মম – নাদিরা সুলতানা নদী (প্রশান্তিকার ঈদ আনন্দ আয়োজন)

  •  
  •  
  •  
  •  

ঈদ আনন্দে প্রশান্তিকা… ঈদ আসছে। আমরা অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি, আপনাদের প্রিয় প্রশান্ত পাড়ের বাঙলা কাগজ ‘প্রশান্তিকা’ ঈদ আনন্দ আয়োজন করেছে। দেশে বিদেশের লেখক ছাড়াও একঝাঁক নবীন লেখকেরা এই আয়োজন সমৃদ্ধ করবেন। সবাইকে অগ্রিম ঈদ মোবারক।

 

আজকের গল্প

মম
নাদিরা সুলতানা নদী

চাকুরীর বয়েস প্রায় ৬ বছর হতে চললো। দ্বিতীয় বছর থেকেই অফিসিয়াল ট্যুরে দেশের বাইরে যাওয়ার সুযোগ এলেও ”মা” হওয়ার জন্যে গত প্রায় দেড় বছরের একটা লম্বা বিরতি নিতেই হল। অফিসে আবার নিয়মিত হওয়ার পর ঠিক এক বছর ৭ মাস পর আরো একবার যাচ্ছি দেশের বাইরে। এবারের গন্তব্য ভারতের দিল্লী।

গোটা ৭ দিনের ট্যুর, আসা যাওয়ার বাইরে থাকতে হবে পাঁচ দিন।

আগের ট্যুরগুলোর সাথে এবারেরটা একদমই আলাদা। আমার কন্যা যার বয়েস দুই ছুঁই ছুঁই করছে। পৃথিবীতে এসেই আমার নিজের পৃথিবী অনেকখানিই বদলে দিয়েছে যে। যার হাসি দেখলে বুকের ভেতর অজানা এক সুখের ঝর্ণা বয়ে যায়। যাকে বুকের কাছে চেপে ধরলে জীবনকে আরো ভালোবাসতে ইচ্ছে করে। আমার সেই মেয়ে ‘রেইনকে’ রেখে প্রথমবারের মত এই সময়টুকুন থাকছিনা।

আমার বুকের ভেতর কী হচ্ছে সেটা কিছুতেই পরিবারের অন্য সদস্যদের বুঝতে দেয়া যাবেনা। আমি এর মাঝেই বুঝে গেছি কে কেমন করে ভাবে বা ভাবতে পারে এই পরিবারে। সবার সব চাহিদাকে গুরুত্ব দিতে গিয়ে নিজের ভেতরে প্রতি মুহূর্তে ভাঙতে ভাঙতে অনেকটাই অন্য আমি হয়ে গেছি, যাচ্ছি।

তবে দিনের পর দিন সব কিছু সামাল দিয়ে এখন এইটুকুন বুঝতে শিখেছি সবকিছু নিয়ে প্রচুর কথা বলা যাবেনা বা প্রয়োজন নেই। দেখছি শুনছি, আমার এই যাওয়াটা নিয়ে পরিবারের বিরক্তিগুলো, চেপে যাচ্ছি।

আমার মেয়ে, তার দাদা, দিদা, বাবা, চাচা, নুতন চাচী এবং আমার নিজের মা, ওর নানু সবাই মিলেই আগলে রাখবে কটা দিন। অফিসের মূল দায়িত্বের মাঝে আবার ফিরতে না পারলে আমি তো আমিই থাকছিনা। থাকতে পারবোনা। এই ট্যুরটা নিতেই হচ্ছে, নো ওয়ে টু স্কিপ। অন্তত আমি এক্সকিউজগুলোকে আমলে নিতে চাইছিনা এই মুহূর্তে। এক বছর ৬ মাস নিয়েছি।

লাগেজ পত্তর নীরবে গুছাতে লাগলাম। ফ্লাই করার দুই দিন আগে কিশোরগঞ্জ থেকে আমার মা চলে এলেন ছোট মামাকে নিয়ে। বাসায় ঢুঁকে বুঝলেন আমার এই যাওয়াটা যে খুব স্বাভাবিক না। অল্প কথায় তাঁকেও বুঝিয়ে দিলাম, এমন কিছু দেখা বা শোনার অবস্থায় আমি আর নেই। মা যেন আতংকে না থেকে যতটা স্বাভাবিক থাকা যায় থাকেন এবং সবাই মিলে আমার রেইনকে নিয়ে ভালো কিছু সময় কাটান। আমাকে নিয়ে দুঃশ্চিন্তা না করে, সেই আশাটাই শুধু করছি আমি।

তবে একটা জায়গায় আমি ব্লেসডই বলবো, মেয়ে আমার এর মাঝেই বুঝিয়ে দিয়েছে ‘শী লাভস লোকজন’ ভীষণ মিশুক এবং আদুরে। এই সময়ের মাঝে তার নিজের মা-বাবাকে নিয়ে যেমন একটা জগত হয়েছে, ঠিক ততটাই হয়েছে পরিবারের অন্য সবাইকে নিয়ে। এমনকি গ্রামের বাড়ী থেকে একটা মেয়ে আনা হয়েছে ওর পাশে থাকার জন্যে, সেই ঝুমার সাথেও তার দারুণ সখ্যতা।

হয়তো ঘুমাতে যেয়ে আমাকে খুঁজবে, কিন্তু ওকে খুব ভালোবেসে ওর বাবাও যে সময় দেবে সে বিশ্বাস আমার আছে। ফ্লাই করার আগের রাতেও রেইনের বাবা যতরকম নেগেটিভ এপ্রোচ করা যায়, করে যাচ্ছে। আমি মনে মনে বলছি, ওহে দয়াময় আমার ধৈর্য দাও, শক্তি দাও, সাহস দাও…

ছোট্ট এক প্লেন জার্নি খারাপ হলোনা। মধ্য দুপুরে পৌঁছে গেলাম মোটামুটি ব্যস্ত দিল্লী এয়ারপোর্ট। ওখানকার লিয়াঁজু অফিস থেকে দুই তরুণ তরুণী এসেছে আমাকে রিসিভ করে হোটেলে পৌঁছে দিতে।

বাংলাদেশে ফেলে যাওয়া চাপা টেনশন আপাতঃ তুলে এবং ভুলে মন দেই আমার কাজে। প্রায় ৪৫ মিনিটের ট্যাক্সি রাইডেই ওদের সাথে কথা হয় পরদিন সকাল থেকে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ”এডুকেশন এক্সপো” নিয়ে। শুনে নেই আরো কিছু খুঁটিনাটি। হোটেলে ঢুঁকে লাগেজ রেখে মোবাইল সচল করে বাংলাদেশের সাথে যোগাযোগ করি এরপর ফ্রেশ হয়ে বের হই ধারে কাছে কোথায় একটু সস্তায় পরিচ্ছন্ন পছন্দসই খাবার পাওয়া যাবে সে খোঁজে। হোটেলে সকালের নাস্তাটা পাওয়া গেলেও বাকি সময় চড়া দামে কিনে নিতে হবে, তাই কাজের সময়ের বাইরে এই কদিন যখনই খেতে হবে, সেই ব্যাবস্থাটা করে রাখা।

হোটেল লবিতেই দেখছিলাম দুই একটা বাংলাদেশী ছোট বড় পরিবার। আমার সেই সময়টা নেই যে যেয়ে কথা বলে একটু সময় দেব। নিজের কাজগুলো সেরে দ্রুত হোটেল রুমে ব্যাক করবো সেই তাড়া নিয়েই বের হচ্ছি আসলে। ট্যাক্সির কাছে পৌঁছানোর আগেই দেখি লবির অন্য একটা পাশ থেকে আমার কাছাকাছিই এক ইন্ডিয়ান তরুণীর সাথে একজন বাংলাদেশী তরুণী খুব প্রাণময় ভঙ্গিতে কথা বলতে বলতে আগাচ্ছে। একজনকে বাংলাদেশী অনুমান করে নিলাম বটে, কিন্তু নিশ্চিত হবো হবো করতেই চোখে চোখ। আমি মুখে হ্যালো উচ্চারণ না করেই চোখ দিয়ে যেন বুঝাতে চাইলাম, আপনি কী বাংলাদেশী?

কী জানি কেমন করে চোখের ভাষা বুঝতে পেরেই, তরুণী তাকালেন আমার দিকে, একটু কাঠিন্য নিয়েই, তবুও আরো কাছে আসতেই আমি বলেই ফেললাম ”বাংলাদেশী”?
আন্তরিক হাসিটাও বিনিময় করলাম, যা আমি করি।
আমি ঢাকা থেকে এসেছি, আপনি?

বুঝা গেলো, উনি ততোটা ইচ্ছুক নন আমার সাথে এই পরিচয় বিনিময়ে তারপরও বললেন, আমি অস্ট্রেলিয়া থেকে, বেড়াতে এসেছি, হুম আমিও হয়তো বাংলাদেশীই !
আমি এবার হাসি আরো বিস্তৃত করি, মানে কি? আপনি নিশ্চিত নন?
এবার তিনিও হাসেন… তবে নিঃশব্দে। মেপে মেপে।

আমি হাসিখুশি মানুষ। কিন্তু এমন না যে কাউকে যেচে ডিস্টার্ব করবো। কিন্তু আমি আসলে আমার থেকে একটু সিনিয়রই হবেন, এমন একজন তরুণী অস্ট্রেলিয়া থেকে বেড়াতে এসেছেন শুনেই গল্প করার উৎসাহ কিছুতেই ছাড়তে পারছিনা।
ফ্যামিলি নিয়ে এসেছেন?

না আমি একাই।

ভদ্র মহিলা দেখতে খুব ইম্প্রেসিভ না, একা বেড়াতে এসেছেন এবং এই মুহূর্তে তাঁর সাথে খুব স্মার্ট এক ভারতীয় তরুণী… আমাকে টানলো বিষয়টা।

পরিচয় পর্বকে আরো একটূ এগিয়ে নিতেই বলি, আমরা বোধ হয় একই হোটেলে উঠেছি?
তরুণী বললেন, তাইতো মনে হচ্ছে…
আবার দেখা হবে নিশ্চয়ই, আপনার মনে হয় তাড়া আছে, বলে আমি পা বাড়াতে নেই।
উনি বলেন না, মানে আমি এই হোটেলেই উঠেছি, তবে আজ আমার এই বন্ধু আমাকে নিতে এসেছে ওর সাথে যাচ্ছি। ওর সাথে হয়তো রাতটা থেকে যেতে পারি। কাল সন্ধ্যায় ফিরবো।

বুঝতে পারিনা, উনি আমাকে পুরোপুরি এভোয়েড করতে চাইছেন কিনা! আসলে বুঝতে ইচ্ছেও করছেনা।  চাইছি দেখা হোক।
আমি ওর বন্ধুর দিকে হাত বাড়াই, ‘হ্যালো আই এম সামিরা” ফ্রম বাংলাদেশ।
ও ইয়েস ইটস মী ”জাহ্নবী” !
নাইস টু মিট উইথ ইউ।
বাংলাদেশী তরুণী মনে হল, একটু অনিচ্ছা নিয়ে তবে স্বাভাবিক ভাবেই বললেন ”আমি মমতা পারভীন” আমার এখানকার বন্ধুরা আমায় ”মম” বলে।

মম, আমার খুব প্রিয় নাম, দেখা হবে আপা, বাই দ্যা ওয়ে আপা বললে আপত্তি আছে আপনার।

মম আপা এবার হাসলেন, মনের ভিতর থেকে হাসি। বললেন না সামিরা, ইটস ওকে, দেখা হবে।

আমি টানা দুই দিন খুব ব্যস্ত ছিলাম। পুরো ৪৮ ঘন্টা আসলে মমকে মনে করবার ফুরসৎই মেলেনি।

তৃতীয় দিন, সকালে হোটেল লবিতে ব্রেকফাস্ট এ দেখা হয়ে গেলো… মমর সাথে। আমার আপা বলার কথা, কিন্তু অস্ট্রেলিয়া থেকে বেড়াতে আসা একজন তরুণী যিনি কিনা বাংলাদেশী কিনা ঠিকমত বললেনওনা, তাকে আপা বলা বোধ হয় সমীচীন হবেনা।
মম কেমন আছেন আপনি, খুব বিজি ছিলাম গত দুই দিন আপনার খোঁজ নেবো সময় করতে পারিনি।
সামিরা, আমিও ছিলামনা, গতকাল লেট নাইটেই ফিরলাম।
লবির একটু কর্নার টেবিলে  একাই বসেছিলেন খাবার নিয়ে। কিছু মনে না করলে আমি কি আমার ব্রেকফাস্ট নিয়ে এসে জয়েন করতে পারি?
না মমকে এবার আর আগের মত আবেগশূন্য বা এক্সপ্রেশনলেস মনে হচ্ছেনা। বরংচ আমি তাঁর চোখে গভীর করে তাকিয়ে অন্যরকম একটা মমকে দেখলাম। যার চোখ উপচে পড়ছে গভীর মায়া এবং আত্নবিশ্বাস।

জ্যুস খেতে খেতে কথা আগায় আমাদের, বয়েসে তিনি আমার ৮/১০ বছরের সিনিয়র আবিষ্কৃত হয়। বাংলাদেশ ছেড়ে অস্ট্রেলিয়া চলে গেছেন এক যুগেরও আগে। কলেজ পড়ুয়া মেয়ে আর আইটি ইঞ্জিনিয়ার হাজব্যান্ডকে রেখে একাই বেড়াতে এসেছেন এবং বছর দুই/এক পরপর এখানেই আসেন বললেন।

স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন করে ফেলি, বাংলাদেশে যাননা? কেন এখানেই, দিল্লিতে?
সামিরা আপনি কী লিখেন?

আমার সরাসরি এমন প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে আমাকে এমন প্রশ্ন, একটু হকচকিয়ে যাই।
অপ্রস্তুত হাসি, হুম লিখি একটু আধটু, চেষ্টা করি। সপ্তাহে ছয়দিন চাকরী, বাংলাদেশের ব্যস্ততম শহর ঢাকায় থেকে একটা পরিবার মেইনটেইন করে যেভাবে চাই সেভাবে পারিনা যদিও।

কথা বলতে খুব ভালো লাগে আমার, কিন্তু হঠাৎই খেয়াল হয় আমাকে ১০ টার মাঝে আজকের ভেন্যুতে পৌঁছাতে হবে। ঘড়িতে প্রায় ৮.৩০, বাকি আধা ঘন্টায় রেডি হয়ে বাই ৯ বের হতে হবে এবং তারচেয়ে বড় কথা, ভীষণ কাজ পাগল আমার মনে পড়ে যায়, আজকের প্রেজেন্টেশনটা আরো একবার চোখ বুলিয়ে দেখে নিতে হবে… যেটা আমি গত দুই সকালে করেছি। আজ মমকে পেয়ে ছন্দ পতন হলো।

অনিচ্ছা নিয়েই উঠলাম। রাতে ডিনার কোথায় করছেন মম?
আমার জাহ্নবী বন্ধু আসবে একটু পরই। সাথে আমার আরো কজন বন্ধু, ওদের নিয়ে ঘুরতে বের হবো। এখনও বুঝতে পারছিনা বাকিটা। সামিরা আমি এই দিল্লিতেই পড়াশুনা করেছি আসলে। তাই এখানেই ফিরে ফিরে আসি। বুঝতে পারছো, জানতে চেয়েছিলে কেন বাংলাদেশের মেয়ে হয়ে এখানে আসি বারবার। দিল্লি আমাকে দ্বিতীয় জীবন দিয়েছে বলতে পার।

মম, কথা হবে। ভালো হোক আজ সারাদিন আপনার। বাই ফর নাও।

কাজকে আমি একটু বেশীই ভালোবাসি। সকালটা অন্য রকম করে কাটলো আজ। একটু দুরুদুরু বুকে বের হলেও ভেন্যুতে ঢুঁকেই নিজেকে ঝাঁকি দিয়ে ফিরিয়ে নিয়ে এলাম পুরো কনসেন্ট্রেশন নিয়ে। ভালো কাটলো, নেপাল, মালেয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়াসহ অন্য কান্ট্রি থেকে আসা অন্যদের সাথে এর মাঝেই টুকটাক আলাপ হয়ে যাওয়াতে আজ সময়টা আরো ভালো কাটলো।

কাজের মাঝের লাঞ্চ ব্রেক, কফি ব্রেকের প্রতিটাই কারো না কারো আরো একটু কাছাকাছি আসার সুযোগ হলো। ওয়েস্টার্ন আউটফিটে আমাকে  ৩০ বছরের এক মা মনে হয়না এমন কম্পলিমেন্টে আমি অনেকটাই অভ্যস্ত। এখানে এসেও কেম্বোডিয়া থেকে আসা লিউক বলে যে তরুণ সেও একটু মজা নেয়। কথা প্রসঙ্গে যখন জানতে পারে আমি ৩০ ছুঁই ছুঁই এই নভেম্বরে এবং এক কন্যা রেইনের মা। আজ কফি ব্রেকে সবার সামনে আমাকে ডেকে নিয়ে দাড় করিয়ে বলছে, হ্যালো এভ্রিওয়ান, এনিওয়ান ক্যান গেইস, হাউ ওল্ডার সামিরা ইজ? সবার জন্যে কুইজ। মজাটা কিভাবে নেবো নেবো করতেই করতেই দুর্দান্ত সব কমেন্টে হাসতেই বাধ্য হই।
তবে ভালো লাগে, সিনিয়র জুনিয়র তরুণ তরুণীর মাঝে নিজের শরীর স্বাস্থ্য পোশাক আশাক নিয়ে খুব সচেতন হতে হচ্ছেনা বলে।
সেশনের তৃতীয় দিন, কজন মিলে একটু দূরে একটা জায়গায় ডিনার করবে বলে ঠিক করলো। আমার খুব ইচ্ছে না থাকা সত্বেও যেতে হল। ভারতীয় আমার বয়েসী এক তরুণী রোহিনীর জন্যে। এতো লাইভ কোন মেয়ে আমি অনেকদিন দেখিনি। সবার সাথে থাকার পরও পুরোটা  সময় ফোকাস ওর দিকে যেতে বাধ্য। স্পস্ট ইংরেজীতে কথা বলে তাই আমাদের কারো বুঝতেও কোন সমস্যা হয়না। আমাকে বলে শোন স্যামি(সামিরা বাদ দিয়ে তাই বলছে সে)  তুমি তোমার কন্যার খোঁজ এখান থেকেই নাও, আমি জানি সে ভালো আছে, তারপরও একটু টেনশন ফ্রী হয়ে চলো আমাদের সাথে।

রাতে ফিরতে ফিরতে ৯টার একটু বেশী। রুমে ঢুঁকে, আরো একবার শাওয়ার নিলাম। রুমে রাখা টি ব্যাগ গরম পানিতে চুবিয়ে বিস্বাদ এক কাপ চা নিয়ে ল্যাপটপ খুলে বসলাম একটু সময়ের জন্যে।

মমকে মনে পড়লো। রুম নাম্বারটা জানলে একটা কল দেয়া যেতো, কেন যে জিজ্ঞেস করলামনা। ঘুমাতে যাওয়ার আগে আরো একবার মনে পড়লো তাঁর সেই কথাটা ‘’দিল্লি আমাকে দ্বিতীয় জীবন দিয়েছে’’!

আমি রীতিমত সকালের অপেক্ষায় রইলাম, কখন মমর সাথে দেখা হবে।
আজ ৭ টায় উঠেই ফ্রেশ হয়ে একবারে রেডি হয়েই নামলাম। আজকের সিডিওল একটু রিলাক্স, সাথে আনা দুইটা শাড়ী থেকে ক্রেপ স্লিল্কের হাল্কা পেস্ট সাদা শাড়ীটা জড়িয়ে কানে সাদা নীল কম্বিনেশনের পাথরের দুল, পিঙ্ক লিপস্টিক আর আইলাইনারে বেশ স্নিগ্ধই লাগছে বুঝতে পারছি।
৭.৩০ তে লবিতে নেমেই চোখ খুঁজে বেড়াচ্ছিল মমকে। মম দূর থেকেই আমাকে দেখে উঠে আসছিলো। আমাকে দেখে রীতিমত উচ্ছসিত আজ, আরে শাড়ীতে তোমাকে এতো অন্যরকম লাগে সামিরা? আমি হাসি, হুম একটু পরিপক্ক লাগে আরকী। মাঝে মাঝে যেমন লাগা উচিত।
মুখোমুখি বসি।
মম আর দুইদিন আছি। আপনার সাথে তো আমার আর দেখা হবেনা। ছোট দুইটা বিষয় যদি খুব পার্সোনাল বা ইমোশনাল না হয়, আমার খুব জানতে ইচ্ছে করছে। বাংলাদেশ নিয়ে আপনার মাঝে একটা ক্ষোভ বা অভিমান নাকি অন্য কিছু, আসলেই কি কিছু কাজ করে?  প্রথমদিনই বলছিলেন, আমি বোধ হয় বাংলাদেশের! আমি কাজের মাঝে আপনাকে নিয়ে কেন যেন ভাবছি।
মম আমার দিকে খুব গভীর দৃষ্টি নিয়ে তাকায়। সামিরা, আমার দিকে ভালো করে তাকিয়ে দেখেছো আমার গায়ের রঙ? আমি একটু বেশীই কালো, না? আমার স্কুল কলেজ কেটেছে যেখানে, অবর্ণনীয় এক কষ্ট নিয়ে আমি শেষ করেছি আমার এই দুই পাঠ। শুধু গায়ের রঙের জন্যেই এমন গুটিয়ে থাকতে হতো। ধরো স্কুলে যাচ্ছি, আড়াল থেকে কোন ছেলে বলে উঠলো ‘’কালিমা’’  কালিমা…  খারাপ লাগতো। পাড়ায় কোন মা হবে, আমি চোখের সামনে পরে গেলে তাড়াতাড়ি যেন সরে যেত। একদিন আমার সিনিয়র এক বড় আপা আমাকে বললেন, মমতা ‘’গোবর মাখলে মানুষ ফর্সা হয়ে যায়’’ জানো, তুমি কদিন দিয়ে দেখতে পার।
সামিরা ‘আমি গোবর মেখে একদিন বাথরুমে বসেছিলাম’।
মম চোখ মুখকে খুব স্বাভাবিক রেখেই কথা বলছিলেন। আমি একটু বেশীই স্পর্শকাতর মানুষ। আমার চোখ ভিজে গেলো। ব্যাপারটা কেমন দেখায় তারপরও আমি মমর হাতটা ছুঁয়ে থাকি…
সামিরা, এটা ছোট একটা অভিজ্ঞতা এমন আরো অনেক অনেক দিন এসেছে আমার জীবনে, কিছু মানুষ, সময় আমার জীবনকে করে তুলেছিলো, শুধুই একটা কালো রঙের মেয়ে শরীরের কালো অধ্যায়ের গল্প টাইপ জীবন…
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বো এমন সিদ্ধান্ত সামনে আসতেই আমি পরিবারকে রাজি করিয়ে পাড়ি দিলাম এই দেশে, দিল্লিতে। সামিরা, জীবনটা আমার মত করে ছিলোনা লম্বা সময় বুঝতেই পারছো। এখানে এসে অল্প কজন বন্ধু পেলাম। আমি জানি এই দেশের আনাচে কানাচেও অসংখ্য মম আছে, গুমড়ে থাকা কান্না বা কষ্ট আছে। কিন্তু আমি এখানে পড়তে এসেই আমার আমিটাকে খুঁজে পেলাম যাকে গায়ের এমন কালো রঙ নিয়ে গুটিয়ে থাকতে হয়নি কখনও।
ঐ যে জাহ্নবীকে দেখেছো আরো কজন আছে এখন ওরা অন্য শহরে। ওরা আমার বন্ধু হয়েছে, খুব ভালো বন্ধু। আমি সুযোগ পেলেই তাই আমার দ্বিতীয় জীবন প্রাপ্তিটা উপভোগ করতে আসি।
তোমার নিশ্চয়ই জানতে ইচ্ছে করছে, আমার জীবন সঙ্গী কেমন হয়েছে। সে খুব পড়ুয়া একজন মানুষ, পড়তে যেয়েই পরিচয়। ভীষণ স্কলার, পড়া নিয়েই থাকে কিন্তু সে আমাকে পছন্দ করেছে এবং একদিনের জন্যেও এটা অনুভব করতে দেয়নি আমাকে ইচ্ছে করলেই ইগ্নোর করা যায়। আমি সব সময়ই তাঁর চোখে খুব স্পেশাল। আমরা অস্ট্রেলিয়ার মত একটা দেশে বাস করছি্‌ মেলবোর্নে। সে একটা ইউনিতে গবেষণায় রত, আমিও আছি কাস্টোমার সার্ভিসে একটা চেইন শপে। অনেক বছর করছি জব। আমাদের ওভাবে কোন আর্থিক অভাব অভিযোগ নেই। একটা মেয়ে, খুব ট্যালেন্টেট। সবাই সবার মত নিজেদের টেক কেয়ার করতে পারি। আমার হাজব্যান্ড তাঁর কাজে বা অন্য কোন পারপাসে একাই যান, দেশের বাইরে। মেয়েকে নিয়ে দেশে যাই আমিও, কিন্তু খুব বেশী যাওয়া হয়না। মা বাবা বেঁচে নাই আমি এবং আমার হাজব্যান্ডের। ভাই বোনেরা আছে, কিন্তু ঐ যে এতো বছর পর তারপরও শুনতে হয়, কিরে মম বিদেশ গিয়া তো মাইন্সে ফর্সা হয়া যায়, তুই দেখি আগের মতোই। তোর মাইয়াডাও তো বাপের রঙডা পাইলোনা।

ও সামিরা তুমি জানতে চাওনি তাও বলি, আমি যে অস্ট্রেলিয়া আছি, সেই শহরেও অনেক বাংলাদেশী থাকে। আমার বন্ধু বলতে হাতে গোনা ক’জন। কেন জান, এই যে আমি এতো কালো দেখতে আমার হাবির গায়ের রঙ আবার একটু বেশীই উজ্জ্বল তাই নিয়ে আমাদের কোন সমস্যা না হলেও ধরো কোন আচার অনুষ্ঠানে গেছি, কোন না কোন মেয়ে বা মহিলা বলবে, আপা বা ভাবি আপনার স্বামী মানে ভাইয়ের গায়ের রঙতো দেখি আপেলের মত… আপনি একটু ধার নিতে পারেননা।

এবার আপা শব্দ করে হেসে উঠেন আমার করুণ মুখের দিকে তাকিয়ে। না না সামিরা তুমি আবার ভুল বুঝোনা। সবখানেই সব রকম মানুষ আছে। এমন বলার মানুষ যেমন দেশে  আছে, প্রবাসেও আছে, এমন অনেক মেয়ে মহিলা, আজও যারা গায়ের রঙ আর বাহ্যিক সৌন্দর্য নিয়েই মেতে আছে। সংখ্যাটা হয়তো কম, কিন্তু আছে এমন। আমার এখন আর মন খারাপ হয়না। তবে আমি এড়িয়ে চলি।
তুমি লেখ, এটা জানার পরই সেদিন ফেসবুকে তোমাকে খুঁজছিলাম, পেয়েও গেলাম। তোমার বেশ কিছু লেখা পাবলিক করা, পড়ে ভালো লেগেছে খুব মনে হলো তোমাকে আমার এই অনুভবটুকু শেয়ার করাই যায়।

আজ একটু দেরী হয়েই গেলো। কিন্তু আমার অন্যরকম ভালো লাগছে। মম হয়তো জানেনা কী দারুণভাবে আমাকে আরো অনেক বেশী ইন্সপায়ার করে গেল। আমি কতোটা পারবো জানিনা কিন্তু লিখবো তাঁর কথা লিখতেই হবে।

আজ পঞ্চম দিন। হালকা কলা পাতা সবুজ আর লাল মিলে জামদানীটা নিয়ে এসেছি শেষদিনে পরবো বলেই। লাল পাথরের মালাটা এবং চোখে মোটা করে কালো কাজল আর লাল বড় টিপে একটু বেশীই সাজগোজ করলাম সক্কাল সক্কাল।
শেষ দিনের আগের দিন,
আমি সেই রকম সারপ্রাইজড হলাম। মম আমার জন্যে একটা প্লেটে আমি মোটামুটি যা খাই,  সুন্দর ওরে উঠিয়ে রেখেছে। সাথে জ্যুস আর সয়া মিল্কও।
সামিরা তুমি একদিন জ্যুস খেয়েছো আরেকদিন মিল্ক, নট শিউর আজ কী খাবে। দুইটাই খেতে পার আজ।
আমি আসলেই খুশী আমার সময়টা বেঁচে গেল, মমর সাথে বসে আরাম করে নাস্তা সারলাম। এদের ম্যাঙ্গো জ্যুসটা যে এতো মজা জানা ছিলোনা। গত দুই দিন যথারীতি অরেঞ্জ জ্যুস খেয়েছি আসলে, উফ মিসই হয়ে গেল।

মমর সাথে সম্পর্কটা বেশ সাবলীল হলো। ফেসবুকে আমার লেখা পড়ে প্রশংসা করলেও ফেসবুক চেক করে দেখলাম আমাকে এড করেননি।
আগামী কাল রাতের ফ্লাইটে চলে যাবো,  কাল সকালের নাস্তাটা হয়তো এক সাথে বসে শেষবারের মত করা যেতো। কিন্তু উনি আজ আবার দূরে কোথায় যাচ্ছেন, কাল ফিরবেন এক সময়। তাই আর দেখা নাও হতে পারে। মম থাকবে আরো প্রায় এক সপ্তাহ।

আমি কি আপনার সাথে একটা ছবি উঠাতে পারি, মম? প্রথমেই একটু মজা করলেন আমি এমন খাঁটি বাংলাদেশী কোন এঞ্জেল কন্যার সাথে ছবি উঠাইনা বলে মুখ কঠিন করে তাকালেন। দুই এক সেকেন্ড মজাটা ধরতে না পেরে দুইজনেই হাসলাম।
আমি জানি আমি কোন চোখ ধাঁধানো দেখতে সুন্দর বলতে যা বুঝায় তা নই, কোন কালেই ছিলামনা। কিন্তু বিষয় হচ্ছে কেমন করে যেন এটা আমি কাটিয়ে উঠেছি অনেক আগেই। আমার আত্ববিশ্বাস এবং সামথিং এলস যেটা আমাকে আলাদা করেই তুলে। তাই এমন প্রশংসা নুতন নয়।

একজনকে অনুরোধ করি আমাদের দুই একটা ছবি উঠিয়ে দিতে। লবির দুই একটা সুন্দর কর্নারে দাঁড়িয়ে বসে বেশ কয়েকটা ছবি উঠিয়ে নেই। মম তাঁর সাথে থাকা আই প্যাডে নেয় ছবি।

একটু ইমোশনাল লাগে। দেখা হবেনা আর ভাবতেই পারছিনা হঠাৎ কেন যেন। শুধুই মনে হচ্ছে আমার আরো কিছু জানার ছিল, বলারও।

মম বলে, সামিরা তোমার বাই এনি চান্স যদি অস্ট্রেলিয়া ট্যুর হয় আমার এখানে মোস্ট ওয়েলকাম, এসো। আমি যে শহরে থাকি একটা নদী আছে ওখানে, ‘ইয়ারা’ তোমাকে নিয়ে তার পাশে বসে না বলা গল্পগুলো করা যাবে…

এবার আমার চোখ সত্যিই ভিজে উঠে। আমাকে একটা টাইট হাগ দিয়ে মম পা বাড়াতে নেয়। কেন যেন মনে হলো, তিনিও ভেজা চোখ লুকাচ্ছেন…
এবার আমি মরিয়া হয়ে বলি, মম আপনি কি আমাকে ফেসবুকে এড করবেন? না হলে আপনাকে হারিয়ে ফেলবো তো। অবশ্য আগামী বছর দুই পর এই দিল্লিতে এসে আপনাকে আবার খুঁজবো, বেঁচে থাকলে, ঠিক এই সময়েই। আমার মনে হচ্ছে আপনি এখানে ফিরে ফিরে আসবেনই…
মম, ছলছল চোখে তাকিয়ে বলে ‘’ভালো থেকো তুমি সামিরা’’ দেখা আমাদের হতেও পারে, নাও হতে পারে, ভালো থেকো। যদিও দেখ এই পাঁচদিনে তোমার কোন গল্পই শোনা হলোনা শুধু ‘রেইনের’ কথা ছাড়া।
থাক মম, আমার গল্প বলা যাবে ‘ইয়ারা নদীর’’ ধারে বসে কোন একদিন, সে আশা বেঁচে থাক, ‘ভালো থেকো তুমিও’’!

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments