মাতাল শিশু – মোয়াজ্জেম আজিম (ধারাবাহিক উপন্যাস)

  •  
  •  
  •  
  •  

মাতাল শিশু

মোয়াজ্জেম আজিম

প্রথম পর্বের পর


হঠাৎ করে গাড়ি থামলো আকাশ ঢাকা এক বিল্ডিংয়ের সামনে। বিশাল বিল্ডিং রড-সিমেন্টের হাত-পা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মানুষের তৈরী এই সিমেন্টের আকাশে দু-একটা বাতিজ্বলা জানালা তারকারাজির সাথে পাল্লা দিয়ে টিমটিম করছে। এক কোনায় বিরাট একটা লাইটপোস্টের আলোকে চাঁদ বলে চালিয়ে দেয়া যেতে পারে। কিচেন থেকে বেরিয়ে আসা ধোঁয়াকে মেঘ। মোটামুটি এই হলো আমার মাথার উপর মুক্ত আকাশ।
আমাদেরকে অভ্যর্থনা জানানোর কেউ ছিল না। বাবা নামক লোকটা দরজায় লাগানো বোতাম টিপে দরজা খুলে ফেললো। ঢুকেই একজনের সাথে দেখা। সে তরুণী, হালকাপাতলা গড়ন, মুখমণ্ডল গোলাকার, গায়ের রং শ্যামলা, পরনে ছিল লাল চেকের ফ্রক ও সালোয়ার। মেয়েটি বেশ চটপটে, কথাবার্তায় সাবলীল। আমাকে ছোঁ মেরে মার কোল থেকে ছিনিয়ে নিলো। আমি কিছু বললাম না। সে আমাকে বেশ পছন্দ করেছে, চুমোয় চুমোয় ভরিয়ে দিচ্ছে আমার মাথা-মুখ-হাত, এমনকি পাও।
আমি খুব ভয় পাচ্ছি, পাটাকে আইসক্রিম মনে করে কামড় বসিয়ে দেবে না তো! মেয়েটার ভাবগতিক ভালো মনে হচ্ছে না। সে আমার পা কেন বারবার মুখে পুরছে কিছুই বুঝতে পারছি না। আর তার এত খুশি হ্ওয়ারই বা কী আছে! একটা হতে পারে সে খেলার সাথী পেয়েছে। কিন্তু আমি তো এখন খেলতে পারবো না। এখনও তো আমার দুদিন বয়স হয়নি। অবশ্য খেলার জন্য পুতুলই শ্রেষ্ট, সেখানে আমি তো জলজ্যান্ত একটা পুতুল। হাসতে পারি, কাঁদতে পারি, হাসাতে পারি, কাঁদাতে পারি, কথা বলতে পারি, যদিও ভাষা বিষয়ক জটিলতার কারণে আমার কথা মানুষ বোঝে না, আমিও মানুষের কথা বুঝি না। এর একটা বিহিত-ব্যবস্থা করতে হবে। আমার ভাষা সবাইকে শিখতে বাধ্য করতে হবে। তা আমি পারবো বটে। মানুষ ভয় পেলে আমার ভাষায় কথা বলে। তার মানে তারা আমার ভাষা জানে, শুধু বলতে নারাজ। বলতে তোমাকে হবেই বাছাধন। হাসপাতাল থেকে বাইর হওয়া ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সেটা যেহেতু করতে পেরেছি আমার মনে হয় না আর কিছুতে আটকা পড়বো। এরই মধ্যে মেয়েটা ওয়া-উ করে আমার সাথে কথা বলার চেষ্টা করছে। খুব একটা কিছু বোঝা যাচ্ছে না সে কী বলতে চায়। কিন্তু শিষ্য হিসাবে প্রথম ছাত্রীটি ভালোই হবে বলে মনে হচ্ছে। বয়সে একটু বড় তাতে কী? বয়সে বড় হলেই জ্ঞানে বড় হবে এমন কোন কথা নেই। জ্ঞানগরিমার দিক থেকে মাশাল্লা আমি গর্ব করার মতো একটা অবস্থানে যে আছি তাতে আমার কোনো সন্দেহ নাই। আমি মার গর্ভকালে যে নাটকীয় পরিস্থিতি দেখেছি বা শুনেছি, ভূমিষ্ট হওয়ার সাথে সাথে যে লঙ্কাকাণ্ড বাঁধিয়েছিলাম, যেভাবে বেরিয়ে আসলাম ডাক্তার নামক কসাইদের হাত থেকে তাতে শিক্ষার আর কিছুই বাকী থাকে না। শিক্ষা কেমন পেয়েছি একটু বলি।
আমার জন্মের তিনদিন আগের কথা। মা গেছিলো তার বসের সাথে দেখা করতে এবং বলতে যে আগামী কয়েকদিন ছুটি নেবে। বস তো খুব দয়ালু, তিনি সাথে সাথে বললেন, ‘ও সিউর, আপনার অবশ্যই ছুটি নেয়া উচিত। অবশ্যই কাল থেকে। মাত্র তো আর দুটো দিন। আমি বুঝি না, মানুষ কেন এত অমানুষ হয়ে যাচ্ছে দিনদিন। জানেন আমাদের গার্মেন্ট ইন্ডাষ্ট্রিতে এখন আমরা নিয়ম করেছি যে ডেলিভারির দিন নারী শ্রমিকরা বেতনসহ ছুটি পাবে। আর আপনিতো দ¯ুÍরমত একজন অফিসার। কাজেই আপনার অবশ্যই কাল থেকে ছুটি নেয়া উচিত।’ মা বললো, ‘স্যার, আপনার দয়া স্যার।’ দেখুন বস কত দয়ালু। ওনার দয়া দেখে আমার না কান্না পাচ্ছিল, সত্যি মানুষ দিনদিন খুব দয়ালু হয়ে যাচ্ছে, আর নানারকম নিয়মকানুন করছে সবাইকে যেন কুকুর-বিড়ালের মতো পোষা যায়।
‘যান, সাবধানে থাকবেন, ভাল থাকবেন। বেতন পেতে দেরি হলে আমাকে ফোন করবেন, আমি বলে দেবো। গুড লাক।’
আমার মা হাজার রাতের বিষণ্ণতা আর রাজ্যের কষ্টমাখা একটা হাসি উপহার দিয়ে বেরিয়ে আসলো। কী নিদারুণ কষ্টে তিনি পার করেছেন ২৯০টি দিন তা শুধু অন্ধ ঈশ্বর আর আমি ব্যাতিরেকে কেউ জানে না। আমি সাক্ষী সবকিছুর। শুনেছি একসময় মার ভালোই কদর ছিল। অফিস সহকারী হিসাবে কাজ করলেও বেতন ভালোই আসতো। প্রেগনেন্ট হওয়ার পর কদর নাকি একটু কমে গেছে। ব্যাপারটা গোলমেলে। বসও নাকি নাখোশ, কেন সে বাচ্ছা নিতে গেল। একজন প্রেগনেন্ট মহিলা দিয়ে কি কাজ চলে? যদিও মা প্রেগনেন্ট হওয়ার পর নিজের দায়িত্ব সম্পর্কে ছিল খুবই তৎপর, কাজও করতো প্রত্যেক দিন ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা। তাও বস নাখোশ, কেন বাচ্ছা নিতে গেল। যাহোক মা অবশ্য নিশ্চিত ছিল বাচ্ছা তার লাগবেই, তাই আমি বেঁচে গেছিলাম।
এরই মধ্যে মা ফ্রেস হযে সাদা ধবধবে কাপড় পড়ে এসেছে। মাকে এখন পরীর মত লাগছে। উনি এসে আমাকে কোলে তুলে নিয়েই ডাক দিলো, ‘মুন্নী, ফিডার নিয়াই।’ ওর নাম তাহলে মুন্নী। আমার নাম জানার পালা শুরু হলো। মুন্নী চমৎকার একটা বোতল নিয়ে হাসতে হাসতে এসে মার হাতে দিলো। আমারও ক্ষুধা লেগেছিল, নিপলটা মা আমার মুখে দিতেই একটা চোসান দিয়েই বুঝলাম জঘন্য একটা মিষ্টি স্বাদ। বুঝলাম খাওয়ার আগে অবশ্যই একটু হুইস্কী লাগবে। এবং হুইস্কী পাওয়ার একটাই উপায় জোরে চিৎকার। আমি শুরু করলাম, ওঁয়াও ওঁয়াও। মা ‘আমার লক্ষ্মী’ বলে, ‘সোনা’ বলে আদর করে, ‘কী হয়েছে বাবা কী হয়েছে, না কাঁদে না বাবা আমার, কাঁদে না’, কিন্তু কিছুতেই কিছু হবে না। শেষ পর্যন্ত আলমারী খুলে নিয়ে আসে তরল সোনা রঙ্গের ঝিলমিল স্কচের বোতল। দেখেই আমার মন খুশিতে চনমন করে ওঠে। আমি কান্না ভুলে যাই। মা আমাকে আর-একটা কাচের বোতলে হুইস্কী দিতেই আমি চুকচুক করে খেতে শুরু করি। মুখে ফুটে ওঠে সূর্যমুখী হাসি, মাও হাসে। দূর থেকে বাবা নামক খবিশটা কেমন যেন আড়চোখে দেখে আর তাচ্ছিল্যভরে মুখ বানায় বান্দরের মতো। মুন্নী অবাক হয়ে দেখে মা আমাকে কী খাওয়াচ্ছে। সম্ভবত সে চেনে এই মাল। চিনবে না, আফটার অল মার বাসার চাকরানী! তাকে নিশ্চয় অনেক কিছুই জানতে হয়!
মুন্নী বুঝতে পেরে মুচকি হাসলো, নাকি না বুঝে হাসলো কিছুই বুঝলাম না। তবে ওর হাসিটার মধ্যে যে একটা দুষ্টমিভাব আছে তাতে কোনো সন্দেহ নাই। আমি ওর দুষ্টমি ভরা হাসিতে মনে হয় খুশিই হয়েছি।

ভালই ছিলাম গত দুইটা মাস। শরীর মন দুইটা খুব বাড়ন্ত। এরই মাঝে একটা সংবাদ মাকে খুব কাঁদিয়েছে। যদিও ব্যাপারটা কেন খারাপ তা এখনও আমার বোধগম্য নয়। আমি নাকি দ্রুত বড় হয়ে যাচ্ছি। মানুষের দশ বছরের সমান আমার এক বছর। ডাক্তার বলেছে এটাও নাকি এক ধরনের অসুখ। ফাক ম্যান। আর কত অসুখে ভুগবো। বড় হয়ে যাওয়া অসুখ হয় কেমনে? এখনতো সবাই দ্রুত বড় হচ্ছে। শাকসবজি আগে জমিতে হতে সময় নিতো তিন কি চার মাস, এখন কয়েক ঘণ্টায় বীজ থেকে চারা গজিয়ে বড় হয়ে প্যাকেট হয়ে সুপার মার্কেটে চলে যাচ্ছে। মোরগমুরগী, গরুছাগল, ভেড়া সবার তো একই অবস্থা। সেখানে আমি বড় হলে অসুবিধা কোথায়? আমি বুঝলাম না, প্রকৃতির সাথে তাল না দিয়ে মানুষ কিভাবে টিকবে? সব কিছু যেখানে দ্রুত বড় হচ্ছে, সেখানে মানুষ কেন বসে থাকবে। সে কেন শিশু হয়ে পার করে দেবে এক-দেড় যুগ।
আমি শুনেছি বজ্জাত ডাক্তারের সাথে মার কথোপকথন। কোন একটা হরমোনাল ডিজঅর্ডারের কারণে এটা হচ্ছে। তবে তার সঠিক তথ্য এখনও তাদের হাতে নাই। নিরাময়েরও কোনো পথ তাদের জানা নাই। বিদেশে নাকি আজকাল হরমোন নিয়ে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা হচ্ছে। বিদেশে নিয়ে যেতে পারলে হয়তো ভাল-মন্দ কোনো একটা কিছু হতে পারে। নতুন করে ভাল-মন্দ হওয়ার চাইতে যা হচ্ছে তা তো ভালই হচ্ছে। এটা নিয়ে মার কেন এত দুচিন্তা তা বলা মুসকিল – মানুষ যেখানে সবাই তাড়াতাড়ি বড় হতে চায়, মাদের এতরকম প্রচেষ্টা বাচ্চাকে তাড়াতাড়ি বড় করার! শুনেছি বাজারে হাজারো রকম প্রোটিন, ভিটামিন, মিনারেলস, মাসল বিল্ড, ব্রেইনবিল্ড, সেক্সবিল্ড ওষুধ পাওয়া যায় যার নব্বই ভাগ ক্রেতা হলো মা, যারা তাদের বাচ্চাকে সুপারম্যান বা সুপারলেডি বানাতে চায়। সেখানে আমার মা দেখি উল্টা; উনি চিন্তিত কেন আমি বড় হয়ে যাচ্ছি; বড় হয়ে যাচ্ছি বলে খুবই মর্মাহত। তাহলে কি উনি আমাকে বনসাঁই বানায়ে রাখতে চায়! কী জানি বাবা। আমি অবশ্য সুযোগ পেলে জানিয়ে দেবো, মা যেন আমার এই দ্রুত বর্ধনশীলতাকে বন্ধ করার কোনোরকম পায়তারা না করে। আমিও চাই তাড়াতাড়ি বড় হতে, একটু ফুর্তিফার্তা করতে। আর তাড়াতাড়ি বড় হতে পারলে বউ খুঁজতে পাড়ায় যেতে হবে না। মুন্নিকেই বিয়ে করতে পারব।
তবে একটা সমস্যা অবশ্য আছে। খবিশটার সাথে আমার লেগে যেতে পারে। ইদানিং সে মা বাসায় না থাকলে কারণে-অকারণে ঢুঁ-মারে। মুন্নি তাতে অনেক খুশি হয়। মা বাসায় না থাকলে মুন্নি খবিশটার সাথে মায়ের মত করে কথা কয়। তুই-তাকারি করে। মার অনুপস্থিতিতে খবিশটার সামনে মু্িন্নকে আমার রঙ্গীন প্রজাপতি মনে হয়। সারাক্ষণ গুনগুন করে, আর পাখনা মেলে উড়ে বেড়ায়। এমন একটা জানোয়ারকে দেখে খুশি হওয়ার কী আছে আমি বুঝে পাই না। অবশ্য লোকটা আমার কাছে জানোয়ার হলেও মু্িন্নর কাছে খুব ভালো। সে মু্িন্নকে খুব আদর করে। মাঝে-মধ্যে কোলে বসায়ে আদর করে। আইসক্রিম কিনে আনে, বাইরে যেতে দেয়। আরো যে কত রকম আহ্লাদ দেখায়, দেখলে যে কারো পিত্তি জ্বলে যাবে। মুন্নিও লোকটাকে খুব ভালবাসে। মা বেরিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে মু্িন্ন লোকটাকে ফোন করে বলে, ‘হানি, তোমার জন্য আমি বিছানা সাজাচ্ছি।’ আর সে কি হাসাহাসি। আর যখন মা বাসায় থাকে তখন বিড়ালের মতো মিউ মিউ করে কথা কয়। চোখ তুলে তাকায় না। তখন সে আমাকে নিয়েই ব্যস্ত থাকে। সারাক্ষণই আমাকে কোলে কোলে রাখে। তখন মনে হয় মু্িন্ন আমাকেই বেশী পছন্দ করে। সারাদিনমান ক্লান্তিহীন আমার সেবা করে। খেলে নানারকম খেলা। ওর সবচেয়ে প্রিয় খেলা মনে হয় আমার নুনু নিয়ে খেলা। সারাক্ষণই নুনু নিয়ে খেলে। এটা আমার পছন্দ না। নুনুতে হাত দেওয়াটা আমি খুব অপছন্দ করি। মাঝে-মধ্যে এত রাগ হয় যে ইচ্ছা করে ওর মুখে শিশি করে দিই। সত্যি সত্যি একদিন রাগে ওর মুখে শিশি করে দিলাম। ভাবলাম, এখন নিশ্চয় একটা লঙ্কাকাণ্ড হবে। ওমা, ও দেখি হাসে! শিশি করে দিলাম বলে আরো খুশি! হো হো করে হাসে। গায়ের ওড়না দিয়ে মুখটা ভাল করে মোছেওনি। আবার আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে নাকে নাক ঘষে, চুমু খায়। শিশি-ভেজা মুখটা আমার মুখে লাগতেই আমি ওঁয়া করে চিৎকার করে উঠি। সে আমার মেজাজের তোয়াক্কা না করে হেসে গড়াগড়ি যায়। আমি তখন মহাধন্দে পড়ি। শিশি করলাম কষ্ট দেওয়ার জন্য সে দেখি মহাখুশি! মানুষ যে কী কারণে কী করে তা বোঝা বড় মুশকিল। কী কারণে রাগ হয় আর কী কারণে খুশি হয় তা বুঝতে বুঝতেই আমার একজীবন পার করতে হবে বলে মনে হচ্ছে। এই তো সেদিন খবিশটা বাসায় আসলো আম্মু তখন বাসায় নাই। এসেই মুন্নির উপর বাঘের মতো ঝাঁপিয়ে পড়লো। আমাকে কোনোরকমে সোফায় ছুড়ে দিয়ে বাঁচালো মুন্নি। সেদিন খবিশ মুন্নিকে মেরেছে। আমি মুন্নিকে কাঁদতেও শুনেছি। কিন্তু তাতে কী, মাইর খাওয়ার একটু পরই খবিশের সাথে কী পিরিতের কথা। আর সেদিন আম্মু একটা থাপ্পর দিলো, তাতে সে কি কান্না! মনে হলো দুনিয়াটা সাগর বানিয়ে ফেলবে! আসলে মুন্নি একটা হিপোক্রেট।

খবিশটাকে অবশ্য আমি একটা ছেঁচা দেবো। আর একটু বড় হয়ে নিই। ওর জন্য মাঝে-মধ্যে মায়াও লাগে। ও বড় দুঃখী। ওর মা-বাপ কেউ নাই, নাকি কেউ ওকে নিচ্ছে না? আসলে ওর বাবার ঠিক নাই। অনেকটা আমার মতো। এমন জন্মকে জারজ বলে। তাহলে সে জারজ? তাহলে আমি কী? আমার কি বাবার ঠিক আছে? ঠিকঠাক বাবাটাকে তো দেখলাম না একদিনও। যাকে চোখের সামনে মার সাথে ফস্টিনস্টি করতে দেখি সে তো মার বয়ফেন্ড। ওরা এখনও বিয়ে করেনি, করবেও না। যার বাচ্চা নিজ শরীরে ধারণ করলো তাকে কী মা বিয়ে করেছিল? বিয়ে না করলে কি বাবা হওয়া যায় না?
তাহলে কি আমিও বড় হলে ওর মতো হয়ে যাব? ভেগাবন্ড বয়ফেন্ড হয়ে লোনলি মেয়েদের বাসায়-বাসায় ঘুরে বেড়াবো? কিন্তু ওরে দেখে তো দুঃখী মনে হয় না। আমার তো মনে হয় ব্যাপারটা যথেষ্ট ইন্টারেস্টিং; ও এনজয় করছে। আমার মনে হয়, আমিও করবো। আমার তো কোনোকিছুতেই দুঃখ লাগে না। মাঝে-মধ্যে একটু অস্থির লাগে, কিছুই ভালো লাগে না। কিন্তু পেটে মাল পড়লে সবই মুহূর্তে ঠিক হয়ে যায়। তখন সবই ভালো লাগে, সব কিছু ঠিকঠাক-ফিটফাট মনে হয়।
শুধু মেজাজ বিগড়ে যায় খবিশটাকে দেখলে। আচ্ছা ওর উপর আমার এত রাগ কেন? আমার বাবা না বলে? মাকে পিশে দলাই-মলাই করে বলে? কিন্তু তাতে মা তো রেগে যায় না! আমি কেন রাগ হই? মা তো আমার মতো ওকেও ভালবাসে, কখনও কখনও জড়িয়ে ধরে চুমু খায়। মাঝে মাঝে মা অবশ্য থাপ্পর-টাপ্পরও মারে, বকা দেয় অনেক জোরে। খবিশটা অবশ্য খুব বেহায়া। কিছুতেই ওর লজ্জা হয় না। মা বকে আর ও ছাগলের মতো হে হে করে। আমি বুঝি ও হাসার চেষ্টা করে, সব বকাঝকা গা থেকে ফান বলে মুছে ফেলতে চায়। মার সামনে দেখায়ও যে ও কিছু মনে করেনি মার বকায়, কিস্তু আসলে ও অনেক ক্ষেপে যায়। মার উপর প্রতিশোধ নেবে বলে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে। আড়ালে-আবডালে বলে, মাগী, খাড়া তরে আমি মজা দেখাচ্ছি! একদিন তোর সামনে তোর ছোট বোনটারে লাগাবো! তখন বুঝবি কত ধানে কত চাল!
মার একটা ছোট বোন আছে খুলনায়। সামনের মাসে আসবে আমাকে দেখতে। মা যখন ফোন করে তখন খবিশটাও ফোনে কথা কয় খালার সাথে। আবার মার আড়ালে খবিশ ফোন করে। খালাকে বলে তোমার বোনকে আবার বইলো না আমি তোমাকে রেগুলার ফোন করি। এই তো সেদিন আম্মু তখনও বাসায় আসেনি। খবিশ ফোন করলো খালাকে। খালা যতই আমার কথা জিজ্ঞেস করে খবিশটা ততই সেক্সি-সেক্সি কথা কয়। কয় তুমি আসো, তাড়াতাড়ি আসো। আরো অনেক খারাপ-খারাপ কথা, এগুলো আমার বলতে লজ্জা লাগতাছে। কত কথা যে খবিশটা বানায়ে বানায়ে বলে! মুন্নিকেও এইসব কথা বলে। আবার রাতের বেলায় মার কাছে মু্িন্নর বদনাম করে। বলে, মেয়েটা দিনদিন বেতমিজ হয়ে যাচ্ছে। আজকাল ফুটফরমাইস দিলে কাজটা করে ঠিকই কিন্তু কোথায় যেন একটা বেয়াদবি ভাব আছে। তোমার সাথেও তো দেখি চটাং চটাং কথা বলে। বেশী লাই দিয়ো না। গরীব হইলো গজবের পয়দা। এইগুলিরে যত টাইটে রাখবা ততই ভালো থাকবো। আবার দিনের বেলায় মুন্নিরে কয়, মু্িন্ন তোর জন্যে আমার খুব খারাপ লাগে। তুই যে সুন্দরি তাতে বড়লোকের ঘরে জন্ম নিলে নির্ঘাত নায়িকা হয়ে যায়তি। শুনে মুন্নির সে কী খুশি! খালি আয়নার সামনে খাড়ায়ে নিজেরে ঘুরায়ে-ঘারায়ে দেখে। কেউ বাসায় না থাকলে সাজতে বসা ওর একটা রুটিন কাজ। একদিন তো সাইজা-গুইজা খবিশরে করলো ফোন, আসেন, আমাকে একনজর দেইখা যান। খবিশতো আর আসে না। মুন্নি বারবার ফোন করে, আসেন আমারে আইসা একবার দেইখা যান। শেষ পর্যন্ত যখন খবিশ আসলোই না তখন মুন্নি শ্রাবণের আকাশের মতো গম্ভীর হয়ে বারান্দায় দাঁড়ায়ে ছিল অনেকক্ষণ। রাস্তার মানুষগুলোর দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে ছিল, মানুষগুলোও ওর দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে হাঁটছিল। কিছুক্ষণ পর আমারে সোফায় শুয়াইয়া সে বারান্দায় গেল এবং সত্যিসত্যি একটা ছেলেকে ডাকলো। বললো, ভাই আমাকে দোকান থেইকা একটা আইসক্রিম কিনে দিবেন। এই নেন টাকা। ছেলেটা বললো, টাকা লাগবে না। আমি তোমার জন্যে আইসক্রিম নেয়া আসতাছি। তুমি খাড়াও। ছেলেটি আইসক্রিম হাতে ফেরত আসলো, আইসা বললো, তুমি একটা দড়িতে পলিথিন বাইন্দা নিচে দেও আমি তোমার পলিথিনে আইসক্রিম দিয়া দেই। মুন্নি তাই করলো। তারপর বারান্দায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সে আইসক্রিম খেল আয়েস করে।
ছেলেটি বললো, আমি কালকেও এইসময় এখানে আসবো তুমি বারান্দায় আইসো। মুন্নি কয়, তুমি কি কালকেও আমাকে আইসক্রিম খাওয়াইবা? ছেলে কয়, যদি খাইতে চাও খায়ামুনা কেন?
– শুধু কি তুমিই খাওয়াইবা, কাল তোমারে আমি আইসক্রিম খাওয়াবো।
– আইসক্রিমে আমার পোষাইবো না। অন্য কিছু খাওয়াও।
– অন্য কিছু কী খাইবা, কও?
– দিয়ো একটা কিছু, তোমার যা মনডা চায়।
– কও, কী চাও?
– দিয়ো, কোনো একদিন চান্স পাইলে দিয়ো।
ছেলে হাসে। মুন্নি মুহূর্তে কেমন যেন রক্তিম হয়ে ওঠে। ছেলেটি চলে যায়।
সেদিন মু্িন্নর চেহারায় এক অদ্ভুত বেদনা আর জেদের জৌলুস খেলা করছিল। ও তো আর জানে না যে, আমি এতকিছু বুঝি। আমি অবশ্য আর একটু দেখবো তারপর মাকে বলে দেবো। আমি এখন চাইলে সব কথাই বলতে পারি, কিন্তু বলি না। আমার কথা শুনলে মানুষ কেমন যেন ভয় পায়। প্রথম যেদিন কথা বললাম তখন আর আমার বয়স কত Ñ এক-দেড় মাস হবে হয়তো। আমাকে দুধ খাওয়াতে আসলো মুন্নি। আমি স্পষ্ট করে বললাম, না। আমার মুখে না শুনে মুন্নি চট করে আমাকে কোল থেকে নামিয়ে গেল মার কাছে, গিয়ে বলে, আফা দেহেন বাবু কেমন পষ্ট কইরা কথা কয়। আমার কেমন জানি ভয় লাগতাছে আফা। মা সাথে সাথেই আমার কাছে আসলো, আমাকে কোলে নিয়ে কান্না জুড়ে দিলো। পরদিন সকালেই ডাক্তার বললো, ওর মাত্রাতিরিক্ত গ্রোথ। বেশীদিন বাঁচবে না। তাড়াতাড়ি বড় হয়ে তাড়াতাড়ি মরে যাবে। এই শুনে মার সে কী কান্না! সেদিন অফিসেও গেল না। সারাদিন বাসায় বসে শুধু কাঁদলো। আমার মা যে কত কাঁদতে পারে তা না দেখলে কেউ বিশ্বাস করবে না। যেকোনো দেশ খরায় আক্রান্ত হলে উনাকে নিয়ে যাওয়া দরকার। তাতে সেই দেশ খরার হাত থেকে রক্ষা পাবে। আমি চাই তাড়াতাড়ি বড় হতে, মা চায় আস্তে আস্তে। মানুষের চাওয়া-পাওয়ার তফাৎ অনেক। কারোটার সাথে দেখি কারোটার কোনো মিল নাই Ñ মার সাথে আমার, মুন্নির সাথে মার, মুন্নির সাথে আমার, খবিশের সাথে মার, ম্ু্ন্িনর সাথে খবিশের। আবার এখন দেখছি পাড়ার এই আইসক্রিমদাতাও চায় একটা, মুন্নি দিতে চায় আর-একটা। কেন বাবা এত ঝামেলা না করে যে যা চায় তাকে সেটা দিয়ে দিলেই লেটা চুকে যায়! আসলে সবাই চায় ঝামেলা লেগে থাকুক। ঝামেলা না থাকলে মানুষ কী নিয়ে বাঁচবে। এই যে আমার মা, যদি খবিশটাকে বিদেয় করে দেয় তাহলে উনার এবং আমার ৯০% ঝামেলা কমে যাবে। কিন্তু মা এটা করবে না। কারণ উনার ঝামেলা দরকার। আমাকে দুনিয়াতে এনে এই মহিলার এখন চোখের পানি শুকায় না। কী দরকার ছিল আমাকে এখনে নিয়ে আসার। তাও যদি স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় হতো তাহলে না হয় বুঝতাম। বাবা নাই, ভাড়াটে বাবা বাসায় রাখতে হয়। চাকরী না করলে একদিন চলার উপায় নাই। বসের মুখের উপর যার খাওয়াপরা নির্ভর করে তারা কিভাবে রিস্ক নেয় আল্লামালুম। মানুষের কি মন মর্জির ঠিক আছে, না থাকে। যে-কোনোদিন যে-কোনো উসিলায় বলতে পারে আপনার চাকরী নট, তাহলে কী হবে? মানুষের সাহস দেখে তো মনে হয় না, তারা কোনো বুদ্ধিমান প্রাণী। মানুষের সকল বুদ্ধি তারা খরচ করে মিথ্যা বলায়। লুকানো-ছাপানোতে তারা খুবই উস্তাদ। এই যেমন আমি মাতাল, তা তো মা কাউকে বলবে না। মানুষ আমাকে দেখতে চাইলে মা বলে, ‘অসুখ। আমি জানাবোনে কবে আসবেন। আমি নিজেও খুব ব্যস্ত।’ বিশেষ করে মার বান্ধবীরা আসতে চায়। তারা এমসিএনএন অর্থাৎ মহিলা কেবল নিউজ আর নিউজ থেকে শুনেছে যে আমি মাতাল শিশু। মাতাল অবস্থায় জন্মগ্রহণ করেছি। এখনও মাতাল থাকি বেশীরভাগ সময়। দুধ না, হুইস্কী আমার প্রধান খাদ্য। এই রকম মজার রসালো খবর শুনলে কার-না সাধ হয় এক নজর দেখার। কিন্তু মা দেখতে দেবে না। তাই বলে কি সে-খবর বসে থাকে। সে তো হাজারো হাতপা মেলে দিনদিন রং-চং মেখে এখন শহরে এক কিংবদন্তী। ইদানীং সাংবাদিকরা নাকি খোঁজখবর নেয়া শুরু করেছে। মা খবিশকে কড়া ভাষায় বলে দিয়েছে কাউকে বাসায় আপাতত না আনতে। কারো কাছে আমার ব্যাপারে কোনোকিছু না বলতে। মু্িন্নকেও বলা আছে, ও যেন কাউকে এখন কিছু না বলে। এটা একটা অসুখ, চিকিৎসা চলছে, হয়তো ভালো হয়ে যাবে। বড় হয়ে যাওয়া নাকি অসুখ ! এই ধরনের কথা শুনলে আমার গা জ্বলে।
মা যতই মানুষকে আটকাতে চায় মানুষ ততই বাঁধভাঙ্গা জোয়ারের মতো ঢুকে পড়ে লোকালয়ে। রাস্তায় দাঁড়িয়ে দোতালায় উঁকি দেয়। ভাবখানা এমন যেন তেনার জিরাফের গলা আর একটু বাড়ালেই কাক্সিক্ষত বস্তুটি দেখতে পারবে। কারণে-অকারণে বাসার আশেপাশে দাঁড়িয়ে থাকে মানুষ। তাতে মুন্নির হয়েছে সুবিধা, প্রেমিকের অভাব নাই। সবাই এখন মুন্নির সাথে চোখাচোখি খেলে। এই করে করে একদিন এক ছোকরা কিসিমের পোলা মুন্নিকে চিঠি দিয়ে ঢিল দিলো। মুন্নিতো পড়তে পারে না। আমি পারি। আমিতো গর্ভে থাকাকালেই পত্রিকা পড়া শিখে ফেলেছি। মা পড়তো আমি শুনতাম, এই করে করে বাংলা, এমনকি কিছু ইংরেজিও শিখে ফেলেছি। কিন্তু মুন্নিকে এই কথাটা বলা যাবে না। এখন বাসায় কেউ নাই। এটা শুনলে মুন্নি হার্টফেল করতে পারে। মুন্নি একটু চিন্তা করে সাথে সাথে খবিশকে ফোন করলো। খবিশ বললো, লুকিয়ে রাখো, আমি এসে দেখবো কী লেখা। কিছুক্ষণের মধ্যেই খবিশ আসলো এবং পত্রখানি পড়ে দেখলো তাতে লেখা পত্রপেরক একজন সাংবাদিক। সে আমার ফটো তুলতে চায়। ফটো তুলতে দিলে দশ হাজার টাকা দেবে। যদি খবিশ ইন্টারভিউ দেয় তো বিশ হাজার, মা ইন্টারভিউ দিলে পঞ্চাশ হাজার, যদি মুন্নিকেও নেওয়া যায় তো আরো দশ হাজার এক্সটা। শুনে খবিশের তো চান্দি গরম। কী করবে বুঝতে না পেরে মাকে করলো ফোন। মা তো ফোন হাতে নিয়া কয়, তুমি এই সময় বাসায় কী করো?
খাইছে ধরা। খবিশের মুখ শুকায়ে বান্দরের পুটকি। এখন কী কয়। আমতা আমতা করে কয়, না মানে আমি বাসার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম ভাবলাম ছেলেটাকে একবার দেখে যাই। এই আর কি। মা যে ঐ পাশ থেকে খবিশকে কঠিন ঝাড়ছিল তা বোঝা যায় তার মুখ দেখে। কী বলবে কিছ্ ুকথা খুঁেজ পাচ্ছিল না। এদিকে মুন্নির অবস্থাও খারাপ। দুজনই ফোন রেখে মহাচিন্তায় পড়ে গেল। এখন কী হবে? মুন্নি কয়, আপনি কোন আক্কেলে আফারে ফোন দিলেন। বাসায় বইসা। আফা কি লবণ খাইয়া বড় হয় নাই? আমি জানি না। আপনে যা যা করছেন সব কয়ে দিমু।
– কী কয়! মুন্নি তোমার কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে?
– হ, তাতো হইছেই। আপনে বাসা থেক্কে কোন আক্কেলে আফারে ফোন করলেন?
– আরে চিন্তা কইরো না। একটা ধুনফুন কিছু ঠিকই বুঝায়ে দিমু। ডোন্ট ওরি মাই সুইটি। লেটস গো ইন আদার রুম। বলেই মুন্নিকে ধাক্কা দিয়ে খবিশ তাকে বেডরুমে ঢুকিয়ে ফেলে।
এখন আমি সবই বুঝি ওরা বেডরুমে কী করে। আমি ঠিক করেছি মাকে বলে দেবো।

চলবে