মাতাল শিশু (১৪/১৫তম পর্ব)/ধারাবাহিক উপন্যাস/ মোয়াজ্জেম আজিম

  •  
  •  
  •  
  •  

 

মোয়াজ্জেম আজিম

১৪তম পর্ব:
মার চেহারা দেখলে ইদানিং আমার খুশিতে ডিগবাজী খাইতে ইচ্ছা করে। উনার কেন যেন মনে হচ্ছে আমি ভাল হয়ে যাব। ডাক্তার সাহেব মনে হয় কোন গোপন তথ্য দিয়েছে। মা ইদানিং খুব হাসিখুশি থাকে সারাক্ষণ, নামাজ পড়া শুরু করেছে। মানুষের সাথে আজাইরা প্যাচাল করা বন্ধ। তবে কেউ ফোন করলে খুব সুন্দর করে কথা বলে। মাঝে-মধ্যে ফোন কেউ করলেও কথা খুব একটা আগায় না। আগে যেখানে মা ফোনের জন্যে কান একটা সববসয় খালি রাখতো, এক কানে দুল পরতো, এখন দুইকানে দুল পরা শুরু করেছে। মা যেন সত্যিকারের বাংলাদেশের মা হওয়ার চেষ্টা করছে। এতদিন কেমন যেন মডার্ণ মা ছিল। কথাবার্তায়, আচার-আচরণে, স্বভাব-চরিত্রে, বন্ধুবান্ধব সবই ছিল উড়াধুড়া। আর খবিশের মত বয়ফেন্ড যার থাকে সে কিভাবে বাঙালী হয়? ও আর-এক কথা তো বলা হয়নি! খবিশ তো চলে গেছে। আর আসবে না। বেশ কিছুদিনই হলো সে গেছে। এবং আজব ব্যাপার সত্যিই সে আর আসছে না। এমনকি গোপনে মুন্নির সাথে দেখা করতেও আসছে না। কয়েকদিন মুন্নি দোকানে গিয়ে ফোন করার চেষ্টা করেছে। ফোন বন্ধ। খবিশ কাউকে কিছু না বলে হঠাৎ করেই একদিন বাসায় ফিরলো না। মা তো মহাচিন্তিত। ফোন করে ফোনও বন্ধ। এক রাত আর এক দিনে মা এমন কাউকে বাকী রাখে নাই ফোন করার, অন্তত খবিশকে যারা চেনে। কেউ কোন সংবাদ দিতে পারলো না। পরের দিন বিকালে খবিশ নিজেই ফোন করে বলে আমি জরুরী কাজে চট্টগ্রাম আসছি। ফিরতে দেরী হবে। মা বলে, আচ্ছা। কিছুক্ষণ পর আবার ফোন করে বলে, আসলে আমি মিথ্যা বলেছি। আমি আর বাসায় আসবো না। আমার খুব কাজের ক্ষতি হয়। লেখালেখি করি তো, একটু নীরবতা দরকার। তাই বাসা নিলাম আজিজ মার্কেটের ১৬ তালায়। মা সবই শুনলো। কিছুই বললো না। শুধু বললো, আচ্ছা।
আমি ভেবেছিলাম মা একটা লঙ্কাকাণ্ড ঘটাবে। ফিটও খাইতে পারে। কয়দিন বিছানায় থাকে আল্লা মালুম! কিন্তু কিসের কি! খবিশের ফোন পাওয়ার পর মা কিছুক্ষণ দম ধরে বসে রইলো। তারপর উঠে বাথরুমে ঢুকলো। অনেকক্ষণ ধরে বাথরুমেই থাকলো, কী করলো এতক্ষণ বোঝা গেল না। বেরিয়ে আসলো যেন সদ্য নেমে আসা পরী। সাদা ধবধবা টাওয়েল দিয়ে মোড়ানো সারা গা ও মাথা। মা যেন সিনেমার নায়িকা। লোশন লাগালো সারাগায়ে যতœ করে। তারপর ডিনারের টেবিলে গিয়ে বসলো। কোনরকম অর্ডার ছাড়াই মুন্নি ঠিকঠিক সবকিছু এনে সামনে রাখলো। মা খেলো, আমাকে খাওয়ালো, মুন্নিকে সুন্দর করে বললো খেতে। বাসার পরিবেশটা সুন্দর কিন্তু কেমন যেন অচেনা আতঙ্ক মিশে থাকলো সারা ঘরে। মা কি এমন কিছু করবে যা আগে করেনি? খবিশকে কি খুন করবে? না, পুলিশে খবর দেবে। ও তো অনেক রকমের দুই নম্বরীর সাথে জড়িত। কিন্তু রাত যায়, দিন যায়, মার মধ্যে কোন ভাবান্তর দেখি না। মুন্নি মাঝে-মধ্যে আতিউতি করে খবিশের জন্যে। মনে হয় ফোনের অপেক্ষা করে, বা ভাবে আসবে। অন্তত ওকে বেডরুমে নেওয়ার জন্যে হলেও আসবে। কিন্তু কিসের কি, সব জল্পনা-কল্পনা মিথ্যা করে দিয়ে খবিশ আজ একমাসেরও উপর একবারের জন্যেও উঁকি দিলো না। একবার ফোনও করলো না। সবচেয়ে বেশী অবাক মনেহয় আমিই হয়ছি। খবিশ আবারও প্রমাণ করলো মানুষ চিনতে আমার আরো কয়েক যুগ দুনিয়াতে পার করতে হবে মদ ছাড়া।
মা খুব স্বভাবিক নিয়মে অফিস যাচ্ছে-আসছে। প্রতি শুক্রবার নিয়ম করে ডাক্তার সাহেবের বাসায় যাচ্ছি। আমারও ভালই লাগে। অন্তত মার মুখ দেখলে মনে হয়, দুর শালা, ড্রিংক করা ছেড়েই দেব। কিন্তু পারি না, বড় বেশী কষ্ট হয়ে যায়। একদিন পারি তাও মায়ের মুখের দিকে চেয়ে, আর ডাক্তার সাহেবও কথায় আর কাজে এত ব্যস্ত রাখে যে কখন কোথা দিয়ে দিন চলে যায় টেরই পাইনা। সকালে গিয়ে চা-নাস্তা করে শুরু করি। দুপুর থেকে শুরু বারবিকিউ। ইদানিং শুক্রবারে বাসার ভিতরে রান্না বন্ধ। আর গ্যাসের চুলা জ্বালানোও বন্ধ। বাগানের খড়খুটো আর ডালপালা দিয়ে চুলা জ্বালানো হয়। তাতে হয় নানারকম সবজি খিচুড়ি। সবই বাগান থেকে নেওয়া। কী যে মজা লাগে! তখন কি আর মদের কথা মনে থাকে নাকি! প্রথম প্রথম মনে হতো একটু মাল পেটে পড়লে নিশ্চয় আরো ভাল লাগতো। সাহস করে মাকে কয়েকবার বলেছিও, কিন্তু মা শুধু ডাক্তার সাহেবের বউয়ের দোহাই দিতো। মহিলা নাকি কড়া করে বলে দিয়েছে। উনার আঙ্গিনায় কোন মদ প্রবেশ করতে পারবে না। ইচ্ছা হয় আসবা, না হয় আসবা না। কিন্তু নো অ্যালকোহল। যা-ই হোক, কী আর করা, এমন সুন্দর বেহেস্তে আসার লোভ সামলাতে পারি না। কিন্তু উনারে কেমনে বুঝায় যে মদ ছাড়া বেহেস্ত হয়না? আওরাতকে বোঝানোর উপায় নাই যে লেজ ছাড়া গরু আর মদ ছাড়া বেহেস্ত একই কথা! যা-ই হোক, অবুঝ জেনানার সাথে ক্যাচাল না করে মোরগ-মুরগীদের সাথে কথা বলা ভাল। মুরগীদের সাথে কথা বলা যায় এবং তারা বোঝে Ñ বিষয়টা প্রথম প্রথম আমাকে খুব অবাক করতো। এত অবাক করতো যে এখন মনে হয় এমন সাধারণ একটা ব্যাপারে আমি এত অবাক হতাম কেন! অবাকের অনুভূতিটা কেমন যেন স্বপ্নে অবাক হওয়ার মত, পরিমাণটা বুঝি না। মনে হয় অনেক, কিন্তু কতটা তা যদি জিগান তো বলতে পারবো না। মুরগীগুলো এখন আমার বেশ বন্ধু হয়ে গেছে। তারা আমি আসলে ডাক্তার সাহেবকে দেখার মতই খুশিতে হৈ-হুলোড় শুরু করে, চিৎকার-চেচামেচি করে পাড়া মাথায় করে। ওদের খুশি দেখলে মনেহয় আমি ওদের নানা, ওদের বাড়িতে বেড়াতে আসছি আম-জাম নিয়ে। মুরগীদের খুশি, খরগোসের আহ্লাদ, সবজি চারাগুলোর সজীবতা, ভেজা মাটির মাদকতা, আর মবিন সাহেবের গল্পের গভীরতা আমাকে মদের চাইতেও বেশী বুদ করে রাখে। শেষ পর্যন্ত এটাই ঠিক হলো যে একদিন মদের রোজা।
কবুল করার পর খুব একটা কষ্ট হয়নি। প্রথম মনে হয়েছিলো হায় হায়, কয় কী? মদ না খেলে আমি বাঁচবো নাকি? আর মদ তো আমি শখ করে খাই না? ডাক্তারের নির্দেশ। না মানলে চিকিৎসা হবে নাকি? যা-ই হোক, কোন জারিজুরিই টিকলো না মার কাছে। তবে এখন দিনটা আমিও এনজয় করি। বেশী করি যখন দেখলাম মা খুশি। মদ না খেয়ে আমার এই দুখিনি মাকে এত খুশি করতে পারবো ভাবিনি। এখন মনে হয় দুর শালা, ছেড়েই দেব, খাবোই না। তবে দেবো, যেদিনই দিই, ছেড়ে দেবো। মার মৃত্যুর আগে মাকে খুশি করার জন্যে হলেও ছেড়ে দেবো। তাতে আমার যত কষ্টই হোক। এখন মাঝে-মধ্যে মিলাই বসে-বসে মদ খেলে আর না খেলে কী অবস্থা হয়। খেলে ভাল লাগে, না খেলে একটু অস্থির লাগে, কী যেন করি-নাই করি-নাই মনে হয়; কোন একটা কাজ বাদ রয়ে গেছে মনে হয়, মনেহয় সবকিছু খালিপেটের মতই শূন্য; চারদিক ফাকা, কোথাও কেউ নাই। শুধু আমি আর আমি বসে আছি। ডাক্তার সাহেবকেও তখন আমিই মনে হয়। একটু বয়স্ক-ভার্শন এই যা। তবে লোকটার কথায় নেশা আছে। উনার কথা শুনেই মনে হয় ইদানিং আমি মাতাল হয়ে যাই। উনি কিন্তু সাধারণত কমকথার মানুষ, কিন্তু পছন্দের বিষয় পেলে অনেক কথা বলতে পারেন। বাইরে থেকে দেখে বোঝার উপায় নাই লোকটার বুকের মধ্যে গল্পের সাগর।  উনার সব কথা রেকর্ড করে আপনাদের শোনাতে পারলে ভাল হতো। সব কথা তো মনে রাখতে পারি না। শুধু জিষ্ট মনে থাকে। উনিও মনে হয় এখন শুক্রবারের অপেক্ষায় থাকেন। আমাদের যখন দরজা খুলে দেন তখন সে কী মধুর হাসি! সবকিছু রেডি করে রাখেন বাগানে। আমি এসে পৌঁছার সাথে সাথে বাগানে চলে যাই। চাচীকে মনে হয় উনার সহ্য হয় না। কিন্তু সারাক্ষণ চাচীর প্রশংসা করেন। ভয়ে মনে হয়। দেয়ালেরও কান আছে। যদি কোন কারণে পৌঁছাইতে পারে উনার কান বরাবর তাইলেই পণ্ডিতি ড্রামের পানিতে ভিজায়ে রাখবে। তবে ভয়ে হোক আর ভালবাসায় হোক, করে তো। আমার মার কপালে তো খবিশের মত একটা খবিশও জুটছে না। ইদানিং মা মনেহয় খুব লোনলি ফিল করে। সারাক্ষণ আমার সাথে কী কী যেন বলতে চায়। ছোট্ট একটা কাজ তাও আমাকে জিজ্ঞেস করে করবে কিনা। আমি তো অবাক। আমাকে কেন জিজ্ঞেস করছো? করবে কি, করবে না, তা তো আমার চাইতে তোমার ভাল জানার কথা। কবে থেকে মা এটা শুরু করেছে তা বলতে পারবো না । তবে খবিশ চলে যাওয়ার পর যে তাতে কোন সন্দেহ নাই। কবে যেন জিজ্ঞেস করে বসে, বাবু, আমি কি টয়লেটে যাবো? তুমি কী বলো?
বিশ্বাস নাই মাকে দিয়ে। কেমন যেন একটু পাগল-পাগল হয়ে যাচ্ছে দিনদিন। নাকি গোপনে নেশা করে? আমার মদ আবার নিজে খেয়ে ফেলে না তো? উনি তো আমার জন্মের আগেই এই কর্ম করে আমাকে নেশাখোর বানিয়েছে! এখন কী করে তা বুঝতে হলে একটু চোখ রাখা দরকার। মা কেমন যেন ছন্নছাড়া বিড়ালের মত। খালি মনে হয় আদর খুঁজে বেড়ায়। কিন্তু এই মহিলা জানে না যে, যে যেটা খোঁজে সে সেটা পায় না। তাই বুদ্ধি করে উল্টাটা খুঁজতে হয়। দেখবেন যা চাইছেন, সেটাই ভুল করে চলে এসেছে। যা-ই হোক, মাকে তো এখন আমার সব বুদ্ধিই দিতে হয় এটাও শিখায়ে দেবো না হয়। আমার তো বয়স আর কম হলো না। এখন দুই। মানে বিশ বৎসর। কিন্তু কেন যেন মনে হয় আমি এখন পঞ্চাশ বছরের বুড়া। সামান্য হাঁটাচলাতেই কাহিল হয়ে যাই, খালি শুয়ে-বসে থেকে টিভি দেখতে ইচ্ছা করে। যদিও মরার চিন্তা এখনও আমাকে পেয়ে বসেনি। হয়তো বয়সের গোলমালের কারণে, আমার যে-সময় যে-ফিলিং হওয়ার কথা তা তো আর হচ্ছে না। হয় কিছ্ ুএকটা তাড়াতাড়ি হয়ে যায়, না হয় দেরী হয়। যেমন আমি সাবালক হয়েছি ২ বছরে মানে ২০ বছরে, আর হাঁটতেই লাগলো ১০ বছর মানে ১ বছর! আমার তো হাঁটার কথা ছিল কয়েক মাসের মধ্যেই। কিন্তু সময়মত হাতপা তো শক্ত হলো না। যা-ই হোক, তাও শেষ পর্যন্ত যে হাঁটতে পারতেছি তা-ই শুক্কুর আলহামদুলিল্লাহ। এখনও কিন্তু সবকিছু ঠিকমত হচ্ছে না। বয়স ২০, চুল-দাড়ি সবে গজাচ্ছে। নুনু কিন্তু বড় হয়ে গেছে আরো আগেই। এখন তো বলা নাই কওয়া নাই যখন-তখন নুনু খাড়ায়ে যায়। মু্ন্নিরে তো ইদানিং আমার কাছে বেশী আসতে দেয় না। ওর ধরাছোঁয়া কেমন যেন মিষ্টি মিষ্টি লাগে। শরীর কেমন যেন নেড়েচেড়ে উঠতে চায়। কাউকে তো এই কথা বলতেও পারি না। বয়সের সাথে সাথে লজ্জাশরমও বাড়তাছে। আগে অবলীলায় যে কোন কথা মাকে জিজ্ঞেস করতে পারতাম, এখন আর পারি না। অবশ্য মা-ই এমন এমব্রেসিং সিচুয়েশন ক্রিয়েট করতো যে আমি অনেকটা বাধ্য হয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যে, ধুর শালা মাকে আর কোন কথা জিজ্ঞেসই করবো না। এই তো কয়েক মাস আগের কথা, মাকে একদিন জিজ্ঞেস করলাম মা, ‘চোদে’ মানে কী? মা তো একেবারে চুপ। কিছুক্ষণ চুপ থেকে চোখমুখ লাল করে আমাকে জিজ্ঞেস করলো, এটা আমি কোত্থেকে শুনেছি। মার চোখমুখের অবস্থা দেখে আমি বুঝতে পারলাম এটা খুবই গুরুতর কথা। মুন্নির নাম বললে ও নিশ্চয় খুন হয়ে যাবে। আমি চুপ করে থাকলাম। মাও চুপ। কিছুক্ষণ পর আমাকে ঠাণ্ডা স্বরে জিজ্ঞেস করে কথাটা আমি কোথায় শুনেছি, কে বলেছে।
মা নিজে থেকেই বলে, মুন্নি বলেছে? না?
আমি মাথা নেড়ে ‘হ্যা’ বলি।
-আর কী বলেছে?
আমি বলবো না, বলে কেঁদে ফেললাম।
মা আরো নরম করে বলে, কিচ্ছু বলবো না, বলো আমাকে আর কী বলেছে।
আমি কাঁদো কাঁদো কণ্ঠে বললাম, বলেছে খবিশ নাকি তোমাকে চোদে!

এই কথা শুনে মা আরো শান্ত হয়ে গেল। আর একটা কথাও বললো না। চুপ করে গিয়ে বারান্দায় অন্ধকারে বসে থাকলো অনেকক্ষণ। তারপর একসময় উঠে এসে আমাকে খেতে দিলো। ওষুধ খাওয়ায়ে ঘুম পাড়িয়ে দিতে আমার সাথে বিছানায় এসে শুলোও, কিন্তু আমি ঘুমানোর আগেই বিছানা থেকে উঠে গেলো। খবিশ তখনও বাসা ছেড়ে যায়নি। রাত তখন কয়টা বাজে আমি জানি না। হঠাৎ গোঙানির শব্দ শুনে আমার ঘুম ভাঙ্গে। সেদিন রাতের অবস্থা ছিল খবিশের বাপের আকামের রাতের চাইতেও ভয়াবহ। আমি কোন আক্কেলে মাকে এই কথা জিজ্ঞেস করতে গেছিলাম! এখন তো দেখি মুন্নিকে মেরেই ফেলবে। আমিও বুঝে না-বুঝে চিৎকার দিয়ে কান্না শুরু করলাম। আমি মনে হয় অনেক ভয় পেয়েছিলাম। তাই চিৎকরটাও হইছিল সেইরকম। মা তাড়াতাড়ি দৌড়ে আমার কাছে আসলো। খবিশও একটু পর এসে মার কাছে দাঁড়ালো। বুঝলাম, আমার চিৎকার মু্ন্নিকে এবারের মত বাঁচিয়ে দিলো। তারপর থেকে কোন কথা মাকে আর আমি জিজ্ঞেস করি না। নিজে পারলে জানবো, না পারলে না-জানবো; তবু মাকে জিজ্ঞেস করবো না। ইদানিং বরং যে কোন কথা মুন্নিকে জিজ্ঞেস করা যায়। ও অনেক কিছু জানে। আমার মত বুদ্ধিমান না। তবে ও ওর মত করে নানা বিষয়ে জ্ঞান রাখে। পরের দিন সকালে মা আর খবিশ বাইরে চলে গেলে মু্ন্নি আমাকে বলেছিল, খবিশ আর মা মিলে ওকে গলায় ওড়না পেঁছিয়ে মাইরে ফেলতে চাইছিলো। ও তো মরেই গেছিলো! আল্লার রহমত আর বড় পীরের দোয়া খালি বাঁচায়ে দিছে। আর আমি যে এত বড় চিৎকার দিলাম তার কোন নামগন্ধ নাই। মু্িন্ন বলে, কই আমি তো কিছু শুনি নাই। যা-ই হোক, তো মা এত ক্ষেপে গেল কেন? তুই কি মিথ্যা কথা বলেছিস?
-না, মিথ্যা বলার আমার কী ঠেকা পড়ছে। সত্যিই কইছি, কিন্তু কেন কইলাম হের জন্যেই তো মাইরটা খাইলাম।
-আর আমি জীবনে সত্য বলবো না। দুনিয়াতে সত্য বলা খারাপ নাকি রে মুন্নি?
-কী জানি, আমি জানি না। তয় মিথ্যা বললে সবাই খুশি হয়। সত্য বললে হয় রাগ।
-ঠিক আছে চল, আমরা আর কোনদিন সত্য বলবো না।
সেই থেকে মার সাথে আমিও সত্য বলা বাতিল করে দিয়েছি। যদি বলে মু্িন্ন তোমাকে আদর করে কিনা। আমি বলি, না। তখন আবার মু্ন্নিকে ঝাড়ি। কই যাই, সত্য বলেও সুখ নাই মিথ্যা বলেও উপায় নাই! ধুর শালা, কথাই কমু না।
ইদানীং সারাদিন মু্িন্নর সাথেই কাটায়। মা চলে যায় অফিসে। খবিশ তো চলে গেছে, আর আসে না। মা মাঝে-মধ্যে ফিরতে দেরীও করে। তখন ফোন করে আমাকে বলে আজ আসতে দেরী হবে। অফিসের পার্টি আছে। মুন্নিকে নানা উপদেশ দেয় আমাকে খাওয়ানো, ওষুধ খাওয়ানো মানে হুইস্কি আর কি। সেই রাতে মাঝে-মধ্যে মু্ন্নি আমাকে একটু বেশীও দেয়। তাতে আমি খুশি। মা না থাকলেই মনে হয় বেশী ফান। মা তো সারাক্ষণই একটা কঠিন নিয়মকানুনের মধ্যে আমাকে আর মু্িন্নকে রাখতে চায়। এরকম দিনে আমার একদমই নিয়মকানুন ভালো লাগে না। নিয়মকানুন না থাকার অনেক মজা!

১৫তম পর্ব:
সত্যি বলতে কি, দ্রুত বড় হয়ে যাওয়ার খবরটি আমার জন্যে ছিল খুবই আনন্দের। আমার শুধু মনে হতো কবে বড় হব, কবে বিয়ে করবো, কবে চাকরী করবো, কবে খবিশকে ঘর থেকে বাইর করে দেবো, কবে মাকে আর চাকরী করতে হবে না, কবে আমি দেখাশোনা করবো সংসারের। কাজেই মার জন্যে যা ছিল আতঙ্কের, আমার জন্যে তা-ই ছিল ফুর্তির। কিন্তু কিছু দিন যেতে-না-যেতেই যখন সত্যিই বড় হতে থাকলাম, তখন দেখি বড় হওয়া শুনতে যত মজা মনে হয় আসলে জিনিসটা খুব কষ্টের। আমার তো প্রথম থেকেই মাথাটা একটু বড় ছিল। এখনও মাথাই বাড়ছে বেশী শরীরের তুলনায়। শরীর সেই আগের মতই হার জিরজিরে, শক্তিহীন। হাত-পা এখনও শক্ত হয়নি, সামান্য হাঁটাচলা করতে জীবন বাইর হয়ে যায় অবস্থা। কিন্তু মাথা, মাথার চুল, এমনকি শরীরেরও নানা যায়গায় চুল গজাতে শুরু করেছে। নুনুটাও বড় হয়ে যাচ্ছে দিনদিন অন্য অঙ্গপ্রতঙ্গের তুলনায় বেশী মাত্রায়। ডাক্তার বলেছে ডিসপ্রোপোর্শনাল গ্রোথ। ডাক্তার এও বলেছে যে ডিসপ্রোপোর্শনাল গ্রোথ অতিমাত্রায় পেইনফুল হয়। ডাক্তারের কথা অবিশ্বাস যে করেছিলাম যে তা না। মনে হয়েছিল, ওকে, পেইনফুল হলে কী আর করা, পেইন নিতে হবে।  কিন্তু পেইন যে এত ভয়াবহ তা বুঝি নাই। মাথাটা এখন প্রত্যেকদিন ব্যথায় ফেটে চৌচির হয়ে যেতে চায়। আমার তখন বেহুশ অবস্থা। কোনো পেইন কিলারে কাজ হয় না। মা মু্িন্ন এমন কী খবিশ পর্যন্ত যতদিন বাসায় ছিল আমার ব্যথায় এতই কাতর হয়ে যেত যে কী করবে বুঝতে পারতো না। ঘরে রান্না-খাওয়া বাদ দিয়ে তখন তিন জন মিলে আমার সেবা-যতেœ নিয়োজিত থাকতো। খবিশ তার সকল ধান্ধাবাজী রেখে ডাক্তার, হাসপাতাল আর ওষুধের দোকানে দৌড়াদৌড়ি করতো। মা আমার শরীরের পেইন নিজের বুকে নিয়ে দম আটকিয়ে বসে থাকতো, আর আল্লাআল্লা করতো নানারকম দোয়াদরুদ পড়ে। কখনও কখনও আর কিছু করতে না পারলে কোরান শরীফ নিয়ে পড়তে বসতো। মা, মুন্নি আর খবিশের অবস্থা হয়ে যেত জাহানদানী ওঠা রোগীর পাশের প্রিয়জনদের মতো। সবাই দেখছে লোকটা মরে যাচ্ছে কিন্তু কারো কিছু করার নাই, করার থাকে না। শুধু মুখপানে চেয়ে বসে থাকা ছাড়া। এই করে করে কতক্ষণ যায় আমি জানি না। তবে একটা সময়ে এসে আমি বেহুশ হয়ে যেতাম। আর কিছু বলতে পারি না; না ব্যথা, না কষ্ট, না সুখ। কিছুই যেন আমাকে আর ষ্পর্শ করতে পারতো না। হঠাৎ করে আমার জীবনের ঘড়ির কাঁটাটা যেন থেমে যেত কিছু সময়ের জন্যে। তারপর নিজে থেকেই আবার চলতে শুধু করতো, টিকটিক, টিকটিক, টিকটিক।

প্রথম যেদিন এমন হয়েছিল মা মু্ন্নি আর খবিশ তিনজনই ধরে নিয়েছিল এটাই আমার জীবনের অন্তিম সময়। এসব মুন্নির মুখে পরে শুনেছি। ও মৃতের জন্যে যে কান্না তা-ই কেঁদেছিল। এবং ওরা ধরে নিয়েছিল আমি মরে গেছি। মুন্নি আর খবিশ নাকি আমি বেঁচে আছি এটা বুঝতেই পারেনি। শুধু মা তখনও আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বসে ছিল কয়েক মিনিট। তাকিয়ে ছিল এক দৃষ্টিতে আমার নীল হয়ে যাওয়া মুখ আর ছোট্ট হাড়জিরজিরে বুকের দিকে। কেননা বুকটাতে তখনও একটা মৃদু কম্পন ছিল।
তারপর বাড়তে শুরু করলো নুনু। বাড়ে নুনু, ব্যথা করে মাথা। কী আজব ব্যাপার রে বাবা! নুনুও ব্যথা করে কিন্তু মাথাই করে বেশী। তারপর বাড়া শুরু করলো পেট। তখনও মাথাই বেশী ব্যথা করে। কিন্তু পেটও তখন কম যায় না। আমি তখন হিসাব করি কার ব্যথা বেশী? মাথার, নাকি পেটের? দেখি, যখন যেটা ব্যথা করে সেটাই বেশী। তবে এখন ব্যথা ওঠার পর বেশীক্ষণ সহ্য করতে হয়নি প্রথমবারের মতো। ডাক্তার তালুকদার মরফিন ইনজেকশন দিয়েছে। ব্যথা ওঠার সাথে সাথে ইনজেক্ট করলে ৫-৭ মিনিটের মধ্যে আমি গভীর ঘুমে তলিয়ে যাই। সুখদুঃখ কিছুই বুঝি না। কেবল ঘুম আর ঘুম। তাতে আমার বাড়ছে ঘুম, আর মার নিশ্চয় বাড়ছে দুশ্চিন্তা। একে তো মদের খরচ, তার উপর এখন মরফিন! বোঝো টেলা! কী করবো; আমি আর এইসব নিয়ে চিন্তা করতে চাই না। যাক, সব কিছু জাহান্নামে যাক! আমি, আমার পরিবার, মা, মুন্নি, খবিশ-সব রসাতলে যাক! মাকে তো আর আল্লার দুনিয়ায় কেউ বোঝাতে পারবে না যে এইভাবে বেঁচে থাকার চেয়ে মরে যাওয়া অনেক ভাল। তাও যদি এই ছেলের ভবিষ্যৎ বলে কিছু থাকতো! যেই ছেলের জীবনচক্র মাত্র ১০ বছরের তারে দিয়া তো আর কিছু আশা করা যায় না? অন্তত মাকে তো আর দেখাশোনা করতে পারবো না? মানুষতো তার ছেলেমেয়েকে লালনপালন করে ভবিষ্যতের চিন্তা করেই, নাকি? আমি  তো তা-ই শুনেছি। কিন্তু কথাটা মনেহয় ঠিক না। বাবা-মা কখনই ছেলেমেয়ে বড় হয়ে তাদের দেখভাল করবে এই জন্যে মনেহয় লালনপালন করে না। তাহলে কেন করে? এই যে আমার মা, সে সবই জানে, আমি কী করতে পারবো আর কী করতে পারবো না; কয় দিন বাঁচবো; কবে আমার মৃত্যু হবে এবং মৃত্যুর আগে মাকে ফকির বানায়ে রেখে যাবো। তারপর বৃদ্ধ বয়সে ভিক্ষা করে বেঁচে থাকবে সে। সব জেনেশুনেই এই মহিলা সবকিছু আমার পেছনে খরচ করছে। নিজের জন্যে একটি টাকাও সঞ্চয় করছে না। নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে কখনও চিন্তা করারও সময় নাই। শুধু আমাকে ডে টু ডে বাঁচিয়ে রাখাই এখন উনার বড় চ্যালেঞ্জ। এবং এই চ্যালেঞ্জে জেতার জন্যে উনি কী না করছে। প্রত্যেকদিন ১২ ঘণ্টা কাজ করে, বসের মনোরঞ্জন করে। শুধু কি তাই, শুনেছি বসের সাথে বসের ক্লায়েন্টদেরও মনোরঞ্জনের দায়িত্ব মার। এবং মা সবই করে যাচ্ছে শুধু আমাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্যে। অবশ্য সবকিছু করা কী কোনো দেবতা যদি এসে বলে যে তোমার ছেলে বেঁচে থাকবে তুমি মরে যাবে, তোমার আয়ু তুমি তোমার ছেলেকে দান করতে পারবে? মা সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে যাবে। মার কাছে গল্প শুনেছি, জগতে আগেও এমন হয়েছে। বাদশা হুমায়ুনের ক্ষেত্রে হয়েছে। কিন্তু মা তো গরীব মানুষ। মার কথা কি আল্লা শুনবে?
মার এই সর্বরকম চেষ্টার একমাত্র সহযোগী এখন মাল্টিন্যাশনাল ওষুধ কোম্পানীগুলো। তারা মাকে বেশ সাহায্য করছে। তবে আমাকে বাঁচাতে, না ওদের প্রফিট বাড়াতে সে-কথা না হয় পরে বলা যাবে। তারা এখন নানারকম ওষুধ আমার উপর পরীক্ষা করছে। বিনিময়ে দিচ্ছে কিছু টাকা, আর বিনামূল্যে সব ধরনের চিকিৎসার বাড়তি সুযোগ-সুবিধা। মার আর না করার কোনো উপায় নাই। মা খুব ভাল করে জানে যে এইসব ওষুধ শরীরের নানা ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে ভবিষ্যতে। কিন্তু তার ভবিষ্যৎ চিন্তা করার সুযোগ কই। উনার যে আজকেই চলছে না। তার সাথে খবিশের নানারকম চালবাজি তো থাকতোই। ও তো পয়সার জন্যে মরিয়া। খবিশ উকিল হিসাবে যুক্ত করতো ডাক্তার তালুকদারকে। তালুকদারের কথা শুনলে আমার মজাও লাগে, আবার চান্দিও গরম হয়ে যায়। কবে যেন মাকে বোঝাচ্ছিল কেন বাংলাদেশে উনারা মানুষের উপরই পরীক্ষা করেন, যেখানে অন্য দেশে করে ইঁদুরের উপর। উনি কয়, যদি বলি যে যান বিশটা ইঁদুর ধরে নিয়ে আসেন। পারবেন? পারবেন না। ঢাকা শহরে বিশটা ইঁদুর ধরে আনতে আপনার লাগবে দুইদিন। আর যদি বলি যে, ২০০টা মানুষ ধরে নিয়ে আসেন, আপনার সময় লাগবে দুই ঘণ্টা। এই মানুষের জঙ্গলে গিনিপিগ বানানোর জন্যে আবার ইঁদুর লাগে নাকি? আর সেটাও বড় কথা না। বড় কথা হইলো ইঁদুরের উপর পরীক্ষাকৃত ওষুধ ততটা রিলায়েবেলিটিও কেরি করে না, যতটা মানুষের উপর পরীক্ষিত ওষুধ করবে। কাজেই মানবজাতির উপকারের কথা চিন্তা করেই আমরা মানুষের উপর নতুন নতুন ড্রাগের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে থাকি। তাতে রোগীর সবচেয়ে বড় বেনিফিট হলো বিনা পয়সায় চিকিৎসা। সাথে বাড়তি কিছু পাওনা। রোগ বেঁচে পয়সা রোজগার, খারাপ কী কন? দুনিয়াতে তো আর কেউ চিরদিন থাকার জন্যে আসে নাই। আল্লা হায়াত যতদিন দিয়া পাঠাইছে ততদিন কোন-না-কোন উছিলায় বেঁচে থাকবোই। আর আল্লা যেদিন ডাক দেয় সেদিন ডাক্তারের বাপের সাধ্য আছে বাঁচায়ে রাখে? তয় মরতে যেহেতু হবেই দুইদিন আগে আর পরে, সেখানে অসুখ নিয়ে ওষুধপথ্যহীন বিছানায় কেগলানোর চাইতে চিকিৎসা ও বাড়তি পথ্যদির জন্যে কিছু টাকা যদি পাওয়া যায়, সাথে কিছু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের চেষ্টা তা আর খারাপ কী কন? সবই তো উছিলা। চিকিৎসকদের উছিলায় তো অনেকে ভাল হয়ে যাচ্ছে, আবার অনেকে বিদায়ও নিচ্ছে। তবে বিদায় নিলেও তা সম্মানের সাথে। না খেয়ে মরার চাইতে আমার মনে হয় গিনিপিগ হওয়া অনেক ভাল।
আমরা শুধু শুনি। কিছু বলি না। বলার কোনো যায়গা থাকলে না হয় মা বলতো। কথা যা বলেছে তা তো আর ফেলে দেওয়া যাবে না। আমাদেরও অবস্থা এখন হয় গিনিপিগ হয়ে চেষ্টা করা, না হয় বিছানায় শুয়ে মৃত্যুর জন্যে আপেক্ষা করা। কাজেই চেষ্টাটাই সবাই বেছে নেবে, তাই না? এইসব যুক্তির পর যখন কোনো ওষুধ কোম্পানী খবর নিয়ে আসে তখন আর মার না করার কোনো উপায় থাকে না। মা যদি পরিষ্কার করে কিছু না বলে তাহলে তালুকদার আবার খবিশকে দায়িত্ব দেয় মাকে বোঝানোর। খবিশ বাসায় এসেই শুরু করতো মাকে বোঝানো। নানা যুক্তিতর্কের পর মা একসময় বাধ্য হয়ে তাদের মতের সাথে একাত্বতা ঘোষণা করতো। অবশ্য আমিও না বলার কোনো যুক্তি দেখি না। কাল কী ক্ষতি হবে সেটা তো আজ বেঁচে থাকলেই কেবল দেখবো, নাকি? যদি আজ মরেই যাই তাহলে আর কালের চিন্তা করে কোন লাভ আছে? ..
চলবে।

অলংকরণ: আসমা সুলতানা মিতা