভব বন্ধুতপূর্ণ এবং দয়ালু পরিবারটার এত কাছে চলে এসেছি যে বিদায় নিতে মন খারাপ হচ্ছিল। দুপুরে খাবার পর রওয়ানা দেই, আজকে জনের বৌ নিয়ে যাচ্ছে, স্টেশনে নামিয়ে দিয়ে আসবে। প্রচন্ড ক্লান্তিতে ট্রেনে বসেই ঘুমিয়ে পড়লাম, একঘুমে সিডনি।

জীবনে অনেকবার নানাভাবে নিজের মত করে স্বাধীনতা এবং বিজয় দিবস পালন করেছি কিন্তু সেবারের সেই স্মৃতি সবকিছু ছাপিয়ে গেছে। জন এবং তার পরিবার, ছোট সেই মায়াবী শহর এবং তার মানুষ, নাকি হাঙ্গরের গুহায় রেখে আসা বিজয়ের পতাকা ঠিক কোনটা বেশি করে হৃদয় ছুঁয়ে গেছে তা নিশ্চিত করে বলতে পারবো না। তবে যতদিন বেঁচে থাকবো সেই তিনটি দিন স্মৃতির পাতায় অম্লান হয়ে থাকবে। আর তাই লিখে রেখে দিতে চেয়েছিলাম সবকিছু যদিও এতদিনে নামগুলো বেশিরভাগ ভুলে গেছি।

পুনশ্চঃ সেবার ক্রিসমাসে জন এবং তার বন্ধুর কাছ থেকে কাছ থেকে শুভেচ্ছাবার্তা লেখা কার্ড পেয়েছিলাম, আমিও পাঠিয়েছিলাম ফেরত। পতাকাটা এক মাসের মত ছিল, তারপর রং চটে যাওয়ায় জনকে তুলে নিতে বলেছিলাম, তার সাথে এখনো যোগাযোগ হয় নিয়মিত। আমার স্কুবা ইন্সট্রাক্টর হবার খবর শুনে খুব খুশি হয়ে অভিনন্দন জানিয়েছে এবং সময় পেয়ে ছুটিতে তার সেন্টারে গিয়ে কিছুদিন তার সাথে কাজ করার আমন্ত্রণ জানিয়েছে। সাউথ অস্ট্রেলিয়ার সেই র‍্যাঞ্চে আর যাওয়া হয়নি, তবে একদিন যাব বলে ঠিক করেছি। মেক্সিকান এবং আইরিশদের সাথে এখনো টুকটাক যোগাযোগ আছে। এবারো বিজয় দিবসে জনের সাথে অন্ধকার সেই গুহায় যাবার প্ল্যান করেছিলাম কিন্তু শারীরিক অসুস্থতার জন্য যাওয়া হয়নি। তবে সেই শহর আর হাঙ্গরের সেই গুহা আবার ডাকছে, আমি যাব, আমাকে যে আবার ফিরে যেতেই হবে।

ফাহাদ আসমার
ফটোগ্রাফার, স্কুবা ডাইভিং ইন্সট্রাক্টর

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments