মাতাল শিশু(২২তম পর্ব)/ ধারাবাহিক উপন্যাস -মোয়াজ্জেম আজিম

  •  
  •  
  •  
  •  
মোয়াজ্জেম আজিম

২২তম পর্ব:
হঠাৎ করে আমার এই অসুস্থতা মাকে খুব ভয় পাইয়ে দিয়েছে। আমি নিজেও খুব আতঙ্কিত। এখন মাথায় খালি ঘুরপাক খায় একটা কথা, সত্যিই কী আমি মরে যাবো? মরে গেলে কি খুব একা হয়ে যাবো? মা কি যাবে আমার সাথে? মৃতের সাথে নাকি কারো যাওয়ার নিয়ম নাই। এমন নিয়ম কেন করছে মানুষ? মানুষ মরে গেলে কি ওর ভয়ডর থাকে না? মুন্নি কি মরে গিয়ে একা হয়ে গেছে? মুন্নির সাথে কি আমার দেখা হবে? মৃতদের দেশের নাম কী? ঠিকানা পাবো কেমনে? মাকে জিজ্ঞেস করবো ঠিকানা যোগাড় করার কথা? মা কি ভাববে যে আমি মুন্নিকে খুঁজতে যাচ্ছি? না, আমিতো মরতে চাই না। মরলে খুব একা হয়ে যাবো। মাকে সাথে নিয়ে মরতে পারলে আমার কোনো অসুবিধা নাই, কিন্তু একা একা মরতে খুব ভয় লাগবে। খুব কষ্টের হবে বলে মনে হয়। তারপর মরার পরই বা একা একা থাকবো কেমনে? খাব কী? মদ কি পাওয়া যায় মৃতদের দেশে। কারো কাছে তো শুনিনি। টিভিও কোনদিন এই সম্পর্কে কিছু বলেনি, বললে নিশ্চয় মনে থাকতো। আমি যখন মৃতদের দেশ নিয়ে গভীর চিন্তায় মগ্ন তখন কোন ফাঁকে যে মা এসে আমার কাছে বসে টেরই পাইনি। মার দিকে চোখ পড়তেই বুকের ভীতর একটা বরফের ছুরি ঢুকে যায়। মাকে দেখেই বলে ফেলি, মা কী হয়েছে? মার মুখ শুকিয়ে কাঠ। মনে হচ্ছে কোন কাঠের মানুষ আমার সামনে বসে আছে। মা বলে, বাবু, তুমি কিছু খাবে এখন? কিছু একটা খাও, খেয়ে টিভি দেখো। মার মুখ থেকে কিভাবে কথা বের হচ্ছে আমি বুঝতেছি না।
গত রাতে খবিশ আসছিল। মাকে অনেক কথা বলে গেছে। মাকে আবারো খবিশের ব্যাপারে বেশ আগ্রহী মনে হচ্ছে। খবিশ চলে যাওয়ার সময় বলে গেছে যে আবার আসবে। যাচ্ছে ঢাকা ক্লাবে, মদের দাওয়াত আছে। বাসাবো থানার ওসি নাকি ওর পেয়ারের দোস্ত এখন। খুব খাতির, সে-ই ড্রিংসের দাওয়াত দিছে। তাই যেতে হচ্ছে, তবে বেশী দেরী করবে না, আবার আসবে। আরো বলেছিল, লোকটার অনেক উপকার করার চেষ্টা আমি করছি। কিন্তু শকুনের দেশে তুমি চাইলেই তো আর কারো উপকার করতে পারবে না। দেশে তো আর শকুন একটা না, হাজারে হাজার! আমার পত্রিকা ‘সুবেসাদেক’ এই খবর প্রকাশ না করলেও ‘দৈনিক ইহকাল’ ঠিকই সব গোপন তথ্য ফাঁস করে দিয়েছে। শালা বুঝলাম না, থানার চিঠির কপি পাইলো কই। ওসি নিজে তো আমারে দোষে। কয়, আপনিই দিছেন, আপনি আমার কাছ থেকেও টাকা খায়ছেন, দৈনিক ইহকালের কাছেও বিক্রি করছেন। আমি তারে কেমনে বোঝায় যে আমি এই কাজ করি নাই! আমি লোক খারাপ, কিন্তু এত খারাপ এখনও হইতে পারি নাই। কিন্তু আমার নিজেরও প্রশ্ন, শালা চিঠির কপি পাইলো কই? আমি নিজে আবারো ডোম ঘরের কেরানী রফিকের কাছে গেছিলাম। শালারে একমুঠে দশ হাজার টাকা দিয়া কোরআন শরীফ হাতে দিয়ে জিগাইলাম, ও কোনো ফটোকপি রাখছিল কি না। ও তো কিড়াকসম কাইট্টা কান্নাকাটি কইরা শেষ। ওর কথা শুনে মনে হলো, শালা মিছা কয় নাই, কিন্তু কপি পাইলো কই? ওসি সাবরে কইলাম, দেহেন আপনার কলিগরাই প্যাঁচ করছে কিনা। তয় উনি বলে, হইতে যে পারে না তা আমি বলবো না। কিন্তু কেন যেন মনে হয় আপনিই করছেন কাজটা। কয় আর হাসে। উনার সাথে এখন আমার বন্ধুর মতো সম্পর্ক। কী করি কও তো?
মা কয়, দেইখো আবার, বন্ধুর ভাব নিয়া বিপদে না ফালায়! পুলিশের কিন্তু জন্মের ঠিক নাই! দোস্ত কইয়া ডাইকা নিয়া মাথায় গুলি কইরা বলবে ক্রসফায়ার। যা-ই হোক, সাবধানে থাইকো। আর তোমার এই বস্তা নাও না কেন। আমার ভয় লাগে।
-না, বিষয়টা আমারেও খুব ভাবনার মধ্যে ফেলছে। অরিজিনাল কপি আমি আর ওসি দুজন একসাথে বইসা পুড়াইলাম। আমি জানি আমার আল্লা জানে, আমি কাউরে কপি দেয় নাই। ওসির এখন একটাই কথা আপনারে আমি আট লাখ টাকা দিলাম। আপনি আমার জন্যে কী করলেন? শেষমেশ উনার জন্যে বসেরে ধইরা একটা রিপোর্ট করায়ে দিলাম। উনি প্রকাশিত খবরের প্রতিবাদ কইরা ঘোষণা করছে যদি কেউ অরিজিনাল কপি দেখাইতে পারে তো তারে দশ লাখ টাকা পুরষ্কার দেয়া হবে। এইডা নিয়া লাগছে আর এক ফেকরা। মান্দিরপুত ‘ইহকালের’ সম্পাদক ফলোআপ রিপোর্টে প্রশ্ন তুলছে, ১৬,৬০০ টাকার বেতন-স্কেলে একজন ওসি দশ লাখ টাকা কোথায় পায়? আরে বাবা, এই সব ফালতু কথা কওনের সময় আছে? কে না জানে বাংলাদেশের একজন ওসির পক্ষে দশ লাখ না, দশ কোটি টাকা দেওনের ক্ষমতা আছে! উনি তো পুরাটা বলে নাই। এই সব শুয়োরদের কেমনে বুঝাইবা যে দশ লাখ টাকা এখন বাংলাদেশে ফকিন্নির ঘরেও থাকে! যাই হোক রে ভাই, বড় যন্ত্রণার মধ্যে আছি। ভাল থাকো, দেখা হবে।
মা বলে, সাবধানে থাইকো।
-যদি পারি রাতে আসবো। আর যদি না আসি তো চিন্তা কইরো না। কাল ফোন দেবো।
খবিশ আর রাতে আসে নাই । মার কী এই জন্যে মন খারাপ? মার চোখের নীচে কালি একদম বসে গেছে। চেহারায় একটা পাগল পাগল ভাব চলে আসতেছে। মা কি আমার আগে মরে যাবে? হায় হায়, মা মরে গেলে আমার কী হবে? মৃতের দুনিয়া থেকে জীবিতের দুনিয়ায় একা থাকা মনে হয় আরো কঠিন হবে। আরো বেশী ভয়ঙ্কর!
মাকে অনেক কথা জিজ্ঞেস করবো বলে ঠিক করে রেখেছিলাম। এখন মার মুখ দেখে আর কিছু মাথায় আসছে না। মাথার মধ্যে প্রশ্নের বদলে আসছে ভয়। ভয়ে মাথায় আর বুকে কেমন যেন শীতশীত লাগছে। হঠাৎ করে বলতে না চাইলেও মুখ ফসকে মাকে বলে ফেলি, মা, আমার শীত লাগছে।
মা লাফিয়ে উঠে এসে আমার মাথায় হাত রাখে। না, গা তো গরম মনে হচ্ছে না। বাবা, তোমাকে কি একটা শুয়েটার পরিয়ে দেবো? না হয় একটা চাদর দেই?
আমি কিছু বলি না, চুপ করে থাকি। মা একটা চাদর নিয়ে আসে। আমার মনে হয়, যাক বাবা, ভাল হলো, আপাতত চাদরের মধ্যে লুকিয়ে হলেও আতঙ্কের হাত থেকে বাঁচতে চাই। মা, আমার ভয় লাগে।

মা আবারো এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে মাথায় চুমু খেয়ে বলে, কিসের ভয়, বাবা? আমি আছি না? এই যে আমি তোমার সাথে। আমি থাকতে তোমাকে কেউ কিছু করতে পারবে না। এই যে মা তোমার সাথে বসে আছে। কোনো ভয় নাই বাবা। তুমি ভাল হয়ে যাবে। বাবা বলেছে না, তোমার নানাভাই বলেছে তোমার লক্ষণ ভাল। আরো দ্রæত ভাল হওয়ার জন্যে প্রয়োজনে আমরা গ্রামে চলে যাব। জান, গ্রাম কত সুন্দর! চারদিকে শুধু সবুজ আর সবুজ! গাছপালা, লতাপাতা আর সবুজ ঘাস দেখলে সবার প্রাণ জুড়িয়ে যায়। দেখবে কত সুন্দর একটা গ্রামে চলে যাবে। তোমার নানাভাইদের গ্রাম। কী সুন্দর নাম, শুভপুর। ঐ গ্রামের সব কিছুই শুভ। লোকজন ভাল, পাখপাখালী ভাল, গরুছাগলগুলোও খুবই ভাল। সেই গ্রামের বিড়াল-কুকুররা পর্যন্ত কথা শোনে। তুমি যা বলবে তাই শুনবে। একদম বেয়াদবি করবে না। তুমি যদি গ্রাম থেকে বাইর হয়ে পূর্ব দিকে যাও দেখবে নীল জলে টইটুম্বর এক নদী। সেই নদীর নাম ঘোড়াউত্রা। সুন্দর না নামটা? তোমার নানাভাই বলেছে, তোমাকে এই নদী দেখাতে নিয়ে যাবে। সারা গ্রামে খালি ফলফলাদির গাছ। ফুলের গাছ, পাখির বাসা। জানো, তোমার নানা ভায়ের ঘরের পেছনেই টুনটুনি বাসা বেঁধেছে, ছানাও দিয়েছে দুইটা! আমরা গেলে দেখতে পারবো। গ্রাম কত সুন্দর! তোমার নানাভাইয়ের বাড়ির পাশে পুকুর আছে, সেই পুকুরের পাড়ে পাড়ে আছে মাছরাঙ্গার বাসা। মাটি খুঁড়ে খুঁড়ে ওরা বাসা বানায়। বাসা থেকে বাইর হয়ে ফুরুৎ করে পানিতে ডুব দিয়ে একটা মাছ ধরে আবার বাসায় গিয়ে বসে থাকে। কিছুক্ষণ পর আবার ফুরুৎ করে বাইর হয় আবার একটা মাছ ধরে বাসায় গিয়ে বসে বসে খায়, ছানাদের খাওয়ায়। কী মজা তাই না? গ্রামের বাতাসও খুব সুন্দর। এই ঢাকা শহরের মতো দুর্গন্ধযুক্ত না। সেই পুকুরের পাড়ে আছে একটা বিশাল বকুল ফুলের গাছ। তুমি গিয়ে সেখানে বসে থাকবে। বকুল ফুলের গাছের ছায়ায়। ঝিরিঝিরি বাতাসে তোমার গায়ে পড়বে একটা-দুইটা বকুল ফুল, চারদিক ফুলের সৌরভে মৌ মৌ করবে। আর তুমি বসে বসে মাছরাঙ্গার খেলা দেখবে। অনেক মজা হবে তাইনা? আব্বু আমার, তুমি কিচ্ছু চিন্তা কোরো নাা। সব ঠিক হয়ে যাবে।
মার গ্রামের কথা শুনছি আর কেবলি মনে পড়ছে টিভির খবরে দেখা গ্রামের ছবি। প্রত্যেকদিনই তো দেখি। মার গ্রাম দেখিনি। কিন্তু অন্য গ্রাম তো দেখেছি। সব ভুখানাঙ্গা মানুষ। বাচ্চাগুলোর একটার গায়েও কাপড় নাই। ঝড়ে ওদের ঘর উড়িয়ে নিয়ে গেছে। এখন থাকারও যায়গা নাই। ঝড়বৃষ্টির মধ্যে পলিথিন মাথায় দিয়ে মা তার দুইতিনজন বাচ্চা নিয়ে বসে আছে। পাশে একটা গাছের সাথে হেলান দেওয়া টিনের নীচে বসে আছে একটা মুরগী তার ছানাপোনা নিয়ে। মুরগীটাতো তাও টিনের নীচে ঢুকতে পারছে ছোট বলে।
-মা, নানাভাইদের গ্রাম এত সুন্দর তো টিভিতে সারাক্ষণ এত নোংরা আর নেংটা মানুষের গ্রাম দেখায় কেন?
প্রশ্নটা শুনেও মা না শোনার মতো করে বাইরে থাকিয়ে থাকে। মার গ্রাম-বর্ণনার উচ্ছ¡াস এত সহজে মিইয়ে গেল যে আমি আরো আরো প্রশ্ন করার ইচ্ছাকে ধরে রাখতে পারলাম না।

চলবে।

অলংকরণ: আসমা সুলতানা মিতা 

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments