মাতাল শিশু – মোয়াজ্জেম আজিম (ধারাবাহিক উপন্যাস)

  •  
  •  
  •  
  •  

মাতাল শিশু

মোয়াজ্জেম আজিম

 


আমি এক মাতাল শিশু। গতরাতে ভূমিষ্ঠ হয়েছি মাতাল অবস্থায়। মাতলামীর রেশ এখনও কাটেনি। আমার মা তার প্রসববেদনা লাঘবের আশায় আলমারিতে রাখা স্কচহুইস্কি পুরো বোতল এক নিঃশ্বাসে শেষ করে ফেললে জন্মের আগেই মাতাল হওয়ার এই মোক্ষম সুযোগটি ঘটে। তাতে তার প্রসববেদনা লাঘব হয়, সাথে আমারও কোনো কষ্ট হয়নি দুনিয়াতে প্রবেশে। মানুষ যেখানে মায়ের পেট থেকে বাইর হওয়ার জন্য লড়াই করে করে প্রাণ বিসর্জন পর্যন্ত দেয়, কাটাছেঁড়া ফরসেইফ আরো কত কী, সেখানে আমি কোনোরকম অস্ত্রপচার ব্যতীত বুলেট ট্রেনের গতিতে হাসতে হাসতে দুনিয়াতে প্রবেশ করি। প্রথমে ডাক্তার বুঝতে পারেনি আমি হাসছি। যখন বুঝতে পারে সে এক আজব কাণ্ড। সবাই একসাথে লাফ দিয়ে দেয়ালে পিঠ ঠেকালো আর হাওমাও করে কান্না জুড়ে দিলো। আমি কিছুতেই বুঝতে পারছিলাম না তাদের কান্নার কারণ। আমি যতই হাসি তারা ততই কাঁদে। কী মুসিবত! আমি একটু হাসি থামাই, ওরাও একটু কান্না থামায়। আমি আবার জোরে ফিক করে হেসে উঠি, ওরা হাওমাও করে কেঁদে উঠে। বেশ মজা তো! আমি হাসি ওরা কাঁদে, ওরা কাঁদে আমি হাসি। জন্মের পর এটাই নিয়ম কিনা কে জানে। শুধু কান্না হলে তাও কথা ছিল, বিড়বিড় করে কী যেন বলে। আমার ভাষার সাথে যথেষ্ট মিল মনে হচ্ছে।

হঠাৎ চারদিকে বিকট আওয়াজ শুরু হলো। কেন এত আওয়াজ কিছুই বুঝতে পারছি না। বোঝার চেষ্টা করতে গিয়ে আমার হাসিতে ব্রেক পড়ে। ডাক্তাররাও কান্নায় ব্রেক দিয়ে আমার কাছাকাছি এসে অবাক বিস্ময়ে কী যেন বোঝার চেষ্টা করে। আমি সামান্য একটু ফিক করে দাঁতবিহীন মাঢ়ি বাইর করতেই সবাই এমনভাবে লাফিয়ে উঠলো যে মনে হলো আমি কোনো বোমা ফাটিয়েছি। ততক্ষণে রুমের একটা দরজা খুলে গেল। মনে হলো কিছু কালো কাপড় পরিহিত কালো কালো কুকুর হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে আসছে আমার দিকে। মুখে বাঁশী, হাতে লম্বা নল, নলের গোড়াটা কাঠের মধ্যে লাগানো বলে মনে হচ্ছে। হাতের এই যন্ত্রটা এমনভাবে তাক করলে কী হয় কে জানে। কিন্তু দেখে মনে হচ্ছে ওরা বিষয়টাতে বেশ সিরিয়াস। আমি আপাতত কোনো কথা বলছি না, হাসছিও না। শুধু দেখছি। ওরাও কোনো কথা বলছে না, শুধু হাত-চোখ-মুখ দিয়ে নানারকম ভঙ্গি করছে। তাতে কেউ পেছনে যাচ্ছে, কেউ সামনে আসছে। আমার মাকে একটু আতঙ্কিত মনে হচ্ছে। তাকে অভয় দেয়ার জন্য আমি ওয়া করে উঠতেই দুই-তিনজন ওদের মধ্যে লাফ দিয়ে পেছনে সরে গেল। আর একজন চিৎকার করে উঠলো ‘হল্ট’। আমার মা উঠতে গিয়েও আবার নিজ বিছানায় লম্বা হয়ে শুয়ে পড়লো। ‘হল্ট’ মানে শুয়ে পড়া! আমার শিক্ষার পালা তাহলে শুরু হলো।

এবার সাদা পোশাকে আসে কয়েকজন। ওরা প্রথমেই আমার মার হাত-পা টেপাটেপি শুরু করে। শরীর থেকে রক্ত চুষে নেয় কয়েক রকমের টিউবে। তারপর আমার কাছে আসে। আমি কিছু বলি না। তারা আমারও হাত-পা টিপে দেখে। একটা দর্জাল টাইপের মহিলা তাদের সাথে। পাজি। সে-ই একটু আগে আমার মাকে, আর এখন আমাকে বন্দুকের নলের মতো মোটা একটা সুই দিয়ে রক্ত চুষে নিয়েছিল। সুই আমার হাতে ফোটানোর সাথে সাথে আমি সহ্য করতে না পেরে কেঁদে উঠি। ওমা, ওরা দেখি সবাই হেসে ওঠে! তার মানে শিশুর কান্না তাদের খুবই পছন্দ। হাসিতে মানুষ কাঁদে, আর কাঁদাতে মানুষ হাসে – এ কোন জগতে এসে পড়লাম! আমার তো এখনই মাথা ঘুরছে! কিভাবে ওদের হাত থেকে রেহাই পাবো আল্লা জানে! দশ মাস মায়ের পেটে থেকে যা শুনেছি পরিস্থিতি তো দেখি তার চাইতেও অনেক ভয়ঙ্কর! এই ডাক্তার জাতটা বেশী পাজি। শালারা আমার যখন পাঁচ মাস বয়স তখন আমার মা-বাবাকে বুদ্ধি দিয়েছিল এবোরশন করার। আমার নাকি মাত্রাতিরিক্ত গ্রোথ। ডিজেবল হওয়ার সম্ভাবনা আছে। তো মাত্রাতিরিক্ত গ্রোথ হলে আমি কী করবো, তোরাই তো হাজারো রকমের ভিটামিন-মিনারেলস হাবিজাবি যা পারিস ধরিয়ে দিয়েছিস। আর বলেছিস, খাওয়ার আগে ও পরে যেন শুধু ওষুধ খায়। ‘ইটস ভেরি ইমপোর্টটেন্ট ফর ইউর বেবি’। পেটে থেকেই বুঝতাম তোদের বজ্জাতি মার্কা কথাবার্তা। কিন্তু আজব ব্যাপার আমার মা বুঝতো না। উনি ডাক্তার যা বলতো তাই শুনতো। মানুষ কি বড় হলে বোকা হয়ে যায়? কী জানি বাবা! ভাবগতিক দেখে তো তা-ই মনে হচ্ছে। না হলে ডাক্তারের কথা কিভাবে মানুষ বিশ্বাস করে! আমি দুনিয়াতে আসার আগেই যা বুঝি, উনি দুনিয়াতে কয়েক যুগ পার করেও তা বুঝবে না এটা কী করে হয়! নাকি বড় বড় মানুষগুলো সব বিশাল বিশাল গোলক ধাঁধায় পড়েছে? এই যে নার্সগুলো তো এক-একটা সাক্ষাৎ যমদূত। তাও সবাই হাসি হাসি মুখ করে ওদের আশপাশ দিয়ে ঘুরে বেড়ায়, ললিত কণ্ঠে বলে ‘সিস্টার কেমন আছেন’। কারোর কি জানের মায়া নাই নাকি? সিস্টারকে আশেপাশে ঘুরঘুর করতে দেখেও নাক ডাকিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে কোন সাহসে কে জানে! তাও যদি খালি হাতে ঘুরঘুর করতো তবে না হয় বুঝতাম, ট্রে ভর্তি ছোরা-কাচি-দা-বল্লম! কী নাই তাদের হাতে! মানুষগুলো ওদের সাথে হাসিমুখে ঢুকে যাচ্ছে টর্চার রুমে।

না, দুনিয়ার ভাবগতিক কিছুই বুঝতে পারছি না। যতক্ষণ মাতাল ছিলাম কারণে-অকারণে ফিক করে হেসে উঠতাম ততক্ষণ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ছিল। সবার মাঝে টানটান উত্তেজনা, কাঁদো কাঁদো মুখ, চোখে রাজ্যের ভয় – এই বুঝি সবার প্রাণবায়ু উড়ে গেল আমার হাসির তোড়ে। শুধু মার চোখে কোনো আতঙ্ক ছিল না। আমার হাসি দেখে তিনিও মুচকি মুচকি হাসছিলেন। মোটের উপর ছেলের হাসি তো। এখন আমার কেবলই কান্না পাচ্ছে। কিন্তু আমি একটু কেঁদে উঠলেই আমার মার মুখ কেমন শুকিয়ে যায়। আর জঘন্য এই টর্চার ক্যাম্পের সব দাঁতাল শুয়োরগুলো হেসে ওঠে। তাই আমি কান্না থামিয়ে রাখছি জোর করে। কিন্তু কতক্ষণ পারবো কে জানে। আমার কেবলই কান্না পাচ্ছে। শরীরে কেমন যেন অস্থিরতা অনুভব করছি। খিদা পেয়েছে, না হাগু আসছে Ñ কিছুই বুঝতে পারছি না। নাকি তৃষ্ণা পেয়েছে? গলা-মুখ-বুক সবকিছু কেমন যেন শুকিয়ে যাচ্ছে। অস্থিরতাটা সইতে না পেরে ওঁয়া করে উঠতেই দজ্জাল টাইপের মহিলাটা এগিয়ে আসে গলা টিপে ধরার জন্য। ভয়ে কান্না থামিয়ে দিই। তাতে গলাটেপার হাত থেকে রক্ষা পেলেও চ্যাংদোলার হাত থেকে রেহাই পাই না। আমাকে চার হাত-পা ধরে অনেকটা ছুড়ে মারা হলো মার কোলে। মার কোল বলেই হয়তো বেঁচে গেলাম এবারের মতো। মা-আমার লুফে নিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরলো। আর দজ্জাল চেচিয়ে উঠলো, ‘ওকে বুকের দুধ খাওয়া।’ মা-আমার বুকের দুধ মুখে তুলে দিলে আমি রাজ্যের ক্ষুধা নিয়ে ঝাপিয়ে পড়লাম তার বুকে। কিন্তু কোথায় যেন একটা গড়বড় আছে। মায়ের দুধ তিতা, বিষাক্ত মনে হচ্ছে। একটু মুখে নিলাম বটে কিন্তু গিলতে পারলাম না। আমি বিকট চিৎকারে কাঁপিয়ে তুলি টর্চার ক্যাম্পের সকল ইটসুড়কি।

এবার আর আমার কান্না দেখে কেউ হাসে না। সবাই মুখ গোমড়া করে দেখে আর কী যেন বোঝার চেষ্টা করে। সবাই চিলের চোখ, কুকুরের নাক আর বাদুড়ের কান নিয়ে দণ্ডায়মান। পরীক্ষা-নিরীক্ষা আর পর্যবেক্ষণের সকল স্তর অত্যন্ত সুচারুরূপে পালন করা হচ্ছে। উপস্থিত দণ্ডায়মান সকল বিজ্ঞানী এমন একটা কিছু আমার মাঝ থেকে আবিষ্কার করবে তা দিয়ে যেন দুনিয়াটা সম্ভাব্য সৌর-সাইক্লোনের হাত থেকে রক্ষা পাবে।

কিন্তু না, উনাদের আবিষ্কারের আগেই চলে আসলো আরও একদল বিজ্ঞানী। সাদা অ্যাপ্রোন, চোখে সেফ্টি গ্লাস, মাথায় হেলমেট, হাতে বক্সিংয়ের গ্লাবস, এফবিআই স্টাইলে সদলবলে আমারই দিকে আসছে। আমি জানি একটু ফিক করে হেসে উঠলেই বিজ্ঞানীর দল তুলার মতো উড়ে যাবে। কিন্তু আমি হাসতে পারছি না। আমার কেবলই কান্না পাচ্ছে। আমি চেষ্টা করছি, ওরাও এগিয়ে আসছে। আমি চেষ্টা করছি, এবং না, পারলাম না। আমার হেসে ওঠার আগেই ওরা আমার চার হাত-পা ধরে ফেললো। প্রথমে একটু টেপাটেপি করলো। দু’একটি যন্ত্র দিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করলো। তারপর একটা কাচের জারে আমাকে বন্দী করে ফেললো, অনেকটা দৈত্যকে বোতলে ঢুকিয়ে ফেলার মতো ঘটনা। ভাগ্যিস জারটাতে একটা ফুটা ছিলও, নাহলে তো দম আটকেই মারা যেতাম। আমার মার উপর খুব রাগ হচ্ছে। উনি কিচ্ছু বলছে না। আমাকে জারে বন্দী করে নিয়ে যাচ্ছে। আর উনি ফ্যালফ্যাল করে শুধু তাকিয়ে আছে। তাকে আতঙ্কিত মনে হচ্ছে। মা তুমি ভয় পাচ্ছ কেন? আমি একটু হেসে উঠলেই ওরা তুলার মতো উড়ে যাবে। কিন্তু আমি হাসতে পারছি না। আমার এত হাসির ফোয়ারা হঠাৎ কোথায় উড়ে গেল বুঝতে পারছি না। আমি আবারও চিৎকার দিয়ে কাঁদতে শুরু করলাম। তাতে ওরা কিছুটা ভয় পেল বলে মনে হলো। আমার এখন একটাই কাজ, ওদেরকে ভয় পাইয়ে দেওয়া। ওরা সবাই মিলে তাড়াহুড়া করে নানারকম নল, চিকন-মোটা পাইপ সব আমার হাতেপায়ে লাগাচ্ছে। নানারকম তরল জাতীয় পদার্থ আমার শরীরে পুশ করা হচ্ছে। কিন্তু আমি কান্না কিছুতেই থামাতে পারছি না। ওরাও একটার পর একটা পাইপ লাগাচ্ছে আর খুলছে। তাতে মনে হচ্ছে আমার হাত-পা বলে কিছু থাকবে না, সবই মোরব্বা হয়ে যাবে। এভাবে কতক্ষণ কাটলো কে জানে। আমার মনে হলো যুগ যুগ ধরে আমি বন্দুকের নলের মতো মোটা সুয়ের গুতো আর নানারকম তরল বিষ গ্রহণ করে যাচ্ছি। শেষ নলটি দিয়ে কিছুটা রঙিন পানি আমার মধ্যে পুশ করার সাথে সাথে দুনিয়ার শান্তি যেন আমার মধ্যে ভর করল। মহাশান্তিতে আমি ভেসে উঠলাম। আহা কী সুখ! আমার কান্না হঠাৎ করেই থেমে গেল। মুখে হাসির আভাস। কিন্তু আমি হাসলাম না। আমার হাসিতে ওরা আবার কান্নাকাটি শুরু করতে পারে। একই হাসির আভা আমি বিশিষ্ট বিজ্ঞানীদের মাঝেও দেখতে পেলাম। আমার হাসি দেখে এই প্রথম কাউকে খুশী হতে দেখলাম। কিন্তু কেন খুশী হলো? আমার হাসি দেখে তো সবার ভয় পাওয়ার কথা, কান্নাকাটি করার কথা। অবশ্য আমি হাসিনি। চেহারায় একটু প্রশান্তির ছায়া এই যা। তবে দেখে মনে হচ্ছে এই বিজ্ঞানীমার্কা লোকগুলো একটু বেশী সাহসী। একটু টেস্ট করা যায়, কিন্তু না করাই ভালো। আমি এখন চুপচাপই থাকব। এই বোতল থেকে তো বাইর হতে হবে। আপাতত আমি কোন অঘটন না ঘটুক সেটাই চাই। মনে হচ্ছে বিটকেলে একটা সমাজে ভুল করে চলে এসেছি। চলে অবশ্য ইচ্ছা করে আসিনি। আমার ইচ্ছা-অনিচ্ছার কোনো বিষয় সেখানে ছিলও না। দুনিয়াতে পাঠানোর আগে ঈশ্বরের উচিত মুসাফিরকে জিজ্ঞেস করা যে তার আসার ইচ্ছা আছে কি নাই। আর যদি ব্যাপারটা একান্তই মা-বাবার হাতে হয়, তাতেও উচিত ছিল আমাকে তাদের জিজ্ঞেস করতে পারার মতো ব্যবস্থা রাখা। দুনিয়া সম্পর্কে আমাকে একটা প্রিট্র্যাভল ব্রিফিং-এর ব্যবস্থা রাখা উচিত ছিল। বলা নাই কওয়া নাই, জানা নাই শোনা নাই এমন একটা আজব দুনিয়াতে একজনকে আচম্বিতে পাঠিয়ে দেওয়াটা বা নিয়ে আসাটা অত্যন্ত গর্হিত কাজ বলে মনে হচ্ছে এই আমার ঘণ্টা-পাঁচেকের জীবনে। বেঁচে থাকলে যে আরো কী দেখবো আল্লা মালুম। তবে ওদের যে কের্দানী দেখছি তাতে কারো পক্ষে বেশীদিন এখানে টেকা সম্ভব নয়। বিশেষ করে কারো যদি এই ডাক্তারদের কয়েদখানায় আসার সুযোগ হয় তাহলেই খেল খতম। এই পাজিগুলো না থাকলে মানুষ আরো কিছুদিন সুস্থভাবে বেঁচে থাকতো। মায়ের পেটের ভিতর থেকেই অনেককিছু শুনেছি, বুঝেছি। উনাদের সাথে দেখা হয়েছে তো এমনি একটা লম্বা ফর্দ ধরিয়ে দেবে কী কী সমস্যা আছে এবং আরো কী কী খুঁজে বার করা যায় তার জন্য উনাদের শ্যালকদের ডায়াগোনস্টিক সেন্টারে গিয়ে পরীক্ষা করে আসুন। তারপর সম্পূর্ণ বিছানায় নিজেকে শুইয়ে দিন। আর খাওয়াদাওয়া করা-না-করা দিয়ে কিছু যায় আসে না। তবে ওষুধপত্র খেতে হবে নিয়মিত!

হায় হায়, ওরা কি আমার ভাবনা ধরে ফেললো নাকি? কী ভাবছি বুঝতে পেরেছে মনে হয়। তাইতো সদলবলে এগিয়ে আসছে আমারই দিকে। নির্ঘাৎ মারা পড়বো। একজনের হাতে মৃত্যুর ফরমান, দজ্জাল নার্সের হতে ছোরাচাকুর ট্রে, সাথে ষণ্ডামার্কা কয়েকজন। ওরা এগিয়ে আসছে। তবে এবার আমি রেডি, এমন একটা অট্টহাসি দেবো না, যেন সবগুলো খড়খুটোর মতো উড়ে যায়। ওই যে ওরা আসছে, আমিও রেডি, অলিম্পিক খেলার মতো সম্পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে তৈরী। ওরা এখন আমার বেশ কাছাকাছি, আর কয়েক কদম আগাতেই আমি ফিক করে হেসে উঠি। ওরাও হো হো করে হেসে ওঠে। ফাক! একি! এমন তো হওয়ার কথা না! ওরা হাসবে কেন? হওয়ার তো কথা উল্টোটা। আমি হাসবো ওরা কাঁদবে, আমি কাঁদবো ওরা হাসবে Ñ এ তো পরীক্ষিত সত্য। প্রমাণিত সত্য কিভাবে মিথ্যা হয়ে যায়! একটু আগেও আমার হাসি দেখে ভয়ে যাদের কাপড় নষ্ট প্রায় এখন এমন কী পরিবর্তন হলো যে কোন ফর্মূলাই কাজ করবে না! আমি আবারও শেষ চেষ্টা করবো বলে মনস্থির করি। আমি এমন জোরে হেসে উঠবো যে ডাক্তার কি, ভয়ে ইটসুড়কিও কেঁপে উঠতে পারে। আমি আমার সর্বোচ্চ শক্তি নিয়ে হো হো করে হেসে উঠি। আমার এই হাসিতে দজ্জাদ মহিলার ছুরির ট্রে, ডাক্তারদের হেলমেট, সেফটি গ্লাস, গলায় সাপের লেজের মতো ঝোলানো স্টেথেস্কোপ সবই কেঁপে ওঠে। কিন্তু আমাকে এক মুহূর্ত সময় না দিয়ে ষণ্ডাদের দল এত বিকট আর ভয়াবহভাবে হেসে ওঠে যে চারপাশের প্রায় সবকিছুই কাঁপতে থাকে। সাথে আমিও কেঁপে উঠে ভয়ে পাথর হয়ে যাই। আমাকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে ষণ্ডার দল। মাথার কাছে দাঁড়ায় ফরমান হাতে ষণ্ডাটি। আমি মৃত্যুর জন্য প্রহর গুনি।
কিন্তু না। ষণ্ডামার্কা লোকটি বলে, ‘একটু অপেক্ষা করুন। বেবির বাবাকে আমরা ডেকে পাঠিয়েছি। ভদ্রলোক এখনই এসে পড়বেন।’
আঁ, কী বলে! আমার আবার বাবা আছে নাকি! কই, মা তো এমন কারো সাথে আমাকে পরিচয় করিয়ে দেয়নি। দু-একজন পুরুষ মানুষকে আমার আশপাশ দিয়ে ঘোরাফেরা করতে দেখেছি। একজনকে একবার মার সাথে ঘনিষ্ঠভাবে কথাও বলতে দেখেছি। কিন্তু লোকটাকে বাবা বলে মনে হয়নি। অবশ্য আমি হেসে ওঠার পর কেইই আমার কাছ-ঘেঁষা হয়নি মা ছাড়া। কিন্তু বাবাতো আর-দশটা লোকের মতো না। তিনি কেন ভয় পাবেন? আমার কেমন যেন মন খারাপ হচ্ছে এটা ভেবে যে জন্মের ১০ ঘণ্টা পরও বাবাকে চিনতে পারলাম না। মার সাথেই ছিলাম গত দশ মাস। বের হয়েও মাকেই দেখেছি প্রথম। সবাই যখন ভয়ে-আতঙ্কে, হয়তো কিছুটা ঘৃণায়ও, আমার পাশ মাড়ায়নি তখন মা-ই একমাত্র যে আরও কাছে এসে আমার হাস্যরত মুখের দিকে তাকিয়ে মিটমিট করে হাসলো। বাবা তখন আসলো না কেন? উনি কোথায় ছিল। দুজনকে কেন আমি একসাথে দেখলাম না। উনিও কি ভেড়াদের দলে ছিল? ছিচকাঁদুনে বুড়ো খবিশগুলোর হাওমাও করে কাঁদার সাথে কি উনি যোগ দিয়েছিল? আমার দুনিয়া জুড়ে এখন একটাই প্রশ্ন উনি কেন আসলো না?
একজনকে দেখে আমি খুব খুশী হয়ে গেলাম। লোকটিকে কেন যেন মনে হলো, সে আমার কিছু-একটা হবে। যদিও লোকটি আমার দিকে একবারের জন্যও ফিরে তাকালো না। ও কি আমার বাবা হতে পারে? এই লোক কিভাবে আমার বাবা হয় আমার বোধগম্য হচ্ছে না। পরে জানলাম সে আমার বাবা না। সে আমার মার বয়ফ্রেন্ড। আর আমার বাবা এখন অন্য একজন ভদ্রমহিলার বয়ফ্রেন্ড। যদিও বয়ফ্রেন্ডের ব্যাপারটা আমার কাছে খুব বেশী পরিষ্কার না। তবে এটুকু মনে হয় বুঝতে পেরেছি যে, সে বাবা চরিত্রের অভিনেতা। তবে লোকটা খুব বাজে অভিনেতা। তাকে আমার মোটেও বাবা মনে হচ্ছে না। একটা ফাজিল লোককে কিভাবে মা বয়ফ্রেন্ড বানায় তাও বুঝতে পারছি না। সবকিছু এত গোলমেলে কেন! আমার এই ১০ ঘণ্টার জীবনে যা কিছু ঘটলো তার প্রায় কোনোকিছুই আমার বোধগম্য হলো না। যা কিছু যতটা বুঝলাম তার পুরোটাই ভুল। এখন যা মনে করি ঠিক, ঠিক পরক্ষণেই দেখি ডাহা মিথ্যা। আবার ভুল মনে করে ভুল করেছি। কী যে করবো কিছুই বুঝতে পারছি না। কাউকে কিছু জিজ্ঞেসও করতে পারছি না। কেউ কিছুই বোঝে না, কথা বললে বোকার মতো ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। এখন বোকাবোকা হাসিহাসি মুখ নিয়ে সবাই ঘুরে বেড়াচ্ছে একটা পরিমিত দূরত্ব বজায় রেখে। আর ডাক্তার নামক কসাইগুলো মুখে বিজ্ঞের হাসি আর রাজ্যজয়ের তৃপ্তি নিয়ে সবাইকে দাবড়িয়ে বেড়াচ্ছে। ওরা আমার নাড়ি-নক্ষত্রের খবর সবই জানে কিন্তু কথা বোঝে না। পরীক্ষা করে বলে দিতে পারে আমার কী লাগবে না-লাগবে। আর যদি মুখে বলি তো চোখগুলো পাথর বানিয়ে ফেলে। আমিও তখন আর কিছুই বুঝি না।
যতই সময় যাচ্ছে ততই বিরক্ত হয়ে উঠছি। মার উপর বিরক্ত হচ্ছি সবচেয়ে বেশী। উনি কোন আক্কেলে এমন একটা জটিল জায়গার আমাকে নিয়ে আসলো? আর সত্যিকারের বাবাকে যদি হাতের কাছে পাই তাহলে যে কী করবো ঠিক করতে পারছি না। হেসে উঠবো, কেঁদে উঠবো, নাকি উনার মুখে শিশি করে দেবো। উনার মুখে শিশি করে দেওয়াটাই বোধহয় উত্তম হবে। দেখা যাক, আগে আসুক তো। মার এই খবিশ বয়ফ্রেন্ডের মুখেও শিশি করতে হবে। ইয়েস! ভালো বুদ্ধি, এখন যে-ই আমার কাছে আসবে তার মুখ বরাবর শিশি করে দেবো। সবার আগে করতে হবে দজ্জাল নাসর্কে, তারপর ডাক্তারকে, তারপর, তারপর এমন অনেকেই আছে। একটা ব্ল্যাকলিস্ট বানাতে হবে। আইডিয়াটা মাথায় আসতেই খুশীতে খলবলিয়ে ওঠে মন। হাত-পা নেড়ে ওঁয়া-উ করে উঠতেই সবার মনোযোগ আমার উপর পড়ে। সবাই আবারও এগিয়ে এসে আমাকে ঘিরে ফেলে। আমিও মনে মনে ভাবছিলাম বাছাধন আর একটু কাছে আসো। কিন্তু সবাই খুব চালাক, কেউ আমার মুতের রেঞ্জের মধ্যে আসছে না। কিন্তু আমি সুযোগের অপেক্ষায়। এবং আমি নিশ্চিত, সুযোগ আসবেই।
একটা ষণ্ডামার্কা লোক অনেকগুলো কাগজ হাতে আমার বাবা নামক অভিনেতাকে কী যেন বোঝাচ্ছে। খবিশ একটা! হঠাৎ ভীড়ের মাঝে উঁকি দেয় মা। আমি মাকে দেখেই আরো জোড়ে খলবলিয়ে উঠি। আমার সাথে সবাই যোগ দেয়। তাতে আমার মেজাজ তিরিক্ষি হয়ে ওঠে। মা সবাইকে সরিয়ে দিয়ে আমার কাছে আসে। এসেই বুকে জড়িয়ে নেয়। আমিও হঠাৎ করে মার বুকে লেপ্টে যেতে পেরে অদ্ভুত আনন্দ অনুভবে মুহূর্তে সব দুঃখকষ্ট ভুলে খুশীতে ওঁয়া-উ করে খলবলিয়ে কথা বলতে থাকি। মা দিব্যি আমার সব কথার উত্তর দিয়ে যাচ্ছে আমারই ভাষায়। আমি খুব অবাক হলাম। কেউ যখন কোনো কথাই বুঝলো না তখন ভেবেছিলাম এই দুনিয়ায় বুঝি আমার কথা কেউ বুঝবে না। এখন মার এই কথা-বোঝা ও বলা দেখে বেশ ভরসা পাচ্ছি। যাক বাবা, একজন তো অন্ততপক্ষে বুঝলো আমার কথা। আমার মনে হলো হাজারো দৈত্যদানবের মাঝে এই একটা পরম নির্ভরতার জায়গা, একটা মমতার বুক, এক হাজার সূর্যের চাইতেও জ্যোতির্ময় একটু হাসি, একটা ভালবাসার চুমু, আমার ১২ ঘণ্টার অসহ্য একটা জীবনের ইতি টানার জন্যে যথেষ্ট। আমি পরম নিশ্চিন্তে মার বুকে শুয়ে শুয়ে দুনিয়ার তামাশা দেখি।

একজন ষণ্ডা আসলো মার কাছে। পাশেই বাবার অভিনয়ে খবিশটি দণ্ডায়মান। ষণ্ডা শুরু করে : ‘মিস্টার এন্ড মিসেস ইসলাম। আপনার বেবি সম্পূর্ণ সুস্থ। এই ফাইলে তার সমস্ত রিপোর্ট আছে। তবে একটা অদ্ভুত ব্যাপার হলো আমরা তার রক্তে এলকোহল পেয়েছি। এবং সে জন্মের আগেই এলকোহলে আসক্ত হয়ে গেছে। এই মুহূর্তে যদি আমরা তার এলকোহল স্টপ করে দিই তাহলে তার প্রতিক্রিয়া হবে মারাত্মক। বেবির টোটাল নার্ভ সিস্টেম ফেল করতে পারে। সে সামলাতে পারবে না। এটা তার মানসিক ও শারীরিক বড় রকমের ড্যামেজের কারণ হতে পারে। তাই মেডিকেল বোর্ড সিদ্ধান্ত নিয়েছে, আপাতত এলকোহল কন্টিনিউ করার। এবং তার যেহেতু বাড়ন্ত শরীর, সেজন্য এলকোহলের মাত্রা প্রতিদিন একটু একটু করে বাড়াতে হবে। কী পরিমাণ বাড়াবেন, বেবির সার্বিক পরিচর্যা কিভাবে করবেন তার জন্য হেড-নার্স আপনাকে যাওয়ার আগে আরো একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্রিফিং দেবে। আর প্রত্যেক সপ্তাহে বেবিসহ আপনাকে হাসপাতালে আসতে হবে চেকআপের জন্য। এই চেকআপ চলতে থাকবে তার বয়ঃসন্ধির আগ পর্যন্ত। এখনও ঠিক করে বলা যাচ্ছে না, হয়তোবা সারাজীবনই তাকে এলকোহল দিয়ে যেতে হবে। হয়তোবা তার যখন পূর্ণ বয়স হবে তখন তাকে মেন্টাল থেরাপীর মধ্য দিয়ে এই অভ্যাস থেকে মুক্ত করতে হবে। এবং ধীরে ধীরে এলকোহলের মাত্রা কমিয়ে শূন্যের কোঠায় নিয়ে আসতে হবে। তার জন্য দরকার নিরলস চেষ্টা ও অধ্যাবসায়। আপনাকে মনে রাখতে হবে, জন্মের আগেই আপনি বেবিটির অনেক বড় ক্ষতি করে ফেলেছেন। তাকে রক্ষা করতে হলে আপনাকে এখন ডাক্তারের পরামর্শ মেনে চলতে হবে সারা জীবন।’
মা মাথা নিচু করে জ্বি বলে। আমি ব্যাপারটার আগামাথা কিছ্ইু বুঝলাম না। এখন বুঝতেও চাই না। বোঝাবুঝি করতে গেলে আবার আটকা পড়তে পারি। কেননা আমি এখন যে কোনোভাবে এই দানবের গুহা থেকে বাইর হতে চাই। তাই আমি ওদের কথা কানেও নিচ্ছিলাম না। আমি জানি অনেক বিজ্ঞ ভাব নিয়ে সিরিয়াসলি ওরা যা বলবে তার অর্থ হলো ‘বারবার আমাদের খোয়াড়ে ফিরে আসো’। আর আমার মা-বাবা যেহেতু ভোদায় ওরা আসবে। কাজেই ওদের কথায় কিছুই যায় আসে না। যাইহোক এই রকম আরো হাজারো নির্দেশ আর বোরিং নিয়মকানুন শুনতে শুনতে আমি কখন যেন ঘুমিয়ে পড়লাম। হঠাৎ গড়গড় আওয়াজ শুনে ঘুম ভাঙলো। আমি ওঁয়া-উ করে উঠতেই মা বলে, ‘আমরা বাড়ি যাচ্ছি সোনা।’ বাড়ি জিনিসটা কী আমি আর তা জিজ্ঞেস করিনি। কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখি আমি, মা আর বাবা নামক খবিশটা বাড়ি নামক একটা অজানা যাদুরাজ্যের উদ্দেশে দ্রুতগতিতে ছুটে চলছি।

চলবে