মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের অহিংসা দর্শন-কাজী মাহবুব হাসান

  •  
  •  
  •  
  •  


কাজী মাহবুব হাসান

কাজী মাহবুব হাসান, অনুবাদক; আগ্রহের ক্ষেত্র বিজ্ঞান ও শিল্পকলার ইতিহাস, এবং সমাজ ও সভ্যতার বিকাশে এই দুটি ক্ষেত্রের মিথস্ক্রিয়া। তিনি লেখালেখি করেন তাঁর ব্যক্তিগত ব্লগ জীবনের বিজ্ঞানে (kmhb.wordpress.com) । প্রকাশিত বই: রিচার্ড ডকিন্সের দ্য গড ডিল্যুশন, দেখার দৃষ্টিভঙ্গি, সভ্যতা: একটি ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি, দর্শনের সহজ পাঠ, দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ, চার্লস ডারউইন: একটি ধারণার বিজয়, দ্য ম্যাজিক অব রিয়েলিটি, বিবর্তন কেন সত্য, দি আনবিয়ারেবল লাইটনেস অব বিয়িং। কাজী মাহবুব হাসান বাস করছেন টরন্টো, কানাডায়।

যদিও ডঃ মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র ( জানুয়ারী ১৫,১৯২৯-এপ্রিল ৪,১৯৬৮) তাঁর লেখা ও অসাধারণ বক্তৃতাগুলোয় সামাজিক নৈতিকতা আর নিউ টেস্টামেন্ট নির্ভর ভালোবাসার উপর অনেকাংশে নির্ভর করেছিলেন, কিন্তু প্রাচ্যের আধ্যাত্মিক দর্শন, মহাত্মা গান্ধীর রাজনৈতিক দর্শন, পৃথিবীর সমস্ত জীবের মধ্যে বিদ্যমান আন্তঃসম্পর্ক বিষয়ক বৌদ্ধ দর্শন এবং প্রাচীন গ্রিক দর্শন তাঁকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। তাঁর অমর দর্শনের মূলে ছিল ধর্ম নিরপেক্ষতা, এবং তাঁর দর্শন আমাদের একক ও সমষ্ঠীগত মানবতাবোধকে আরো বেশী দৃঢ়তর করে তুলতে একগুচ্ছ নৈতিক, আধ্যাত্মিক , সামাজিক ও নাগরিক দ্বায়িত্বকে সমর্থন করেছিল ।
আর এই ধারণাগুলো তিনি ১৯৫৮ সালে প্রকাশিত ‘এন এক্সপেরিমেন্ট ইন লাভ’ শীর্ষক একটি অসাধারণ প্রবন্ধে সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ করেছিলেন। এখানেই তিনি বিভিন্ন উৎস থেকে আসা আধ্যাত্মিক ধারণাগুলোকে সমন্বয় করে সেগুলোকে ধর্মনিরপেক্ষ একটি মূলনীতিতে রূপান্তর করতে চেষ্টা করেছিলেন। যেখানে তিনি ছয়টি আবশ্যিক মূলনীতিকে বিশ্লেষণ করেছিলেন, যা ছিল তাঁর অহিংসা দর্শনের মূল ভিত্তি। এখানেই তিনি অহিংস প্রতিরোধ নিয়ে কিছু প্রচলিত ভ্রান্ত ধারণাকে শনাক্ত করেছিলেন, এবং প্রদর্শন করেছিলেন কিভাবে এই মূলনীতিগুলোকে ব্যবহার করা সম্ভব হতে পারে কোনো সফল অহিংস প্রতিরোধ আন্দোলনে।
ছয়টি মৌলিক দর্শনের প্রথমটিকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ডঃ কিং অহিংস আন্দোলনকে ‘নিষ্ক্রিয়’ কোনো আন্দোলন হিসাবে চিহ্নিত করার সাধারণ প্রবণতাটি নিয়ে আলোচনা করেছিলেন। তিনি দেখিয়েছিলেন যে অহিংস আন্দোলন অবশ্যই ভীরুতার কোনো রুপ নয়, বরং অত্যন্ত সাহসী একটি অবস্থান। তিনি লিখেছিলেন –
‘অবশ্যই গুরুত্বারোপ করতে হবে যে, অহিংস আন্দোলন কখনোই ভীরুদের জন্য উপযুক্ত পদ্ধতি নয়। কারণ এটি প্রতিরোধ করে। কেউ যদি এই পথ অনুসরণ করেন কারণ তার সহিংস প্রতিরোধ করার কোনো উপকরণ নেই বলে, তাহলে অবশ্যই সে সত্যিকারভাবে অহিংস নয়। প্রায়শই গান্ধী বলতেন, যদি ভীরুতাই সহিংসতার একমাত্র বিকল্প হয়ে থাকে, তাহলে যুদ্ধ করারই উত্তম। অহিংস প্রতিরোধের পথ আসলেই শক্তিশালী মানুষদের জন্য। এটি আবদ্ধ নিষ্ক্রিয়তাপূর্ণ কোনো পথ নয়, কারণ কোনো অহিংস প্রতিরোধকারী নিষ্ক্রিয় শুধুমাত্র সেই অর্থে তার প্রতিপক্ষের প্রতি যে তিনি শারীরিকভাবে আগ্রাসী নন, কিন্তু তার মন, চিন্তা আর আবেগ সবসময়ই সক্রিয়, সারাক্ষণই যিনি তার প্রতিপক্ষকে প্ররোচিত করার চেষ্টা করেন, যেন সে তার অবস্থানটি যে ভুল সেটি অনুধাবন করতে পারে। অহিংস আন্দোলন পদ্ধতিটি শারীরিকভাবে নিষ্ক্রিয় হতে পারে, কিন্তু আধ্যাত্মিকভাবে এটি অত্যন্ত তীব্রভাবেই সক্রিয়। অবশ্যই এটি অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে নিষ্ক্রিয় প্রতিরোধহীনতা নয়, এটি অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে সক্রিয় অহিংস প্রতিরোধ’।

এরপর অহিংসতার দ্বিতীয় মূলনীতিটি তিনি উপস্থাপন করেন:
‘অহিংসা প্রতিপক্ষকে পরাজিত অথবা অপমান করার প্রচেষ্টায় ব্যস্ত নয়, বরং  এটি ‘বন্ধুত্ব’ আর ‘দৃষ্টিভঙ্গিগত আচরণকে’ জয় করার চেষ্টা করে। অবশ্যই প্রায়শ অহিংস কোনো প্রতিরোধকারীকে তার প্রতিরোধ করতে হয় অসহযোগিতা আর বয়কটের মাধ্যমে, কিন্তু তিনি বিষয়টি অনুধাবন করেন বেশ আগেই যে এই সবকিছুই নিজেরা কোনো উপসংহারের দিকে নিয়ে যাবেনা, এই কৌশলগুলো মূলত প্রতিপক্ষের মনে নৈতিক লজ্জা জাগরণ করার প্রচেষ্টা। যে পরিণতি তিনি খুঁজছেন সেটি হচ্ছে, পরিত্রাণ মুক্তি ও পুনমিত্রতা। অহিংস আন্দোলনের পরের পরিণতি হচ্ছে একটি সহমর্মিতাপূর্ণ ভালোবাসার সমাজ সৃষ্টি, যেখানে সহিংস আন্দোলনের পরিণতি হতাশাময় তিক্ত আর বিভক্ত একটি সমাজ’।
তাঁর অহিংস দর্শনের তৃতীয় মূলনীতিটি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ডঃ কিং চিহ্নিত করেন প্রতিটি অহিংস আন্দোলনকারীদের বিবেকবান সচেতনায় মনে রাখতে হবে যারা আসলে সহিংস আচরণ করছে তারা অনেকেই ‘নিজেরাই’ সহিংসতার শিকার।
‘অহিংস আন্দোলনের লক্ষ্য অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে বিবেকবান মানুষের সংগ্রাম, এই সংগ্রাম সেই সব মানুষের বিরুদ্ধে কিন্তু নয় যারা ঘটনাচক্রে সেই অশুভ কাজগুলো করছে। অহিংস আন্দোলনকারীরা সেই অশুভ শক্তিকে পরাজিত করার চেষ্টা করে, সেই মানুষটিকে নয়, যাকে সহিংসতা নিজেই তার শিকার হিসাবে ব্যবহার করছে অশুভ কর্ম সম্পাদনে। যদি তিনি বর্ণবাদী বৈষম্যমূলক অবিচারের বিরুদ্ধে সংগ্রামরত থাকেন, তাহলে তার অবশ্যই বোঝার ক্ষমতা থাকতে হবে যে, মূল টানাপোড়েনটি দুটি বর্ণের মধ্যে নয়, বরং সেটি ন্যায়বিচার আর অবিচারের মধ্যে , আলোর শক্তি ও অন্ধকারের শক্তির মধ্যে। আমরা অবিচারকে পরাজিত করার চেষ্টায় সংগ্রাম করছি, কোনো শ্বেতাঙ্গ ব্যক্তিকে পরাজিত করার সংগ্রাম করছি না, যারা কিনা অবিচার আর অন্যায় করতে পারে’।
তৃতীয় মূলনীতিকে মূল্যায়ন করে তিনি তাঁর অহিংস দর্শনের চতুর্থ মূলনীতিটি প্রস্তাব করেন:
‘অহিংস প্রতিরোধকারীদের সেই মানসিক শক্তি থাকতে হবে, যেন তারা যে কোনো কষ্টকে মেনে নিতে পারেন কোনো পাল্টা প্রতিশোধ নেবার কথা না ভেবে। তারা প্রতিপক্ষের আক্রমণকে মেনে নেবেন পাল্টা সেই একইভাবে আক্রমণ না করে। অহিংস আন্দোলনকারী যদি প্রয়োজন হয় সব সহিংসতাকে মেনে নেবেন, কিন্তু কখনোই পাল্টা সহিংসতা প্রয়োগ করবেন না। তিনি কারাবরণ করার সম্ভাবনা থেকে নিজেকে লুকিয়ে রাখবেন না, যদি কারাগারে যাওয়া প্রয়োজনীয় হয়, সেখানে তিনি প্রবেশ করবেন যেভাবে কোনো বর বিয়ের রাতে কনের ঘরে প্রবেশ করেন’।
আর এভাবেই আসলে ডঃ কিং প্রায় ত্রিশ বার কারাবন্দী হয়েছিলেন। অহিংসতা নিয়ে সংশয় প্রকাশকারীদের তিনি অন্য গাল পেতে দেবার মূল্য কি হতে পারে সেটি বোঝাতে প্রস্তাব করেছিলেন,
‘অনর্জিত কষ্ট ভোগ করা আসলেই পরিত্রাণমূলক, কারণ অহিংস আন্দোলনকারীরা জানেন কষ্টভোগ অত্যন্ত শিক্ষণীয়, মানব চরিত্রকে ইতিবাচক দিকে রূপান্তরিত করার জন্য যা আসামান্য ক্ষমতা ধারণ করতে পারে’।
পঞ্চম মূলনীতিটি চতুর্থ মূলনীতিকে একটি অন্তর্মুখী দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে ব্যাখ্যা করেছিলেন ডঃ কিং এবং এখানেই তিনি তার অহিংস দর্শনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতিটি প্রস্তাব করেছিলেন – আমরা যাকে ‘ভালোবাসা’ বলি, সেই ভালোবাসারই মহত্তম ব্যবহার প্রসঙ্গে:
‘অহিংস প্রতিরোধ শুধুমাত্র বাহ্যিক শারীরিক সহিংসতাকে বর্জন করেনা, আত্মার গভীরের সহিংসতাকে প্রত্যাখ্যান করে। অহিংস আন্দোলনে কোনো প্রতিরোধকারী তার প্রতিপক্ষকে শুধুমাত্র গুলি করতেই অস্বীকার করেন না, তিনি তাকে ‘ঘৃণা’ করতেও অস্বীকার করেন। অহিংসার কেন্দ্রে তাই ‘ভালোবাসার’ মূলনীতি অবস্থান করছে। অহিংস নীতিতে প্রতিরোধকারী মানব মর্যাদার সেই সংগ্রামের চেষ্টা করবে, যেখানে শোষিত মানুষ যেন তিক্ত হবার প্রবণতা থেকেও নিজেদের মুক্ত রাখতে পারে, তারা যেন কোনো ঘৃণার আন্দোলনে নিজেদের সংম্পৃক্ত না করে ফেলেন। আর একই ভাবে প্রতিশোধ নিলে কিছুই আসলে অর্জিত হয়না, কিন্তু অবশ্যই সেটি এই মহাবিশ্বে ঘৃণা অস্তিত্বকে আরো তীব্রতর করে তোলে। জীবনে চলার পথে কারো অবশ্যই যথেষ্ঠ বোধ আর নৈতিকতা থাকতে হবে ঘৃণার শৃঙ্খলকে ছিন্ন করার জন্য। আর এটা তখনই করা সম্ভব যদি আমাদের জীবনের কেন্দ্রে ভালোবাসার নৈতিকতাকে প্রক্ষেপ করতে পারি’।
এখানে ডঃ কিং প্রাচীন গ্রিক দর্শনের দিকে তাকিয়েছিলেন, তিনি বলেছিলেন যে ভালোবাসার কথা তিনি বলছেন সেটি ভাবালুতাপূর্ণ অথবা স্নেহময় ধরনের ভালোবাসা নয় – অবশ্যই খুব অদ্ভুত হবে মানুষকে তাগাদা দেওয়া যেন তারা তাদের অত্যাচারীকে স্নেহশীল উপায়ে ভালোবাসবেন, তিনি সহজেই সেটি স্বীকার করে নিয়েছিলেন, বরং তিনি যে ভালোবাসার কথা প্রস্তাব করেছিলেন, তিনি বলছেন সেটি বোঝাপড়া, সহমর্মিতা আর পরিত্রাণমূলক শুভকামনায় সিক্ত ভালোবাসা। গ্রিকরা যার নাম দিয়েছিলেন, agape – যে ভালোবাসা খুবই স্বতন্ত্র, eros থেকে, যে ভালোবাসা আমাদের প্রেমিক কিংবা প্রেমিকার জন্য সংরক্ষিত, অথবা philia থেকে, যে ভালোবাসা আমরা আমাদের পরিবার ও বন্ধুদের প্রতি অনুভব করি। ডঃ কিং ব্যাখ্যা করেন:
‘Agape হচ্ছে বোঝাপড়া, পরিত্রাণ আর প্রতিদানমূলক শুভকামনা যা সব মানুষের জন্য অনুভব করা সম্ভব। এটি উপচে পড়া ভালোবাসা, যা বিশুদ্ধভাবে স্বতঃস্ফুর্ত, উদ্দেশ্যহীন, ভিত্তিহীন এবং সৃজনশীল। এটি যার প্রতি ভালোবাসার নির্দেশিত তার কোনো বিশেষ বৈশিষ্ট্য বা কর্ম দ্বারা পরিচালিত নয়। Agape হচ্ছে স্বার্থশূন্য ভালোবাসা। এটি সেই ভালোবাসা যা মানুষ অনুসন্ধান করে তার নিজের কল্যাণের জন্য নয়, বলং তার প্রতিবেশীর কল্যাণের জন্য। Agape এর সূচনাকে ভালোবাসা পাবার যোগ্য আর কে অযোগ্য, সেই বৈষম্য সৃষ্টি করে নয়, অথবা এটি তারা কি বিশেষ যোগ্যতা ধারণ করে তার উপরও নির্ভর করেনা। এটির সূচনা শুধুমাত্র তাদের খাতিরেই তাদেরকে ভালোবাসার মাধ্যমে। পুরোপুরিভাবে অন্যদের প্রতিবেশী বিবেচনা করে ভালোবাসা, যা প্রতিটি মানুষের মধ্যে সেই প্রতিবেশীকে খুঁজে পায়। সেকারণে Agape বন্ধু আর শত্রুর মধ্যে কোনো পার্থক্য করেনা। উভয়ের প্রতি সেটি নির্দেশিত। যদি কোনো এক ব্যক্তিকে কেউ ভালোবাসে শুধুমাত্র তার বন্ধুভাবাপন্নতার জন্য, তাহলে সে তাকে ভালোবাসছে তার সাথে বন্ধুত্ব করার মাধ্যমে যে উপকারিতা সে অর্জন করতে পারে তার জন্য, সেই বন্ধুর নিজের খাতিরে সেই ভালোবাসার জন্ম হয়নি। পরিণতিতে, ভালোবাসা স্বার্থশূন্য সেটি নিশ্চিৎ করার জন্য শ্রেষ্ঠ উপায় হচ্ছে শত্রু প্রতিবেশীকে ভালোবাসা, যার কাছ থেকে আপনি ভালো কিছু আশা করতে পারেন না শুধুমাত্র বৈরীতা আর নিপীড়ন ছাড়া’।
স্পষ্টতই এই ধারণার সাথে বৌদ্ধ দর্শনের চার স্বর্গীয় দৃষ্টিভঙ্গি বা brahmavihara র সদৃশ্যতা আছে, সেই মেত্তা বা Metta, যাকে প্রায়শই অনূদিত করা হয় ভালোবাসাপূর্ণ দয়াশীলতা হিসাবে বা benevolence বা কল্যাণ করার সংকল্প হিসাবে। স্পষ্টতই এই সমান্তরাল ইঙ্গিত করে মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের অসাধারণ বৌদ্ধিক দক্ষতা, অনুপ্রেরণা আর প্রভাবিত হবার বৈচিত্র্যময় উৎস, আর অর্থপূর্ণ উপায়ে মানবতার সাধারণ লক্ষ্যে জন্য কোনো অবদান রাখার জন্য খুবই উচ্চস্তরের সমন্বয়মূলক সৃজনশীলতা আবশ্যিক। ডঃ কিং সেটি ধারণ করতেন, এবং তার অহিংস দর্শনে জায়গা পেয়েছিল পৃথিবীর সব প্রধান আধ্যাত্মিক ও দার্শনিক চিন্তার মৌলিক সাধারণ বিষয়গুলোয়। তিনি স্পষ্টতই বোঝাতে চেয়েছিলেন, শোষণের কোনো পরিস্থিতেতে দুই পক্ষই কষ্ট ভোগ করে, শোষিত এবং শোষক; কিং এর প্রস্তাবনা ছিল, যে শোষণ করছে সেও নৈতিকভাবে কষ্টভোগ করে, সে কি নিপীড়ন করছে সেটি শনাক্ত করার মাধ্যমে, আর সেটাই তার মতে ভোগ করার জন্য সবচেয়ে ভয়ঙ্কর খারাপ ধরনের কষ্ট। ডঃ কিং বলেন,
‘Agape এর আরেকটি মৌলিক বিষয় হচ্ছে, অন্য মানুষের প্রয়োজনীয়তা থেকে এর উদ্ভব হয়, এবং মানব পরিবারের শ্রেষ্ঠতম অংশের সাথে সংযুক্ত হবার প্রয়োজন থেকে এটি পরিচালিত। যেহেতু শ্বেতাঙ্গ মানুষদের ব্যক্তিত্ব পৃথকীকরণের কারণে এতটাই বিকৃত, তার আত্মা এত বিক্ষত, তার প্রয়োজন আছে কৃষ্ণাঙ্গ কারো ভালোবাসার। কৃষ্ণাঙ্গদের অবশ্যই ভালোবাসা উচিৎ শ্বেতাঙ্গদের, কারণ শ্বেতাঙ্গ মানুষের তার ভালোবাসা প্রয়োজন আছে, তার দুশ্চিন্তা,নিরাপত্তাহীনতা ও ভয় নির্মুল করার জন্য’।
তিনি যুক্তি দেন agape এর কেন্দ্রে আছে ক্ষমা করার ধারণা।
‘Agape দূর্বল, নিষ্ক্রিয় ভালোবাসা না, এটি সক্রিয় ভালোবাসা, Agape হচ্ছে সমাজকে পুনর্গঠন করার জন্য সর্ব্বোচ্চ প্রচেষ্টা করার ইচ্ছা। এটি ক্ষমা করার ইচ্ছা, সমাজকে পুনর্গঠন করার জন্য সাত বার নয়, বরং সত্তর গুণন সাত বার ক্ষমা করা। আমি যদি ঘৃণার উত্তর দেই পাল্টা ঘৃণা দিয়ে, আমি সেই ভাঙ্গা সমাজটির ফাটলটিকে আরো তীব্র করে তুলবো। কোনো বিভাজিত সমাজের মধ্যে দূরত্বকে কমাতে পারি ঘৃণাকে ভালোবাসার সাথে মোকাবেলা করার মাধ্যমে’।
এর মাধ্যমে তিনি তার অহিংসা দর্শনের ষষ্ঠ আর শেষ মুলনীতি আলোচনা করেন, ন্যায়বিচারের শক্তি, যাকে সুরক্ষা করে আধ্যাত্মিকতার একটি ধর্মনিরপেক্ষ রুপ – ডঃ কিং লিখেছিলেন:
অহিংস প্রতিরোধের ভিত্তি যে মহাবিশ্ব, সেটি ন্যায়বিচারের পক্ষে। পরিণতিতে, ভবিষ্যৎ নিয়ে অহিংসতায় বিশ্বাসীরা গভীর একটি বিশ্বাস ধারণ করেন। আর এই বিশ্বাস হচ্ছে অন্য একটি কারণ, কোনো প্রতিশোধ না নিয়ে কেন অহিংস প্রতিরোধকারী কষ্টভোগকে মেনে নেবেন। কারণ তিনি জানেন যে ন্যায়বিচারের জন্য তার সংগ্রামে একজন একটি মহাজাগতিক সঙ্গী আছে। এবং সত্যি যে, অহিংস দর্শনের বিশ্বাসী অনেক অনুসারী আছেন যারা ব্যক্তিগত ঈশ্বর ধারণায় বিশ্বাস করেন না। কিন্তু এই মানুষগুলো বিশ্বাস করেন যে একটি সৃজনশীল শক্তি, যা মহাজাগতিক সামগ্রিকতা রক্ষায় কাজ করে। আমরা এটিকে অচেতন প্রক্রিয়া অথবা একটি অসীম ভালোবাসায় পূর্ণ অসীম ক্ষমতাবান সত্তা যাই বলি না কেন, অবশ্যই সৃজনশীল একটি শক্তি আছে এই মহাবিশ্বে, যা বাস্তবতার বিচ্ছিন্ন অংশগুলোকে একটি সঙ্গতিপূর্ণ সম্পূর্ণতায় নিয়ে আসার জন্য কাজ করে।