মাতাল শিশু(২৩ ও ২৪ পর্ব)/ ধারাবাহিক উপন্যাস- মোয়াজ্জেম আজিম

  •  
  •  
  •  
  •  
মোয়াজ্জেম আজিম

২৩তম পর্ব:
ক’দিন থেকে খবিশকে নিয়ে মা আবার খুব চিন্তিত। ওর কোনো পাত্তা নাই। সাদিয়া আন্টির সাথে ফিসফিস করে কথা বলে, নানারকম পরামর্শ করে। আমাকে শুনতে দেয় না। কিন্তু মা যতই লুকাতে চাক আমি ঠিকই সব শুনে ফেলি। যে কোনো রুমে বসে যত আস্তেই কথা বলুক না কেন আমার বাদুড়ের কান ঠিকই শুনতে পায়। প্রথম দিকে তো মা বুঝতেই পারতো না যে আমি সবই বুঝি। তাই সব কথা আমার সামনেই বলতো, সব কাজ আমার সামনেই করতো। তারপর যখন বুঝলো তখন থেকে আমার আড়ালে কথা বলা শুরু করলো। কিন্তু হলে কী হবে আমি তো ঠিকই শুনি। কয়েকদিন যাবৎ মার এই বিমর্ষ ও হতাশ ভাব দেখে মনে করেছিলাম আমার অসুখটা বাড়াতে মা এতটা ভেঙ্গে পড়েছে। এখন দেখছি শুধু আমি না, কারণ আরো আছে। মুন্নির হারিয়ে যাওয়া, খবিশের লাপাত্তা যোগ হয়েছে আমার অসুখের সাথে। সব মিলিয়ে মার অবস্থা এতটাই কাহিল যে আমার ভয় হচ্ছে, মরে না যায়। এখন আমি টিভি দেখছি কিন্তু আমার কান সজাগ মা আর সাদিয়া আন্টির আলাপে। সাদিয়া আন্টি যতই বোঝাচ্ছে ভয় পাওয়ার কিছু নাই মা যেন ততই বেশী করে ভয় পাচ্ছে।
Ñ সাগর ফোন ধরছে না আজ দুইদিন। প্রথম দিন বিকাল পর্যন্ত রিং হলো। তারপর থেকে আর রিংও হচ্ছে না। সরাসরি মেসেজে চলে যায়। আর সাগর যেহেতু এই বাসায় আসা-যাওয়া করতো পুলিশ নিশ্চয় এই বাসায় হামলা করবে।
-কেন পুলিশ কেন হামলা করবে?
-সাগর যেই রাতে গেল সেই রাতে তো ওসির সাথেই দেখা করতে গেল। তারপর আর খবর নাই। আমার ধারণা ওসি ওকে মেরে ফেলেছে। তুই তো জানিসই, ও ওসির  বিরুদ্ধে রিপোর্ট করতে চাইছিল। কিন্তু পরে কী একটা আপোস-রফার কারণে ও আর রিপোর্ট করে নাই। কিন্তু দৈনিক ইহকাল পত্রিকা ঐ একই রিপোর্ট করে। তাতে ওসি সন্দেহ করে সাগরই ওদের কাছে ইনফরমেশন ফাঁস করেছে টাকার বিনিময়ে, আবার ওসির কাছ থেকেও টাকা নিয়েছে। বিশ্বাস কর, সাগর আমায় বলেছে ও কোনো বেঈমানী করে নাই ওসির সাথে। কিন্তু দৈনিক ইহকাল কোথায় ইনফরমেশন পেলো তা এক বিরাট রহস্য। সাগর বলে, থানা থেকেই নাকি কেউ ইনফরমেশন ফাঁস করেছে। কিন্তু ওসি সেটা বিশ্বাস করে কি করে নাই তা তো বলে নাই। এখন আমার মনে হয় এই ঘটনার জের ধরেই ওসি সাগরকে মেরে ফেলেছে।
-তাহলে তুই ঠিকই বলেছিস। তুইও এখন রিস্কে।
-আমি এখন কী করবো, সাদিয়া, তুই বল?
মার এই কথা হাহাকারের মতো শোনায়।
-আমার এই বাসায় আর এক মুহূর্তও থাকতে মন সায় দিচ্ছে না। এই বাসায় আর দুইদিন থাকলে আমাকে আর মারা লাগবে না। আমি ভয়েই মরে যাবো।
-তাহলে কী করবি? আমার বাসায় তো সিঙ্গেল খাট। আবার রুমমেটও আছে। না হয় আরো আগেই বলতাম আমার বাসায় চল। তারপরও যদি মা-ছেলে সিঙ্গেল বেডে থাকতে পারিস তো চল। আমার কোনো অসুবিধা নাই। রুমমেটকে ম্যানেজ দেওয়ার দায়িত্ব আমার। আমি তোদের মা-ছেলের কথা চিন্তা করেই অফার করার সাহস পাচ্ছিলাম না।
-নাকি বাবার বাসায় চলে যাব?
-দেখ, যদি ভাল মনে করিস তো চিন্তা কর।
-কিন্তু বাবার বাসায়ও কি শান্তি আছে, ক? লোকটা তো একটা আজাবের মধ্যে আছে। তার মধ্যে আমরা গিয়ে উনারে আরো দোজখের আগুনে কুড়া ছিটানোর ব্যবস্থা কররো? কেমনে করি, ক?
-আচ্ছা, তুই সবকিছুতেই যদি এত চিন্তা করছ তাইলে এই ঢাকা শহরে কিছু করার কোনো জো আছে নাকি!
-ঠিকই কইছিস। লজ্জা নিয়ে বসে থাকলেতো মরণ ছাড়া গতি নাই। উনার বউতো উনাকে খুব জ্বালাতনের মধ্যে রাখছে। ছেলেমেয়ে ছেড়ে গেছে এখন শুনছি উনিও চলে যাবে ছেলেমেয়ের কাছে। উনার সবাই দুনিয়াতে থেকেও নাই। অথচ ফেরেশতার মতো মানুষ।
কথা শেষ না করেই মা নানাজানকে ফোন করে। ডাক্তার সাহেব এখন আমার সত্যিকারের নানা হয়ে গেছে। মা ফোন করে বলে আমাদের এসে নিয়ে যেতে। উনার তো গাড়ি আছে। ঢাকা শহরের ট্যাক্সির উপর তো আর ভরসা করা যায় না। মা ফোন রেখেই তাড়াহুড়া করে সবকিছু গোছাতে থাকে। বেশ কয়েকটা ব্যাগ আগে থেকেই গোছানো। তার মানে কি মা আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছে কোথাও চলে যাওয়ার?
খুব বেশী সময় লাগেনি নানাজানের আসতে। আমার টিভি দেখতে দেখতে আর সাদিয়া আন্টির সাথে মা গল্প করতে থাকা অবস্থায় নানাজান এসে হাজির। আজ মনে হয় রাস্তাঘাট ফাঁকা। ও আজ তো শুক্রবার। তাই ট্রাফিকজ্যাম কম। নানাজান এসে যতারীতি আমাকে একটু টিপেটেপে দেখে। বলে, দেখি জিহ্বা দেখি। আমি দেখাই। গুড, ঘুম হচ্ছে ভাল? আমি কিছু বলি না, চুপ করে থাকি। এই পরীক্ষা-নিরীক্ষার সময়ের মধ্যেই মা আর সাদিয়া আন্টি গোছানো ব্যাগগুলোকে রান্নাঘরের সামনে এনে রাখছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা নানাভায়ের গাড়িতে করে উনার বাসার উদ্দেশে রওয়ানা করি।

২৪তম পর্ব:
মিথিলা খুব সুন্দর একটা মেয়ে। খুব সুন্দর করে হাসে, কথা কয়। মা নানার সাথে গল্প করতে গিয়ে জানলো, মিথিলার বাবাকে মেরে ফেলেছে ওর চাচারা। মা হারিয়ে গেছে। ধারণা করা হয় গুম করে ফেলা হয়েছে। চাচারা তারপর রটিয়ে দিয়েছে হারিয়ে গেছে। মিথিলার বাবা মারা যাওয়ার পর তার একটু মেন্টাল সমস্যা দেখা দিয়েছিল। তাই রটনাটা প্রচার করতেও ওদের বেশ সুবিধা হয় যে পাগল হয়ে কোথায় যেন চলে গেছে।
-কী করবো বলো? মিথিলার নানা আমার বন্ধু। এখন ওরা, মানে বুড়াবুড়ি গাজিপুর একটা ওল্ডহোমে থাকে। দুই মেয়ে এক ছেলে। বড় মেয়ের মেয়ে এই মিথিলা। ছোট ছেলে ও মেয়ে দুজনই  প্রবাসী। ছেলেটা আমেরিকায় গেছিল পড়াশোনা করতে। তারপর তো আর আসে নাই। পড়াশোনাও নাকি আসলে করে নাই। এখন হিপ্পি সেজে ঘুরে বেড়ায় নানা স্টেটে। মেয়ে থাকে নিউজিল্যান্ড, স্বামীর সাথেই গেছিল, কিন্তু পরবর্তীতে সেপারেটেড হয়ে যায়। এখন সিঙ্গেল মাম হিসাবে আছে এক বাচ্চা নিয়ে। দেশে এসে কী করবে বলো! আমার এই বন্ধুও ডাক্তার ছিল। বিসিএস দিয়ে সরকারী চাকরীতে ঢোকে, টাকাপয়সা খুব বেশী তো ছিল না, যা ছিল সবই ছেলেকে পাঠানোর জন্যে খরচ করে। আর ছেলেও ইন্টারমিডিয়েট পাস করার পর গো ধরলো, দেশে কোনো ইউনিভার্সিটিতে সে পড়বে না, তাকে আমেরিকায় পাঠাতে হবে। ছেলেটা ছাত্র ভালই ছিল, এখানে বুয়েটে বা মেডিকেলে সহজেই চান্স পেতো। কিন্তু এই যে উচ্চাশা, তার তো কোনো লাগাম নাই! এখন তো আমও নাই, ছালাও নাই। মিথিলার নানার নাম কবির। ও-ই আমাকে ফোন করে। গেলাম গাজীপুর ওদের ওল্ডহোমে, গিয়ে দেখি এই অবস্থা। মিথিলাকে লালনপালন করার কোনো ক্ষমতাই এখন আর কবিরের নেই। যতটুকু জানতাম মিথিলার বাপ-চাচা ভাল মানুষ ছিল না। পড়াশোনা কী করছে তাও জানি না। প্রথমে আস্তানী-মাস্তানী করলেও পরে মিথিলার বাপ গার্মেন্টের ব্যবসা করে প্রচুর টাকাপয়সার মালিক হয়। ওর দুই ভাইও যোগ দেয় ওর বিজনেসে। খুব সুন্দর সম্পর্ক তিন ভাইয়ের। সবারই সুন্দর সংসার। ছেলেমেয়ে-বউ-ব্যবসাসহ সুখের সাগর! কিন্তু কী তে কী হইল! ছোট দুই ভাই নাকি ব্যবসা থেকে টাকা সরানো শুরু করলো। মিথিলার বাবা টের পেয়ে ওদের বাইর করে দিতে চাইলো। এই তো শুরু ঝামেলার। এর জের ধরেই খুন হয় মিথিলার বাপ, গুম হয় মিথিলার মা। দুই ভাইও এখন জেলে খুন আর গুমের মামলায়। গত বিশ বছর ধরে যে ব্যবসা তিন ভাই গড়ে তুলেছিল তা মাত্র বছর দুয়েকের মধ্যে বন্ধ হয়ে গেল। কবির বললো, গার্মেন্ট ফ্যাক্টরীর লাইটগুলো পর্যন্ত খুলে নিয়ে গেছে কর্মচারীরা। মিথিলার বাবা খুন হওয়ার পর দুই ভাই খুব চেষ্টা করেছিল খুন মিথিলার মার উপর চাপাতে। অপবাদ হিসাবে এক প্রেমিকও ওরা তৈরী করেছিল পয়সার বিনিময়ে। কবির তখন মেয়েকে রক্ষা করার জন্যে সাধ্যমত সবই করেছে। কিন্তু সাধারণ মানুষের করারই-বা কী থাকে বলো! আমি তখন সদ্য দেশে ফিরেছি। ছেলেমেয়ে নিয়ে আমিও মহা ঝামেলায়। ছেলেমেয়ে এদেশে থাকবে না। তোমার চাচীও নাখোশ। তাই ইচ্ছা থাকা সত্তে¡ও খুব বেশী কিছু করতে পারিনি। কী বলবে এই দেশ, এই সমাজের কথা! নিজের রক্ত যদি এতটা নিষ্ঠুর হতে পারে, তাহলে আর তুমি কোথায় যাবে? কার কাছে চাইবে আশ্রয়? এখনতো সবারই ছেলে-মেয়ে না খেয়ে মরার দশা! কী দুর্ভাগ্য বলো! এইসব শুনে কবিরকে বললাম দে, মিথিলাকে আমার কাছেই দে। যতদিন বাঁচি লালনপালন করবো। তারপর কী হয় জানি না।

ডাক্তার সাহেব এখন আমার সত্যিকারের নানা। আর উনার স্ত্রী মিথ্যাকারের নানী। উনি তো কারো সাথে কথা বলে না। সারাদিন শুধু বসে বসে টিভি দেখে। আর কিছুক্ষণ পরপর কাজের মেয়ে জরিনাকে অর্ডার দেয়, জরিনা পানি গরম দে। একটু পর বলে, জরিনা তেল গরম দে। আর একটু পর বলে, জরিনা টাওয়েল গরম দে। তারপর বলে, ভাত গরম দে। তারপর বলে, তরকারী গরম দে। এই রকম একটার পর একটা বলতেই থাকে। কিন্তু কোনোকিছু একসাথে বলতে পারে না। জরিনা উনাকে একটুও ভয় পায় না। ইচ্ছা হয় তো দেয়, না হয় তো দেয় না। উনিও কিছু বলে না। যা দেয় তা খায়, যা দেয় তা-ই নেয়। কিন্তু এক ফরমাইশ দুই বার দেয় না। এটা উনার একটা মহাগুণ বলে মনে হয়েছে আমার।
নানাজান উনারে খুব আদর যত্ন করেন। জরিনা উনার কথা না শুনলেও নানাজান উনার কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করে। আমার অবশ্য রাগ হয়। উনি তো সুস্থ স্বাভাবিক একজন মানুষ! তো উনি এমন পীর-আওলিয়ার ভাব নেয় কেন আল্লামালুম! দুইদিন হয়ে গেল আমরা উনার বাসায় এসেছি। একবারও জিগাইল না, বাবু তোমার নাম কী? টিভির ভিতর কী মজা পায়ছে আল্লা জানে! মা অবশ্য এই দুই দিনে উনার রুম থেকে খুব একটা বাইর হয় নাই। মা মনেহয় খুব অস্বস্তিতে আছে। আজব দুনিয়া! একটা মাত্র ঘর, দুই জন মানুষ; একজন ফেরেস্তা তো আর-একজন ধুন্ধা-শয়তান! না, উনি তো কোন শয়তানী করেন নাই। করেন নাই বলি কেন? একজন মানুষ যদি বিপদে পড়ে বা কোনো কারণে উনার বাসায় আসে তো উনার উচিত আদর-আপ্যায়ন করা, নাকি? কোনো কথাই বলবে না, মুখ টিভির দিকে আটা দিয়ে লাগিয়ে বসে থাকবে! এটা তো শয়তানীরই লক্ষণ, নাকি? নানাজান একাই সবকিছু সামলায়, সবার দিকে উনার নজর। তাও উনাকে উনার বউ আর ছেলেমেয়ে ভালবাসে না। উনার বউও ডাক্তার ছিল। যৌবনে নাকি উনাদের চেনাপরিচয়ও ছিল। তারপর পরিবারের সম্মতিক্রমে বিয়ে। সংসার করলো আরো ৩৫ বৎসর। ছেলেমেয়ে হইলো তিনখান। নানাজান এই জুলমত নিয়া কেমনে কী করছে কে জানে! অবশ্য উনি তো আর মাটির মানুষ ন!। উনি হইল আগুনের তৈরী ফেরেস্তা! তাই উনার শরীরে কোনো আগুনের তাপ লাগে না। কিন্তু আমার তো লাগে। আমিও তো টিভির পোকা। এখন অবশ্য মিথিলাকে পেয়ে আমার আর টিভির দিকে নজর নাই। মিথিলাকে নিয়ে আমি সারাদিন বাড়ির বাইরে পড়ে থাকি। মোরগমুরগী আর খরগোসের বাচ্চাগুলো এই ধুন্ধা-শয়তান আর শয়তানের বাক্সের চাইতে হাজার গুণ ভাল। নানাজানও আমাদের সাথে সারাক্ষণ বাগানেই থাকে। মা মাঝে-মধ্যে আসে আমাদেরকে এটা-সেটা দিতে। তখন কিছুক্ষণ নানাজানের সাথে কথাও বলে। নানাজান উনার যৌবনের কত কথা যে কয়! তবে তার চেয়ে দেখি মার কথা বলতেই বেশী ভাল লাগে। যদিও মার কথা বলতে গেলে এখন কষ্ট হয়। আগে হইত না, এখন হয়। বড় হয়ে গেছি বলে হয়তো-বা কষ্ট কারে কয় তাও মনেহয় বোঝা শুরু করছি।
এর মধ্যে খবিশের আর খবর নাই। আজকাল অবশ্য লোকটাকে খবিশ বলতে আর ভাল লাগে না। আবার আঙ্কেল কইতেও লজ্জা পাই। মার মুখে এখন সারাক্ষণই খবিশের প্রশংসা। মা তো এখন আর কারো সাথে কথা বলে না। বলে খালি সাদিয়া অন্টির সাথে। উনারে যে কতরকম গল্প শোনায় খবিশের। শানে নজুল বলি। মা খবিশকে এত ভালবাসতো না কখনই। এই প্রথম মার খবিশের জন্যে কষ্ট হচ্ছে। আসলে খবিশের সাথে মার দেখা কমলাপুর স্টেশনে। মা গেছিল টিকিট কাটতে। খবিশ তখন নাকি লাইনে দাঁড়ায়ে মানুষরে টিকিট কাইটা দেয়। বিনিময়ে সে দশ টাকা দাবী করে, কেউ যদি বেশী দিতে চায় তো খুশি হয়ে নেয়। যদি না দিতে চায় তো কোনো দাবী নাই। যা-ই হোক, মার টিকিট কাইটা দিলো সে। বিনিময়ে মা খবিশরে বিশ টাকা দিলো। খবিশ নাকি কয়, না আপা আপনার কাছ থেকে বেশী নিতে লজ্জা লাগতাছে। আপনি দশ টাকাই দেন। মা একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করছিল, কেন, আপনি লজ্জা পাচ্ছেন কেন? খবিশ উত্তরে বলছিল, আপনারে দেইখা আমার কেমন জানি কষ্ট লাগতাছে। বইনের সাথে বহুদিন পর দেখা হইলে যেমন লাগে সেইরকম। কিন্তু আসলে আমার কোনো বইন নাই। আমি মন থেকে বানাইয়া কথাটা কইলাম। মারও নাকি শুনে খুব কষ্ট লাগছিল। তারপর মা উনাকে ফোন নাম্বার দেয়, বলে যে যোগাযোগ কইরেন। দেখি আপনার জন্যে একটা চাকরীর ব্যবস্থা করতে পারি কিনা। মা নাকি চেষ্টা করছিল উনার গার্মেন্টে। বসও বলছিল ব্যবস্থা করবে, অপেক্ষা করতে। মাকে সে ফোনের দোকান থেকে ফোন করতো মাঝে-মধ্যে। তারপর কয়েকদিন পরপর কথা বলার পর মার মনে হইছিল যে ছেলেটা গ্রামের আলাভোলা ছেলে। কিন্তু দেখতে-শুনতে স্মার্ট। পড়ালেখা খুব একটা জানে না। কিন্তু ভাব দেখায় বিএ ফেল ছাত্রের মতো। মা একদিন ওরে বাসায় দাওয়াত করলো দুপুরে খাওয়ার জন্যে। সেইদিন খাইতে আসলে মা জানতে পারে সে কমলাপুর স্টেশনেই থাকে। ঢাকায় কেউ নাই। দেশেও কেউ নাই। বাপ নামক এক বস্তু আছে কিন্তু কোথায় থাকে, কী করে কিছ্ইু জানে না। বড় হয়ছে পালক-বাপের বাড়িতে। এখন ঢাকায় আইছে একটা কিছু করা যায় কিনা তা দেখতে। কিন্তু কেউ কোনো কাজ ওকে দিচ্ছে না। তাই বাধ্য হয়ে স্টেশনে মানুষের টিকিট কাইটা দেয়। তাতে সারদিনে যা পায় খাওয়া চলে। প্রথম প্রথম খবিশ মাকে আপাই বলতো। কিন্তু আমার বাপ যখন মাকে ছাইড়া পালাইল, তখন আমি মার পেটে। মা রাতের বেলায় খুব ভয় পায়। কাকে বলবে সাথে থাকতে, তখন খবিশকে একদিন ফোন করে বলে, রাতে যেন ও আমাদের বাসায় আইসা থাকে। সেই থেকে খবিশের প্রেম শুরু। তারপর মার দুর্বল মুহূর্তে মাকে পটিয়ে খবিশ মার বেডরুমে ঢুকে পড়ে। প্রথম প্রথম খবিশকে যাইতে বলতে পারতো না। কোথায় যাবে? নাই কোনো কাজ, নাই কোনো টাকাপয়সা! একবেলা মা খাইতে না করলো তো উপোস। মার খুব মায়া লাগতো। মুখে কয়েকবার বাইর হয়ে যা কথাটা তৈরী হয়েও শেষ পর্যন্ত বাইর হয় নাই। তারপর যখন ও কিছু রোজগারপাতি শুরু করলো তখন ও নিজেই যাওয়ার পায়তারা শুরু করলো। এবং একদিন সত্যিসত্যিই চলে গেল। মার তখন দুঃখের চাইতে রাগই বেশী হইছিল।
-কিন্তু এখন ওর জন্যে সারাক্ষণ মনটা কেমন যেন হুহু করে। এমন জোয়ান একটা মানুষ একদিনে লাপাত্তা হয়ে গেল! কোথাও যে খোঁজ নেবো সেই সাহসও নাই! এই কথা মনে হলে বুক ভেঙ্গে কান্না আসে। কী করি সাদিয়া?
সাদিয়া আন্টি মাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করে। সাদিয়া আন্টি যতই বলে খবিশ বেঁেচ আছে, কোথাও না কোথাও আছে, মা ততই বলে, না সাদিয়া আমার মন জানে ওরে বাসাবো থানার ওসি ডাইকা নিয়া মাইরা ফালাইছে। সেই রাইতে ওরে আমি যাইতে মানা করার সাহস করি নাই। এখন এই কারণে আমার আফসোসের সীমা নাই। আমার এই পুড়ানী সারাজীবন থাকবো। ওরে তো আমি বলতে পারতাম, সকালে গিয়া দেখা করো ওসির সাথে। ওর দাওয়াত আজ এভয়েড করো, মাঝে-মধ্যে করতে হয়। এখন তো কত কথাই মনে আসে, তখন তো একবারের জন্যেও বললাম না, যাইও না। জানিস সাদিয়া, ও গরীবের পোলা, কিন্তু আত্মাটা খুব বড় ছিল। টাকাপয়সা হাতে পড়লে খরচ করতে হিসাব করতো না। আবার যখন না থাকতো তখন মুখটা চোরের মতো কইরা আশপাশ দিয়া খালি ঘুরঘুর করতো, চাইতো না। হঠাৎ করে বলতো, কয়টা মুদ্রা দাও তো, একটু গুলিস্তান যামু। গুলিস্তান কেন? বলতো একটা ফ্রেন্ডের সাথে দেখা কইরা আসি। বিশটা টাকা বাইর কইরা দিলে, টাকাটার দিকে না তাকায়ে পকেটে ঢুকাইয়া একটা মুচকি হাসি দিয়া বাইর হইয়া যাইতো। ও ভাবছিল ওরে আমি বিয়া করুম। কিন্তু আসলে আমি ওরে বিয়ে করার কথা কখনও সিরিয়াসলি ভাবি নাই। আজকাল মনে হয় ভাবলেই পারতাম। তাইলে ওরে এত রকমের ধান্ধার মধ্যে যাওয়া লাগতো না। আবার ভাবি, ও তো জন্ম ধান্ধাবাজ, ওকে কি আমি ধান্ধা থেকে রক্ষা করতে পারতাম? হয়তো পারতাম, হয়তো পারতাম না। চেষ্টা তো করি নাই। কেমনে বলি যে পারতাম না?
মা খবিশের কথা বলতে বলতে কেঁদে ফেলে। তারপর ফোন রেখেও বেশ কিছুক্ষণ কাঁদে। কখনও কখনও বাথরুমে গিয়ে পানির কল ছেড়ে দিয়ে হাওমাউ করে কাঁদে। আমি সবই শুনি।
সাদিয়া আন্টি খবিশের হাউজমেটের সাথে দেখা করছে, নীলক্ষেত থানায় ডায়রীও করছে। খবিশের হাউজমেট আর সাদিয়া আন্টি গেছিল থানায়। মা বলে, আমি যেতে পারলে ভাল হতো। কিন্তু পরের বাড়িতে বাবুকে একা রেখে কেমনে যায়? আসলে মা ভয় পায়। যাওয়ার ইচ্ছা মার নাই। মা খবিশের ব্যাপারে কোনো পুলিশি কর্মকাণ্ডে জড়াতে চায় না। মা যেন এখন খবিশের সমস্ত কানেকশন থেকে পালিয়ে দূরে যেতে পারলেই বেঁচে যায়। আর তার অংশ হিসাবেই সিদ্ধান্ত হয়েছে আমরা গ্রামের বাড়ি চলে যাব। যদিও গ্রামের বাড়ি গেলে আমার চিকিৎসার কী হবে এটা নিয়ে মার দুশ্চিন্তার শেষ নাই। তাও মনে হয় চলেই যাব। এখানে এই ধুন্ধা-শয়তানের রাজ্যে বসবাস করা যাবে না বেশীদিন, ফেরেস্তার আশীর্বাদ যতই থাকুক। সাদিয়া আন্টি খবিশের পত্রিকা-অফিসেও গেছিল। ওরা নাকি বলেছে, সাগর কক্সবাজার গেছে। কবে আসবে জানে না। তাহলে মা কেন মনে করছে বাসাবো থানার ওসি খবিশকে মেরে ফেলছে। অবশ্য মা-ই মনে হয় একমাত্র লোক যে জানে আসলে খবিশ সেই রাতে কই গেছিল। বাসাবো থানার ওসির সাথে খবিশের কেনই-বা যোগাযোগ Ñ এই কথাও তো মা কাউরে বলতে পারছে না। সাদিয়া আন্টির সাথে সবকথা বললেও এই কথা তো বলে নাই! তাই সাদিয়া আন্টি বা নানাজান কোনভাবেই বুঝতে পারছে না মা কেন খবিশকে নিয়ে চিন্তা করছে। ওরা অবশ্য মনে করছে মা বেশী চিন্তিত মুন্নির পালিয়ে যাওয়া, আমার অসুস্থতার মাত্রা বৃদ্ধি, মার চাকরী করতে না যাইতে পারা ইত্যাকার নানাবিদও সমস্যার ভিতর সবচেয়ে বড় সমস্যা যে খবিশ আর তার গোপন পোটলা তা শুধু আমিই জানি।

চলবে।

অলংকরণ: আসমা সুলতানা মিতা