মিস ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশ-শিমুল শিকদার 

  •  
  •  
  •  
  •  

প্রতি বছর পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের নারীদের মেধা আর সৌন্দর্যের সমন্বয়ে মিস ওয়ার্ল্ড প্রতিযোগিতা হয়। এ প্রতিযোগিতার পেছনে মহৎ এক উদ্দেশ্য থাকে, যাকে বলা হয়, Beauty with a Purpose. প্রতিযোগিতায় পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে আসা সুন্দরী, স্মার্ট আর বুদ্ধিমতী অসংখ্য নারীদের মধ্যে থেকে তীব্র প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে একজন নারীকে মিস ওয়ার্ল্ড খেতাব দেয়া হয়, যিনি পৃথিবীর বিভিন্ন জনকল্যানমুলক কাজের এম্বাস্যাডর হিসেবে এক বছরের জন্য নিযুক্ত হন।

এ প্রতিযোগিতায় শারীরিক সৌন্দর্য্যের পাশাপাশি মানসিক যোগ্যতাকে সমানভাবে গুরুত্ব দেয়া হয়। আর এজন্যই আফ্রিকার কটকটে কালো চেহারার মেয়েদেরও বিশ্ব সুন্দরী হতে দেখা গিয়েছে। সুন্দরীদের বুদ্ধিমত্তা পরীক্ষা করতে প্রশ্নোত্তর পর্ব থাকে। পৃথিবীর সেরা সেরা বুদ্ধিমান মানুষরা এই আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার জাজ হন। জাজদের করা সৃজনশীল প্রশ্নে কে কতো সুন্দর করে উত্তর দিতে পারে, তার উপর ভিত্তি করে নম্বর দেয়া হয়।

মিস ওয়ার্ল্ড প্রতিযোগিতায় ভারতের সুস্মিতা সেনকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, তাঁর একজন নারী হওয়ার বিশেষত্ব কি?
তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, নারী হিসেবে আমি গর্ববোধ করি এই ভেবে যে নারী স্রষ্টার সেরা সৃষ্টি। একজন নারীর গর্ভের দ্বারাই মনুষ্য প্রজাতির বংশবিস্তার ঘটছে ও মানুষ প্রজাতি টিকে আছে।

ঐশ্বরিয়া রাইকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, একজন বিশ্ব সুন্দরীর কি বিশেষ যোগ্যতা থাকা প্রয়োজন?
তাঁর উত্তরটা ছিল এরকম, বিশ্ব সুন্দরীকে এমন একজন সত্যিকারের মানুষ হতে হবে যার হৃদয়ে থাকতে হবে মানুষের জন্য অগাধ ভালোবাসা, থাকতে হবে অসাধারণ মততা। সে ভালোবাসা, সে মমতার ছোঁয়া যেন বর্ণ, জাতি, মনুষ্য তৈরি সীমানা পেরিয়ে পৃথিবীর সমস্ত পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
গত বছরের “মিস ওয়ার্ল্ড প্রতিযোগিতার” প্রশ্নোত্তর পর্বে ভারতের মানসী চিলারকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, পৃথিবীর কোন পেশার চাকুরিতে সর্বোচ্চ বেতন পাওয়া উচিত বলে আপনি মনে করেন? তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, একজন মা তাঁর সন্তানকে বুকে আগলে যেভাবে তিলতিল করে গড়ে তোলেন, আমার মতে তিনিই সর্বোচ্চ বেতনের দাবিদার। আর সে বেতন অর্থে নয়, বরং ভালোবাসা আর যোগ্য সন্মান দিয়েই দেয়া উচিত।

সুস্মিতা সেন, ঐশ্বরিয়া রাই, মানসী চিলার প্রত্যেকেই মিস ওয়ার্ল্ড জিতেছিলেন।
গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশে মিস ওয়ার্ল্ড প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হচ্ছে। আমাদের নারীরা পিছিয়ে নেই। তাঁরাও নিজেদের সৌন্দর্য্য আর বুদ্ধিমত্তা দিয়ে বিশ্বের সামনে দেশকে তুলে ধরবেন। সেরা সুন্দরী বিদেশে গিয়ে দেশের কথা বলবেন, দেশকে প্রতিনিধিত্ব করবেন। আমাদের সুন্দরীরা তাই আমাদের গর্বের বিষয়।

এ বছর মিস ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশ প্রতিযোগিতায় অনেক যাচাই বাছাই শেষে সেরা কয়েকজন সুন্দরীদের একজনকে প্রশ্নোত্তর পর্বে জিজ্ঞেস করা হলো, H2O কি?
H2O অর্থ যে পানি, আমাদের সুন্দরীরা তা জানেন না। এরকম বেসিক প্রশ্নের উত্তর না জানাও খুব বেশী দোষের পর্যায়ে পড়ে না। দোষ তখনই হয় যখন সে উত্তর তাঁর বাড়ির গলির মোড়ের দোকানের নাম পর্যন্ত গিয়ে ঠেকে।
সুন্দরী উত্তর দিলেন, H2O ধানমন্ডির এক রেস্টুরেন্টের নাম।টিভির পর্দায় সুন্দরীর এ উত্তর শুনে পুরো দেশ হতভম্ভ।

আরেক সুন্দরীকে জিজ্ঞেস করা হলো, হলিডেতে আপনি কোথায় যেতে চান?
তিনি উত্তর দিলেন, মক্কায়, ক্বাবা শরিফে।
ওপর এক সুন্দরীকে জিজ্ঞেস করা হলো, আপনি দেশের জন্য কি উইশ করতে চান?
সুন্দরী বেশ আত্মবিশ্বাসের সাথেই উত্তর দিলেন, আমি কক্সবাজারের সমুদ্র ও পাহাড় উইশ করতে চাই।সমুদ্র আর পাহাড়কে উইশ দিয়ে তিনি কি বুঝাতে চেয়েছেন কে জানে?

এই তো গেলো সুন্দরীদের জ্ঞানের দৌড়।
এরপর জাজদের প্রশ্নের ধরন, ইংরেজি মিশ্রিত বাংলার অদ্ভুত এক ভাষায় তাদের কথাবার্তায় মনে হয় কি এক অদ্ভুত এক উটের পিঠে চড়ে আমাদের সময় চলছে। এদেরই একজন জাজ সুন্দরীকে প্রশ্ন করলেন, তুমি কি চাঁদে যেতে চাও না কি মিস ওয়ার্ল্ড হতে চাও?
অপর এক জাজ প্রশ্ন করলেন, নাসার রিসার্চে দেখা গেছে ৩৬৫ দিনে একদিন পৃথিবীতে উল্কাপিণ্ড হয় না। সে দিন কোনটা?
আমার বিশ্বাস, এ প্রশ্ন শুনে শুধু বাংলাদেশেরই না, পৃথিবীর যে কোন সুন্দরীরই ধাঁধা লেগে যাবে। আমাদের সুন্দরী উত্তর দিতে পারছে না দেখে জাজ উত্তরটা দিয়েই দিলেন, শবে কদরের রাতে পৃথিবীতে কোন উল্কাপিণ্ড হয় না।
এই আজগুবি তথ্য জাজ সাহেব কোথায় পেলেন জানতে ইচ্ছে করে।

আরেক জাজ প্রশ্ন করলেন, তুমি যদি স্পেসে যাওয়ার জন্য ডোনাল্ট ট্রাম্প, পুতিন অথবা আবদুল হামিদ যেকোন একজনকে নিতে পার, কাকে নিবে ? সুন্দরীও কম গেলেন না। উত্তর দিলেন, আবদুল হামিদ, কারণ তিনি একজন লইয়ার এবং সাবেক স্পিকার এবং তিনি অনেক হাসাতে পারেন।মনে হচ্ছিল, যেমন গুরু তেমন তাঁর শিষ্য।

‘মিস বাংলাদেশ’ খেতাব অর্জনের বিষয়টিকে ছোট করে দেখার সুযোগ নাই। বিজয়ী মিস বাংলাদেশই আন্তর্জাতিক একটা প্ল্যাটফর্মে আমাদের দেশের প্রতিনিধিত্ব করতে যাচ্ছে। এ তো আমাদের জন্য অনেক সুখবর। কিন্তু এতো বড়ো এক প্লাটফর্মে যারা সুন্দরী হয়ে পরীক্ষা দিচ্ছেন আর যারা পরীক্ষা নিচ্ছেন দুই গোষ্ঠীরই বুদ্ধিমত্তার মানদণ্ড নিয়ে প্রশ্ন জাগে। অদ্ভুত এসব প্রশ্ন আর উত্তর শুনে আমাদের জ্ঞানের দৌড়াত্ব বোঝা যায়, অনুমান করা যায় আমাদের মস্তিষ্কের কতটুকু অবনতি ঘটেছে। ঘটনাটি ছোট্ট কিন্তু যে বার্তা দিচ্ছে তা উপেক্ষা করার মতো না।

আমাদের দেশের খাদ্যে ভেজাল, বাতাসে ভেজাল, নীতিতে ভেজাল, দুর্নীতিতে ভেজাল, রাজনীতিতে ভেজাল, শিক্ষায় ভেজাল, ইতিহাসে ভেজাল, …. শেষমেশ বাকি থাকে যে বুদ্ধিবৃত্তি, তাকেও যদি ভেজালে ধরে তাইলে আর বাকি রইলো কি? দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের সমাজের প্রতিটি স্তরে, প্রতিটি ভাঁজে, প্রতিটি পরতে মস্তিষ্কহীন নির্বোধ মানুষদের বিচরন আর দাপট চলছে। এ থেকে আর যেন মুক্তি নাই।

শিমুল শিকদার
গল্পকার, নাটক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা
সিডনি, অস্ট্রেলিয়া।