মনকাঁটা । মোয়াজ্জেম আজিম

  •  
  •  
  •  
  •  


খুব মাথা ঘুরছে। এত বেশী ঘুরছে যে নিজেকে লাটিম মনে হচ্ছে। যতক্ষণ সজোরে ঘুরতেছিলও ততক্ষণ খাড়ার উপরই ছিলাম যেই ঘুর্ণনটা একটু কমলো এমনিই দপ করে পড়ে গেলাম। আমার কপাল ভাল, যে জায়গাটায় পড়লাম সেটা বালুময়। জায়গাটার নামই বালুকান্দা। আর এই বালুকান্দার বালুতে গুদাম ঘরের ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়ে পড়েই তো বড় হলাম। প্রায় প্রত্যেক দিন স্কুলের পর বা স্কুল থেকে পালিয়ে এই গুদাম ঘরের ছাদেই বসে থাকতাম। বসে থাকতে থাকতে যখন বিরক্ত হয়ে যেতাম, তখন শুরু হত ছাদ থেকে লাফানো। বালুকান্দার বালু ছিলও স্যাতস্যাতে তুলার মত নরম। ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়লে ব্যাথার বদলে আরামই লাগতো। সেই বাল্যবান্ধব বালুতে এতদিন পর আবার মাথা ঘুরান দিয়ে পড়ে গেলাম। পড়ে গিয়েও আমার মাথা ঘুরানটা কিন্তু থামে নাই। তবে ঘুর্ণনের স্প্রিড কমে তা ঘড়ির কাঁটায় রূপ নিয়েছে। এখন মনে হচ্ছে ঠিক আমার মাথা না পুরো শরীরটা ঘড়ির কাঁটা হয়ে ঘুরছে, টিকটিক টিকটিক। টিকটিক আওয়াজটা কি সত্যিই হচ্ছে, না আমি বানাচ্ছি তা একটু চিন্তা করে বলতে হবে। হ্যাঁ, আওয়াজটা হচ্ছে মনে হচ্ছে, কিন্তু ঠিক কোথায় তা ধরতে পারছি না, যেন ঘড়ির ঘুর্ণন আর আওয়াজ আলাদা জায়গায়। আওয়াজটা হচ্ছে দূরে কোথাও, পূর্ব দিকে কি? আমি ঘুরছি এখানে ঘড়ির কাঁটা হয়ে আর আওয়াজটা আসছে বালুকান্দার ঐ পাড় বাবুবাজারের নামা থেকে। সেখানে অনেকগুলো শিয়ালের গর্ত আছে। সেখানে শিয়ালরা বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে থাকে। রাতের বেলায় বার হয় খাবারের সন্ধানে। আমাদের হাসমুরগীর অর্ধেকতো শিয়ালদের পেটেই গেল। এই নিয়ে আমার আম্মার প্যান-প্যানানি প্রায় থামেই না। আর আমার আব্বা নির্বিকার নির্লিপ্ত বসে থাকে শীত কালের রোদে, উনার বহু বছর আগের কিনা কাস্মীরি শাল গায়ে দিয়ে। আম্মার ঘ্যানঘ্যানানি শুনে মুচকি মুচকি হাসে, খুব নিচু গলায় আমারে কয়।
– মুরগী খাইছেতো কি হৈচে। এরলা¹ে এয়াল কি মাইরে লাইতে অইব নাহি?। তুই নিজে খাচ না। এয়ালদেরওতো খাওন লাগে নাহি। ভুখের কষ্ট সব প্রাণীর এহই।

আমরা বাপবেটা অতি সতর্কতার সাথে হাসি। হোহো করে হাসবো কিন্তু কোন শব্দ হবে না। আমরা বহুদিন প্যাকট্রিস করে এই হাসি রপ্ত করেছি। আমরা প্রাণ খুলে হাসি আর খুব সন্তর্পনে শেয়ালদের গল্প করি। শিয়ালদেরতো অনেক বুদ্ধি।
– শেয়ালদের এত বুদ্ধি কে? কৈ পাইলো এরা এতো বুদ্ধি?
– কৈ পাইলো, মানুষই বানাইছে গল্পে গল্পে, ওরা যে আমাদের মুরগী খায়া ফেলে তানা, নানা রকম উপকারও করে।
– কেমনে?
– এই ধর, আগুন মাসে যহন ক্ষেতে ধান, তহন ইঁন্দুর সব ধান কাঁইট্টা নিজের গাতায় নিয়ে যায়। এয়াল তহন ইঁন্দুর খায়া আমাদের ধান রক্ষা করে। দেখবি এয়াল কহনও ধানের সিজনে হাঁসমুরগী বা ছাগল খায়তে আসে না। আসে কার্তিক মাসে বা চৈত্র মাসে, যহন ক্ষেতে ধান নাই, জঙ্গলে ইঁন্দুর নাই।

শিয়ালদের অনেক বুদ্ধি কিভাবে তা চিন্তা করতে গিয়ে দেখি আমার নিজের বুদ্ধি লোপ পাচ্ছে। আমি ঠিক চিন্তা করতে পারছি না। আমার শরীরের ঘুর্ণন আমার মাথার বুদ্ধিকে কি তরল করে ফেলছে? আব্বা বলে,
– এত বুদ্ধি দে কী করবি? বু্দ্ধি কম থাহা ভালা। বেশী বুদ্ধির মানুষ ইতর কিছিমের হয়।
– আমার ছোট চাচা যে পাগল হয়ে গেছিলও, উনি কি বেশী বুদ্ধির মানুষ ছিল?
আব্বার মুখ থেকে খুব সন্তর্পনে হাসিটা অপসৃয়মান হয়ে যায়। যেন শীতের সকালে ভুল করে এক টুকরা মেঘ এসে উত্তাপের একমাত্র ভরসা  রোদটা ঢেকে দিল। প্রশ্নকর্তা আমি রাজ্যের বোকামি মাথায় নিয়ে বসে থাকি। আর ভাবি আমার যদি আর একটু বুদ্ধি থাকতো। তাহলে নিশ্চয় আব্বাকে এই প্রশ্নটা করতাম না। আমার ছোট চাচা অনেক বুদ্ধিমান প্রাণী ছিল। পড়াশুনায় সবসময় ফাস্ট। কলেজে গিয়ে প্রথমে নেতা হয়ে উঠলো, দাদা এটা নিয়ে অনেক চিৎকার চেঁচামেচি করতো কিন্তু কোন কাজ হয় নাই। তারপর মাস্তান হয়ে গেল। তারপর ড্রাগ এডিকটেড। তারপর একদিন বুদ্ধি করে আম গাছের ডালে ঝুলে পড়লো। কেন ঝুলে পড়ছিলও তা আমরা জানি না। কেউ কোনদিন মুখও খোলেনি সে ব্যাপারে। আমরাও জিজ্ঞেস করার সাহস করিনি। এটা কোন রহস্য এবং সেই রহস্য জানতে হবে সে চিন্তাও কোনদিন মাথায় আসেনি। বুদ্ধি কম বলেই হয়তো বা। অনেক ছোট বেলায় আমার ছোট চাচা আমাকে আর আমার বড় ভাইকে দুইটা কাঠের তলোয়ার বানায়ে দিছিল। আমার দুই ভাই সেই তলোয়ার ফাইটে একজন আর একজনকে রক্তাক্ত করে দিয়েছিলাম। ছোটচাচা যখন কলেজ থেকে ফিরে এসে দেখলো আমরা দুইজনকে তখন কিছু বলে নাই।  সেই কাঠের তলোয়ার নিয়ে আমরা শীতের সন্ধ্যায় আগুন পোহাতে বসি। চাচা কিছুক্ষণ কী যেন চিন্তা করল, তারপর তলোয়ার গুলো খড়ের আগুনে দিয়ে দিল। আমরাও কিছু বলি নাই। যেন এটাই সঠিক কাজ।  সেদিন সন্ধ্যায় কাঠের তলোয়ার আগুনে দেওয়াতে আমরা অনেকক্ষণ ধরে আগুন পোহাতে পেরেছিলাম। আমাদেরকে কেউ পড়তে হবে সেই জন্যেও ডাকেনি। মনে হয়েছিলও যেন  দুনিয়ার সমস্ত যুদ্ধবিগ্রহকে, সমস্ত তালোয়ারের ইতিহাসকে আমরা শ্মশানে শেষকৃত্য করে জগতে ফিরে এসেছিলাম। সেই রাতে বাল্লে মাছের ঝোল আর মুলার সাথে টেংরা মাছের শুটকির তরকারি দিয়ে ছোটচাচা আমি আর আমার বড় ভাই একই পাটিতে বসে খুব আয়েস করে খেয়েছিলাম যুদ্ধ-মৃত্যুর প্রথম খানা।
তারপর বহু বহুদিন পর ছোটচাচা নাকি ভাতের কষ্ট সইতে না পেরে আম গাছে ঝুলে পড়েছিল। এটা আসলে একটা ভোগাস কথা। খাইতে না পেয়ে কেউ আত্নহত্যা করে আমার বিশ্বাস হয় না। মাস্তান হয়ে উনি প্রথমেই উনার ভাগের জমিজমা বিক্রি করে দেয়। দাদা ততদিনে গত হয়েছেন। আমার আব্বার ব্যবসা বানিজ্যও আর আগের মত নাই যে উনি কিনে নিবেন। তাই কোথায় বিক্রি করলো তা কেউ জানতেও যায় নি। সবকিছু শেষ করে উনার মধ্যে শুরু হয়েছিলও ধ্বংসাত্নক প্রবনতা। একবারতো উনার মা, মানে আমার দাদি, ছোটচাচি আর উনার একমাত্র মেয়েকে ঘরের মধ্যে তালবব্ধ রেখে ঘরে আগুন দেয়। সেই দিন কপাল ভাল যে পাড়া-প্রতিবেশী খুব সহজেই উনার ঘরের বেড়া ভেঙ্গে সবাইকে জীবিত উদ্ধার করতে পেরেছিল। সেই ঘটনার পর ছোটচাচা বহুদিন নিরুদ্দেশ ছিল। আমরা বাড়ির সবাইও হাঁপ ছেড়ে বেঁচেছিলাম। যাক বাবা আপদ গেল কোন এক উছিলায়।
তারপর একদিন আমরা খবর পেলাম যে উনি আমাদের গ্রামের পাশে উজার বাড়ির জঙ্গলে পেত্নিদের বাসা বলে খ্যাত যে বিশাল গাব গাছ তার নিচে আস্তানা গাড়ছে। মাথায় বাবরি চুল,দাড়ি গোঁফে নাকি উনাকে চেনাই যায় না। উজার বাড়িতে রাতের বেলায় তো দূরের কথা মানুষ দিনের বেলায়ও যায় না। সেই জঙ্গলে আস্তানা, আমরা শুনেও দেখতে যাবো কিনা সে নিয়ে দোনোমোনোয় ছিলাম। আমাদের বাড়ির কেউ কেউ গিয়ে দেখে এসেছে ঘটনা সত্যি। উনি গাবগাছের নিচে ধ্যানে মগ্ন। তার কিছুদিন পরই উনি আমগাছে ঝুলে পড়ে। যেদিন আম গাছে ঝুলে পড়ে তার আগের দিন আমাদের বাড়িতে এসেছিল। আমার মা আমার এই ছোটচাচাকে নিজ সন্তানের মতই বড় করেছিলও কিন্তু মাস্তান হয়ে যাওযার পর, ড্রাগ এডিকটেড হয়ে যাওয়ার পর উনার ভালবাসা রূপ নিয়েছিলও চরম ঘৃণায়। তারপর থেকে ছোটচাচা আমাদের বাড়ি আসলেই আম্মা কুকুরের মত তাড়িয়ে দিতো। ছোটচাচকে এমনকি বারান্দায়ও বসতে দিতো না। সেই রাতেও যখন উনি কিছু একটা খাইতে দিতে বলেছিলও, আম্মা কিছু দেওয়াতো দূরের কথা কুত্তার মতই চে চে করে তাড়িয়ে দিয়েছিল। এই তাড়িয়ে দেওয়ার খবর আর কারো জানা না থাকলেও আমার ছিল। আমার কেন যেন খুব ইচ্ছা করছিলও সেদিন ছোটচাচাকে ডেকে এনে খাইতে বলি। আমাদের সেই রাতে অনেক ভাল খাবারদাবার ছিল। কোন উপলক্ষে না তবে ভাল। মাছ মাংস ডাল সবিই ছিলো। তাও আমার মা আমার ছোটচাচাকে খাইতে দেয়নি শুধু উনার কর্মকা- ঘৃণা করতো বলে। আমার কেন যেন মনে হয়, আমার ছোটচাচা সব অপমান সইতে পারলেও সেই রাতের অপমান সইতে পারে নাই। তার পরের দিনই উনি ঝুলে পড়ে।

তারপর আমরা কত দিন কিভাবে বেঁচেছিলাম আমার মনে নাই। শিয়াল কি তখনও ছিল? আমাদের জমিক্ষেতি বহু আগেই ইটের ভাটা হয়ে গেছে। বাবু বাজারের নামা বলে এলাকায় আর কিছু নাই। বালুকান্দার বালু বহু আগেই বিক্রি হয়ে গেছে। তাহলে আমি যে বালুর মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছি সেটা কোথায়? শিয়ালের ডাক শুনছি, তলোয়ারের আগুনের তাপ এসে আমার মুখ ঝলসে দিচ্ছে। স্যাতস্যাতে তুলার মত নরম বালুর মধ্যে আমি গড়াগড়ি খাচ্ছি। আমার শরীর তখন ঘড়ির কাঁটার মত টিকটিক করে ঘুরছে। মনে হচ্ছে আমি যেন ছোটচাচার কবরের ঝুরঝুরে মাটির মধ্যে শুয়া।


আমার দাদি যেদিন মারা যায় সেদিন আমার বৃত্তি পরীক্ষা ছিল। ক্লাস এইটের বৃত্তি পরীক্ষা। আমার মা আর আমাদের জাগির মাস্টার মিলে আমাকে না জানিয়েই পরীক্ষা দিতে পাঠিয়ে দেয় থানা শহরে। আমার পরীক্ষা ভাল হয়নি সেদিন। বৃত্তি আমি পাইনি। বেশ কয়েকদিন পর যখন আমি বাড়ি ফেরত আসি, আমাকে দেখে প্রতিবেশী কোন এক চাচী কেন হাওমাও করে কাঁদতে ছিলও আমি বুঝি নাই। উনার কান্না জড়িত অস্পষ্ট কথাও সব বুঝি নাই। কেবল বুঝছিলাম আমার দাদি মারা গেছে এবং আমি তাকে শেষ দেখা দেখতে পারি নাই। বাড়িতে পৌঁছার পরও আমার মা আমাকে জড়িয়ে ধরে অনেক কেঁদেছিলেন, সাথে আমিও, কিন্তু সেই কান্না কতটা মৃতের জন্যে ছিলও তা আমার মনে নাই। মৃত্যুর সময় অনুপস্থিতির একটা মজা আমি ছোটবেলায় পেয়ে গেছিলাম। তারপর যখনই কোন মৃত্যু আসন্ন বুঝতে পারতাম তখনই আমি পালিয়ে যেতাম। সেটা করেছি বাবা মারা যাবার সময়, মা মারা যাবার সময়। তারপর কোন মৃত্যুই আমি আর কাছ থেকে দেখিনি। দেখতাম না, নানা উছিলায় দূরে থাকতাম। জীবনে আমি দুইটা মৃত্যু খুব কাছ থেকে দেখেছিলাম; একটা এক মুরগীর বাচ্চার মৃত্যু আর একটা একটা পাখির। মুরগীর বাচ্চাটা তখন আমারই বয়সী ছিল। যখন সে মরে আমি একদৃৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়েছিলাম। তারপর যখনই কেউ মারা যেত আমার কেবল সেই মুরগীর বাচ্চার শেষ নিশ্বাস নেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টার কথাই মনে পড়তো। আমার খুব কষ্ট হতো এই ভেবে যে মুরগীর বাচ্চাটাকে আমি কোন হেল্প করতে পারি নাই, তাকে সহযোগীতা করতে পারি নাই একটু নিশ্বাস নেওয়ায়। সেই কষ্ট লাগবের আশায়, যখন অনেক বড় হয়েছি তখন একটা শালিককে রাস্তার পাশে পড়ে থাকতে দেখে হাতে তুলে নেই। তাকে চেষ্টা করি কিছুটা কমফোর্ট দিতে। কিন্তু আমার এই কমফোর্টকে সে কোনই তোয়াক্কা না করে মুরগীর বাচ্চার মতই নিঃশ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করতে করতে এক সময় থেমে যায়। আমি বুঝি তাকে আর কোন ভাবেই কমফোর্ট বা  ডিসকমফোর্ট  কোনটাই দেওয়ার সুযোগ নাই। আমি তাকে আমার বাড়ির বেকইয়ার্ডে অতি যতেœর সাথে দাফন করি।
এখন আমার নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। আমার কি এখন শালিকের মতই অন্তিম সময়? আমি কি ঘুরতে ঘুরতে একসময় থেমে যাব? আব্দুর রহমান বয়াতির কথা মনে পড়ে, ’একটা চাবি মাইরা দিছে চাইরা জনম ভরা ঘুরতে আছে’। ঘড়ির কাঁটার মতই আমি এখন ঘুরছি থেমে যাবার আতঙ্ক নিয়ে, ছোটচাচার কবরে, যা বালুকান্দার বালুর মতই নরম, ঠাণ্ডা, স্যাতস্যাতে।


ছোটচাচা আমারে ধমক লাগায়, ’এই বান্দরের বাচ্চা মাটির মধ্যে গড়াগড়ি খায়তাছস কেন? যা বাড়ি যা। গিয়া দেখ চেয়ারম্যান বাড়িতে আগুন লাগছে’। আমি ঘাড় তোলার চেষ্টা করি, আগুন দেখার চেষ্টা করি, কোথাও কোন আগুন দেখি না। চারদিকে কেমন যেন ঝপসা, এই ঝাপসার কারণ কী ধোঁয়া না কুয়াশা আমি ঠিক ঠিক বুঝতে পারি না। চেয়ারম্যান বাড়ি কোনদিকে উত্তরে না দক্ষিনে না পুবে না পশ্চিমে কোন দিকে ছিল। আমি ঘড়ির কাঁটা হয়ে ঘুরি, ঘুরে ঘুরে দেখার চেষ্টা করি, কিন্তু আমি কিছুই দেখতে পারি না এক আকাশ ব্যতিত, আকাশের কোন দিক আছে কিনা জানিনা, নক্ষত্ররাজির সাথে আমার কোন পরিচয় নাই, দাদা নক্ষত্র দেখে দিক বলে দিতে পারতো। উনি অন্ধকার রাতেও শুধু নক্ষত্র দেখে দেখে নাকি নৌপথে গন্ডগোলের সময় বাড়ি আসছিলও কাশিপুর থেকে। কাশিপুর দাদার পীরের বাড়ি। সেখানে তিনি সময় পেলেই চলে যেতেন, আপদে-বিপদে যেতেন, দিনকাল ভাল হলে যেতেন, ফসল ভাল হলে যেতেন, মন্দ হলেও যেতেন, কোন পরামর্শের দরকার হলে যেতেন। উনার পীর (বাবাজানের) অনুমতি ছাড়া উনি কোন কাজ করতেন না।  গণ্ডগোল যখন দেশে লাগি লাগি করতেছিলও তখনই নাকি তিনি বাবাজানের কাছে চলে গিয়েছিলেন পরামর্শ করার জন্যে। উনার অবস্থান কী হবে সেই সিদ্ধান্ত নেওয়া উনার জন্যে সহজ ছিলও না। কারণ তিনি তখন এলাকার চেয়ারম্যান, বহুদিনের পুরোনো চেয়ারম্যান। তার উপর নির্ভর করে এলাকার শান্তিশৃঙ্খলা। একদিকে মুক্তিবাহিনী আর একদিকে সরকার। কার পক্ষ নিবেন তিনি? মুক্তিবাহিনীর পক্ষ নেয়া উনার পক্ষে সম্ভব ছিলও না, কারন উনার বিদ্রোহী বড় ছেলে যাকে দাদা বেশ কয়েক বছর আগেই ত্যাজ্য করেছিলেন এলাকায় আকাম কুকাম করার অপরাধে, সেই বড় ছেলেই এখন মুক্তিবাহিনীর কমান্ডার। বড়চাচার সাথে দাদার বিরোধ নাকি চরমে গিয়েছিলো কোন এক ইলেকশনের সময়। চাচা দাদার বিরুদ্ধে ইলেকশন করেছিলও, যদিও দাদাই পাশ করে কিন্তু উনাকে বেশ বেগ পাইতে হৈছিল। বড়চাচা স্বভাবে দুষ্ট, আকাম-কুকামের রাজা, দশগ্রামের যত খারাপ মানুষ আছে সবাই নাকি তার চেলাচামু-া। এলাকায় ভেরাইটি শো করা, জুয়ার আসর বসানো, নরসিংদী থেকে মেয়ে এনে প্যাণ্ডেল করে নাচানো এই সবই ছিলো উনার পছন্দের কাজ। দাদা এসব পছন্দ করতো না। সেই বিরোধের জের ধরেই বাপছেলের কুরুক্ষেত্র আমাদের সংসারে নাকি শুরু হৈছিলও বহুবছর আগে। আমরা তখন ছোট, কিছুই বুঝি না, শুধু দেখি ছোটচাচা, আব্বা আর দাদা খালি মিটিং করে রাতবিরাতে। মাঝে মধ্যে শুনেছি বড়চাচাকে পুলিশে ধরে নিয়ে গেছে। দাদাই নাকি পুলিশ খবর দিয়ে নিয়ে আসতো। দাদি কান্দে, ছোটচাচাকে কবুতরের মাংস আর চিটারুটি টিফিন ক্যারিযার ভরে থানা হাজতে পাঠায়। কয়েকদিন পর বড়চাচা জেল থেকে ফেরত আসে, তারপর যেই সেই। এই করে করেই উনার দিন যাচ্ছিল। তারপর মুক্তিযুদ্ধের সময় বাপ ও ছেলে দুজন দুপথে পা বাড়ায়। বিরোধ তখন চরমে। এইগুলো আমার সবি শুনা কথা দাদির কাছে। তবে বড়চাচা যে আমাদের পরিবারের বাইরে, আমাদের বিরুদ্ধে তা আমরা ছোটবেলায় বুঝে যাই এবং উনার বাড়ির দিকে কখনও যেতেম না। উনার ছেলেমেয়ের সাথে দেখা হলেও কথা বলতাম না। আমরা দুপক্ষই লজ্জায় মাথা নিচু করে একদল আর একদলকে ক্রস করে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পার হয়ে যেতাম। স্বাধীনতার পর বড়চাচাই চেয়ারম্যান হয়। দাদাকে ততদিনে মুক্তিবাহিনী মেরে ফেলেছে। সবাই বলাবলি করে বড়চাচার নির্দেশেই নাকি এটা  হয়েছে। দাদির কাছে শুনছি দাদাকে মুক্তিবাহিনী ধরে নিয়ে গিয়ে জীবন্ত কবর দিয়ে দিছিল। এটাই ছিলও দাদার শেষ ইচ্ছা।  দাদা নাকি একটা আর্জি করছিলও যারা দাদাকে মেরে ফেলার জন্যে নিয়ে যাচ্ছিল তাদের কাছে। দাদার শেষ আর্জি ছিলও উনাকে যেন জীবন্ত একটা কবরে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। কবরটা ছিল উনার বড় ছেলের বড় নাতি রিশুর। রিশু খুব আদরের নাতি ছিলো দাদার। তখনও বড় ছেলের সাথে উনার বিরোধ চরমে পৌঁছে নাই। একান্নবর্তি পরিবারে প্রথম শিশু, সবাই লাইন দিয়ে থাকতো কে কোলে নিবে। একজন রাখেতো আর একজন এসে সাথে সাথে কোলে তুলে নিত। সেই রিশু একদিন সবার চোখ ফাাঁকি দিয়ে চলে গেল বাড়ির পেছনের পুকুরে। তারপর যখন ভেসে উঠলো ততক্ষণে সবি শেষ। রিশুর ঘটনা দিয়েই নাকি পরিবারে বিরোধের শুরু। পুকুরে যাওয়ার আগ মুহূর্তে নাকি দাদার কাছেই বসা ছিলও রিশু। বড় চাচী নাকি দাদাকে সরাসরিই বইলা বসছিলও ’আপনার উদাসিনতাই আমার ছেলের মৃত্যুর কারণ’। তারপর দাদাও আর কোনদিন চাচীর সাথে কথা বলেনি। সেই প্রিয় নাতির কবরে শুয়ে শেষ নিশ্বাস নিতে চায়ছিলও দাদা। তার কথা মত যে দুইজন তারে খুন করতে ধরে নিয়ে গেছিলও তারাও তাই করলো। দাদাতো খুব দাপটি লোক ছিল। পঁচিশ বছর চেয়ারম্যানি করছে এলাকায়। হেন মানুষ নাই দাদাকে সালাম না দিয়ে রাস্তা ক্রস করতো। সেই সম্মানি লোক একটা আবদার করবো সেটা না রাখার শক্তি কি মার্ডারাদের ছিলো? দাদির মুখে শুনা এইসব গল্প বড় হয়ে এলাকার নানা গল্পের সাথে মিলায়ে বোঝার চেষ্টা করতাম। পরে মনে হৈছে গল্প আসলে একই তবে নানা লোক নানাভাবে বলে এই যা। এলাকায় অবশ্য এই গল্পও চালু আছে যে দাদাকে মুক্তিরা মেরে গাছে ঝুলায়ে রাখছিল। বড় চাচার নির্দেশে পরে নদীতে ভাসায়ে দেয়। চাচাকে কি একবার জিজ্ঞেস করবো? কোন নদীতে ফেলছিল? সে নদীতে কি অনেক ক্ষুধার্ত কুমির ছিল?

বড়চাচা আসলে আমাদের আপন চাচা না। দাদার অবৈধ সন্তান। সেটাও নাকি কাশিপুরের ঘটনা। দাদা তার পীরের বাড়ি গিয়ে থাকতো এটা তার বিয়ের আগের ঘটনা। তখন সেই পীরের বাড়ির কাজের মেয়ের সাথে নাকি আকাম করতে গিয়ে এই সন্তানের জন্ম হয়। পীরের নির্দেশে এই মেয়েকে কিছুদিনের জন্যে বিয়ে করলেও তাকে কোনদিন বাড়ি আনেনি। তারপর দাদির সাথে বিয়ে হওয়ার পর নাকি একদিন এই ছেলেকে নিয়ে এসে দাদির হাতে দেয় এবং ঘটনা খুলে বলে। তারপর দাদিই এই ছেলেকে মাতৃস্নেহে বড় করে। এই সবি গল্প। আমার পরিবারের গল্প আমি সারাজীবন মানুষের কাছেই শুনেছি। পরিবারের লোকজন কখনও এসব নিয়ে মুখ খুলতো না। লোকজন এও বলাবলি করে যে দাদা নাকি, বউ আর বাচ্চা সহই রওয়ানা করছিলও পীরের বাড়ি থেকে, তারপর আসার পথে কোন এক নদীতে,মেঘনা নাকি তিতাস এখন আর মনে করতে পারতেছি না, যেখানে ক্ষুধার্ত কুমির কিলবিল করতেছিলও, সেখানে বড়চাচার মাকে ধাক্কা দিয়া নৌকা থেকে ফেলে দেয়। দাদার ক্ষমতার কারণে সেই মার্ডার নিয়ে কেউ কোনদিন টু শব্দ করার সাহস করে নাই। বড়চাচা নাকি মায়ের হত্যার বদলা নেওয়ার জন্যেই দাদাকে তার দলের লোক দিয়ে হত্যা করে। মাতৃ হত্যার বদলা নেয়া হৈল, আবার রাজাকার পিতাকে ক্ষমা না করার দৃষ্টান্তও স্থাপন হৈল। এসবি মানুষের গালগল্প। এরকম বহু গল্প চালু আছে আমাদের এলাকায়।
বড় চাচা তখন কত বড় ছিল? উনি কি দেখছিলও উনার মাতৃহত্যার দৃশ্য? সেই জিঘাংসা কি মনে মনে পোষণ করতো সবসময়? তিলে তিলে কি উনি উনার ক্ষমতাকে গড়ে তুলছিলও দাদা সাথে শেষ বোঝপড়া করার জন্যে?
দাদির মুখে এই সম্পর্কে কোনদিন কিছু শুনি নাই। গ্রামবাসীর কথাও সত্যি হৈতে পারে। সত্যি যদি না হয়, তবে বাপ ছেলের বিরোধ কিভাবে খুনখারাপি পর্যন্ত যায়? কিভাবে একটা গোটা পরিবার ধ্বংস হয়ে যায়?
এই ঘটনার পর বড়চাচাকে দাদি আর কোনদিন ছেলে হিসাবে গন্য করেনি। আর কোনদিন বড়ছেলের নামও মুখে নেয়নি। দাদিও আমাদের  বলতে বলতে একদিন গল্পের দিন শেষ হয়ে যায়। দাদির শেষ গল্পটা ছিলো ঘড়ির কাঁটার। মৃত্যুর সময় সকল প্রাণীই নাকি ঘড়ির কাঁটার মত ঘুরতে ঘুরতে উত্তরশিরানা হয়ে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করে। আমিও এখন ঘুরছি। আমার শেষ নিশ্বাস নেওয়ার সময় কি ঘনিয়ে এসেছে দাদি?
৭-৪-২০২০।

স্কেচ ও অলংকরণ: দীপংকর গৌতম 

মোয়াজ্জেম আজিম
মেলবোর্ন।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments