মা । পিয়ারা বেগম

  •  
  •  
  •  
  •  

দিনটি ছিল ১৯৯৪ সালের জুলাইয়ের  ৪ তারিখ। আকাশ ছিল মেঘাচ্ছন্ন। গুমোট, থমথমে! কখনো অঝোরে বৃষ্টিধারা। বিষণ্ণ প্রকৃতি! বিষণ্ন ছিল আমার মনও! আজো এমনি দিনে প্রকৃতির বিরূপ-বিরূপতায় মায়ের কথা খুব বেশি মনে পড়ছে। আজ আমার মায়ের ২৭তম মৃত্যু বার্ষিকী! তাই আজ আমার কষ্টের অনুভূতির কথা লিখব। মায়ের মৃত লাশ দেখে কাঁদতে না পারার অক্ষমতা কতটা বেদনাদায়ক তা লিখব। তখন আমি ছিলাম শূন্যতা থেকে নতুন করে ভূমিষ্ঠ হওয়া এক চিরঅভাগিনী। কারণ, জটিল অপারেশনে মুমূর্ষু অবস্থা থেকে বেঁচেবর্তে ওঠেও ছিলাম শয্যাশায়ী। চিকিৎসাধীন ছিলাম ছোট বোন নাহারের বাসায়। আমার মা জননীও ছিলেন সে বাসায়। মা আমাকে ছোট্ট শিশুর মতোই যত্ন-আত্তি করতেন। নামাজ পড়ে এসেই মা আমার পিঠে, মাথায় হাত বুলিয়ে ফুঁ দিতেন। আর মায়ের দু’চোখের পানি গলেগলে গাল বেয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে পড়ত। আজো যেন হৃদপিণ্ডের চোয়ানো রক্তের ধারায় মায়ের সে ফোটাফোটা অশ্রু ঝরার শব্দ স্পন্দিত হয়। আর আমিও স্মৃতিকাতরতায় ক্ষতবিক্ষত  হই। মায়ের মুখ নিঃসৃত সেই কথাগুলো প্রতিধ্বনি হয়ে কানে বাজে। মা বলতেন, “হে আল্লাহ, আমার মেয়েটাকে তুমি সারাইয়া দাও?” এই বয়সে পুত্র শোকের বোজা বহন কইরা বাঁইচা আছি। এই কষ্ট সহ্য করা যে কত কষ্টের এইডা পুত্রহারা মা ছাড়া কেউ বুঝবেনা।”(প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, আমার শ্রদ্ধাভাজন বড় ভাইজান মাত্র ৪৮ বছর বয়সে মারা যান।) তাই মা বলতেন, “আল্লাহ, আমার মেয়েটাকেও তুমি কাইড়া নিওনা। আমার বুক আর খালি কইরা দিওনা। আমার বয়স অইছে, আমার জীবনের বিনিময়ে তুমি আমার মেয়েটারে ভালো কইরা দাও আল্লাহ!” আমি ফ্যালফ্যাল করে মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখতাম। দেখতাম মায়ের অন্তর্নিহিত বেদনাবোধের মূর্তিমান মুখাবয়ব!

নগদ অর্থ, বাড়ি-গাড়ি সহায়-সম্পদ থেকে মায়ের এই গুণগুলো অনেক অর্থেই অনেক অনেক বেশী মূল্যবান।

আমার স্নেহময়ী মায়ের হাতের সেই আলতো ছোঁয়ার স্পর্শ আমি এখনো অনুভব করি। যা ছিল আমার রোগক্লিষ্ট শরীরে আরামপ্রদ সুখানুভূতি! কিন্তু মায়ের এ করুণ আকুতি আল্লাহ কবুল করে নিবেন এটা ভাবি নি কখনো। সুস্থ সবল মা আমার মারা যাবেন ঘুণাক্ষরে ভাবনায় আসে নি। এটা আমি কখনো চাই নি। এই জন্যই আমি নিজেকেই দায়ী করছি। তাই তো এই অনুশোচনার দহন আর কষ্টের দ্যোতনা আজো আমি বয়ে বেড়াচ্ছি। মা নিজের জীবনের বিনিময়ে আমাকে বাঁচিয়ে দিয়ে গেলেন। এ দুঃখ আমার আমৃত্যু থাকবে!

আমি একটু সুস্থ হই। তাই  মা এবং বোনের নিষেধ সত্ত্বেও আমি বাসায় চলে আসি। কথা দিয়েছিলাম মাকে, আমি কয়েকদিন পর আবার আসব। সে যাওয়া আর হয়ে ওঠেনি। গেলাম  মায়ের স্ট্রোক হওয়ার খবর পেয়ে। গিয়ে দেখি মায়ের অসাড় দেহখান বিছানায় নেতিয়ে পড়ে আছে। আমি কান্নায় ভেঙ্গে পড়লাম। ভেতরের অপ্রতিরোধ্য দলা পাকানো খেদ ফেনিয়ে ফেনিয়ে ওঠছে। এক কঠিন বাস্তবের মুখোমুখি আমি!
মাকে সাবেক মিটফোর্ড হাসপাতালে( বর্তমানে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে) ভর্তি করা হলো। দুদিন পর মাকে দেখতে গেলাম। মা পিটপিট করে তাকাচ্ছেন আমার দিকে। চোখের পলক নড়ছে। আমি  আনন্দে গদগদ হলাম। মায়ের সুস্থ হওয়ার আশার আলোটা উজ্জ্বল হলো। পরের দিন আবারো গেলাম। কিন্তু মায়ের পিটপিট চাহনী আর নেই। আশার উজ্জ্বল আলোটা দপ করে নিভে গেল। বুকে চিনচিনে ব্যথা অনুভূত হলো। আমি অসুস্থ হয়ে পড়ছি। তাই ছোট ভাবীর সাথে রাতে ছিলাম হাসপাতালে। সারারাতে মা আর তাকালেন না। ডাকলেও সাড়া দেন না। মাকে নাক দিয়ে তরল খাবার দেওয়া হতো। মায়ের এ অবস্থা দেখে আমি কাঁদতেও পারি নি। আবার সইতেও পারছিলাম না। সারারাত শরবিদ্ধ পাখির মতো ছটফট করেছি।
একটু কেঁদে হালকা হবো সেটাও সম্ভব ছিল না। এ ক্যামন নিয়তি? এ ক্যামন অমোঘতা? সে মুহূর্তে এ পৃথিবীটা আমার কাছে নিষ্ঠুর এক জগত মনে হতো। ইচ্ছে করত, সব হাসপাতালটা ভেঙ্গে-চুরে, দুমড়ে-মুচড়ে সব ওলট-পালট করে দিই। কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলাম না মায়ের এমন অসাড়তা।
তখন কষ্টে বুক চাপড়ায়ে বলতে ইচ্ছে করছে, আমার মা চোখ খুলছে না কেন? কষ্ট! ভীষণ কষ্ট!! এ কষ্ট প্রকাশের কোন ভাষা নেই। এ কষ্টের অনুভূতি মাপার কোন পরিমাপক যন্ত্র নেই। সিটি স্কানে মায়ের বাঁচার নেগেটিভ রিপোর্ট আসে। তখন শোকের মাতম চলছে আমাদের পরিবারে। নয় দিন পর মা মৃত্যুর সাথে যুদ্ধ করে হেরে গেলেন। আমাদের শোকের জলে ভাসিয়ে ছেড়ে চলে গেলেন মা।

আমার মা আমাদের লেখাপড়া করাতে গিয়ে ধারণাতীত কষ্ট করেছেন। এই কষ্টের কোন বাজার মূল্য নেই। তেমনি মায়ের ভালোবাসা, আদর-সোহাগ, মায়ের মুখের মিষ্টি হাসি, এসবেরও কোন বাজার মূল্য নেই। কারণ, এই পৃথিবীতে সবকিছু বাজারমূল্যে পরিমাপ করা যায় না। তাই তো নগদ অর্থ, বাড়ি-গাড়ি সহায়-সম্পদ থেকে মায়ের এই গুণগুলো অনেক অর্থেই অনেক অনেক বেশী মূল্যবান। কেননা,কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে কী মায়ের মুখের হাসিটুকু কিনতে পারব? সুতরাং এগুলো একজন সন্তানের কাছে অমূল্য সম্পদ। তাই তো মায়ের কষ্ট, ত্যাগ এগুলো শতসহস্র ভাষায় বর্ণনা করলেও শেষ হবার নয়। আমার মা আমার কাছে একজন রত্নগর্ভা মা। মায়ের পাঁচজন সন্তানই আমরা সরকারি চাকুরীজীবী। তখনকার সময়ে মেঘনা অঞ্চল ছিল যোগাযোগব্যবস্থায় একেবারে অনুন্নত। চারপাঁচ মাইলের ভেতর কোন স্কুল ছিল না। একজন  গৃহস্ত পরিবারে পাঁচ-পাচঁজন সন্তানকে লেখাপড়া করানো ছিল একেবারেই কঠিন। এমন অসাধ্য সাধন করেছেন আমার মহীয়সী মা।
মায়ের মৃত্যুর অমোঘ মুহূর্তটুকুর কথা মনে হলে এখনো আমার অন্তরাত্মা হুহু করে উথলে ওঠে। বরফ গলা নদীর মতো অশ্রুজলের স্রোতস্বিনী বয়ে চলে সময়ব্যাপী। তাই অশ্রুদিয়ে লেখাটাই হোক আমার স্মৃতির পাতায় মাকে নিয়ে স্মৃতির এলবাম (এক)
মা, মাগো, বর্ষা আসলেই আমার মনের বর্ষায় ঢল নামে, বন্যাস্ফীত বানের জলের মতো।। দিনে এক, রাতে আমি অন্য এক মানবী। আমার কল্পনার চারপাশে কেবলি তুমি। আর বৃষ্টির ফোটায় ফোটায় শুনি আমারই কান্নার প্রতিধ্বনি! স্মৃতিরা আষ্টেপৃষ্ঠে আমার টুটি চেপে ধরে। তবুও আমি তোমা থেকে দূরে থাকতে পারছি না মা! তুমি যে আমার অস্তিত্বে, আমার সত্তায় মিশে আছ। আর আমৃত্যু তা-ই থাকবে। আজ আর নয়, ওপারে ভালো থেকো মা।
তোমার আত্মার চিরশান্তি কামনায় মহামহিম প্রভুর কাছে জান্নাতুল ফেরদৌস প্রার্থনা করছি। আমিন!

পিয়ারা বেগম
: কথাসাহিত্যিক, কবি, প্রাবন্ধিক। 
তারাব, রূপগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments