মাতাল শিশু (১১তম পর্ব)/উপন্যাস/ মোয়াজ্জেম আজিম

  •  
  •  
  •  
  •  
মোয়াজ্জেম আজিম

এগার তম পর্ব:
খবিশ আবার নতুন একটা ব্যবসা করার কথা চিন্তা করছে। ও কিছুদিন হলো ব্যাংকক থেকে ঘুরে এসেছে। ওর পত্রিকা-অফিস ওকে এক এসাইনমেন্টে পাঠিয়েছিল। সেখানে সে ব্যাংককের দেহব্যবসা সম্পর্কে একটা প্রতিবেদনের কাজ করেছে। বলে কী! সাংবাদিকরা তো সাংঘাতিক রকমের সুবিধাজনক অবস্থানে আছে দেখি! তিনদিন হয়নি শুরু করলো সাংবাদিকতা, তাও আবার এডাল্ট সাংবাদিক, এরই মধ্যে বিদেশ! না, খবিশদের অপরচুনিটির কোনো শেষ দেখি না। তার উপর একটা করতে গিয়ে সে আর-একটার সন্ধান নিয়ে এসেছে। নতুন ব্যবসা, ইনোভেটিভ অনলাইন আইডিয়া। মাকে সে বোঝাচ্ছে ঠিকমতো করতে পারলে শুধু টাকাই টাকা। সেখানে সে এক আশ্চর্য মলম ও ব্রাইবেটরের সন্ধান পেয়েছে, যা ব্যবহার করলে মেয়েদের স্তন ও ফিগার বিশ্বের বড় বড় মডেলদের মতো সুন্দর হয়ে যায় কয়েক ঘণ্টায়। এই ব্যবসা নিয়ে ইদানীং মার সাথে পরামর্শ করছে।
ব্রাইবেটরটা মেয়েদের নিপলে লাগিয়ে অন করে দিলে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ব্রেস্ট বেলুনের মতো ফুলিয়ে ফেলবে; আর নিপলও চাইলে জাম, বরই বা লটকন সাইজ করা যাবে। কেউ যদি ক্রেজি হয় তবে আপেলের সাইজ করাও সম্ভব। মলমের গুণ আরো আর্শ্চয। সরি, মলম না বলে বলা ভালো, মেজিক লোশন। এটা পেটে মালিশ করে দিলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ভুড়ি কমিয়ে যে কোনো সাইজের অতি ¯িøম থেকে শুরু করে সুইট ফ্যাট সব রকমের ডিজাইন করা যাবে। এইরকম কোনো প্রোডাক্টের কথা আগে কখনও শুনিনি। শুনে বেশ এক্সাইটেড ফিল করছি। মাকে মনে হচ্ছে সবচেয়ে বেশী এক্সাইটেড। তিনি বলছেন আগে স্যাম্পল কপি আনতে, ব্যবহার করে দেখে নিতে আদৌ কাজ করে কি না। তারপর না হয় ব্যবসা শুরু করা যাবে। কিন্তু খবিশ কেন যেন মাকে স্যাম্পল কপি এনে দেওয়ার ব্যাপারে একেবারেই আগ্রহী না। সে বলে বিজনেসটা  হবে সম্পূর্ণ অনলাইনে। শুধু থাকবে একটা ওয়েবসাইট আর একটা ফোনলাইন, জাস্ট ফর কাস্টমার সার্ভিস। আমাদের এই ওয়েবসাইটের মাধ্যমে যত অর্ডার আসবে তার ৭৫% কমিশন আমাদের আর বাকী ২৫% ব্যাংককের সেই ম্যাজিক কোম্পানীর।
মা বলে, কেন ব্যবসা করবো আমরা, তাদেরকে কমিশন দেবো কেন?
খবিশ বলে, কমিশন দেবো না, নেবো। সবই তো তাদের, আমাদের শুধু একটু এফোর্ড। এটা একটা কমিশন বিজনেস। তোমার কোনো খরচ নাই, এমনকি ওয়েবসাইটের ব্যবস্থাও মাদার-কোম্পানীই করবে। ওরা শুধু লোকাল কারো নাম ব্যবহার করবে, যার সমাজে প্রতিপত্তি আছে। আর তুমিতো জানো যে আমি একজন প্রতিষ্ঠিত সাংবাদিক। সাংবাদিক হিসাবে নাম করেছি বলেই ওরা আমাকে পিক করেছে। না হয় করতো নাকি। কত নামীদামী লোক গিয়ে দেখো তাদের সাথে লাইন দিচ্ছে, কেউ কোনো পাত্তা পাচ্ছে না। আমার সুনামই আমাকে এই কাজের সুযোগ করে দিয়েছে। এখন শুধু অপেক্ষা ওয়েবসাইটের। সাইটটা হয়ে গেলেই একটা বিজ্ঞাপন দেবো নানা পত্রিকায়। তারপর দেখবে বিক্রি কাহাকে বলে! তুমি তো জানোই আজকালকার মেয়েগুলো কী পরিমাণ ক্রেজি! ওরা কিনবে, পাগল হয়ে কিনবে। আরে বিজনেস তো এমনই। মরুভূমিতে কিভাবে পানি দেখাতে হয় জানতে হবে। তবেই হবে বিজিনেস।

অলংকরণ: আসমা সুলতানা মিতা

মাকে দেখে মনে হচ্ছে উনিই হবে খবিশের প্রথম কাস্টমার। মা পারলে এখনই পার্স খুলে অ্যাডভান্স করে। বহুদিন মাকে আমি এতটা এক্সাইটেড হতে দেখি না। এ যেন মদ না খেয়েও মাতাল। মা যতই এক্সাইটেড হচ্ছে খবিশ কেন যেন ততই পোতায়ে যাচ্ছে। হাওয়া বেরিয়ে যাওয়া বেলুনের দশা! শেষ পর্যন্ত মা বলেই বসলো, কী ব্যাপার তুমি দেখি এখন আর বেশী উৎসাহ দেখাচ্ছ না আমাকে স্যাম্পল এনে দেওয়ার! খবিশের মুখে রাজ্যের লজ্জা। ও এতটা লজ্জা পাচ্ছে কেন আমি বুঝতে পারছি না। খবিশ মনেহয় ভয় পাচ্ছে, যদি মা আরো সুন্দর হয়ে যায় তো ওরে আর পাত্তা দেবে না। তখন খবিশের কী হবে!
আমি চিন্তা করি একটা, আর খবিশ বলে আর-একটা। খবিশের অবস্থা খুবই কাচুমাচু। মা এবং আমি কিছু বোঝার আগেই খবিশ গড়গড় করে কিছু বলে বসে। কথাগুলো পুরোপুরি না বুঝলেও আমি আমার মাথায় রেকর্ড করে রেখেছি। কথাগুলো ছিল এমন।
আসলে এই ধরনের কোন প্রোডাক্টের অস্থিত্ব এডাল্ট ইন্ডাস্ট্রিতে নাই। যা কিছু আছে তার ৯৯% ভুয়া। বিজ্ঞাপনই আসল। মানুষ বিজ্ঞাপনে মুগ্ধ হয়ে জীবনে একবারই কেনে। এটা মানুষকে প্রতারিত করে সহজে টাকা হাতায়ে নেওয়ার মোক্ষম সুযোগ। কোম্পানীর রিফান্ড পলিসিও থাকবে। যে কোন মানুষ প্রডাক্টের গুণাগুণে সন্তুষ্ট না হয়ে ৩০ দিনের মধ্যে প্রেডাক্ট ফেরৎ দিয়ে পূর্ণ রিফান্ড পেতে পারে। কিন্তু এই ধরনের ব্যবসায় রিফান্ডের ঘটনা মাত্র ২%। সবাই প্রতারিত হয়ে চেপে যায়। লজ্জায় কাউকে বলতেও পারে না। তার উপর আছে পরিবারের ভয়। সবাই তো তাদের স্বামীর কাছে গোপন রেখেই কাজ করে।  কাজেই কোনরকম হ্যাসেল ছাড়া পয়সা ধরার এর চেয়ে কোন সহজ উপায় দুনিয়াতে নাই।
মাকে মনে হলো এতক্ষণ কিছুই শোনে নাই। খবিশও একনাগাড়ে বলে হঠাৎ চুপ মেরে গেল। দুইজনই একদম চুপ। মনে হচ্ছে কোন মৃতের সম্মানে নীরবতা পালন করছে। আমি ব্যাপারটার আগামাথা কিছুই বুঝলাম না। শুধু বুঝলাম খবিশ আবারো এডাল্ট সাংবাদিকতার মতই আরও একটা গুরুতর অপরাধে মত্ত।
কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর মা আবার শুরু করে। আচ্ছা, তোমার কী কখনই শুভ বুদ্ধির উদয় হবে না? মানুষকে ঠকানোর আর কত ফন্দি তুমি আঁটবে?
-বেবী, তুমি কেন আমার বুদ্ধিকে কুবুদ্ধি বলছো? এটা একটা প্রতিষ্ঠিত বিজনেস। উন্নত বিশ্বের বিজনেস ফর্মুলা। আমি শুধু তাদের হয়ে কাজ করবো। সবাই তো তাই করছে, তাই না? তার উপর আমি তো কোন গরীব মানুষকে ঠকাচ্ছি না। যারা ক্রেজি, দুহাতে পয়সা কামাচ্ছে, খরচ করার সময় নাই, তারাই এই লাইনে পয়সা খরচ করবে। যারা নিজের রূপযৌবন দেখিয়ে ধান্ধাবাজিতে ব্যস্ত এইসব ধান্ধাবাজদের উপর আমরা একটু ধান্ধাবাজি করছি। তাকে তুমি অনৈতিক বলছো কেন? নৈতিকতার ধারণা কী এখন আর আগের মত আছে? দুনিয়া আগাচ্ছে প্রতিদিন, ধারণাও পাল্টাচ্ছে প্রতিনিয়ত। আজ যা সত্য, কাল তা মিথ্যা। এটাই তো হবে, হওয়ার কথা। যদি না হয় তবেই-না দুনিয়া ধ্বংসের দুয়ারে দাঁড়িয়ে আছে বুঝতে হবে।
বাহ্! খবিশের মুখে এমন  বুদ্ধিদীপ্ত কথা আগে কখনও শুনিনি। ইদানিং টাকাপয়সার সাথে জ্ঞানগরিমা আসছে দেখি ওর পকেটে। জ্ঞানের উৎস কি তাহলে টাকা? তাহলে মানুষ স্কুলে গিয়ে বইপুস্তক না পড়ে টাকা নিয়ে খেললেই তো পারে? টাকা বানানো শিখলেই তো পারে? কে জানে হয়তো তাই করে ওরা! আমি তো বয়েস জটিলতার কারণে স্কুলে যেতে পারছি না, তবে যাবো কিছুদিনের মধ্যেই। তখন না হয় দেখা যাবে স্কুলে মানুষ কী করে।
তবে একথাও ঠিক স্কুলে যাই আর না যাই শিখছি তো প্রতিদিনই। সেই যে মার গর্ভ থেকে শেখার শুরু তার তো আর থামাথামির নাম নাই। সারাজীবন মনে হয় খালি শিখেই যেতে হবে। খবিশকে দেখলাম মাত্র ১৫ কি ১৬ মাসের মধ্যে, এখনও কত কী পারে! জন্মের পর দেখলাম বেকার। তারপর আবিষ্কার হলো সে সাংবাদিক, এখন আবার ব্যবসায়ী। আগে যেখানে কথাই বলতো না, এখন সেই ফটফট করে কত কথাই না বলে। আগে মা বলতো, আর খবিশ শুনতো। টাকা-পয়সা হাতে আসার পর থেকে দেখি খবিশ বলে, আর মা শোনে। তবে আমার মনে হয় খবিশ অনেক দ্রæত শিখতে পারে। সে কি আমার চাইতেও দ্রæত শিখতে পারে? আমি তো হাইব্রিড শিশু। আমার বেলায় সবকিছুই দ্রæতগতিতে হবে। ডাক্তার তো তা-ই বলেছে। খবিশও দেখি সবকিছু দ্রæত করে ফেলছে। অবশ্য পারতেই হবে। হাইব্রিড দুনিয়াতে সারভাইব করতে হলে সবাইকে কমবেশী হাইব্রিড হতে হবে। আর খবিশদের মত মানুষ তা খুব সহজেই ধরে ফেলে।
চলবে।