মেলবোর্নে দূর্যোগ এবং কারফিউ, থামছে না সংক্রমণ ও মৃত্যু

  •  
  •  
  •  
  •  

মিতা চৌধুরী, মেলবোর্ন থেকে: মেট্রোপলিটন মেলবোর্ন ও রিজিওনাল ভিক্টোরিয়াতে দ্বিতীয় দফায় কোভিড-১৯ সংক্রমণ ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে। মেলবোর্নে এই প্রথম দূর্যোগপূর্ণ স্টেজ ফোর বা চতুর্থ পর্যায়ের জরুরী অবস্থা এবং কারফিউ গত চারদিন ধরে জারি রয়েছে । এতো কঠোরতার মধ্যেও গতকাল রাজ্যে রেকর্ডসংখ্যক ৭২৫ জন নতুন করে আক্রান্ত হয়েছেন এবং ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। এই নিয়ে ভিক্টোরিয়া রাজ্যে মোট মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৭০ জনে। পুরো দেশে মৃতের সংখ্যা ২৫৫ জনের অধিকাংশই এখন ভিক্টোরিয়াতে।

গত প্রায় দুই সপ্তাহে এই আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েছে কোনোরকম প্যাটার্ন ছাড়াই। গত ২২ জুলাই থেকেই মেট্রোপলিটন মেলবোর্ন ও মিচেল শায়ের এর বাসিন্দাদের জন্য ফেস মাস্ক বা মুখ ঢাকা বাদ্ধতামূলক করা হয় এবং এই আদেশ অমান্যে জরিমানা জারি করা হয়। সরকার ও স্বাস্থমন্ত্রণালয়ের আশা ছিল এই মাস্ক পড়া বাদ্ধতামূলকের ফলই হয়তো সংক্রমণ কমে আসবে। কিন্তু কোনো ভাবেই যেন নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না এই অদেখা শত্রুকে। গত ৩০ জুলাই শুধু ভিক্টোরিয়া রাজ্যেই মোট ৭২৩ জন নতুন কোভিড আক্রান্ত হয় এবং ১৩ জন মৃত্যুবরণ করেন যা গত মার্চ মাস থেকে শুরু হওয়া এই মহামারিতে শুধু ভিক্টোরিয়া নয় সমগ্র অস্ট্রেলিয়ার জন্য সর্বোচ্চ রেকর্ড সংখ্যা ছিলো, গতকালের ৭২৫ জনের সংক্রমণ সেই রেকর্ডকেও অতিক্রম করলো। ভিক্টোরিয়ার প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা জানান অতি আশঙ্কাজনক হারেই বাড়ছে কমিউনিটি সংক্রামণ, এবং এই রেকর্ডসংখ্যক সংক্রমণ যা উদ্বেগের ও আশংকার বিষয়। বিগত কয়েকদিন ধরেই সরকারের কাছ থেকে নতুন নিয়মজারির আভাসপাওয়া যাচ্ছিলো।

দুর্যোগপূর্ণ রাজ্য ঘোষণা:
গত ২জুলাই বিকেলে নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে ভিক্টোরিয়ার প্রিমিয়ার ড্যানিয়েল এন্ড্রুস ভিক্টোরিয়া রাজ্যকে সন্ধ্যা ৬টা থেকে দুর্যোগপূর্ণ বলে ঘোষণা দেন। সেইসাথে মেট্রোপলিটন মেলবোর্নে চতুর্থ ধাপের ও রিজিওনাল ভিক্টোরিয়াতে ধাপের বিধিমালা আরোপ করে চলতি লকডাউন আরো ৬ সপ্তাহের জন্য বর্ধিত করেন। এই চতুর্থ ধাপের নতুন বিধিমালার কারণে বেশকিছু নতুন নিয়ম জারি করা হয় ভিক্টোরিয়া বাসীর জন্য।

ভিক্টোরিয়া রাজ্যের প্রিমিয়ার ড্যানিয়েল এন্ড্রুজ 

কারফিউ :
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং কমিউনিটি সংক্রমণ কমাতে গত ২জুলাই রাত ৮টা থেকে ভোর ৫টা পর্যন্ত রাজ্য জুড়ে কারফিউ জারি করা হয় যা প্রতিদিন চলতে থাকবে আগামী ৬ সপ্তাহ পর্যন্ত। এই কারফিউ চলাকালীন সময়ে কোনো ব্যক্তি কাজ, ঔষধ বা স্বাস্থসেবা, অন্য কোনো রোগীকে সেবাদান ছাড়া তার আবাসস্থলের বাইরে যেতে পারবে না।

যা করা যাবে আর যা করা যাবে না :
আবাসস্থল থেকে ৫কিঃমিঃ সীমানা চতুর্থ ধাপের এই লকডাউনে বিধিনিষেধে গুরুত্বপূর্ণ যে নতুন নিয়মটি যোগ হয়েছে তা হলো কোনো ব্যক্তি তার আবাসস্থল থেকে সর্বোচ্চ ৫কিঃমিঃ রেডিয়াসের মধ্যে বাজার, শারীরিক অনুশীলন বা হাটতে যেতে পারবেন।

এক্সারসাইজ : নিজ আবাসস্থল থেকে ৫কিঃমিঃ রেডিয়াসের মধ্যে দিনে সর্বোচ্চ ১ ঘন্টা বাইরে শারীরিক অনুশীলন, হাঁটা  বা দৌড়ানো যাবে। একই পরিবারের একজনকে সঙ্গে নেয়া যাবে। ছোট বাচ্চাদের জন্য এই নিয়ম শিথিল, এই বিষয়ে প্রিমিয়ার এন্ড্রুস বলেন, ” যাদের ছোট বাচ্চা আছে এবং সঙ্গে নিত্য হয় বা বাসায় একা রেখে যাওয়া যায়না তাদের জন্য অবশ্যই এই নিয়ম শিথিল যোগ্য”।

মেলবোর্নের স্থানীয় সুপারশপে নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের কেনাকাটার লাইন।

বাজার ও কেনাকাটা : সকল সুপারমার্কেট, মুদিদোকান, মাংসের দোকান, বেকারী যথারীতি খোলা থাকবে, এইসকল ব্যবসা বা ব্যবস্থাপনা এই নিয়মের মধ্যে পড়বে না। কোনো ব্যক্তি তার আবাসস্থল থেকে ৫কিমি রেডিয়াসের মধ্যে থাকা কোনো দোকান বা সুপারস্টোর বাজার করতে যেতে পারবেন।একই পরিবারের একজন ব্যক্তি দিনে একবার বাজার করতে বের হতে পারবেন। তবে এই নিয়ম বয়স্ক ব্যক্তিদের জন্য শিথিল। উল্লেখ ভিক্টোরিয়া ও সমগ্র অষ্ট্রেলিয়া জুড়েই পেন্ডেমিক কালীন সময়ে ক্রেতাদের মাঝে আতঙ্ক বিরাজ করতে দেখা গেছে, যার ফলস্বরুপ সুপারমার্কেটগুলোতে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির ব্যাপক ঘাটতি ও অব্যবস্থাপনা দেখা দেয় মার্চের শুরুর দিকে যা পরে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে আসে। সেই বিষয় মাথায় রেখেই প্রিমিয়ার এন্ড্রুস বার বার করে ভিক্টোরিয়াবাসীকে আস্বস্ত করে বলেন, “আমি সকল ভিক্টোরিয়াবাসীকে নিশ্চিত করে বলতে চাই, সুপারশপ, মাংসের দোকান, মুদিদোকান, বাকরী , কাঁচাবাজার এইসকল ব্যাবস্থাপনাতে কোনো প্রভাব পড়বে না”। তিনি আরো বলেন, “আমি সুনিদৃষ্ট করে বলতে চাই, কোলস, উলওয়ার্থস বা আপনার লোকাল মাংসের দোকানে অযথা ভীড় করার কোনো কারণ নেই, এগুলো সবই খোলা থাকবে।

স্কুল ও শিক্ষা কার্যক্রম : আগামী ৫ অগাস্ট থেকে মেলবোর্ন মেট্রোপলিটন ও রিজিওনাল ভিক্টোরিয়ার সকল স্কুল আবারো বন্ধ হচ্ছে। আগামী ৪ আগস্ট সকল স্কুল পিউপিল ফ্রি ঘোষণা করা হয়েছে, আর আগামী ৫ আগস্ট থেকে সকল শিক্ষা কার্যক্রম অনলাইনে দূরশিক্ষণ পর্যায়ে পরিচালনা করা হবে। সকল চাইল্ডকেয়ার ও কিন্ডারগার্টেনও বন্ধ থাকবে এবং তাদের কার্যক্রম অনলাইন ভিত্তিক পরিচালিত হবে। তবে যে সকল শিশু বা শিক্ষার্থীরা বিশেষ চাহিদার বা কর্মজীবী বাবা-মা  কাজের জন্য বাইরে যেতে বাধ্য ও বাসায় তাদের সন্তানদের দেখাশুনা করতে সক্ষম নয় সেই সকল শিশু ও শিক্ষার্থীরা যথারীতি স্কুল কিন্ডারগার্ডেন বা চাইল্ডকেয়ারে যেতে পারবে।

ট্যাক্সি/উবার: ট্যাক্সি উবার বা শেয়াররাইডিং কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে তবে সকলের মাস্ক পড়া বাধ্যতামূলক।

রেস্তোরাঁ/ক্যাফে: ক্যাফে বা রেস্টুরেন্ট বন্ধ থাকবে শুধুমাত্র ক্লিক ও কালেক্ট বা টেকওয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে।

গণপরিবহন : সীমাবদ্ধ ও রাতের কিছু ট্রেন চলবে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বাড়তি প্রোটেক্টিভ সার্ভিস অফিসার প্রয়োগ করা হবে।

বিয়ের অনুষ্ঠান : সকল প্রকার অনুষ্ঠান বিয়ের অনুষ্ঠান আগামী বৃহস্পতিবার ৬ আগস্ট থেকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া : অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার অনুষ্ঠানে কোনো পরিবর্তন করা হয়নি অর্থাৎ, সর্বোচ্চ ১০জন ব্যক্তি কোন অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার অনুষ্ঠানে যোগ দিতে পারবেন।

ভিক্টোরিয়াবাসী আবারো ৬সপ্তাহের এই লকডাউনে তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের উপরে কি প্রভাব ফেলবে তা নিয়ে এই মুহূর্তে চিন্তিত আছেন মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। সমগ্র ভিক্টোরিয়াবাসীর এখন একটাই প্রার্থনা যেনো এই ৬সপ্তাহেই ইতি ঘটে এই দীর্ঘ লকডাউনের।

তথ্য সূত্র : এবিসি নিউজ, দি এইজ ও নাইন নিউজ।