মুক্তি । গল্প । মো. আমির হোসেন

  •  
  •  
  •  
  •  

পাখি পুষতো ছেলেটি। দুরন্ত হলেও নিজস্ব জগৎ ছিল তার। ওর বয়সীরা যখন মোবাইল গেইমে ব্যস্ত তখন সে পাখিদের নিয়ে মজে থাকতো। ছেলেটার নাম আবীর। বয়স ১৪ বছর। অষ্টম শ্রেণির ছাত্র। মায়ের তুলনায় দুই ফুপুর ভালোবাসা বেশি পায় সে। ফুপুদের নয়নের মণি। বড় ফুপু মায়ের প্রতিরূপ। আবীরের মানসিকতা বড় ফুপুটাই বেশি বুঝে।

মফস্বল শহরে বাড়ি। বাবা চাকুরে, মা গৃহিণী, দাদুভাই আছে, দাদাভাই নেই। পরিবারের একমাত্র নবপ্রজন্ম আবীর। তারপর ছেলে বাচ্চা। বাবা ছাড়া বাকিদের শাসনকে শাসন বলা চলে না। পড়ায় মনোযোগী বেশি বলা যাবে না। আবার কম বললেও অবিচার হবে। ঘরে কয়েকটা মোবাইল। ফুফুরা এলে তো কথাই নেই। ফুফুদেরও সংসার আছে। সেই সংসার থেকে সে দূরে থাকলেও সেখানেও তার রাজত্ব। সব সংসারেই সে সবেধননীলমণি। ভার্চুয়াল যোগাযোগে সে তার অধিকার বুঝে নেয়। কিন্তু যন্ত্রগুলো মানে মোবাইল তাকে টানে না। জীবন্ত জিনিসের প্রতি তার মায়া বেশি। গাছ, পাখি তার ভালোবাসার ধন। পাখিকে বন্দী করে সে আনন্দ পায়। ইস্কুলে যাওয়ার আগে ও পরে গাছ এবং পাখিদের সেবা করে।

দাদুভাই কাছে পেলেই মাথায় হাত দেয়। মাথা কি তার বেশি পছন্দ? না-কি চুল? প্রায়ই দীর্ঘশ্বাস ফেলে। চোখ দুটো চকচকে হয়ে উঠে। বাইরের দিকে তাকায়। বুড়ির মুখের গল্পগুলো বিশ্বাস হয় না। দাদু তো বলে, সব সত্য ঘটনা। এই যে বাড়ি এখানে পুকুর ছিল। চারপাশে ধানের জমি ছিল। শিয়াল, সাপ এমনকি ভূতও ছিল। মিটিমিটি হাসে আবীর। স্কুলের স্যার-ম্যাডামরা বলেছেন ভূত বলতে কিছু নেই। তাইলে দাদু ভূত দেখলো কীভাবে? জ্বীনপ্রেতও নাকি মানুষকে ধরতো। ঘাড় মটকে মেরে ফেলতো। মরা মানুষের মুখে না-কি মাটির চাকাও দেখেছে। বড্ড ভাবে আবীর। ফুপু থাকলে ফুপুর সাথে সে ঘুমায়। অনেক গল্প বলেন ফুপু। ফুপুর গল্প আর দাদুর গল্পের মিল কম। দাদুর মুখে শোনা গল্প রূপকথা মনে হয়। এইতো সেদিন দাদু বললো কলেরা- ডায়রিয়ায় অনেক অনেক মানুষ মারা যেতো। কী বোকারে বাবা, একটু স্যালাইন বানিয়ে নিলেই হতো। আবীরের হাসি দেখে দাদু জিজ্ঞেস করে-
-কীরে ভাই হাসি, কেন?
-তোমরা চিনি আর লবণ দিয়ে একটু স্যালাইন বানিয়েও খাওয়াতে পারনি।
দাদুর ঝুলে যাওয়া চামড়ার মুখেও রাজ্যের হাসি-
-কী যে কও ভাই! তখন কি এসব আবিষ্কার হইছে?
-এই সামান্য জিনিসটাও হয়নি? ফোন কইরা ডাক্তার ডাকতে। এম্বুলেন্স ডেকে হাসপাতালে নিলেই পারতে।
বুড়ি ওকে কীভাবে বুঝায় সেকালের কথা। কেমন কইরা সব পাল্টাইয়া গেলো। ডাক্তার, হাসপাতাল, এম্বুলেন্স তো এই সেদিনের কথা! জেনারেশন গ্যাপ হলে যা হয়।
-দাদু ভাইরে। তরে কেমনে বুঝাই। আমরা কেমন ছিলাম?
-ধুর দাদু! সব কথায় তুমি মিছে কও ক্যান? এই যে ফার্মেসিটা। ওখান থেকে ডাক্তারকে আইন্না স্যালাইন পুশ করতে।
-দাদু ভাইরে। এখানে ফার্মেসি তো দূরের কথা। কোন ঘরবাড়িই ছিল না।
আবীর ভেবে পায় না, ওতো জন্মের পর থেকেই ঘরবাড়ি দেখছে। ওর মন থেকে সন্দেহ যায়ই না-
-আচ্ছা দাদু, ফুপুরা ঢাকায় থাকে। তখন ঢাকায় গেলেই পারতে।
-বুড়ি তো হাসতে হাসতে শেষ।
-তখন কি ওরা ছিল?
-ছিল না মানে! আমি তো দেখি ফুপু দুজনেই ঢাকায় থাকে। ছোট ফুপু চাকরিও করে।
বুড়ি চুপ করে ভাবে, কী উত্তর দিবে? বুড়ি যখন ছোট ছিল তখন তারও দাদি ছিল। বাবামা ছিল। বাবা তো ছিল ভয়ের কিছু। মা ভয়ে কাঁপতেন। কখনও নাম ধরে ডাকতেন না। ওগো, হ্যাঁগো, শুনছেন এভাবে কথা বলতেন। বাবা তো মাকে তুই কইরা কইতেন। ঘরের বাইরে মা যাইতেন না। কোন গাড়িঘোড়া ছিল না। পাল্কি ছিল। যাদের টাকাপয়সা ছিল তারা বেয়ারা ডেকে বাড়ির ভিতরে পাল্কি আনতেন। বেয়ারারা বেরিয়ে গেলে বউ পাল্কিতে বসতেন। কাপড় দিয়া ঢাইকা দিত সব। বর সাথে সাথে হাঁটতেন। কেউ কারোর চোখের দিকে তাকানোরও সুযোগ ছিল না। বুড়ির দাদি যখন তাঁর শৈশবের কথা বলতেন, তখন রূপকথা মনে হইতো। এখন তার গল্প নাতি রূপকথা মনে করে। স্কুল কলেজ বলতেই ছিল না। বুড়িই প্রথম তাদের বাড়ি থাইকা প্রথম স্কুলে যায়। প্রাইমারি স্কুলে থাকতেই বুড়ির বিয়ে হয়। বুইড়ার বয়স তখন ১২/১৪, বুড়ির বয়স ৯/১০। আর এখন? কী তাজ্জব ব্যাপার! তার মেয়েরাই সোয়ামিরে নাম ধইরা ডাকে। দুইজনে হাত ধইরা রাস্তা দিয়া হাঁটে। লাজশরম এক্কেবারে উইঠাই গেলো। বুড়ি নাতির মাথার চুল নাড়তে নাড়তে লম্বা শ্বাস ছাইড়া কয়-
-হরে ভাই। তোর ফুপু চাকরি করে। আমি যখন এই বাড়িতে আসি তখন তোর দাদার বয়স কত ছিল জানিস?
-তুমি এই বাড়িতে আসছো মানে? এইটা তোমার বাড়ি না?
বুড়ি হাসে আর কয়-
-হরে ভাই, এইটা আমার বাড়ি। তয় একদিন এই বাড়ি আমার ছিল না।
– কার ছিল দাদু?
-আমার শ্বশুরের বাড়ি। আমি এই বাড়ির বউ।
-কী কও দাদি। তোমারও ফুপুদের মতো বিয়া হইছিল?
বুড়ি তো হাসতে হাসতে শেষ। নাতিরে জড়াইয়া ধইরা কয়-
-তোর দাদার সাথে আমার যখন বিয়ে হয়, তখন তোর দাদার বয়স তোর সমান।
-কও কি! পুলিশ আইসা দাদারে তোমারে ধইরা নিয়া যায় নাই। টিভিতে দেখ না বাল্য বিয়ে অন্যায়।
বুড়ি হাসে আর কয়-
-দাদু ভাই। তখন এই বয়সটাই ছিল বিয়ার বয়স।
তাজ্জব হয়ে যায় আবীর। ওর মনে কৌতূহল জাগে। সে বলে-
-তোমার বিয়ের গল্প শোনাও।
আমার বিয়ে। সেই অনেক দিন আগের কথা। চোখ বন্ধ করলেই মনে বিয়ের কনে আমি। বরটা রুমাল মুখে দিয়ে আড় চোখে তাকিয়ে আছে। হঠাৎ নাতির প্রশ্ন-
-আচ্ছা দাদু। কোন কমিউনিটি সেন্টারে তোমার বিয়া হইছিল?

হাসতে হাসতে বুড়ি কাঁপছে। এতো হাসা যায়? কত সহজসরল এই নাতি। চোখে চোখে পাহারায় রাখার এই পরিণতি। খাঁচায় বন্দী পাখির সাথে এদের কোন পার্থক্য নেই। ওদের আকাশ নেই, উন্মুক্ত বিচরণ নেই। আছে খাওয়া আর ঘরের বারান্দাটুকু। স্কুলে নিয়ে যায় আর আনে। এই বিদ্যালয়ে গিয়ে বইপড়াটুকুই পাখি থেকে ভিন্ন। হাসি কমিয়ে বুড়ি বলে-
-আমাদের কালে কমিউনিটি সেন্টার ছিল না, আমাদের মায়ের মুখের ভাষাও এমন ছিল না।
-কোথায় বিয়ে হলো?
-আমাদের বাড়ির উঠুনে!
কথাটা শেষ হওয়ার আগেই আবীর কুটকুট করে হাসতে থাকে। দুই হাত দিয়ে সুড়সুড়ি দিতে থাকে দাদুকে।
দাদু বুড়িও হাসে। চমৎকার পরিবেশ-
-তোমরা এতো খেত আছিলা?
-খেত কিরে ভাই?
-হাহাহা দাদু! তারপর?
-কলাগাছ দিয়ে বিয়ের গেইট বানানো হইছিল। বাড়িঘর ঘুড্ডির রঙিন কাগজ কেটে সাজানো হইছিল। লাউডস্পিকার বাজছিল।
-ডিজে হয়নি দাদু?
-এইটা আবার কিরে ভাই?
-ইটা আবার কিরে ভাই?
-ধুর! তুমি এক্কেবারে খেত।
বুড়ি খেত শব্দের অর্থ না বুঝেই বলে
হ-রে ভাই। আমি খেত বইলাই তোর বাবাকে মানুষ করতে পারছি।
ভালো কথা মনে করছো দাদু।
-আমার মনে একটা কষ্ট দাদু।
-কী কষ্ট ভাই?
-আমি একটা এলবাম দেখেছি। মা-বাবার বিয়ে। সবাই আছে ছবিতে। শুধু আমি নাই! আমাকে কেন নিয়ে যাওনি?
বুড়ি এক্কেবারে থ! কঠিন প্রশ্ন-
-মায়ের কাছে জানতে চেয়েছিলাম। মা ধমক দিয়েছে।
-তারপর?
-বাবাকেও জিজ্ঞেস করতে পারিনি ভয়ে। তুমিও কিছু বললে না। আমি কেন নেই?
বুড়ি চুপ হয়ে যায়। ঘুমানোর ভান করে। আবীর বলতে থাকে-
-বড় ফুপু আসুক। এজমাত্র বড় ফুপুই বিচারটা করতে পারবে।
ফুপুর প্রতি তার অগাধ বিশ্বাস।

ফুপু ঢাকায়। দেশময় করোনা। স্কুলকলেজ বন্ধ। ঘরে বন্দী থাকতে থাকতে আবীর বুঝতে থাকে খাঁচায় বন্দী পাখির কষ্ট। তাই খাঁচার দরোজা খুলে পাখি ছেড়ে দিয়েছে। পাখিগুলো ডানা মেলেছে আকাশে। ও বারান্দার গ্রিল ধরে দেখছে আর ভাবছে- কবে করোনা যাবে? কবে সে মুক্ত হয়ে স্কুলে হাসবে, খেলবে, পড়বে?

অলংকরণ: আসমা সুলতানা মিতা

প্রফেসর মো. আমির হোসেন
অধ্যক্ষ, ঘিওর সরকারি কলেজ, মানিকগঞ্জ
কবি, ঔপন্যাসিক, গল্পকার, প্রাবন্ধিক ও গীতিকার।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments